কিছু গল্প হবহু জীবনেরই হয়, স্মৃতিকাতারে একটা সময় লোপ পায়...আজ থেকে প্রায় কয়েক বছর আগের একটা অবহেলিত নিংড়ে যাওয়া নিম্নমধ্যবিত্তের কিশোর বয়সের গল্প...যখন সে ২য় শ্রেণীতে পড়ুয়া একটা বাচ্চা ছেলে। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে সময় কাটতো যার প্রতিনিয়ত। যারা শেষ বেঞ্চে বসে তারাই তার অনুভূতি বুঝে। আপনি শেষ বেঞ্চে না বসলে বুঝবেন না ঐ টেবিলের ছেলেগুলোর আকুতি। অনেক মজাই হয় স্কুল জীবনে। দুষ্টামি করতে পারতো না,তবুও মিশতো কতোই না খুঁনশুটি,মারামারি আবার কখনো নিরবতায় জায়গা পায়। প্রতিনিয়ত পড়া না পারার জন্য মার খাওয়া, কখনো বা পিছনের টেবিলে পড়ে থাকা ছেলেটা প্রত্যাখিত হয় সামনের টেবিলের মলিনতা থেকে। মাঝে মাঝে কথা না বুঝে, না শুনে সবার সাথে মুখ নাড়ানো ছেলেটাই যেনো শেষ বেঞ্চের ছাত্র। কখনো কখনো না বুঝেও কিংবা স্যারের কথা না শুনেও সবার সাথে তাল মিলিয়ে গর্জন দিয়ে বলে উঠা স্যার পারি,সবার সাথে তাল মিলানোর মজাই আলাদা । তবে পড়া যখন জিঙ্গাসাবাদ করা হয় তখন আর এতোটা স্পিড থাকে না। এভাবে অবহেলার জায়গা থেকে ছেলেটি আস্তে আস্তে অনেক কিছু বুঝতে শিখে । একটা সময় সেও প্রথম বেঞ্চে জায়গা নেয়। সেটা ছিলো ৪র্থ শ্রেণিতে তার প্রথম সফলতা । মাঝখানে একটা গল্প অবশ্যই ঘটলো । ঘটনাটা হলো ফেইল নামক শব্দটা তাকে ২য় শ্রেণিতে দুইবার রাখে। তৃতীয় বার সে সফল হয়। পরবর্তীতে তার অগ্রসর প্রথম কাতারে প্রথম বেঞ্চের ছাত্রদের মাঝে প্রথমই সে হয়। এভাবে তার সফলতার অগ্রগতি । যখন হাইস্কুলে লেবেলে ভর্তি হবে,সেখানেও ছেলেটার ছিলো এক পিঁছুটান। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ভাত পেলে কাপড় পায় না,আর কাপড় পেলে ভাত পায় না। মধ্যবিত্তদের যা হয় আর কি! কিন্তু ছেলেটা এতো তাড়াতাড়ি সফলতার ঘ্রাণ নাক থেকে ফেলতে পারে নি । তার লক্ষ্য সে পড়বে,যে প্রকারেই হউক সে পড়বে । অবশেষে ৬ষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি । তার রোল নাম্বার তখন ৩১ছিলো,এখানেও যেনো সে পিছনের কাতারে । যেহেতু রোল পিছনে তাই সামনে টেবিলেও সে নিয়মিত জায়গা নিয়ে ক্লাস করতে পারি নি ঐ সময়টাতেই। মনে হয় যেনো আবার পিঁছুটানে শেষ বেঞ্চে সাড়া জাগে । এভাবে ক্লাস করে নবীণ-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের কাতারে। অবহেলার দ্বারপ্রান্ত কি সেটা শেষ বেঞ্চের ছেলেটা মোটামুটি ভালোই জানে । একদিন স্যার ক্লাসে হঠাৎ ক্যাপ্টিন নির্বাচনের কথা ছড়িয়ে দেয়,এ যেনো শিক্ষা জীবনেরই আরেকটা একটা সংসদীয় নির্বাচন। ছেলেটি হুট করে শেষ বেঞ্চ থেকে হাত তুলে প্রার্থীদের কাতারে। অবাক করা বিষয়,শেষ বেঞ্চের আবাল-টাও নির্বাচন করবে,কিছুটা হাসি-ঠ্রাট্রা ও তাকে নিয়ে হয়েছে কিছু নিঁচু মস্তিষ্কে । যেমনটা রাজনীতিক মঞ্চে । যাই হউক রাজনীতি নিয়ে বলতে চাই না।
ছেলের কথাই আসি,পরবর্তীতে সব ইগো,সব নিঁচু মস্তিষ্ক পার করে ছেলেটা আবার কারো কারো মাঝে অল্প সময়েই পিছন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অতি শিগ্রই মন জোগাড় করে ফেলেছে ছেলেটি । এমন একটা দল থাকবে যারা সর্বদা আপনাকে,আপনার স্বপ্নকে তুচ্ছ করে দেখবে । যাই হউক অবশেষে নির্বাচন তাকে প্রমাণিত করে সে আবাল না,সে আসলে সত্যিকারার্থে লড়াকু সৈনিক। যার জীবনটাই যুদ্ধ,কারণ সে মধ্যবিত্ত । অবশেষে পরবর্তীতে কয়েকদিন পর হুট করে একদিন ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে নির্বাচন আয়োজন করা হয়। ভোট করে নির্বাচনের মাধ্যমে ছেলেটা নির্বাচিত হয় ক্লাস ক্যাপ্টিন । ইন্টারেস্টিং ছিলো মাত্র এক ভোটের ব্যাবধানে সে জয়ী লাভ করে । যাত্রা শুরু শেষ বেঞ্চের স্টুডেন্টের প্রথম বেঞ্চে জায়গা নেওয়ার। তার জন্য সর্বদা একটা সিট প্রথম বেঞ্চে সে না আসলেও খালি থাকবে। এটাই যেনো কৃতিত্ব । তার সাথে সাথেই স্বাভাবিকভাবেই সে হয়ে উঠে সবার মাঝে ভালো মানের একটা ছাত্র এবং স্যার,ম্যাডাম আর সহপাঠীদের মনে বিরাট জায়গা দখল করে ছেলেটি । সবার সাথে হাসি-খুশি চলে । একটা বছর পার হয় ক্লাস সেভেনের যাত্রা । পরবর্তী ক্লাসে ৩১থেকে তার রোল নং হয় ০১। যেনো আবারো সফলতায় প্রশংসনীয় ছেলেটি । জীবনের ছোট ছোট বিজয়গুলো তার এ কিশোর বয়সের শিক্ষাজীবন থেকেই শুরু । নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে বলে সে পাশ কাটিয়ে চলে নি। শেষ বেঞ্চ থেকে উঠে আসা ছেলেটি আজ একটা শিক্ষা প্রতিষ্টানের অধ্যাপক। আজ সে নিজেই জ্ঞানের আলো ছড়ায়। অনেক কষ্ট ছিলো এ উঠে আসার পিছনে । তবে জীবনের যুদ্ধগুলো যেনো কিশোর বয়স থেকেই শুরু । আর তার এ একেকটা ছোট ছোট সফলতা তাকে বড় সফলতার দিকে নিয়ে যায়। যে ছেলেটা শেষ বেঞ্চে বসে হাউমাউ করতো নিরবতায়,কখনো খুঁনশুটি কিংবা খালিপেটে শিক্ষার উদ্দেশ্য চলে আসতো বিদ্যালয়ে। অথচ সে অবহেলাই,সেই পঞ্চমুখই আজ পিছনের কাতার ডিঙিয়ে সামনে বেঞ্চে আলো ছড়াচ্ছে । এখন আর সে স্কুল জীবনে নেই,নেই স্মৃতি আটকে যাওয়া কিশোর জীবনের সে কয়েকগুলো দীর্ঘশ্বাসে । এখন সে জাতির মঞ্চে সামনের কাতারে বসে জাতিকে আলো দেখায়,আজ সে জাতি গড়ার কারিগর।সে একটা শিক্ষক, একটা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক ।