এই গল্পকণিকায় একটা অদৃশ্য সূতাকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংসারে আরোও সুতা আছে; বাঁধন আছে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে পিতা-পুত্রের কদাচ-দৃশ্যমান টানটান সম্পর্কের সুতাটি অনন্য। মাতার মত পিতারা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সাধারণত দেখাতে পারেন না। আশা করি আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস পিতৃত্বের অস্ফুট আকুতিকে কিছুটা ভাষারূপ দিয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ২১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপিতৃত্ব (জুন ২০১৮)

খোকা
পিতৃত্ব

সংখ্যা

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ০  favorite ০  import_contacts ৬৩
খোকা বলে, দেখ বাবা, তোমার নাতি, চঞ্চল।
ঠিক তোর মত। বাবা ট্যাব টেনে নেয় তার হাতে। দাদুভাই! কেমন আছ?
বাবা! বাবা! চঞ্চল বাবাকে খোঁজে। বয়স আড়াই বছর। দাদুর হাতে ট্যাব। স্কাইপে বাবার ছবির পরিবর্তে একটা বুড়ো লোকের ছবি দেখছে সে। আগেও কয়েকবার এই লোকের ছবি বাবা দেখিয়েছে। ছোট মানুষ। এত কি আর মনে থাকে।
খোকা তার পিতার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় যাতে করে চঞ্চল তাকেও দেখতে পায়।
চঞ্চল স্বাভাবিক হতে পারে না। সামনে একটা লোক; বাবা পেছনে। তাকে কিছুটা বিরক্ত দেখায়। তবুও তর্জনী তুলে নিচুস্বরে বলে, কে? অর্থাৎ তোমার সাথের লোকটি কে?
কেন, চেনো না? তোমার দাদু। দাদুভাই। আমার বাবা। দাদুভাইকে নিয়ে আসব আমার সাথে। তোমার সাথে খেলা করবে।
চঞ্চলের কোন ভাবান্তর হল না।
বাবা বলে, তুমি কী খাবে দাদুভাই? বাবার সাথে পাঠাব; বল। আম খাবে, আম? নাকি কাঁঠাল?
চঞ্চল কিছু বলেনা।
তুইও এমন ছিলি রে ছোটবেলা। বাবা খোকার মুখের দিকে তাকায়।
খোকা বাবার হাত থেকে ট্যাবটি নিয়ে কিছুক্ষণ ছেলে আর স্ত্রীর সাথে কথা বলে। তারপর বাবার পাশে এসে সোফাতে বসে।
নাতির ছবি দেখে বাবা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছে। বলে, মনে আছে খোকা?- মিরপুর থেকে দোতলা বাসে চড়ে গুলিস্তান, গুলিস্তান থেকে টমটমে সদরঘাট। তোর হাতে ম্যাপ, ঘুরে ঘুরে ঢাকা শহর দেখবি। শেষে বুড়িগঙ্গায় নৌকা চড়লাম।
খোকার মানসপট থেকে হয়ত এতদিনে সে ছবি মুছেই গেছে। তবু বাবাকে খুশি করার জন্য বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে।
আর ওইযে, তুই মোটরসাইকেলে ঘুমিয়ে পড়তি। আমি অফিসে যাবার সময় তোকে স্কুলে ছেড়ে যেতাম। তুই আমার পেছনে জড়িয়ে ধরে ঘুম। রাস্তার লোকজন ডেকে বলত। তখন আমি বাইক থামিয়ে তোকে ধমক লাগাতাম।
হ্যাঁ বাবা। ভোরে ঘুম ভাঙতনাতো । খোকার একথা মনে থাকলেও থাকতে পারে।
পুরনো ছবি একটার পর একটা বাবার চোখের সামনে আসতে থাকে। আর যেদিন তুই সিঁড়ি থেকে পড়ে পা ভাঙলি, তোর মা-র সেকি কান্না!
মা-র কথা আসায় খোকার মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। সে বলে, থাক্ বাবা, এসব গল্প তোমার নাতির সাথে করো; সে মজা পাবে।
ওকে পাব কোথায়?
কেন! তুমিতো যাচ্ছই। এই বার কোন মানা শুনব না। কে দেখবে তোমায়? ফুফুর নিজের শরীরই খারাপ। কাজের লোকের ওপর কতটুকু ভরসা করা যায়? খোকা এবার বাবাকে অষ্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাবে বলে পণ করে এসেছে।

বাবা মাথা ঝাঁকায়। না রে। তোর মাকে এখানে ফেলে আমি অষ্ট্রেলিয়ায় যাব না।
খোকা বলে, ঢাকায় থাকা আর সিডনীতে থাকা একই কথা। এখানে কি তুমি মায়ের কাছাকাছি আছ? মা পড়ে আছে সেই গ্রামের বাড়িতে।
হোক না। এখানে মরলেতো সবাই তোর মা-র কাছেই আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু অষ্ট্রেলিয়া থেকেতো আমার লাশ পাঠাবিনা তোরা।
খোকা অনেক করে বুঝাল বাবাকে। কিন্তু বাবা কিছুতেই রাজি না। তার স্মৃতি বিজড়িত দেশ ফেলে সে বিদেশে যাবে না। তার অতীতের মিরপুর, গুলিস্তান, সদরঘাট, টমটম, মোটরবাইক এগুলোই সম্পদ। এসবের মধ্যেই তার খোকার শৈশব আছে, খোকার মা আছে। খোকাতো এখন অনেক বড়; নিজেই বাবা হয়ে গেছে। এই বড় খোকা তাকে আনন্দ উপহার দিতে চায়, সুখ উপহার দিতে চায়। কিন্তু বাবার অন্তর জুড়ে যে খোকা ছোটাছুটি করছে সে তো এ নয়। সে সুদূরের সেই ছোট্ট খোকা যে এখনো ভেতর থেকে চিৎকার করে ডেকে ওঠে, বাবা! ঠিক চঞ্চলের মত। আর সেই চিকন কন্ঠের বাবা ডাক তার দু’চোখে সমুদ্রের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে। এই মোহজাল থেকে বাবা বেরিয়ে যেতে একেবারে অনিচ্ছুক। কিন্তু এই অব্যাখ্যেয় জটিল মনস্তত্ত্ব খোকা বোঝেনা।
দেখতে দেখতে খোকার ফেরার দিন চলে এল। লাগেজ গোছগাছ করে বাবার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে বলল, আরেকবার ভেবে দেখো’ বাবা। তোমার মত পরিবর্তন করলেই আমি চলে আসব।
বাবা বলল, দাঁড়া। তারপর আলমারির খুলে বেশ ক’টা ছবির অ্যালবাম বের করে খোকার হাতে দিয়ে বলল, এগুলো নিয়ে যা। পরে কোথায় হারিয়ে যাবে। যখন সময় পাবি, খুলে দেখিস।
খোকার চোখ দুটি আপনাআপনি জলে ভারি হয়ে গেল। নিজেকে সামলাতে না পেরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। বলল, আমি তোমার সেই খোকা, বাবা। তুমি অফিস থেকে ফিরলে লাফ দিয়ে তোমার কোলে চড়তাম। সেই খোকা। আমি যাতে সাহস করে প্যাডাল মারতে পারি সেজন্য তুমি আমার সাইকেলের পেছন পেছন দৌড়াতে। সেই খোকা। শিশুপার্কের নাগরদোলায় আমাকে জড়িয়ে ধরে বসতে যাতে আমি পড়ে না যাই। আমি সেই খোকা, বাবা, আমি সেই খোকা।
বাবা বুকের সাথে তাকে এমন চেপে ধরেছে যে খোকা কিছুতেই ছুটতে পারছে না। তার মুখ থেকে একটি শব্দও বেরোচ্ছে না। শুধু উষ্ণ জলের প্রস্রবণ খোকার কাঁধ ভিজিয়ে চলেছে।


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement