বিলুপ্ত মেঘের আকাশে হঠাৎ ঝনাৎ। আমি শব্দের রশ্মি ধরে ধরে উৎসের দিকে যাই। মাঝ পথে ঘ্যাচাং করে কে যেন রশ্মির লেজ কেটে দেয়। দাঁড়ানো আমাকে আবিষ্কার করি কোজাগরি পূর্ণিমার চাঁদের কৌণিক দূরত্বে – এক ন্যাড়া তালগাছের নিচে। পাশে টাকপড়া কাশবন চিরে চলে যাওয়া শীর্ণ অপুষ্ট খাল।

কী ঝলমলে রাত! রূপালি ঝালর! আচ্ছা, কোনো পূর্ণিমায় এই ঢিবির পাশ দিয়ে কি দেবী লক্ষ্মী পার হয়েছিলেন? তার পাদপদ্ম কি ছুঁইয়েছিলেন তালগাছ তলায়? এখানে বসে কথা বলেছিলেন প্রায় চার লাখ কিমি দূরের চাঁদের সাথে? আচ্ছা, তালগাছটার মাথা মটকে দিল কোন দুরাচার?

লোকমুখে শোনা, হরিপদ জলদাসের ঠাকুরদা এই খালে চাঁই পেতে মাছ ধরতেন রাতের বেলা। এ রকম এক পূর্ণিমায় চাঁই থেকে খালুইয়ে মাছ ঢালার সময় একটি কুঁচে লাফ দিয়ে উঠলে তিনিও নাকি লাফ দিয়ে ওর ঘাড় চেপে ধরেন। সে মুহূর্তেই ঘটনাটি ঘটে। একটা শোঁ শব্দের সাথে জল-কাদা ছিটিয়ে ধপাস করে কী যেন পড়ল তার থেকে মাত্র দশ হাত দূরে। তিনি ইতিমধ্যে একটা লাফ দিয়ে ফেলেছিলেন বলে অজ্ঞাত বস্তুর পতনে দ্বিতীয় লাফের প্রস্তুতি নিতে পারেননি। শুধু ভয় পেয়েছিলেন অল্প কিছুক্ষণের জন্য। ঠাকুরদা তখন যুবক। জওয়ান মানুষের ভয় পেতে নেই। হাত ফসকে কুঁচে মাছটি তিড়িং বিড়িং করে জলে নেমে গেলেও তিনি আক্ষেপ না করে পতনস্থলের দিকে পা বাড়ান।

না, রাতের বেলায় তেমন কিছু দেখতে পাননি হরিপদের ঠাকুরদা। পরদিন তিনি তার ঠাকুরদার কাছে কাহিনীটি বর্ণনা করলে বুড়ো বললেন, ‘চল, আমি যামু।’

হরিপদের ঠাকুরদা তার ঠাকুরদাকে নিয়ে সাবধানে অকুস্থল পরিদর্শনে গেলে বুড়ো ঠাকুরদা পা টিপে টিপে খালের পানিতে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন। কিন্তু তিনিও কোনোকিছুর সন্ধান করতে পারলেন না। তবে বার বার পায়ে পাথরের মত কিছু একটা ঠেকলে তিনি নাতিকে ইশারা করলেন, ‘উঠা।’ নাতি কষ্ট করে দু’হাত পানির নিচ থেকে বস্তুটি উঠালে দেখা গেল এ যে প্রায় দশ সের ওজনের একটি লৌহপিণ্ড।

পরে নাকি সেই মহাজাগতিক – পরে জেনেছিলেন ওটি পুড়ে যাওয়া উল্কার এক ক্ষুদ্রাংশ – ধাতু দিয়ে হরিপদের ঠাকুরদা কোচ, সড়কি, দা, বটি, ইত্যাদি তৈরি করেছিলেন। ওসব অবশ্য যুদ্ধের সময় লুট হয়ে গেছে। তবে হরিপদের দাবি, যে ছোরাটা সে প্রতি রাতে কোমরে গুঁজে মাছ মারতে বেরোয় ওটা নাকি সেই মহামূল্যবান ধাতুর তৈরি।

আমি হরিপদের কাহিনী ভাবতে ভাবতে তালগাছের মাথার দিকে তাকাই। গাছটা ন্যাড়া বলেই হয়তো ভয় লাগছে না। আচ্ছা, এই তালগাছের মাথায়ও কি কোনো উল্কাপিণ্ড পড়েছিল? মনে হয় না। নইলে ব্যাপারটি চাউর হত। তবে বজ্রপাত হতে পারে। কিন্তু আমি শুনিনি। আগে যতবার দেখেছি, এভাবেই মুণ্ডহীন দেখেছি।

খালপারের উঁচু জায়গাতে তালগাছটি জন্মানোর কারণে এখানে লক্ষ্মী না বসলেও পথচারী, রাখাল কিংবা কল্কেটানা ছোকরারা যে বসত সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। এখন হয়তো ছায়া নেই বলে কেউ বসে না। কিন্তু আমি এখানে এলাম কেন? এই দুপুর-রাতে?

ঝনাৎ শব্দের রশ্মিতো রশি নয়; ঘ্যাচাং করে কে কেটে দিল? আমি শুধু চাঁদ চিনি; আর শুকতারা। অদ্ভুতুড়ে রাতের আকাশের অন্য কিছুর নাম জানি না।

আমি ন্যাড়া তালগাছের গোড়ায় শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে শব্দের উৎস খুঁজি। রশ্মির বিচ্ছিন্ন প্রান্তও খুঁজি। আকাশের দিকে আগে কখনও এমন হা করে তাকাইনি। আজ তারার দাপট নেই। পুরো আকাশটাই চাঁদের দখলে। আচ্ছা, শব্দটা কি চাঁদ থেকে এসেছিল? ওখানে কি আর্মস্ট্রং কোনো যন্ত্রপাতি স্থাপন করে এসেছিলেন? নাকি বিশ্বমোড়লের কেউ ওখানে নতুন মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে? বলা যায় না; যে কোনোটি হতে পারে।

কিন্তু আমি কেন এখানে? আজ কি লক্ষ্মী আসবেন? এখানে? চাঁদ থেকে? তা কেমন করে হয়? শুনেছি, তিনি পদ্মে স্থিত। কেউ বলে, বেলপাতার উল্টোপিঠেও তিনি থাকেন। কেউ আবার হাতীর কপাল কিংবা গরুর পিঠের কথাও বলে থাকে। হাতের আঙুলের মাথায়ও নাকি তিনি থাকেন বলে পণ্ডিতরা বলেন। এবারের পূজোর সময় তিনি কোথায় অবস্থান করছেন তা কেউ কি বলতে পারবে? আচ্ছা, এমনওতো হতে পারে তিনি চাঁদে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এবারের কোজাগরী পূজোয় হয়তো তিনি চাঁদ থেকে নেমে আসবেন।

শুনেছি আকাশের নক্ষত্রগুলি দেবতাদের ঘর। দেবতারা সেখানে বসে বসে সোমরস পান করেন। রূপালি আলোয় টইটুম্বুর এই চাঁদকেও নাকি তারা পান করেন। চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার কষ্ট লাগছে। দেবতারা চুমুক শুরু করলেই এই হাস্যময় লাস্যময় চাঁদ ধীরে ধীরে তার অঙ্গ হারাতে থাকবে। আমি এই কষ্ট-কল্পনা করার জন্যই কি এখানে এসেছি?

হরিপদ আজ মাছ ধরতে বেরোবে না। নইলে তার সাথে চুটিয়ে গল্প করতাম আর মনে মনে আকাঙ্ক্ষা করতাম, আহা! আজ যদি একটা উল্কাপিণ্ড ন্যাড়া তালগাছটার নিচে পড়ত। দিব্যি করে বলছি, আমি ওটায় ভাগ বসাতাম না। বরং হরিপদকে দিয়ে দিতাম। সে তার ঠাকুরদার মত সেটা কাজে লাগাত।

হরিপদ অনেক জ্ঞান রাখে। তার ঠাকুরদা তাকে কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল আরোও কতকিছু চিনিয়েছেন। আমাকে সে অনেকবার তার সাথে আসতে বলেছে; সে সাতজন ঋষির সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে। কৃষ্ণপক্ষে নাকি তারাগুলো পরিষ্কার দেখা যায়। আমি আসি আসি করেও কেন যে আসিনি। আমার অন্ধকার ভাল লাগে না। তবু আজ যদি সে আসত!

শীতল হাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমার চোখ বুজে আসছে। আবার নিশাচর পাখির ডানার আওয়াজে তন্দ্রা কেটে যাচ্ছে। কী যে অদ্ভুত সময়! এভাবে পূর্ণিমা উপভোগ করার সুযোগ আমার আগে কখনও হয়নি। …… হায় মহিমা! ক’বছর আগে এরকম এক জ্যোৎস্না-রাতে মহিমা কোন বনে যে হারিয়ে গেল, আর ফিরে আসেনি। সে অন্য এক কাহিনী। আমি আজ কীভাবে যেন এখানে এসে পড়লাম। আচ্ছা, কোন সে রশ্মির টানে আমি এসেছি?

সপ্রভ জ্যোৎস্নায় তারার উপস্থিতি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ায় চেনা শুকতারাটিও আজ খুঁজে পাচ্ছি না। আচ্ছা, আমি এখানে শুয়ে আছি কেন? রাত এতক্ষণে পুরোপুরি থিতু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি একাকী, এত রাতে – ভয় লাগছে না কেন?

বাড়িতে ফিরে যাব নাকি? কিন্তু যে রশ্মির পিছু পিছু এসে আমি এখানে বৃন্তচ্যুত হলাম তার রহস্য কী? ঝনাৎ শব্দটার উৎপত্তিই বা কোথায়? আচ্ছা, এমনওতো হতে পারে যে আদৌ কোনো শব্দ হয়নি; আমি ভুল শুনেছি। আর ওই রশ্মিটা? ওটা কি কোনো ভিন জগতের বস্তু – হরিপদের ঠাকুরদার লৌহখণ্ডের মত? ওটি কি আমাকে সম্মোহিত করে এখানে নিয়ে এসেছে।

আমি এই বিভ্রান্তি কাটাতে চাই তাই শোয়া থেকে উঠে বসলাম – এখন ফেরা উচিৎ। কিন্তু এ কী! ওই যে! সেই রশ্মিটি ন্যাড়া তালগাছের অনেক উপর থেকে সর্পিল ভঙ্গিমায় নেমে আসছে আমার দিকে। এখন আমার ভয় ভয় করছে। রশ্মিটি আমার সামনে এসে ঘূর্ণিবায়ুর মত দ্রুত ঘুরতে ঘুরতে থেমে গেল।

আমার মূর্ছা যাবার অবস্থা। চোখের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে বর্ণালী আলোর ছটায় তৈরি এক মানবাকৃতির এক প্রাণী। আমাকে শান্ত করে সে প্রথম যে বাক্য উচ্চারণ করল – ‘ভয় পেয়ো না’ – তা অনেকটা নারীকণ্ঠের মত কিন্তু যান্ত্রিক। মহিমার কণ্ঠ কি এমন যান্ত্রিক ছিল? আমি ঝনাৎ শব্দের সাথে তার কণ্ঠস্বরের মিল খুঁজতে চেষ্টা করলাম। সে অভয় দিলেও আমি কিছু বলতে পারছি না, বলার শক্তি ফুরিয়ে গেছে। সে আবার বলল, ‘আমার মত আরোও অনেকে তোমাদের পৃথিবীতে আসাযাওয়া করে।’

আমার মাথায় এলোমেলোভাবে হাজারটা প্রশ্ন এসে ভীড় করলেও সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়ে যাই এই ভেবে যে অন্য গ্রহের বা অন্য জগতের প্রাণী হয়েও সে কেমন গড়গড় করে বাংলায় কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তাকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে পারছি না। আমি ক্রমশ বিবশ হয়ে যাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি আমার গায়েও অল্প অল্প করে বর্ণালী আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

হঠাৎ হীরক-দ্যুতিতে উজ্জ্বল দেখাল প্রাণীটির মুখ; মনে হল সে যেন একটুখানি হাসল। তারপর বলল, ‘তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব।’