বর্ষণমুখর বোটানিক্যাল গার্ডেন

বৃষ্টি ভেজা সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ
  • 0
  • ১৮৬
ডঃ চৌধুরী প্রায়ই কিছু একটা চিবান, কখনও মনে হয় চুইংগাম হতে পারে, কিন্তু আবার মনে হয় – না, চুইংগাম হলেতো একটা সুগন্ধ বেরোত মুখ থেকে কিংবা চোয়ালের আন্দোলনের ধরন দেখে আঁচ করা যেত। কৌতুহল হলেও আবু জাফর ডঃ চৌধুরীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন না; এটা খুবই অশোভন। ডঃ চৌধুরী আজ জোর করে আবু জাফরকে গুলশানের একটা রেষ্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে নিয়ে গেছেন। ফেরার পথে তারা লেকের পাড় ধরে গল্প করতে করতে অফিসে ফিরছেন। অন্য সময়ের মত ডঃ চৌধুরীর মুখ মৃদু নড়ছে।

নিউজিল্যাণ্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাওসার চৌধুরী পঁচিশ বছর আগে ওয়েলিংটনের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়ে ওখানেই স্থায়ী আবাস গেড়েছেন। দেশে খুবই কম আসা হয়। বিয়ের পর দুই অথবা তিনবার এসেছেন । তা-ও পুরোপুরি বিনোদন বা বেড়ানোর জন্য নয়। অনেকটা এবারকার আসার মত। একটা কাজ নিয়ে এলেন, মাতৃভূমিও বেড়ানো হয়ে গেল। একবার এসেছিলেন তার ইউনিভার্সিটির একটা কাজের সূত্রে; দ্বিতীয়বার জাতিসংঘের একটি মিশনের সদস্য হয়ে। এবারও এসেছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি প্রকল্পের মূল্যায়ন করার দায়িত্ব নিয়ে। সময় দুই সপ্তাহ। এই প্রকল্পটির প্রজেক্ট ম্যানেজার আবু জাফর।

কাকতালীয়ভাবে ডঃ চৌধুরী এবং আবু জাফর দুজনই প্রায় সমবয়সী। চৌধুরী যখন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিলেন জাফর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র। তবে আগে কখনও তাদের যোগাযোগ হওয়ার সুযোগ ঘটেনি। সেই ছাত্রত্বকালীন সময়ের কথা এবং পরবর্তীকালে কে কোন পথ ধরে কীভাবে হাঁটলেন সেই গল্প করতে করতে অফিসে ফিরে এলেন দুজন। কাজে হাত দেবার আগে অবশ্য আবু জাফর আরেকবার ডঃ চৌধুরীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে নিউজিল্যাণ্ড ফিরে যাবার আগে অবশ্যই ভাবীকে নিয়ে তার বাসায় একটু ডাল-ভাত খেয়ে যেতে হবে।

ছোট বোন রুমানা অনেকেদিন পর বড় বোন সুমনাকে পেয়ে যেন সেই কিশোরীবেলায় চলে গেছে। উত্তরার বাড়িতে বড় ব্যবসায়ী স্বামীর সাথে সুখের সংসার রুমানার। একটাই সন্তান, মেয়ে, টিপ, এ-লেভেল করছে। শালীর জোরাজুরিতে ডঃ চৌধুরী এবার হোটেলে উঠতে পারেননি। রুমানা বলেছে, ‘দুলাভাই আমার বাড়িতে না থাকুন তাতে আপত্তি নেই, আপুকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না। ’ অগত্যা দুলাভাই বাধ্য হয়েছেন। সুমনা বলেছেন টিপকে তিনি নিউজিল্যাণ্ডে নিয়ে যাবেন। অধ্যাপক স্বামী তার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন নিশ্চয়ই। রুমানা মেয়ের ব্যাপারে তত উৎসাহ না দেখিয়ে বরং বোনকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত। সকালে যাচ্ছে দিলু রোডের খালার বাসায় তো বিকেলে ঘুরে আসছে যমুনা ফিউচার পার্ক। আবার হয়ত সন্ধ্যায় হুট করে চলে যাচ্ছে বসুন্ধরা শপিং মলে। শুধু আত্মীয়স্বজন আর শপিং মলই নয়, কখনও রবীন্দ্র সরোবর, কখনও টিএসসি আবার কখনও হাতীর ঝিলেও চক্কর লাগাচ্ছে সুমনাকে নিয়ে। এরই মধ্যে একবার সদরঘাটও ঘোরা হয়ে গেছে তাদের। যতই জনাকীর্ণ আর নোংরা হোক, নিজের শহর বলে কথা; সুমনা দেখছেন আর চোখ বড় করছেন, ‘সব কিছু পাল্টে গেছেরে বাবা! কিছুই চেনা যাচ্ছে না!’

সন্ধ্যায় ডঃ চৌধুরী ফিরে এলে রুমানা অভিমানী হয়ে ওঠে। ‘শুধু কাজ আর কাজ, আমাকে সময় দেবেন না দুলাভাই?’

‘আরে তোমার জন্যইতো সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এসেছি।’ বলে, ডঃ চৌধুরী কপট হাসেন।

এই সুযোগে সুমনা ফোঁড়ন কাটতে ছাড়লেন না। ‘চাপাবাজি কর না। কাজ ছাড়া কি একবারও এসেছ দেশে? সবসময় ধান্ধা নিয়ে থাক।’

ডঃ চৌধুরী বললেন, ‘চিন্তা কর না, এবার ঢাকার সবার সাথে দেখা করে যাব। এখনও এক সপ্তাহ সময় আছে। আগামি শুক্রবার সকালবেলা সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়ব...।’ হঠাৎ থেমে বললেন, ‘ওহ, শুক্রবার না; শনিবার। বলেছিলাম না শুক্রবারে একটা দাওয়াতে যেতে হবে। প্রজেক্ট ম্যানেজার খুব জোর করে ধরেছে। খুবই আন্তরিক ভদ্রলোক।’

‘তাহলে বোটানিক্যাল গার্ডেনের কী হবে? ওদিকে নাকি বাঁধটাধ কতকিছু করেছে?’ সুমনা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন।

রুমানা বলে, ‘ছিল। বেড়িবাঁধ তৈরি করার পর কী যে সুন্দর ছিল! বর্ষাকালেতো একটা প্রাকৃতিক হ্রদ হয়ে যেত। এখন গিয়ে প্রকৃতি খুঁজে পাওয়া যাবে না; বেনিয়ারা মাটি ভরাট করে প্রকৃতিকে ঢেকে দিয়েছে।’

‘হয়ে যাবে।’ ডঃ চৌধুরী চুটকি বাজিয়ে বলেন, ‘শুক্রবারে লাঞ্চ করে বেরিয়ে যাব, বোটানি বেড়িবাঁধ ঘুরে সন্ধ্যায় প্রজেক্ট ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে হাজির হব। কাছেই তার বাসা, পল্লবীতে। ’

রুমানা বলে, ‘তো হয়ে গেল। আর ফাঁক-ফোঁকরে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করার কাজ সেরে নেবেন ।’

জাফর-গিন্নি মন-প্রাণ উজাড় করে ভিআইপি অতিথিদের জন্য যা কিছু সম্ভব সব করছেন। মেনুর মধ্যে আমিষ, নিরামিষ, ভর্তা, চচ্চড়ি, শাক, সালাদ, মিষ্টান্ন ইত্যাদির এক বিশাল সমাবেশ। আমিষের মধ্যে সরষে-ইলিশ আর গরুভূনার বিশেষ পদ তৈরি করা ছাড়াও এই অসময়ে তিনি স্বামীকে দিয়ে সজনে ডাঁটাও সংগ্রহ করিয়েছেন। অভ্যাস না থাকলেও আবু জাফর ঘর গোছগাছ করতে খাতুনের মাকে সোৎসাহে সাহায্য করে যাচ্ছেন। কর্তার কর্মোদ্দীপনা দেখে গৃহপরিচারিকা খাতুনের মা আঁচলের আড়ালে মুখ টিপে হাসছে মাঝে মাঝে। এরই মধ্যে গিন্নি এসে জাফরকে তাড়া দিচ্ছেন মেহমানদের ফোন করে আজকের দাওয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। উঁচু সারির মানুষ, কখন না অন্য কোন জরুরি কাজে ফেঁসে যান।

দুপুর থেকেই আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে । কিন্তু স্বেচ্ছায় কথা দিয়ে ফেলেছেন যে তিনি বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেটে ডঃ চৌধুরীকে রিসিভ করবেন এবং ঘোরাঘুরিতে সঙ্গ দেবেন তাই আবু জাফর আগেভাগেই চলে এসেছেন। কে জানে কত বছর পর তারা এদিকে ঘুরতে আসবেন; তাছাড়া ডঃ চৌধুরী একা নন, সাথে তার মিসেস। সৌজন্য এবং স্বাচ্ছন্দের জন্যওতো একজন গাইড থাকা উচিৎ।

বিকেল চারটার দিকে টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ডঃ চৌধুরীর গাড়ি এসে বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেটে থামল। তখনই আবু জাফরের মনে হল তিনি কত বড় স্টুপিডের মত কাজ করেছেন। বাড়তিতো আনেনই নি, নিজের জন্যও একটা ছাতা সঙ্গে আনেননি। চৌধুরী দম্পতির ভাবনায়ও ছাতার কথা আসেনি। আবু জাফর লজ্জায় লাল হয়ে অতিথিদের কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে থাকলেন তার বোকামির জন্য। বিব্রতকর অবস্থায় মিসেস চৌধুরীকে কাঁচুমাচু হয়ে সালামটা দিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি; কুশলাদি জিজ্ঞেস করবার মত বাড়তি কোনো কথাও খুঁজে পেলেন না। ডঃ চৌধুরী বিচক্ষণ ব্যক্তি; স্বভাবমত তার চোয়াল নাড়াতে নাড়াতে তিনি এক তুড়িতে বিষয়টা হালকা করে ফেললেন, ‘আরে ধুর, ছাতা লাগবে কেন, এটা একটা বৃষ্টি হল? চলুনতো, হাঁটা দিই।’ তার কথায় মিসেস চৌধুরীকেও উৎফুল্ল ও উত্তেজিত দেখা গেল।

কিন্তু বিধি বাম। গেট পেরিয়ে মূল বাগানে পৌঁছার আগে হিজল তমালঢাকা পথটুকুতে থাকা অবস্থায়ই বৃষ্টি ঘন হয়ে এল। ওই পথের ডানপাশের কৃত্রিম হ্রদ ঘেষে সিমেন্টের বেঞ্চসহ কয়েকটি ছাউনি আছে; গা বাঁচানোর জন্য আবু জাফর বললেন, ‘চলুন, ছাউনির নিচে একটু বসি।’ প্রায় দৌড়ে গিয়ে তারা একটা খালি ছাউনির নিচে আশ্রয় নিলেন।

ডঃ চৌধুরী একটু হাঁফাতে হাঁফাতে বেঞ্চে চুপ করে বসে পড়লেও মিসেস চৌধুরী তার চোখের বড় সাইজের গোগলসটা খুলতে খুলতে উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘ওয়াও, ভেরি ইন্টারেস্টিং!’ আবু জাফর ততক্ষণে স্বতস্ফূর্ত হয়ে এসেছেন; তিনিও মিসেস চৌধুরীর আনন্দকে বাড়িয়ে দিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হোয়াট অ্যান অ্যাডভেঞ্চার!’ আর ঠিক তখনই তিনি তড়িতাহত হলেন।

আবু জাফর নিশ্চিত, শারীরিক অনেক পরিবর্তন হলেও মিসেস চৌধুরীই পঁচিশ বছর আগের সুমনা। এতক্ষণ গোগলসে চোখ ঢাকা থাকায় বুঝতে পারেননি তিনি। কিন্তু সুমনা কি তাকে চিনতে পেরেছেন? দেখেতো মনে হচ্ছেনা। সহসা তাকে চেনাটাও সুমনার জন্য সহজ না। ইতিমধ্যে তার চাঁদি ফাঁকা। যুবাকালের মোটা গুম্ফ সেই কবে চেঁছে ফেলেছেন। গাল-গলায় দৃশ্যমান ভাঁজও পড়েছে। আরেকটা চিন্তা আবু জাফর মাথায় প্রশ্রয় দিতে না চাইলেও তার মনে এল যে অতি কুশলী সুমনা তাকে চিনলেও নিপুণভাবে না চেনার অভিনয় করে যেতে পারেন। পরমুহূর্তেই আবু জাফর ধাতস্থ হয়ে তার মনযোগকে ডঃ চৌধুরীর দিকে ধাবিত করলেন এবং মনে মনে এটাই কামনা করলেন যে সুমনা যেন মিসেস চৌধুরী হয়েই থাকেন।

বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে বলে মনে হয়। ডঃ চৌধুরীর মুখে স্ত্রীর মত উচ্ছ্বলতা না থাকলেও বিরক্ত হচ্ছেন বলেও মনে হচ্ছে না। তিনি বললেন, ‘জাফর সাহেব, আমাদের দেশের বৃষ্টি-বর্ষণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কেমন স্লো করে দেয়, তারপরও শিল্পী-সাহিত্যকরা কেমন মেতে ওঠে, দেখেছেন?’

ডঃ চৌধুরী আবু জাফরকে জাফর সাহেব বললেও তিনি ডঃ চৌধুরীকে চৌধুরী ভাই সম্বোধন করেন; তাদের দেখাদেখির আগেই টেলিফোনে সম্পর্কটা এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ডঃ চৌধুরীর কথার উত্তর দেবার আগে আবু জাফর আবার একটা ধাক্কা অনুভব করলেন এবং প্রায় সাথে সাথে আড়চোখে সুমনার দিকে তাকালেন। না, জাফর নামটি শোনার পরও সুমনার চোখেমুখে কোনও চাঞ্চল্যের আভাস দেখা গেল না। কিছু একটা বলতে হবে বলে ডঃ চৌধুরীর কথার উত্তরে বললেন, ‘তা ঠিক, তবে যাই বলুন চৌধুরী ভাই, বর্ষা বাঙালির জীবনে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বৃষ্টি-বাদল কেবল শিল্প-সংস্কৃতির নিয়ামকই নয়, তা আমাদের ভাত-মাছ উৎপাদনের মুখ্য অনুষঙ্গ।’

কথোপকথন শুধু ডঃ চৌধুরী এবং আবু জাফরের মধ্যে থেমে থেমে চলতে থাকাকালে মিসেস জাফর ফোনে দুই বার তাদের খোঁজ নিয়েছেন। তবে মিসেস চৌধুরী এসব কথাবার্তার মধ্যে একবারও অংশগ্রহণ না করাতে আবু জাফরের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। তবে কি সুমনা আবু জাফরকে চিনে ফেলেছেন? আর সেজন্যই সচেতনভাবে তিনি নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন? পাছে কোনো বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় সে আশংকায় আবু জাফরের কপাল কুঁচকে যায়। কিন্তু হঠাৎ সুমনার ‘বৃষ্টি থেমে গেছে’ চিৎকার শুনে তার চিন্তায় চিড় ধরে।

ডঃ চৌধুরী দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ‘যাক বাঁচা গেল। চল তাহলে।’ বলে, তিনি দ্রুতপায়ে ছাউনি থেকে বেরিয়ে এলেন।

সুমনা পিছে পড়ে যাওয়ায় আবু জাফরকে অনন্যোপায় হয়ে থামতে হল। সুমনার ডাই করা কাল চুলে বৃষ্টির ছাঁট পড়ে শিশিরের মত চিকচিক করছে। গোগলসটি জামার বুকের মধ্যে ঝুলিয়ে রেখেছেন তিনি।

আবু জাফর সর্বশক্তি সঞ্চয় করে মুখ তুলে মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসেন ভাবী।’ ফেঁসেই গেছেন যখন মাইনকা চিপায়, যা ঘটুক কপালে সৌজন্যতো দেখাতে হবে। কিন্তু এ কী! সুমনা পাথরের মত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। আবু জাফর বুঝতে পারলেন, হয়ে গেছে!

‘ছেলে মেয়ে ক’জন?’ আবু জাফরের কানে শব্দগুলো বজ্রনিনাদের মত শুনাল। আবু জাফর স্থির হবার আগেই সুমনা নিস্তরঙ্গ কন্ঠে সতর্ক করলেন, ‘স্বাভাবিক থেক প্লিজ; জীবন নদীর জলের মত বহমান; লেট ইট ফ্লো
আনইন্টারাপ্টেড। ’ বলে, সুমনাও দ্রুত পা ফেললেন।

তারা পাইন বাগান পৌঁছান পর্যন্ত বৃষ্টিস্নাত বনানী প্রাণভরে উপভোগ করলেন। চৌধুরী দম্পতিই বেশি প্রগলভ হয়ে উঠলেন অনেক দিন পর দেশীয় সবুজের সমারোহে নিজেদের আবিষ্কার করে, যদিও নিউজিল্যাণ্ডের প্রকৃতির কাছে এ কিছুই না। বিশেষ করে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন গাছের সাথে পরিচয় লেখা ছোট সাইনপ্লেটগুলি মনযোগ দিয়ে পড়লেন ডঃ চৌধুরী। হঠাৎ একটি গাছের সামনে দাঁড়িয়ে সোৎসাহে বললেন, ‘দেখেন জাফর সাহেব, হরিতকী। ’ তারপর নিজের মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমি সবসময় শুকনো হরিতকী মুখে রাখি; দারুন উপকারী।’ আবু জাফর বড় একটি রহস্য ভেদ করে ফেলেছেন এমন উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করতে বসেছিলেন। কিন্তু পরে নিজেকে সংযত রাখেন।

ইতিমধ্যে আবু জাফর অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন। মিসেস চৌধুরীর সাথে কৃত্রিমভাবে হলেও দু’চার কথা বলেছেন। গার্ডেনের শেষপ্রান্তের অরক্ষিত ফটক পেরিয়ে বেড়িবাঁধে উঠে চৌধুরী দম্পতি কৌতুহলভরা চোখ নিয়ে চারিদিকে তাকাচ্ছেন। তখন আবু জাফর গাইডের মত বললেন, ‘জানেন ভাবী, এই ক’বছর আগেও এখানে দাঁড়ালে পুরো বাংলাদেশ দেখা যেত। বর্ষাকালে ছলাৎ ছলাৎ জলের এক বিশাল হাওর; আবার জল নেমে গেলে শুধুই সবুজ আর সবুজ। এখন ডেভেলপাররা সবুজকে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছে। ’

‘আমরা যখন ঘুরতে আসতাম তখন বাঁধটাঁধ ছিল না। ’ সুমনা স্মৃতি থেকে বলেন, ‘আমাদের আকর্ষণ ছিল পদ্মপুকুর, অর্কিড হাউস, বাঁশবাগান...।'

আবু জাফর সুমনার কথার অর্থ বোঝেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিও কত এসেছি। কতদিন বৃষ্টিতেও ভিজেছি...।’

বেড়িবাঁধের দুপাশে অনেকগুলো ভাসমান রেস্তোরাঁ; নান্দনিক বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে গিয়ে পানির উপর বানানো ছোটছোট ঘরে বসে চা-কফি খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। লোক সমাগম হয় প্রচুর। আজকে বৃষ্টির জন্য একটু কম। সুমনার ইচ্ছে তিনিও ওখানে বসে এক কাপ কফি খাবেন। ডঃ চৌধুরীও উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘বেশতো, চল।’

সাঁকো ধরে এগুবার সময় একটি জরুরি কল আসে নিউজিল্যাণ্ড থেকে। তাই ডঃ চৌধুরী মাঝপথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন এবং ইশারায় তার স্ত্রী ও আবু জাফরকে এগিয়ে যেতে বলেন।

হয়তবা সুমনা ও আবু জাফর এরকম একটা বিব্রতকর সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ‘আমার দুই মেয়ে, সাথী, বিথী – একটি কলেজে উঠেছে এবার, অন্যটি ডাক্তারি পড়ছে। স্ত্রীর নাম সাদিয়া। আমরা ভাল আছি। তোমার ছেলেমেয়ের কথা শুনেছি চৌধুরী ভাইয়ের কাছে।’ টংঘরে পৌঁছুনোর আগেই সুমনাকে চিঠি পড়ার মত কথাগুলো বলে গেলেন আবু জাফর। অনেক আগে ছাউনি থেকে বেরোনোর সময় সুমনা ছেলেমেয়ে সম্মন্ধে জানতে চেয়েছিলেন তার কাছে।

‘আমার উপর তোমার অনেক রাগ আমি জানি। আর এভাবে যে তোমার সাথে দেখা হয়ে যাবে সেটাও ভাবিনি, নয়তো আমি আসার ঝুঁকি নিতাম না।’ সুমনা নিচু কন্ঠে কথাগুলো বললেন।

আবু জাফর কথার মোড় ঘুরাবার জন্য বললেন, ‘আমার মেয়েরা তোমাদের দেখে অনেক খুশি হবে।’

‘হ্যাঁ, মুরুব্বিরা চৌধুরীর মত পাত্র ঠিক করে ফেললে আমি আর লোভ সামলাতে পারিনি। স্বার্থপরের মত তোমাকে ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু বৃষ্টিভেজা দিনগুলি আমাকে ছেড়ে যায়নি, না এখানে, না নিউজিল্যাণ্ডে।‘ সুমনা আপন মনে বলে গেলেন।

আবু জাফর এসব কথা বলতে বা শুনতে প্রস্তুত নন। তিনি বললেন, ‘সন্ধ্যার আগে আমাদের ফিরতে হবে। জায়গাটা বেশি নিরাপদ নয়।’ একটা ছেলে ছুটে এসে দাঁড়ালে তিনি তিনটা কফির অর্ডার দিলেন।

ডঃ চৌধুরীর ফোনে কথা বলা শেষ হলে তিনি তাড়াহুড়ো করে এসে সুমনা এবং আবু জাফরের সাথে যোগ দিয়ে চেয়ারা বসতে বসতে বললেন, ‘আমার কাছে জায়গাটা বেশ রোমান্টিক মনে হয়।’

মিসেস চৌধুরী কৌণিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘তাই নাকি?’

‘তাই। কিন্তু দু’বারের বেশিতো এখানে আসার সুযোগ ঘটেনি, তা-ও আবার একা একা।’ বলে, ডঃ চৌধুরী হো হো করে হেসে উঠলেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মোঃ মোখলেছুর রহমান জামাল ভাই আপনি তো সাব্যসাচী লেখক তাই কি আর কমু,ভাল থাকবেন, সাথে ভোটও।
জামাল উদ্দিন আহমদ আপনি পড়েছেন এতেই আমি ধন্য। ব্যস্ততার জন্য এখনও আপনার লেখার স্বাদ গ্রহন করতে পারনি। খুব শিঘ্রই যাব ইনশাল্লাহ।
মোঃ মোখলেছুর রহমান গল্পকবিতা লেখকদের জন্য একটি অসাধারন সাহিত্য চর্চার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির প্লাটফর্ম। এখানে লেখা দেয়ার জন্য মনে একটা আলাদা চাপ থাকে তাই লিখি নতুবা লেখাই হতো না। স্বাদ বিস্বাদ বুঝিনা লেংড়া খোড়া কিছু বেরোয় তো এই আর কি শুভ কামনা জানবেন।
বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত সুন্দর লিখেছেন । ভাল লাগল । শুভকামনা রইল ।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

স্মৃতি মানুষকে কাতর করে, তা সুখের কিংবা দুঃখেরই হোক । এরকম বৃষ্টিভেজা দিনে আচমকা দুজন দুই দিগন্তের মানুষের দেখা হয়ে গেল যাদের স্মৃতিতে এরকম আরও অনেক বৃষ্টিভেজা যাপন এখনও ভাস্বর। প্রতিকুল সময়ের পলেস্তারা ফুটো করে অতীত কখনও কখনও মাথা জাগায়।

১৯ নভেম্বর - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "মা আমার মা”
কবিতার বিষয় "মা আমার মা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২১