পৃথিবীর অনেক দেশে থাকলেও আমাদের এ উপমহাদেশে ধর্মবিশ্বাস ও জাতপাতের বিভাজনটা প্রকট। ফলস্বরূপ হারুন ও বিথীর মতো হাজার প্রাণের কান্না কর্পূরের মতো উবে যায় অজান্তে। আবার কখনও এসব আত্মা হননের ভেতর দিয়ে পরিসমাপ্তি খোঁজে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ ও ধর্মের অদৃশ্য দেয়াল ভাঙ্গা সম্ভব হয়না। গল্পের চরিত্র দুটি মরিয়া হয়ে উষ্ণতা খুঁজেছে একে অপরের মধ্যে, তা-ও তাদের অন্তিম যাত্রায়। অন্য জনমের বর্ণিল স্বপন দুজোড়া চোখে মেখে উষ্ণ আলিঙ্গনে তারা এক রাঙ্গা সমুদ্র সাঁতরে পার হয়ে যায়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩১টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

বর্ণিল যাত্রা
উষ্ণতা

সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ৩  favorite ০  import_contacts ১১২
খোলা মাঠের বুক চিরে দক্ষিণের কুমিল্লা-সিলেট হাইওয়ে থেকে উত্তরের শাখা-তিতাসের পাড় অব্দি চলে গেছে পূবগাঁও এবং পশ্চিমগাঁওয়ের একমাত্র পায়েচলা পথ। আলপথ থেকে গায়েগতরে একটু বড় হলেও রিক্সা কিংবা গরুর গাড়ি চলাচলের মত প্রশস্ত নয় রাস্তাটি। মাঝামাঝি জায়গায় বাঁশ-কাঠের জোড়া দেয়া ছোট একটা পুল। নিচে অগভীর সরু নালা; বর্ষার জল এদিক ওদিক চলাচলের জন্য যথেষ্ট। পুলের নিচে বসে উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে হারুন।
চৈত্রের দাবদাহ। গ্রীষ্ম শুরু না হতেই ঘূর্ণিঝড় ইতিমধ্যে দুবার ঝাপটা মেরে গেছে। যতটুকু না জল বিতরণ করেছে, তার চেয়ে বেশি ঘাড় মটকেছে গাছ-বাঁশের। বৃষ্টির পরপর অতি তৎপর দুয়েকজন কৃষক বিচ্ছিন্নভাবে লাঙলের ফলা পাথরকঠিন মাটিতে সেঁধানোর নিষ্ফল চেষ্টা করেছে তা ডানেবাঁয়ে তাকালে বোঝা যায়। তবে ঝুম বৃষ্টি পড়লেও এই দহনকালে হালের বলদ মাঠে নামতে পারবে কিনা কেউ বলতে পারে না।
কলেজপড়ুয়া হারুন যে এই সাঁঝের বেলায় শখ করে আধভাঙ্গা পুলের নিচে বসে আছে এমন নয়। আসলে তারমস্তিষ্কের কোষগুলো স্থবির হয়ে গেছে; দোয়া-দরুদ যা শিখেছিল তাও ভুলে গেছে এই মুহুর্তে। পশ্চিমগাঁওয়ের আকাশসীমার ওপর দিয়ে এখনও আবীরমাখা ঔজ্জ্বল্য দীপ্যমান। কিন্তু পূবগাঁওয়ের আকাশে আবীরের দীপ্তি নয়, ওখানে সর্বনাশা লেলিহান শিখা তার বিধ্বংসী ডানা মেলে আকাশের অসীমতায় উড়ে চলেছে। হারুন পশ্চিমগাঁওয়ের ছেলে; হলে কী হবে, তার রক্তকণিকায় পূবগাঁওয়ের দাউদাউ আগুনের আঁচ লাগছে বলেই সে অসহায়ের মত পুলের নিচে আত্মগোপন করে এই ধ্বংশলীলা অবলোকন করছে আর ছটফট করছে।
হারুন বা হারাণের কেউই নেতাগোছের ছাত্র নয়। স্কুলের ডানপিটে সময়ে তারা শুধু এটুকুই উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে অন্যজগতের কোন দেবদূত তার অপার্থিব শক্তি নিয়ে সাড়ে সাতকোটি মানুষের এই ভূখণ্ডটিকে খালুইয়ের মধ্যে পুরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলে পাখলিয়ে নিয়ে দুই দশকের গ্লানি ছাড়ানোর চেষ্টা করছে; আর এই মুখ থুবড়েপড়া নির্জীব প্রাণিগুলোর চোখের ঠুলি হেঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলছে। প্রাণিগুলোও থতমত খেয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে সেই বিশাল শক্তিধর দৈবপুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখনিঃসৃত গগনবিদারী শব্দগুলো হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে নিজেদের জীবন-বৃত্তান্ত সাজাচ্ছে। যতই সময় যাচ্ছে আধমরা মানুষের শিরদাঁড়া ক্রমশ ঋজু হচ্ছে। মানুষগুলো যতই নড়ছে ততই যেন বাঁধভাঙ্গা ঢেউ শহর পেরিয়ে আছড়ে পড়ছে গ্রামে-গঞ্জে। হারুনরা বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে দেখছে শহর থেকে বড়মাপের লোকজন এসে হাটে-ঘাটে-মাঠে ছড়িয়ে পড়ছে আর বলছে, ভায়েরা আর ঘুমিয়ে থেক না, চোখ খুলে দেখ বঞ্চনার ছবি, গায়ে যতটুকু রক্ত আছে তা আর শুষে নিতে দিয়ো না, রুখে দাঁড়াও।
সময় যত গড়িয়ে চলল তারা অবাক বিস্ময়ে আরও দেখল, মাঠে হাল ফেলে আসা কাদাজলমাখা কৃষক, কল-কারখানা ছেড়ে আসা ছাইধুলোমাখা শ্রমিক, স্কুল-কলেজর ছাত্র-শিক্ষক এক কাতারে দাঁড়িয়ে গলাফাটানো চিৎকারে আকাশ-বাতাস চৌচির করতে আরম্ভ করেছে। তখন হারুন আর হারাণের মত স্কুলপড়ুয়া ছাত্ররাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের আবিষ্কার করে ফেলল অগুনতি মানুষের ভিড়ে। সচেতন মানুষের মত তারাও ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তান নামের যে দেশ সৃষ্টি হয়েছে তার মালিক আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভুরা; পূর্ববঙ্গের মানুষগুলোর চোখে ঠুলি পরিয়ে কলুর বলদ বানানো হয়েছে।
শহরের কলেজে ভর্তি হবার পরই কেবল হারুনের চোখে স্কুলবেলার বিস্ময়বৃত্তান্ত প্রকৃতরূপে ধরা দিল। বুঝতে পারল জেল-জুলুম, মিছিল-আন্দোলন, স্বায়ত্বশাসন-নির্বাচন এসব বিষয় শুধু কথার কথাই নয়। তাই সবার সাথে সে এবং হারাণ পরিণত সংগ্রামীর মত মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহন করতে আরম্ভ করল। স্কুলে দুজনের বিষয় ছিল বিজ্ঞান, কলেজেও তাই। দুবন্ধু নেংটোবেলা থেকেই হরিহর আত্মা। তাই দুজন ভর্তি হয়েছে একই কলেজে; দুজনেরই স্বপ্ন, ডাক্তার হবে। কিন্তু বাঙালির গোলামির জিঞ্জির ভাঙার নির্বাচন সামনে রেখে ডাক্তার হবার স্বপ্নে বিভোর হতে পারছিল না কেউই। হোষ্টেলে জায়গা না পেয়ে আরও কজন ছাত্র মিলে মেস করে থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে তাদের। হারাণকে অনেক বোঝানোর পরেও সে হারুনকে ছেড়ে হিন্দু ছেলেদের মেসে যায়নি। সে হারুনকে বলেছে, জাত যায় যাক, তুই শুধু বাড়িতে কাউকে বলবি না; জাত এত ঠুনকো নাকি? এটা সত্য, এ খেয়েছে ওর বাড়িরটা, ও খেয়েছে এর বাড়িরটা; জাত কারুরই যায়নি এ পর্যন্ত।
