বাবারা কঠোর হতে পারে না। রাফি খানও পারেননি। জীবনের শেষ দিনগুলি রক্তাক্ত উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও শেষ বেলায় সন্তানের ভালবাসা তাঁকে দুর্বল করে দিয়েছ। হয়ত সব বাবাই এরকম হয়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

পুনর্মিলন
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ৩  favorite ০  import_contacts ৪৮
দাফন-কাফনের ব্যবস্থাটা গ্রামের সবাই মিলে করেছে; খানদের পারিবারিক গোরস্থানেই। গ্রামে সাধারণত এসব কাজের জন্য লোক ভাড়া করতে হয়না। বিয়ে আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আত্মীয়স্বজনের সমাগম প্রথাগতভাবেই হয়ে থাকে। তবে মৃত্যুর বেলায় কাউকে দাওয়াতও করতে হয়না; আত্মীয়স্বজন ছাড়াও আশেপাশের দু’চার গ্রামের অনেক লোক লৌকিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই ছুটে আসে। তাছাড়া রাফি খান একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক; জীবনের শেষ ক’টা দিন পিতৃপুরুষের ভিটায় আপনজনদের সাথে কাটিয়ে অবশেষে অগস্ত্যযাত্রা করেছেন। লোকজন তাঁর স্তুতি করতে করতেই কবর খোঁড়া, বাঁশ কাটা, গোসলের ব্যবস্থা করা, কাফনের কাপড় আনা এসব কাজে স্বতঃপ্রবৃত হয়ে লেগে পড়েছে। লাশের খাটিয়ার ব্যবস্থা মসজিদের ইমাম সাহেবই করেছেন।

একমাত্র ছেলে কাফি খান বাড়িতে এসে পৌঁছানোর আগেই জানাজা পড়া হয়ে গেছে। কাফি আসার পর তাকে জড়িয়ে ধরে চাচাতো ভাইয়েরা অনেক কান্নাকাটি করেছে। মুহিব বলল, ‘সেইতো এলি, দুদিন আগে আসলেতো মাফটাফ চাইতে পারতি; চাচার রাগ হয়ত পড়ে যেত।’ এসব কথা যে এখন অবান্তর তা কাফিসহ সবাই বুঝতে পারছে। এখনতো সব শেষ।

কবরস্থানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলে সবাই গোসল সেরে নামাজ পড়ে আরেকবার মৃতের কবর জিয়ারত করতে যায়। সবার না হলেও কাফির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। হয়ত নিকট অতীতের অনেক ঘটনাই তার মনে পড়ে যায়। বাবাতো বাবাই। কাফি নিজেও বাবা হয়েছে। ছেলেকে ঢাকায় ফেলে এসেছে জরিনা খালার হাতে; প্রাণটা কেমন আনচান করছে। চাচাতো ভাই মুহিব তাকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে চলে। এর মধ্যেই সে জরিনা খালাকে ফোন করে। ফোন ধরেন জেবা খালা। অস্থির হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, কিরে বাবা, তুমি কি ঠিকমত পৌঁছেছ, তোমার বাপের লাশ কি দাফন করতে পেরেছিলে?

কাফি বলে, ‘খালা, চিন্তা করবেন না; আমি সময়মত এসে পৌঁছেছি। নাফি কেমন আছে?’

‘নাফি ঠিক আছে; তুমি মোটেও চিন্তা করো’না। তুমি বরং এখন রেষ্ট নাও; পরে কথা বলো।’

