মসজিদটি বাড়ি থেকে চার টিলা দূরত্বে। তবে এক টিলা থেকে আরেক টিলার মাঝখানে ফাঁকা ধানী জমিও আছে। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের আগে এই সীমান্ত এলাকা পুরোটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। আসামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাড়া খেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন- বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী অন্যান্য পাহাড়ী এলাকার মত বিরোধপূর্ণ লাঠিটিলাতে এসেও বনজঙ্গল পরিস্কার করে বসতি স্থাপন করে। আরাকান পর্বতমালা থেকে নেমে মিজোরাম চট্টগ্রাম ত্রিপুরা হয়ে যে পাহাড়ী পঙক্তিমালা খাসিয়া নাগা অঞ্চলের দিকে চলে গেছে তারই একটি রেখা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এই এলাকা।
দুলুর মিয়ার বুকের ব্যথাটা সহনীয় পর্যায়ে থাকায় তিনি আজ লাঠিতে ভর দিয়ে জোহরের নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন। বাড়ির মহিলারা বারণ করলেও শোনেননি। নামাজ শেষে ছোট ছোট পা ফেলে বাড়ি ফেরার পথে উঁচু টিলার পাশে একটু দাঁড়িয়ে তিনি দম নিলেন। তারপর একটা ভারী শ্বাস ফেলে টিলার চূড়ার দিকে তাকালেন। চার যুগ আগে যেমন ছিল টিলাটি এখন আর তেমনটি নেই। আগে অনেক গাছ-গাছালি ছিল, মুলিবাঁশ ছিল। লোকজন জ্বালানিকাঠ সংগ্রহ করার জন্যই শুধু এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন পাহাড়-টিলায় যেত। অবশ্য দক্ষ শিকারীরা ফাঁদ পেথে এক সময় প্রচুর বনমোরগও ধরত। এমন কি বেশ কিছু হরিণও ছিল এসব পাহাড়ে – লোকজন অনেক আগেই তা সাবাড় করে দিয়েছে। এখন সেসব পাহাড়-টিলা প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া গুটিকয় গাছ ছাড়া তেমন ঝোপও নেই। ক্রমবর্ধমান জনবসতির চাপে এই পাহাড়ি এলাকার রূপ পুরোপুরি পালটে গেছে। সাম্প্রতিককালের ভারতের সাথে সীমানা ভাগাভাগির সমাপ্তিতে এখন এই এলাকাও পল্লীবিদ্যুতের আলোয় আলোকিত।
‘দাদা!’
নাতি পঙ্খির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পান দুলু মিয়া। শরীরের এ নাজুক অবস্থায় তার বাইরে যাওয়া অনুচিৎ। কিন্তু তিনি সাময়িক সুস্থ বোধ করলে অন্তত মসজিদের দিকে যাবেনই – কারুর কথা শুনবেন না। এখন নাতি চলে এসেছে – আর দাঁড়ানো যাবে না। কোনো কথা না বলেই দুলু মিয়া নাতির হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেন।
বড় ছেলে বেলাল গতকাল কিছু আয়ুর্বেদী ওষুধ নিয়ে এসেছে। জুড়ি শহরে প্লাষ্টিক পণ্যের একটি দোকান আছে তার। মোটামুটি ভালই চলে। একজন পরিচিত গ্রাহকের চাপেই সে বড়লেখার এক বৈদ্যের কাছ থেকে কিছু বড়ি এবং দুই বোতল ভেষজ ওষুধ বাপের জন্য নিয়ে এসেছে। ডাক্তার-হাসপাতাল-ল্যাবরেটরীতে দৌড়াদৌড়ি করে ইতিমধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। ডাক্তারের নের্দেশিত নিদান অনুযায়ী চিকিৎসা চালানো বেলালদের সাধ্যের বাইরে। ছোটভাই হেলাল বাহরাইন থেকে চল্লিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। তা চিকিৎসার প্রথম দিকেই খরচ হয়ে গেছে। বেলালেরও কিছু সঞ্চয় ছিল। তা-ও প্রায় শেষ হওয়ার পথে। তাই কেমোথেরাপি রেডিওথেরাপি এসবের পরিবর্তে কিছু অ্যালোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি আর আয়ুর্বেদীর মিশেলে ক্যান্সারাক্রান্ত পিতার চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। এটা সবারই জানা এ রাজরোগের কোনো চিকিৎসা নেই – মৃত্যু নিশ্চিত। তবুও সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী শেষমুহুর্ত পর্যন্ত নিষ্ফল চেষ্টা করে যায়; অন্তত যন্ত্রণার তীব্রতা কমানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কখনও একটু আরাম বোধ করলে সবাই মনে করে ওষুধ হয়ত কিছুটা কাজ করেছে। দুলু মিয়ার শরীরও আজ এরকম একটু স্বস্তিদায়ক মনে হওয়ায় তিনি মসজিদে গিয়েছিলেন জোহরের নামাজ আদায় করতে।
এখন দুলু মিয়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেই সারা জীবনের টুকরো টুকরো চিত্রনাট্য দ্রুতবেগে ইন-আউট করতে থাকে। তবে খুব বেশি ফিরে আসে একাত্তরের দিনগুলি। বাড়ির কাছের সেই উঁচু টিলাটি স্মৃতিটাকে আরোও বেশি করে উস্কে দেয়। এই সাথে মেজর ডালিমের ছবিটাও বার বার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ওই ব্যাটা যদি ইতিহাসের নৃশংস ঘটনার কুশীলবদের একজন না হত তাহলে সে-ই হত দুলু মিয়ার জীবনের সবচেয়ে পূজনীয় ব্যাক্তিত্ব। যদি পাপিষ্ট হয়ে দেশান্তরী না হত তাহলে সে যেমন হতে পারত এ দেশের সূর্যসন্তান তেমনি দুলু মিয়ার জীবনটাও হতে পারত অন্য রকম; তার জীবনের দুঃখকষ্টও কিছুটা লাঘব হত, সরকার-প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসাও পাওয়া যেত। কিন্তু সারা জীবনের গলদঘর্ম প্রচেষ্টার পরেও নিজের নামটি তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তুলতে পারেননি। সহযোদ্ধা কতজনই মেম্বার-চেয়ারম্যান হয়েছে, নেতা হয়েছে, কিন্তু দুলু মিয়া একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও স্বীকৃতি পাননি। পরিচিত অনেক নেতার নিকট তিনি ধর্ণা দিয়েছেন, তাদের কথানুযায়ী দফায় দফায় অনেক টাকাও দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নামটা উঠেনি। তাই একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য কিছুই তিনি পাননি।
নামাজ থেকে ফেরার পথে যে টিলার সামনে দুলু মিয়া দাঁড়িয়েছিলেন এ যাবৎকালে যতবার এই পথে তিনি গিয়েছেন ততবারই তার মনে হয়েছে তিনি ওখানে বাকীর গোঙানি শুনতে পান। রক্তমাংসমাখা বাকীর দেহ কাঁধে নিয়ে তিনি বর্ডারের নালাটি পার হয়ে যখনওপারে যাচ্ছিলেন তখন বাকীর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোনোর মত অবস্থা ছিল না। শুধু গোঙানির শব্দই শুনেছিলেন দুলু মিয়া, তা-ও আবার ভারতীয় সীমানায় ঢোকার পরপরই বন্ধ হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল কোনোরকমে তাকে ধর্মনগরে নিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা। শেষ পর্যন্ত ধর্মনগরে গেলেও বাকীর কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়নি; তবে মেজর ডালিমের আঙুল উড়ে-যাওয়া হাতের চিকিৎসা হয়েছিল।
ভারতে এক সপ্তাহের ট্রেনিং শেষে কচুরগুলের বাকী মিয়া এবং লাঠিটিলার দুলু মিয়াকে মেজর ডালিমের গাইড হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। জুলাইর প্রথম সপ্তাহে মেজর ডালিম সীমান্তবর্তী গ্রাম লাঠিটিলায় ঢুকলেন রেকি করতে। যদিও যুদ্ধকালীন সময়ে হানাদাররা সীমান্তরেখায় গিয়ে ক্যাম্প করেনি, তবুও খবর ছিল সীমান্তের অদূরে এক টিলার উপরে পাকসেনারা আস্তানা গেড়েছে। রাজাকারদের সহায়তায় বাংকার খুঁড়ে তাতে তারা অবস্থান নিয়েছে। ডালিম তার গাইডসহ খুব সতর্কতার সাথে দুলু মিয়ার বাড়ির পাশের উঁচু টিলার চূড়ায় উঠে পড়েন। তারপর বাকী মিয়ার হাতে একটি দূরবীন দিয়ে তাকে একটি গর্জন গাছে উঠিয়ে দেন। গাছের উঁচু ডাল থেকে চতুর্দিকে গভীরভাবে তাকালেও বাকীর চোখে কিছু পড়ে না। এতে মেজর ডালিম অধৈর্য হয়ে বলেন, ‘দুলু, তুমি স্টেনগান রেডি করে নিচে পাহারা দাও, আমি একটু ওঠার চেষ্টা করি।’
নিচে যখন দুলু মিয়া আশেপাশের নজরদারিতে ব্যস্ত তখনই ট্ ট্ ট্ ট্ শব্দে নিঃশব্দ পাহাড়ি এলাকা কেঁপে ওঠে। দুলু মিয়া স্থিত হয়ে ওঠার আগেই তার সামনে ধপাস করে বস্তার মত কিছু একটা পড়ে – আরে, এ-তো বাকী মিয়া, বুক আর পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।! দুলু মিয়া চিৎকার করার সাহসও হারিয়ে ফেলেন তখন। কিন্তু গাছের প্রায় মাঝামাঝি স্থান থেকে মেজর ডালিম যখন চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘ওকে নিয়ে ওপারে যাও’, তখন দুলু মিয়া উপর দিকে তাকিয়ে দেখেন আঙুলছেঁড়া হাত নিয়ে ডালিম গাছ থেকে বানরের মত নামার চেষ্টা করছেন। দুলু মিয়া এ মুহুর্তে কী করবেন সেটা ভাববার আগেই ডালিম আবার চিৎকার করে বলেন, ‘লোকজন ডাক, কুইক।’ দুলু মিয়ার চোখে আজ অবধি এসব ঘটনা ছবির মত জ্বলজ্বল করে ।
নির্ধারিত নিয়তির মতই মাসখানেক পর দুলু মিয়া শয্যা নিলেন, এ যেন অবর্ণনীয় বিষাদের কাল। গোটা পরিবার বিভীষিকার কাল মেঘের কুণ্ডলীর ভেতর। দুলু মিয়ার অসহনীয় রোগযন্ত্রণা মুহুর্মুহু বজ্রাঘাতের মত। রুগির সাথে সাথে পরিবারের সবার নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এরকম সময় হঠাৎ করে এক বিকালে কিছু খেজুর, এক বোতল জমজমের পানি এবং একটি টুপি নিয়ে এসে হাজির হন ফরিদ আলি – জুড়ি মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডের সদস্য। ক’দিন আগে তিনি হজ্জ্ব করে ফিরেছেন। দুলু মিয়া মৃত্যু-যন্ত্রণার ভেতর থেকেও কয়েক মুহুর্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন ফরিদ আলির দিকে। তখন তার চোখ থেকে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
বাড়ির সঙ্কটাপন্ন অবস্থার মধ্যেও টোষ্ট বিস্কুটসহ এক কাপ চায়ের ব্যবস্থা করা হল ফরিদ আলির জন্য। বিষাদময় পরিস্থিতি কিংবা নিজের অনুশোচনার কারণেই হোক ফরিদ আলিকে খুব কাতর দেখাল। দুলু মিয়া বিড়বিড় করে কিছু বলতে চাইলেও কিছুই বোঝা যায় না। তারপরও ফরিদ আলি চেয়ার টেনে নিয়ে দুলু মিয়ার মুখের কাছাকাছি বসেন এবং আস্তে আস্তে বলেন, ‘ভাই, আমারে মাফ করে দাও।’
দুলু মিয়া আবার একটু স্থির হয়ে তাকান ফরিদ আলির দিকে। এখন ভর্ৎসনা করার পরিস্থিতি নয়। তবু এটাতো মিথ্যা নয়, এই ফরিদ আলির পিছনেও অনেক ঘুরেছেন দুলু মিয়া। গতরে-সাহসে বিশাল ফরিদ আলি যুদ্ধের সময় জুড়ি-কুলাউড়া রুটের মুড়ির টিন বাসের হ্যাণ্ডলম্যান ছিলেন। যুদ্ধে না গিয়েও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। তারপর একসময় মোটর শ্রমিক নেতা হওয়ার জোরে মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডে জায়গা করে নেন। অশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা যারা প্রাথমিক সনদপত্র সংগ্রহ করেনি কিংবা করলেও তা হারিয়ে ফেলেছে তারা এক সময় দেখল সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে শুরু করেছে তখনই তারা দৌড়ঝাঁপ আরম্ভ করে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফরিদ আলির মত লোকের হাতে ততক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের সুফল চলে গেছে। ফরিদ আলিরা নয়-ছয় বুঝিয়ে নিরীহ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা নিতে থাকে। দুয়েকজনের যে কাজ হয়নি এমন নয়, কিন্তু দুলু মিয়ার নাম আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঠাঁই পায়নি।
দুলু মিয়া আবার অস্থিরতা আরম্ভ করলে ফরিদ আলি দ্রুততার সাথে বলতে আরম্ভ করেন, ‘দুলু ভাই, আমি আল্লাহ্র ঘর থেকে এসেছি। এখন তুমি মাফ না করলে আমার হজ্জ্ব কবুল হবে না। তুমিতো জান, আমি যুদ্ধ করি নাই। তারপরও আমি নেতা হয়েছি। তুমি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছ, অথচ খাতায় তোমার নাম উঠে নাই। তুমি কি জান, এ দেশের কত আমলা মন্ত্রী হানাদারের সহযোগী হয়ে কাজ করেও মুক্তিযোদ্ধা সেজে সব সুবিধা নিয়েছে। যারা মরে গেছে তারা গার্ড অব অনার নিয়ে গেছে। আমি মরলেও আমাকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে। অথচ তোমাকে কেউ মুক্তিযোদ্ধা বলবে না। আমিও তোমার জন্য কিছু করতে পারি নাই। আমি মনস্থ করেছি আমি মরার আগে সবাইকে সত্য কথাটা বলে যাব যে আমি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না। আমাকে যেন গার্ড অব অনার না দেয়া হয়।
এসব কথা শুনে দুলু মিয়ার যন্ত্রণার মাত্রা যেন আরোও বেড়ে যায়। তিনি কিছু বলতে পারছেন না, কিন্তু গোঙানির শব্দে বোঝা যায় চিৎকার করে যেন তিনি কিছু বলতে চান।
ফরিদ আলি চেয়ার থেকে ওঠার আগে অস্থির হাতে পাঁচ হাজার টাকার একটা তোড়া দুলু মিয়ার হাতে গুঁজে দিতে দিতে বলেন, ‘বল ভাই তুমি আমাকে মাফ করেছ। বল!
দুলু মিয়া কিছুই বলতে পারেন না, তবে একবার চোখ বড় করে তাকান ফরিদ আলির দিকে। ফরিদ আলি তখনও দুলু মিয়ার হাত চেপে ধরে আছেন।
‘আমি যদি বেঁচে থাকি, কথা দিলাম, আমি এসে একাই তোমাকে স্যালুট করে কবরে নামাব’, বলে ফরিদ আলি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।
তখন শরীরের সকল শক্তি সঞ্চয় করে সবাইকে চমকে দিয়ে দুলু মিয়া টাকার তোড়াটা ছুড়ে মারেন ফরিদ আলির গায়ে।