জাতপাতের খেলা এতদিনে এখনকার তরুণরা বুঝে গেছে। ইংরেজের তুলে দেয়া হিংসার কাঁটাতারের বেড়া ধুতিপরা দাদা আর লুঙ্গিপরা মিয়াভাইয়ের কোনো উপকারে আসেনি; বরং এই বিভাজনের ফায়দা ইংরেজের চেয়ে বেশি উঠিয়ে নিয়েছে স্বদেশী প্রভুগোষ্ঠী। যার ফলে ধর্মের গোঁড়ামি ঢুকে গেছে সহজ-সরল মানুষের মনে। হারুনের মনে আছে, অসুখবিসুখে পূবপাড়ার হরিদাস ডাক্তারের বাড়িতে পুরিয়া আনতে গেলে খড়ের ছাউনির নিচে রাখা বেঞ্চিতে বসে ডাক্তারবাবুর জন্য অপেক্ষা করতে হত। একদিন হারুনের মায়ের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে সন্ধ্যাবেলা সে ডাক্তারের বাড়িতে গিয়ে হাজির। বাইরে কাউকে না দেখে সে সোজা মূলঘরের বারান্দায় উঠে ডাক্তার কাকা, ডাক্তার কাকা ডাক জুড়ে দিল। ডাক্তার কাকা হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কপাল কুঁচকে বললেন, অ্যাই, তুমি এখানে কেন? ছাউনিতে যাও, আমি আসছি। হারুন ওষুধ নিয়ে ফেরার সময় দেখল এক মহিলা গোবর দিয়ে ওই বারান্দাটি লেপে দিচ্ছে। এর কারণটা অবশ্য সে জেনেছিল পরে, হারাণের কাছ থেকেই। এরকম উদাহরণ আরও আছে। পূবগাঁওয়ের হিন্দু ছেলেমেয়েরা প্রায়ই আসত পশ্চিমগাঁওয়ে পূজার ফুল তুলতে। সূর্যোদয়ের আগে; প্রায় চুপি চুপি। হারুন হঠাৎ কোনোদিন আগেআগে জেগে উঠলে উদ্ভট কাণ্ড করে বসত। রাগারাগি বকাবকি করে তাদের বাড়ি থেকে ওদের তাড়িয়ে দিত। কখনও ধাক্কাধাক্কিও করত। একদিন রাগের চোটে বিথীর সাজি ধরে যেইনা টান দিয়েছে, অমনি এক অবাক কাণ্ড! বিথী এক ঝটকায় সাজির সবগুলো ফুল ছুঁড়ে ফেলে দিল পুকুরের জলে। তারপর ফোঁসফোঁস করে চোখ মুছতে মুছতে ফিরে চলল বাড়ির পথে। হারুন ভাবতেই পারেনি মেয়েটি অমন রাগ দেখাবে। ভ্যাবাচ্যাকার মত সেও বিথীর পিছু নিয়ে ডাকতে লাগল, অ্যাই বিথী শোন শোন, দাঁড়া! কে শোনে কার কথা। কিছুদূর যাওয়ার পর একবার সাপের ফণার মত মাথা ঘুরিয়ে বলল, আমার পিছু পিছু আসছ কেন হারুনভাই; তুমি আর আমাদের বাড়িতে আসবেনা কিন্তু, বলে দিলাম।
ইতিমধ্যে তিতাসে জল গড়িয়েছে অনেক । দাদাজি হারুনকে বলেছেন, তোরা যে এত লাফালাফি করস, কিছু বুঝস? আমারা ল্যড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান কেন করছিলাম জানস? জমিদার বাবুরা আমাদেরকে কি কম জ্বালাইসে? ইংরেজ সাহেব নিজেরাতো চাবুক চালায় নাই, চাবুক চালাইছে জমিদারের লোক। রঙমহলের খরচ জোগাইতে কৃষকদের রক্ত বেচতে হইছে। এখন পাকিস্তান ভাইঙ্গা আবার বাবুদের গোলাম হইবি?
দাদাজিকে বোঝানো অসাধ্য-সাধন ব্যাপার। যুগের পরিবর্তন, পশ্চিমাদের শোষণ এসব কিছুই দাদাজির মনের পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। তাছাড়া হারাণের সাথে হারুনের মাখামাখিও দাদা তেমন ভালভাবে নিতে পারেননি। হারাণ হারুনদের বাড়িতে বিনা দ্বিধায় আসাযাওয়া করে; হারুনও তাদের বাড়িতে যখন-তখন যায় আসে এতটুকুই দাদাজি জানতেন। এর বাইরেও যে আরেকটা অস্ফুট মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার ছিল দাদাজি তা বোঝার আগেই আন্দোলন-নির্বাচন এসব পাশ কাটিয়ে অন্যজগতে পাড়ি জমিয়েছেন।
শহরে চলে যাবার দুদিন আগেও বিথী খলখল করে কথা বলেছে – ক্লাস টেনের ছাত্রী। হারুনকে বলেছে, তোমরা দুবন্ধু শহরে গিয়েতো একেবারে ফুলবাবু হয়ে যাবে; আমাদের কথা মনেই থাকবে না। হারাণ বলেছে, তবে কী? আমরা কি রাখাল বালক নাকি? হারুন অবশ্য এভাবে বলেনি। বলেছে, কীযে বলিস, তোর হাতের নাড়ু খেতে আসব না?
হারুন শুধু নাড়ু খেতেই আসতনা; সে এমনি এমনিই আসত। হারাণ বাড়িতে না থাকলেও আসত। হরিপদ ডাক্তারের মত এ বাড়িতে তেমন শাসন-বারণ নেই। হারাণের পড়ার ঘরে বসে দিব্যি আড্ডা মারত, হৈহুল্লোড় করত। একদিন নাড়ুর প্লেট এগিয়ে দিয়ে বিথী বলল, আমার নিজের হাতে বানিয়েছি, তুমি খাবে হারুনভাই?
হারুন চোখ বড় করে বলল, তার মানে?
মানেটানে কিছু না, আমিতো অন্য জাত!
হারুন রেগে বলল, একটা চটকনা দিব, আমি কি তোর মতো?
বিথী ভেচকি মেরে বলে, আমি কী করলাম আবার?
কেন, মনে নাই? সাজির ফুল ছুঁড়ে ফেলেছিলি পুকুরে।
বিথী লজ্জা পায়। চোখ নামিয়ে বলে, তোমরা ছুঁয়ে ফেললেতো সে ফুলে পূজা হয়না।
হারুন বলল, হুম, বুঝেছি, চুরি করে আনা ফুল দিয়ে পূজা হয় আর মানুষের হাতের ছোঁয়া লাগলে পূজা হয়না!
এই ক’দিন আগেও – এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে, হঠাৎ করে বিথী হারুনকে জিজ্ঞেস করে, তোমার রক্তের রঙ কী, হারুনভাই?
হারুন তেড়ে গিয়ে বলে, লেখাপড়া করে কী শিখলি? রক্ত লাল হয়, জানিস না?
বিথী বলে, আমারওতো লাল।
তো কী হয়েছে?
না, হয়নি কিছু। তবে এত জাতপাত এল কোত্থেকে?
হারুন যে ভাঙনের শব্দ পায়না এমন নয়। বিথীর ঝর্ণার কলকল ধারায় হারুনের ভিতরের বেলেমাটি অল্প অল্প করে ক্ষয়ে যায় তা দুজনই বুঝতে পারে। কিন্তু বুঝলে কী হবে? ঝর্ণার গতিপথ যে মসৃণ নয়; পথের ওপর ছড়িয়ে আছে বড়বড় পাহাড়ি পাথর; গতি থামিয়ে দেয়, পথ বদলে দেয়। দুজনই জানে এ সমাজে এমন অসম্ভব ইচ্ছের ভ্রুণকে বাড়তে দেয়া যায় না। রক্তক্ষরণ হবে, তবুও করার কিছু নেই। সেই না-বোঝার বয়স থেকে অল্প অল্প করে কীভাবে যে ওরা এগোতে এগোতে একটা দুর্ভেদ্য কাঁচের দেয়ালের দুপাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছে দুজনই জানে না। সেদিন কলা আর পেঁপে খেতে খেতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিথীকে হারুন বলেছিল, আমি যখন মারা যাব তখন আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব, আমাকে আবার পৃথিবীতে পাঠালে বিথী আর আমার জাত যেন এক করে দেয়া হয়। বিথী ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, আমিও তাই বলব। বলতে গেলে এপর্যন্তই ছিল হারুন আর বিথী উপাখ্যানের চরম সংক্রান্তি।

সাধারণ নির্বাচন জিনিসটা যে ঈদ-পূজার চাইতেও বেশি উৎসবমুখর তা এদেশের মানুষ এবারই প্রথম জানল। কাছে থেকে দেখল বড়বড় নেতাদের বিস্ফোরিত নয়নে। কিন্তু সব ছাপিয়ে আকাশে-বাতাসে একজন দেবদূতের নামই তখন তরঙ্গের মত ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে – শেখ মুজিব। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছিল শেখ মুজিব আর স্বাধিকার সমার্থক হয়ে উঠছিল পূর্বপাকিস্তানের লোকজনের কাছে। দুই দশকের পাকিস্তানের জোতদারদের লম্বা জিভ টেনে বার করার সাহস এপর্যন্ত কেউ দেখাতে পারেনি। হিমালয়সদৃশ এই লোকটি শুধু ওদের জিহ্বাই টেনে বার করেনি, জিহ্বার ওপরেই অংক কষে দেখিয়েছে এদেশের সহজ-সরল মানুষের কতটুকু রক্ত ওরা শুষে নিয়েছে। সাধারণ মানুষ যতটুকু না চিনেছে রাজনৈতিক দলকে তার চেয়ে বেশি চিনেছে সেই মহান ত্রাতাকে। অধিকারের স্বপ্লে বিভোর হয়ে মানুষ ভোট দিয়েছে সে লড়াকু স্বপ্নের ফেরিওয়ালাকে। হারুন-হারাণ ততদিনে কলেজের মোটামুটি পরিচিত নেতা। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়ে রাতদিন খেটেছে তারা। এরপর নির্বাচনের বিজয় যখন এল তখন তা আর কোনো দলের একক বিজয় রইল না। পাকিস্তানের শাসনদণ্ড বাঙালিদের হাতে আসবে এই সুখানুভূতি গুটিকয় বাংলাবিদ্বেষী লোক ছাড়া এদেশের ছেলেবুড়ো সবার মনে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ল।
আট মার্চের রেডিওতে প্রচারিত নেতার ঐতিহাসিক বক্তৃতা শোনার পর আবালবৃদ্ধবনিতা মোটামুটি বুঝে গেল যে শোষকদের কাছে জনমত আর গণতন্ত্রের কোন মূল্য নেই। বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছাড়বেনা পাকিস্তানের জোতদাররা; অতএব, অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। কিন্তু ছাব্বিশে মার্চের ভোরের আলো না ফুটতেই ঢাকার নারকীয় তাণ্ডবের কথা বিশ্বময় জানাজানি হয়ে গেল। সবার মত মফস্বলের হারুন আর হারাণের কাছেও বার্তা পৌঁছে গেল – যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে মাঠে নেমে যেতে হবে। যখন কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক দিশা হারিয়ে ছোটাছুটি আরম্ভ করে দিল তখন স্থানীয় নেতারা সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন।
হিন্দু-অধ্যুসিত পূবগাঁওয়ে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে অধিক মাত্রায়। পাকিস্তানপেয়ারী প্রতিবেশীরা লম্বা আচকান পরে টুপি মাথায় দিয়ে তেরচাচোখে তাকাচ্ছে শুধু হিন্দুদের দিকেই নয়, একপ্লেটে খাওয়া স্বজাতি মুসলমান বন্ধুদের দিকেও। প্রভুদের স্বাগত জানাবার জন্য তাদের মধ্যে সাজসাজ রব। এ অবস্থায় গ্রামে ফিরে হারুনরা ছুটোছুটি শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন দেখে ভড়কে যায় দুজনই। হারাণ আস্তে করে বলে, থাকা যাবেনা রে, পালাতে হবে।
তাতো দেখতেই পাচ্ছি। গর্তের কেঁচোগুলা সাপ হয়ে বেরোতে আরম্ভ করেছে। তবে পালিয়ে যাবার আগে যতগুলো সম্ভব ছেলেপুলে জোগাড় করতে হবে। ওদেরও সাথে করে নিয়ে যাব।
হারাণ বলে, তোর না গেলেও চলবে।
মানে?
তোর বাপ পশ্চিম পাকিস্তানে আছে না।
হারুন বলে, ওখানকার কোনো বাঙালিকে ফিরে আসতে দিবেনা রে, সবাইকে মেরে ফেলবে।
ঘটনা যে এত দ্রুত ঘটে যাবে তা কেউ ভাবতে পারেনি। পূবগাঁওয়ের প্রায় অর্ধেক হিন্দু পরিবার ইতিমধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে লাপাত্তা হয়েছে। গরুছাগলসহ অস্থাবর যা কিছু পেরেছে অনেকে পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছে। কেউ আবার কিছু জিনিস ঘনিষ্ট লোকের কাছে আমানত রেখে গেছে। নিত্যবাবু, হারাণের বাবা, দুদিন আগে আগরতলার কোন এক আত্মীয়ের খোঁজ নিতে বর্ডার পাড়ি দিয়েছেন। যাবার সময় স্ত্রীকে সবকিছু গোছগাছ করে রাখতে বলে গেছেন। আত্মীয়ের ভরসা পেলেই সবাইকে নিয়ে তিনিও পাড়ি দিবেন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা ঘনাবার আগেই এ দুই গ্রামের মানুষের কাছে মুখে মুখে সংবাদ পৌঁছে যায় পাক আর্মি বিনা বাধায় আখাউড়া পৌঁছে গেছে। হারাণ পাগলের মতো ছুটে আসে হারুনের কাছে। তার মুখ থেকেই জানা যায়, সবকিছু ফেলেথুয়ে যে যেভাবে পারছে অন্ধকার রাতেই ছুটছে বর্ডারের দিকে। এলাকার চোরগুলা প্রকাশ্যেই জান নিয়ে পালানো লোকগুলার পোটলা -পুটলি, থালাবাসন কেড়ে নিচ্ছে। হারুন অভয় দিয়ে বলে, চিন্তা করিস না, কাকা যেকোন সময় ফিরে আসতে পারে, তারপর রওনা করবি; আমিও যাব তোদের সাথে।
রাত পোহালে দেখা গেল পুরো গ্রাম শুনসান। ক্বচিৎ দুয়েকজন লোকের সতর্ক পদচারণা লক্ষ করা যায়। পূবগাঁও প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। তবে বাঁশের মাথায় পাকিস্তানি পতাকা বেঁধে কয়েকটি লোক জোরকদমে কোনো কোনো বাড়ির একপাশ দিয় ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এদের সাথে মাখনচোরাও আছে; সে পোশাকআশাকে হুজুর সেজেছে। হারাণদের বাড়ির পাঁচিলের কাছে দাঁড়িয়ে একজন আওয়াজ দেয়, বাবু বাড়িতে আছেন নাকি? হারাণ ঘরের জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল; সে ঘরের বাইরে এসে কিছু বলার আগেই লোকটি বলল, ও আছ দেখতেছি। কিন্তু বুঝিনা গ্রামের সব হিন্দুরা নিজের সহায়সম্পত্তি ফালাইয়া ক্যান যে পালাইয়া যাইতাছে। এরপর এরা আর দাঁড়ায়নি। হারাণের বুঝতে বাকি থাকেনা এদের উদ্দেশ্য মহৎ নয়।
দুপুরে হারুন একবার ছুটে গেল হারাণদের বাড়ি। ওদের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তার চোখও আর্দ্র হয়ে ওঠে। নিত্যবাবু ফেরেননি; কোন খবরও পাওয়া যায়নি। হারাণ বলল, আমরা যাদের সাথে কথা বলেছিলাম এদের মধ্যে হাসান, করিম, লাভলু, আতা আর মুহিব আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য তৈরি। বাবা সন্ধ্যার মধ্যে না ফিরে এলে আমরা আর অপেক্ষা করব না। তোর অবস্থা কী?
বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। কিন্তু আমার ভয় লাগছে।
কেন?
শুনলাম শয়তানের দল গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। ওদের গাইড আছে সাথে। তবে চিন্তা করিসনা। সূর্য ডোবার সাথেসাথেই আমি চলে আসব। খাওয়াদাওয়া করে নিস তোরা। আর ভারি কিছু নেয়া যাবেনা মনে রাখিস।
মাকে মিথ্যে প্রবোধ দিয়ে হারুন বিকেলবেলা একটু ঘুমাবার চেষ্টা করছিল। আজকের অনিশ্চিত যাত্রা অগস্ত্যযাত্রাও হয়ে যেতে পারে। মাকে বলে যাবে না সে, এ চিন্তাও ভাবাচ্ছে ভীষণ। তখনই একটা ছোট্ট ছেলে পাগলের মতো ‘আর্মি আইছে, আগুন দিছে’ বলে চিৎকার দিতে দিতে তাদের বাড়ির উঠান দিয়ে দৌড়ে গেল। হারুন লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে মা’র বিভীষিকাময় চেহারা দেখে বলল, মা তুমি ভয় পেওনা। আমি দেখছি।
মা তাকে চেপে ধরে বলেন, খবরদার, বেরোবি না, শয়তানরা তোকে মেরে ফেলবে; তুই আমার একমাত্র সন্তান।
মা আমি যাব না; শুধু দূরে লুকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করব কী হচ্ছে। মায়ের পরের কথা আর তার কানে যায়নি; এক দৌড়ে সে মাঠে নেমে দেখে পূবগাঁওয়ের আকাশ লাল। দূর থেকে ক্ষীণ চিৎকার ও কান্নাকাটির শব্দও শোনা যাচ্ছে। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে হিতাহিত না ভেবে দু’গ্রামের মাঝখানের আধভাঙ্গা পুলের নিচে স্থিত হয়।
হারুন জানে পূবগাঁওয়ে এখনও কিছু পরিবার পালিয়ে যাবার সুযোগ পায়নি। এরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে শেষ। ঘরবাড়ি পশুপাখি যা আছে সব মারা পড়বে। এসব কিছু বাদ দিয়ে তার উৎকণ্ঠা দখল করে আছে হারাণের পরিবার। ওরা কি বেঁচে আছে? পালাতে পেরেছে? বিথী কোথায়? বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। গোধুলির আবছা আলোতে বেশ দূরে ক’জন মানুষকে এদিকে আসতে দেখল হারুন। তার গা এখনও কাঁপছে, ভয়ে এবং ক্রোধে। মানুষগুলো আরেকটু এগিয়ে এলে হারুন পরিষ্কার দেখতে পেল দুটি ভয়ঙ্কর সশস্ত্র সিপাহী সামনের দিকে বন্দুক তাক করে আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে, আর......এ দৃশ্য দেখতে গিয়ে হারুন কেঁদে ফ্যালে – লাল ফ্রক আর হলুদ শেলোয়ারপরা বিথীকে পশুর মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে মাখনচোরা। বিথীর আর্তনাদ শোনার মত কেউ নেই চরাচরে। ওরা পূবগাঁও থেকে মাঠ পেরিয়ে এসে পুলের একটু সামনে গিয়ে গ্রামের একমাত্র পথে উঠবে।
হারুনের গায়ের কাঁপুনি থেমে গেছে। শরীরের পেশীগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। একবার পিছনদিকে ফিরে নিজের গ্রামটি ভাল করে দেখে নেয় হারুন। তারপর পুলের নিচে একটি আধভাঙ্গা ইটের টুকরো দেখে ওটা হাতে তুলে নেয় সে। পরনের লুঙ্গিটাকে মালকোচা মেরে মাথা নিচু করে আলপথটার পাশ দিয়ে দ্রুত সামনে এগোতে থাকে । সিপাহীরা বেশ আগে আগে হাঁটছে; পেছনে পড়ে গেছে মাখনচোরা। হারুন চুপি চুপি ওই পর্যন্ত পৌঁছে লাফ দিয়ে রাস্তায় উঠে মাখনের মাথায় সজোরে ইটখানা বসিয়ে দেয়। মাখন কিছু বোঝার আগেই বাবাগো বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। লহমায় এক ঝটকায় বিথীর হাত ধরে উল্টাদিকে দৌড় দেয় হারুন। প্রশিক্ষিত সৈন্যদেরও বুঝতে দেরি হয়নি পিছনে কোনো অঘটন ঘটে গেছে। মুহুর্তের মধ্যে ওরা ডাবল মার্চ করে পলায়নপর শিকারের পিছু নেয়। হারুন বিথীকে নিয়ে মাঠে নেমে দৌঁড়াচ্ছে। তখনই প্রথম গুলিটা এসে লাগে বিথীর পিঠের ঠিক মাঝখানে। বিথী কঁকিয়ে উঠে মাঠে পড়ে যায়। হারুন জানে এই মাঠ পেরনো তার পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও বিথীকে ঝটকা মেরে উঠিয়ে নেয় কাঁধে। এখন সে আগের মতো দৌঁড়াতে পারছেনা। দশ কদম সামনে যাবার পরই দ্বিতীয় গুলিটা এসে লাগে হারুনের কানের পিছন দিকে। সে আর টাল সামলাতে পারেনা। বিথীকে জড়িয়ে ধরে সেও পড়ে যায় মাটিতে। তারপর কোনোরকমে বলে, বিথী, আর আমাদের কেউ আটকাতে পারবেনা; আমার মানও যাবেনা, তোর জাতও যাবেনা। বিথী সর্বশক্তি দিয়ে হারুনকে আঁকড়ে ধরে বলে, হারুনভাই, আমার খুব শীত লাগছে, আমার গা কাঁপছে, আমাকে চেপে ধর, আমাকে বিশ্বধাতার কাছে নিয়ে যাও, তাঁর কাছে যে আমাদের বলার আছে... । সে মুহুর্তে একঝাক গুলি এসে দুজনের দেহকে ঝাঁঝরা করে দিলে এক অনাবিল উষ্ণ প্রস্রবণ হারুন ও বিথীকে আপাদমস্তক রঙিন করে তোলে।


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান জামাল ভাই,দুদিন থেকে কেন জানিনা গ/ক-এ ঢুকতে পারি নাই, আজ আপনার গল্পটিই প্রথম পড়লাম,ভাল লাগল।শুভ কামনা সব সময়।
    প্রত্যুত্তর . ৭ জানুয়ারী
  • আবীর রায়হান
    আবীর রায়হান গল্পটি পড়ে মিশ্র অনুভূতি হলো। অনেক শুভকামনা রইলো।
    প্রত্যুত্তর . ৮ জানুয়ারী
  • Tahmina Alom Mollah
    Tahmina Alom Mollah কি বলব? স্হিত হয়ে পড়ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ তো আমাদের ইতিহাস। তখন আমার জন্মও হয়নি। তাই এ নিয়ে কিছু বলতে স্পর্ধা করি না।
    অভেদ্য কাঁচের দেয়ালটা ভেঙে কি যে সুন্দর করে মাখামাখি করে দিয়েছেন দুটো হৃদয়ের সুপ্ত ভালবাসা তা মুগ্ধতা কে ছাড়িয়ে ভাললাগার আরো কোন দুরের গাঁয়...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১২ জানুয়ারী

advertisement