কাফি মাঝে মাঝে এই কথা ভেবে ভিরমি খেয়ে যায় যে এখনও এমন মানুষ আছে যে কোদালকে কোদাল বলতে পারে। জেবা খালা এরকমই একজন মানুষ; আপন বোনের মেয়ের পক্ষ তিনি নেননি। লতা যেদিন কাফির সংসারের মুখে থুতু দিয়ে বেরিয়ে গেল, সেদিন রাতেই জেবা খালা কাফিকে সান্ত্বনা দিয়ে অনেক কথাই বলেছেন; পরদিন ভোরবেলা কোথা থেকে জরিনা খালাকে ধরে নিয়ে এসেছেন। মনে হল তারা দুজন অনেক পুরনো বন্ধু। অন্তত তাদের কথোপকথন থেকে মনে হয়নি জরিনা খালা পেশাগতভাবে একজন পরিচারিকা। নাফি ছোট বাচ্চা; মাকেতো খুঁজবেই। কিন্তু জরিনা খালা দুদিনেই ম্যানেজ করে ফেলেছে। জেবা খালাও হুট করে চলে যাননি। জরিনাকে ঘরের সব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং নাফির সাথে তার মেলবন্ধনকে টেকসই করে দিয়ে তারপর গেছেন। প্রয়োজন নেই তবুও জরিনা খালার সাথে জেবা খালা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। এসব কারণে জেবা খালার উপর কাফি রাগ করতে পারেনা। না, বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে লতা খালার বাসায় যায়নি। প্রথম দিন এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে উঠেছে। দুদিন পর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। হয়ত কোনো বন্ধুর কাছে দেশেই আছে, নয়তো বিদেশে চলে গেছে। হয়ে গেলতো মাস ছয়েক; কাফি আর খোঁজ করতে যায়নি।

লতার লতিয়ে বেড়ানো স্বভাব সবার মত জেবা খালা জানতেন। মা-মরা মেয়েকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে তিনিই পেলেছেন, পুষেছেন। ছোটবেলা থেকেই সে এরকম। তবুও কাফিকেই সে বিয়ে করবে বলে যখন ঠিক করে ফেলল, এবং দু’পরিবারই অনেক যোগবিয়োগ করে বিয়ের তারিখ নির্ধারন করে ফেলল, তখন জেবা খালাই লতাকে ধরে অনেক বুঝিয়েছেন; বলেছেন, মা-রে, এখন স্বামীর ঘরে যাচ্ছিস, যা মন চায় তা করা চলবে না। চাকরি করছিস কর কিন্তু শ্বশুরবাড়িকে কখনো অবহেলা করবি না। স্বামীর ঘরেতো শ্বশুর-শাশুড়ি ছাড়া আর বাড়তি কেউ নেই। ওদের যত্নআত্তি করবি।

সন্ধার পর পরিবারের সবাই মিলে রাফি খানের স্মৃতিচারণ করছে – তিনি কারও মামা, কারও চাচা, কারও সম্পর্কিত ভাই। দুঃখভারাক্রান্ত পরিবেশের মধ্যে নিরবে চায়ের কাপও কেউ কেউ বিলিয়ে যাচ্ছে। রাফি খাটের উপর উঠে দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার যেন কিছুই বলার নেই। সবাই কথা বলছে, সে শুধু শুনেই যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে চোখ মুছছে।

দীর্ঘ সময় ধরে অনেক কথা হলেও একটি বারও কেউ কাফিকে তার বউ বা সন্তানের কথা জিজ্ঞেস করেনি। অবশ্য তাদের এটা জানা ছিল, ছেলের উপর রাগ করে নিজের শহরের বাসা ফেলে রাফি খান বাপ-দাদার ভিটেয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই গ্রামে চলে এসেছিলেন। তাছাড়া আরেকটা কারণও থাকতে পারে; কাফির মা-ও যে এই গ্রামের মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন। স্ত্রীর কাছাকাছি থাকার একটা সুপ্ত সাধও হয়ত তাঁর মনের মধ্যে ছিল।

একমাত্র সন্তান বলে মা-বাবার অফুরন্ত আদর ছিল কাফির জন্য। বেসরকারি কলেজের শিক্ষক হলেও বিজ্ঞানের তুখোড় টিউটর হিসেবে রাফি খান দুহাতে বাড়তি আয় করেছেন। তাজমহল রোডের মাঝারি আয়তনের ফ্ল্যাটটি কিনতে তাই তাঁর বেগ পেতে হয়নি। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকেই গাউসিয়া মার্কেটে বুদ্ধি করে একটা দোকান কিনে ফেলেছিলেন বলে ছেলের হাতের দিকে শেষদিন পর্যন্ত তাকাতেও হয়নি। ছেলেকে সব বাবার মত বিশাল কিছু একটা বানানোর স্বপ্ন দেখলেও কাফি তাঁকে একেবারে হতাশ করেনি। আইবিএ থেকে এমবিএ শেষ করার সাথে সাথেই বিদেশি ব্যাংকে চাকুরি পেয়ে যায়। ঐ পর্যন্ত সবকিছুই হেসেখেলে চলে এসেছিল। কিন্তু যখন মা-বাবা ছেলের জন্য বউ খোঁজা আরম্ভ করলেন তখনই ছেলে ঘোষণা দিল যে তাদের কষ্ট করতে হবে না; তার পছন্দের মেয়ে আছে। বলতে গেলে জীবনের উচ্ছ্বাসের যতি এখানেই পড়ল। বাবা-মার ভালবাসার কাছে জাগতিক সব হিসেব-নিকেশ, যুক্তিতর্ক মার খেয়ে গেল। ছেলের পছন্দ করা স্মার্ট বউ – লতা অল্পদিনের মধ্যেই রাফি খানের সংসারে লতিয়ে গেল। কিন্তু এই লতানোটা সত্যিকার অর্থে আগাছার মত। নিজের খালার এত করে বলা উপদেশের প্রতি সে সুবিচার করেনি।

রাফি খান বছরখানেক আগে গ্রামমুখী হলেও তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ হেলেন অক্কা পেয়েছিলেন তারও মাসছয়েক আগে। হেলেনের মৃত্যু অবধি বুড়োবুড়ির অক্সিজেন ছিল নাফি। কিন্তু তাঁর পৌনঃপুনিক মানসিক চাপের কাছে অক্সিজেন অপ্রতুল ছিল বিধায় তিনি স্বামীকে একা ফেলে চলে যান। এরপর রাফি খান অনিচ্ছা আর তিক্ততার সাথে একা আর লড়ে যেতে পারেননি। তাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে তিনি এক সকালে একটি মাত্র স্যুটকেস নিয়ে নবীগঞ্জের বাসে চড়ে বসেন।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের ইমাম সাহেবকে নিয়ে কবর জিয়ারত শেষে ঘরে ফিরে নাস্তা খেতে খেতে কাফি বলল যে তাকে পরদিন ফিরে যেতে হবে। হঠাৎ করে দীর্ঘ সময় ব্যাংকে অনুপস্থিত থাকা যাবে না। মাসখানেক পর কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে সে আসবে; সাথে নাফিকেও নিয়ে আসবে। প্রথমে কয়েকজন ঘোর আপত্তি জানালেও পরে বাস্তবতার দিকটিও বিবেচনায় আনল। তখনই মুহিব বলল, মনে করে আমার কাছ থেকে একটি খাম নিয়ে যাস; চাচা রেখে গেছেন তোর জন্য। কয়েক মুহুর্তের জন্য ঘরটি কবরের মত স্তব্ধ হয়ে গেল। রাফি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে উদ্যত হয়েও কী ভেবে ডানেবাঁয়ে তাকিয়ে কিছু বলল না।


ঢাকা ফেরার পথে বাসেই খামটা খুলল রাফি। খামটি খোলার আগেই তার চোখ আর্দ্র হয়ে গেছে। গতকাল থেকে বাবার রেখে যাওয়া খামটা তার মস্তিষ্ক চেপে ধরে আছে। রাতে ঘুম হয়নি বললেই চলে। কী রেখে যেতে পারেন বাবা তার অভিশপ্ত সন্তানের জন্য। কয়েকবার ভেবেছিল মুহিব ভাইয়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসে দেখবে খামের ভিতর কী আছে। কিন্তু নৈতিক সাহসের অভাবে তা আর হয়নি। শেষপর্যন্ত বিদায় নেবার আগে আগেই খামটি দিয়েছে মুহিব ভাই।

খামের ভিতরে আছে বেশ ক’টি দলিল; আর আছে একটি দীর্ঘ চিঠি। কাফির চোখে জমে থাকা অশ্রু এবার টুপটুপ করে খামের উপরে পড়ল। তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে বাবা তাঁর ইহজগৎকে সন্তানের কাছে হস্তান্তর করে চলে গেছেন। এখন তার কাছে দলিলগুলোকে নিছক কাগজ মনে হচ্ছে। তার ভেজা চোখের দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠির দিকে। কিন্তু কাফি এগোতে পারছে না; লোকচক্ষু আড়াল করে প্রাণভরে কাঁদতেও পারছে না। এ যেন চিঠি নয়, ভালবাসার এক দীর্ঘ উপাখ্যান। প্রাণপ্রিয় সন্তানকে দেয়া সারাজীবনের ভালবাসার বেশুমার চিত্রনাট্য। সেই হামাগুড়ি দেয়ার সময় থেকে তার পুরুষ হয়ে ওঠা পর্যন্ত হাসিকান্নাভরা স্মৃতির ঝালর। বাবা লিপিবদ্ধ করে না গেলে সে নিজেকে কোনোদিনই এভাবে আবিষ্কার করতে পারত না। পুরো চারঘন্টা সময় নিয়ে কাফিকে বাবার চিঠিখানি পড়তে হল।


চিঠির কিছু অংশ এমন ছিল:
… টুকরো টুকরো যে স্মৃতিগুলো তুলে ধরলাম, ওগুলোই ছিল আমার সারা জীবনের আনন্দের সম্ভার। সন্তানরা বড় হয়ে যেতে থাকলেই দূরে সরে যেতে থাকে। মা-বাবারা একটা দৈন্যের মধ্যে পড়ে যায়। তারপরও জীবন চলতে থাকে। কপাল ভাল থাকলে শেষ জীবনেও অল্পস্বল্প ভালবাসার নুড়িপাথর কুড়িয়ে পাওয়া যায়। আমাদের একটা নুড়ি ছিল, নাফি। সে সুখও কপালে সইল না – ভেতরটা পুড়ে যায়।

... তোমার ইচ্ছাকেই আমরা মেনে নিয়েছিলাম তোমার সুখের জন্য। কিন্তু তোমাকে অসুখে পুড়তে দেখে আমরা কেমনে সুখী হই বল? দিনের পর দিন তুমি ছাইচাপা আগুনের মত পুড়ছ, কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছ না। তোমার মা আর আমি লতাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করেছি, অনেকভাবে বুঝিয়েছি। এতে হিতে বিপরীত হল। তোমার মা-তো চাপ সইতেই পারল না, চলে গেল। আমি নাফির মুখের দিকে চেয়ে অন্য সবকিছুর প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম।

না, কাফিও চায়নি বাবা-মা কষ্ট পান। কিন্তু চাইলেইতো হয় না। সে নাহয় প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে লতার বাড়াবাড়ি মেনে নিয়েছিল, কিন্তু বাবা-মা? হৈ-হুল্লোড়ে জীবনটাই লতার কাছে মুখ্য ছিল সংসারে। ঘরে যে আরও দুটি প্রাণী একটুখানি মনযোগ চায় সেটা লতা কোনোদিন ভাবনায়ও আনেনি। জেবা খালা লজ্জার মাথা খেয়ে কাফিকে বলেছেন, ‘বাবা, চেষ্টা করতে থাক। মা-মরা মেয়েকে আদর-ভালবাসা দিয়ে পেলেছি বলে যে এত বেয়াড়া হয়ে যাবে তা ভাবিনি। ’ চেষ্টাতো কাফি কম করেনি। এতে তিক্ততা আরও বেড়েছে। কিন্তু মা-বাবাও যখন চেষ্টাতে বিফল হয়ে গেলেন তখন শ্বশুর-শাশুড়ি আর বৌমার সম্পর্ক অহিনকুলে পর্যবসিত হ্ল। শাশুড়ি চেপে থাকলেও শ্বশুর সঙ্গত কারণে চুপ করে বসে থাকলেন না। তিনি সরাসরি ছেলের বউকে বললেন, ‘দেখ মা, আমরা ভদ্র ফ্যামিলির লোক। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছি; একটা আদর্শ নিয়ে থেকেছি। তোমার মত হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আমার হাতে মানুষ হয়েছে। আমার ঘরে আমার ছেলের বউ হয়ে তোমার দাঁড়িকমাহীন চলাফেরা আমার মোটেও পছন্দ নয়।’ লতার বেশি রাত করে অফিস থেকে ফেরা কিংবা হুট করে ঢাকার বাইরে বিদেশি প্রিন্সিপালদের নিয়ে চলে যাওয়া শুধু শ্বশুর-শাশুড়ির কেন, কাফির নিজেরও ইচ্ছাবিরুদ্ধ। লতাকে চাকুরি ছাড়ার চাপ দিয়েও যখন লাভ হয়নি তখন কাফি প্রায় যুদ্ধ করে একটা সন্তান নিয়ে আসে পৃথিবীতে। উদ্দেশ্য একটাই, যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। কিন্তু আসলে হয়নি। শ্বশুরের অভিভাবকসুলভ কথাগুলো আরও আগুন ধরিয়ে দেয় লতার গায়ে। স্বামীকে তুলোধুনো করে আলাদা বাসা নেয়ার আল্টিমেটাম দেয় সে। এ অবস্থায় কাফির মায়ের রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। হার্টের অবস্থা আগে থেকেই নাজুক ছিল। কিন্তু এই ধুন্ধুমারের মধ্যে একদিন কাফি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসে পৌঁছুবার আগেই স্বামীর কোলে মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হেলেন অর্থাৎ কাফির মা। জীবনের এত বড় পট পরিবর্তনের পরও শুধু নাফির টানে ছেলের সাথে আরও ছয়মাস থেকেছিলেন রাফি খান।

... হ্যাঁ, আমি শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়েই বাড়িতে চলে এসেছি, তোমাদের মুখ কোনোদিন দেখব না সে দিব্যি দিয়েও এসেছি। আমি জানতাম, বাসা পরিবর্তন করলে তোমার জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া তোমরা চলে গেলে আমি একাকী বাসায় থাকব কেমন করে? এসব ভেবেই আমি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবুওতো শেষ রক্ষা হল না। মেয়েটা তার জেদকেই সবকিছুর উপরে রাখল; নিজের সন্তানকে ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল!

... ইদানীং আমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। সব ছেড়েছুড়ে এলেও তোমাদেরকে মন থেকে সরাতে পারছি না। নাফির জন্য মনটা সবসময় ছটফট করে। হয়ত তার সাথেও আর কোনোদিন দেখা হবে না। জীবনের ভয়ঙ্কর একটা অধ্যায় পার হয়ে আসার পরও কেন জানি মনে হচ্ছে তোমাকে বলি, যদি পার তবে শেষ চেষ্টা করে দেখ। তোমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর, অন্তত আমার নাতিটার জন্য।

... এই খামের মধ্যে যা রেখে গেলাম তার বিবরণ না দিলেও চলবে। তুমিই আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার যা কিছু আছে ওয়াক্‌ফ করে দিব। পরে নাফিটাই আটকে দিল। দাদাকে হয়ত স্মৃতিতে খুঁজে পাবে না সে। তবে যা কিছু রেখে গেলাম, যদি ধরে রাখ, সে হয়ত তার দাদার নাম মনে রাখতে পারে।

গাড়ি ততক্ষণে ঢাকা এসে পৌঁছেছে। কল্যাণপুরে বাস থেকে নামতে নামতে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত কাফির ভাবনাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। বাবা-মার কাছ থেকে তার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ যেহেতু সে আর পাবে না, তাকে অন্য কিছু করতে হবে। বাবা যা রেখে গেছেন তা দিয়ে চাকুরি না করলেও তার ভালভাবেই চলে যাবে। এই পাষানী শহরে আর নয়, নাফিকে নিয়ে নবীগঞ্জে বাবা-মার কাছেই সে চলে যাবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement