বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ জুন ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯১

বিচারক স্কোরঃ ২.৯৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯২ / ৩.০

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯১ স্বপ্ন

Asif Rumi
comment ৫  favorite ০  import_contacts ১১৬

"একটা খুব অদ্ভুত বিষয় আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় জানো? "
সবুজ মাঠটার মধ্য দিয়ে, দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া একটা পথ দিয়ে হাটছে নাজমুল। ত্রপাও হাটছে নাজমুলের পাশাপাশি। তার চোখে কৌতুহল।
"কী অদ্ভুত বিষয় ? " জিজ্ঞেস করে ত্রপা।
"জানি না, বললে তুমি হাসবে। মনে হয়, এই যে পথটা, যেটাতে আমরা প্রায় বিকেলে হাটতে আসি, যেটা মনে হতে থাকে নীল দিগন্তে মিলিয়ে গেছে, সেটা আসলেই কোথাও গিয়ে শেষ হয়েছে। একটা সীমানা য় মাঠ আর আকাশ টা মিশে গেছে। কিন্তু আকাশ টা একটা দেয়ালের মতন। এই মাঠ টা আমরা হাটতেই থাকবো, হাটতেই থাকবো, কিন্তু কখনো, মাঠ টা পেরিয়ে যেতে পারবোনা। "
" বাব্বাহ! পুরোই দার্শনিক হয়ে গেছেন আপনি " ত্রপা হেসে ফেলে।
হাসলে ত্রপাকে খুব সুন্দর দেখায়। নাজমুল একবার তাকায়, তারপর আবার বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে,
" দার্শনিক কীনা জানি না, তবে মাঝে মাঝেই যখন এখানে হাটতে আসি, তখন এটা মনে হয়। মনে হয় এই মাঠ এবং আকাশের সীমানার ওপাশে কী আছে, সেটা আমরা কখনো দেখতে পারবোনা। এভাবে হাটতেই থাকবো অনন্তকাল। মনে হয় একটা চক্রের মধ্যে বাধা পরে গেছি। কেউ একজন এই চক্রের বাইরে আমাদের যেতে দিচ্ছেনা।
ত্রপা আবার হেসে ফেলে নাজমুলের কথা শুনে,
"কালকে কী ঘুমিয়েছ ঠিকঠাক? নাকি উদ্ভট কোন স্বপ্ন দেখেছো? "

"কেন বলতো? "

"না, কী সব আবোলতাবোল ভাবছো, চক্র টক্র, নাকি আমার সাথে যে এখানে হাটতে আসো সেটা ভালো লাগেনা? " ত্রপা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে।

"কী যে বলোনা তুমি! " সবেগে মাথা নাড়ে নাজমুল। তারপর আরো যোগ করে,
"তোমার সাথে এখানে যে ঘুরতে আসি, এই সময়ে, সেটা আমার প্রতিদিনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্ত। তাই তো প্রতিদিন যতো কাজই থাকনা কেন, ঠিক চলে আসি।
তবে এই সবুজ মাঠ, আকাশের সীমানা, সেগুলো দেখলে, কেন জানি দার্শনিক হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। "

"আচ্ছা সাহেব, এখন কী শুধু দার্শনিক হয়েই থাকবেন, নাকি আমি আজকে কী পরে এসেছি সে দিকেও একটু নজর দেবেন, আজকে মনে হচ্ছে, আমাকে একেবারে খেয়াল ঈ করছেন না সাহেব " ত্রপার চোখে মুখে কৃত্তিম রাগ ফুটে ওঠে।
নাজমুল এবার ভালো করে তাকায় ত্রপার দিকে। তারপর হেসে ফেলে। ত্রপার পরনে একটা সবুজ শাড়ি, চুলগুলো খুলে দিয়েছে। সবুজ মাঠ, শরত শেষের পরিষ্কার আকাশ। অসাধারণ সমন্বয় হয়ে গেছে। নাজমুলের মনে হতে থাকে সে স্বপ্ন দেখছে। পরীক্ষা করে দেখা যাক।
ত্রপাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যায় সে, আসলেই কী বাস্তব নাকি স্বপ্ন পরখ করার জন্য। কিন্তু ত্রপা খিল খিল করে হেসে দূরে সরে যায়। নাজমুল আবার হাত বাড়ায়।

ঠিক তখনই খাট থেকে পড়ে যায় সে।
ব্যাথায় কুকড়ে যায়। চোখ মেলে দেখে, মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ধুর! স্বপ্ন দেখছিলো সে এতোক্ষণ! চোখ মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে ফেলে নাজমুল।

2.

হেলমেট টা খুলে ফেলে রায়ান। থ্রিডি গগলস টাও। নাজমুল আর ত্রপা নামের দুই ভার্চুয়াল ক্যারেক্টার এর কর্মকান্ড দেখছিলো সে এতোক্ষণ। সে একজন ভার্চুয়াল আর্কিটেক্ট। অর্থাৎ ভার্চুয়াল বা কল্পনার জগত এর নকশা করে সে। নানা ধরণের ভার্চুয়াল বা কল্পনার জগত তৈরি করে, মানুষের কাছে বিক্রি করার জন্য।
এই শিল্প মাধ্যমের প্রবল জনপ্রিয়তা এখন। পুরনো দিনের চলচ্চিত্র নামক শিল্পের বাজার দখল করেছে ভি ঈ বা ভার্চুয়াল এন্টারটেইনমেন্ট।
এতোক্ষণ নাজমুল আর ত্রপার ভার্চুয়াল জগতে ছিলো সে। এই জগত টা তার নিজের ঈ তৈরি করা। "ইনসেপশন " নামক প্রাচীন একটা মুভি দেখতে দেখতে নাজমুল আর ত্রপার কনসেপ্ট টা মাথায় আসে ওর। ভার্চুয়াল জগত টা কিছুটা তৈরি হয়েছে, তার ট্রায়াল দেখছিলো সে। নাজমুলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ওর নিজের ঈ আইডিয়া। সিরিয়াস রোমান্সের মাঝে একটু কমিক রিলিফ দেয়ার চেষ্টা আর কী। কিন্তু যখনই সেই দৃশ্যটা আসে, ও নিজেই হেসে ফেলে। দৃশ্যটা আসলেই খুব হাস্যকর হয়েছে। ভালো সাড়া পাবে এই ভি ঈ টা। ভাবতে ভালোই লাগে রায়ানের। তবে শুরুর দিকে নাজমুল এর দার্শনিক কথা বার্তা শুনে চমকে গেছে সে। ক্যারেক্টার গুলোতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্ত্বা যোগ করেছে সে। তাই বলে, তারা এতোটা গভীর, বুদ্ধিদীপ্ত কথা বার্তা বলতে শুরু করবে, ভাবতে পারেনি সে। ভি ঈ টার পুরুষ মানে নাজমুল নামের চরিত্রটার বলা কথা গুলো আসলেই অদ্ভুত। আকাশের এবং মাঠের সীমানা শেষ হচ্ছেনা, ও পাশে কী আছে, কী হবে জানা যাচ্ছেনা। কথাগুলো অদ্ভুত হলেও পদার্থবিদ্যা র দিক থেকে কিছুটা সত্যি। মৌলিক কণিকাদের জগতে, অনিশ্চয়তা বলে একটা জিনিষ আবিষ্কার করেছিলেন, হাইসেনবার্গ নামক প্রাচীন এক বিজ্ঞানী। যেটা অনুযায়ী, পর্যবেক্ষক কখনো, ইলেকট্রন এর ভরবেগ আর অবস্থান দুটো একই সাথে নিশ্চিত হতে পারবেনা। তাছাড়া ব্ল্যাকহোলের কথা ধরা যাক। ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত মানে ইভেন্ট হরাইজনের ওপাশে কী হচ্ছে, তা হয়তো কখনো নিশ্চিত জানা যাবেনা। কেননা ব্ল্যাক হোল আলো পর্যন্ত শুষে নেয়।
তাহলে কী একটা সীমানায়, পর্যবেক্ষণ সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না?
ধুর! এসব কী ভাবছে রায়ান! নিজেরই তৈরি করা একটা ক্যারেক্টার এর বলা মাথামুণ্ডু ছাড়া অর্থহীন কথা নিয়ে ভাবছে সে! আশ্চর্য।
হঠাত মাথা ঘুরে পরে যেতে থাকে রায়ান।
আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, প্রাচীন এক সাধুর মতন দেখতে, এক কবির একটা কবিতার লাইন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে ওর।
" রুপনারাণের কুলে জাগিয়া উঠিলাম,
এ জীবন স্বপ্ন নয় "
আচ্ছা রায়ান কী স্বপ্ন দেখছে? তবে স্বপ্নটা ভাংছে না কেন? সে কী স্বপ্ন তে আটকা পড়ে গেছে? হাসফাস করতে থাকে সে! তার মাথাটা মনে হয় দপদপ করে জ্বলছে! সে কী স্বপ্ন দেখছে? তার দম বন্ধ হয়ে আসছে কেন? সে কী স্বপ্নে আটকা পরে গেছে? হাত পা ছুড়তে থাকে রায়ান!
চেয়ার টা মাটিতে পরে যায়।
ধ্যাত! এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো সে!
ঘুমিয়ে পরেছিলো রায়ান। ধুর অনেক কাজ বাকী রয়ে গেছে। কাজটা শেষ করতে হবে।
ভি ঈ তৈরি করার মেশিন টা চালু করে সে। থ্রিডি গগলস আর, হেলমেট টা পড়ে নেয়।
আবার ঢুকে পড়ে তার তৈরি করা ক্যারেক্টার নাজমুলের জগতে। তবে স্বপ্নের দমবন্ধ করা অনুভুতিটার রেশ রয়ে যায় তখনো তার শরীরে।

3.
রায়ান নামের চরিত্রটার কর্মকান্ড দেখছিলেন, তিনি কিংবা তারা। আসলে এক বচন, বহুবচন দুটোই খাটে কিংবা খাটেনা তাদের ক্ষেত্রে। ব্যাপার টা ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছে। তিনি অনন্তে ঘুরে বেড়ান, অথবা তারা। কিংবা তারা অথবা তিনিই অনন্ত। এতোক্ষণ যা ঘটছিলো, তিনি কিংবা তাদের নিজের ভেতরের জগতেই ঘটছিলো।
তিনি কিংবা তারা একাকী! রায়ান, রায়ানের মতন অন্যরা কিংবা রায়ানের সৃষ্টি নাজমুল রা তাকে বা তাদের সংগ দেয়।
যদিও তারা জানেনা। তারা প্রত্যোকেই আসলে তার তাদের স্বপ্নের এক একটা অংশ, চরিত্র। কিন্তু তার বা তাদের একটা অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছে।
এই স্বপ্নের বাইরে কী, তিনি বা তারা ও কী কোন স্বপ্ন?
এর বাইরে বেরুনো র কী পথ নেই?
তার বা তাদের জগতে তোলপাড় শুরু হয়। তিনি অথবা তারা স্বপ্নের জগতের বাইরে বেরুতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আদৌ কী আছে কিছু? এই স্বপ্নের জগতের বাইরে?
অসহ্য তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।
স্বপ্নের এই চক্রের বাইরে কী বাস্তব জগত নেই?
জগত কেঁপে কেঁপে ওঠে।
সবকিছু নাকি স্বপ্ন ভেঙে পড়তে থাকে?

4 .

উফফ! কী বিশ্রী আর কিম্ভুত একটা স্বপ্ন!
লেখকের ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে। বেশি জটিল চিন্তা থেকে এই বাজে স্বপ্নটা এসে অবচেতনে ঘর করেছিলো বোধহয়। এখনো মাথা থেকে যাচ্ছেনা মনে হচ্ছে স্বপ্নটা। লেখক বিছানা থেকে উঠে বসেন। ডাইনিং রুমে যান। পানি খান ঢকঢক করে।
তারপর বিছানায় শুয়ে পড়েন। কিন্তু ঘুম আসেনা তার। বিছানায় এ পাশ ও পাশ করতে থাকেন। গুনতে থাকেন সং্খ্যা। কাজে লাগেনা কোন কৌশল। বিছানার পাশেই স্টাডি টেবিল লেখকের।
কিছু একটা লিখতে চেষ্টা করা যাক।
তাহলে হয়তো ঘুম আসেন।
আচ্ছা বিশ্রী স্বপ্নটা লিখে ফেললে কেমন হয়! ভাবেন লেখক। অতএব লিখতে বসে যান। ভালোই লাগতে থাকে তার "স্বপ্নের গল্প " লিখতে।
হঠাত তার মনে হলো, তার স্বপ্নের চরিত্রদের মতন, তিনি কী এখনো স্বপ্ন দেখছেন! এখন যা করছেন, এতোক্ষণ যা হয়েছে, এটা কারো স্বপ্নের অংশ নয় তো?
লেখকের ভয় করতে থাকে।
যাচাই করার একটা ধ্রুপদী উপায় আছে।
শরীরে চিমটি কাটতে চলেছেন লেখক....
তারপর,

স্বপ্নের বাকী অংশটুকু মনে নেই আর।

অথবা এটাও স্বপ্ন কীনা কে জানে!

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন