নীরা এমন একজন যে ভাঙ্গা মন নিয়েও হাসতে পারে । মানুষকে ভালবাসতে পারে । জীবনযুদ্ধে পরাজিত নয় । যাকে ভালবাসত তাকে সে পায় নি। তবুও হাসিমুখে বাচতে চেয়েছে সবাইকে নিয়ে ।মাদার টেরেসার মত মানুষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিল সে ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ মে ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ২৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

স্রোতের সলিলে
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

এলিজা রহমান

comment ৫  favorite ০  import_contacts ৪৭
আজকের দিনটা অনেক সুন্দর । ঝলমলে দিন, কোন কোন বিনা কারনেই মন খুশি হয়ে উঠে আজকের দিনটা তেমনিই নীরা ভাবল ,মনে মনে । পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্মই হয় দুঃখ পাওয়ার জন্য , নীরার নিজেকে সেই দলেরই ভাবে ।

আজকের ছুটির দিনটা কিভাবে কাটাবে সে ? বন্ধুরা তো ব্যস্ত তাদের নিজেদের জীবন । আয়েশা,আলিয়া আর তিন্নি এখন পুরোদস্তর গিন্নী । ও থাকে ভাইয়ের সাথে । ভাই-ভাবী ওকে যথেষ্ট আদর করে , সন্মান করে । বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে বড় ভাই‌ দায়িত্ব দিয়ে ওকে মানুষ করে ।

সরকারি গার্লস কলেজের লাইব্রেরিয়ান নীরা আলম । স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে কলেজের দারোয়ান পর্যন্ত সবাই ওকে খুব পছন্দ করে । সে যতটা পারে মানুষকে সাহায্য করে। কেউ আর্থিক সাহায্য চাইলেও নীরা তাকে ফেরাতে পারে না । ওর সহকর্মী বিলকিস জাহান বলে ,' আপনি মানুষকে যে টাকা ধার দেন , জানেন না এরা আপনাকে ঠকাচ্ছে !'
নীরা তাকে হেসে উত্তর দেয় , ' জানি তো , কিন্তু সে তো জানে না যে আমি জানি । মজাটা এখানেই , মানুষকে অপ্রত্যাশিত আনন্দ দিতে ভাল লাগে আমার । টাকা নিয়ে এই জন্য আমাকে সে কোনদিন ভুলতে পারবে না । এই কথাটা যতবার ভাবি আমি মনটা আনন্দে ভরে উঠে ।'
বিলকিস জাহান বলেন , ' নিজের জন্য সঞ্চয় করেন আপা , বিপদ আপদ তো বলে কয়ে আসে না । একটু ঘুরতেও তো যেতে পারেন ,মালয়শিয়া না হয় সিঙ্গাপুর ?'
নীরা বলে , ' হ্যাঁ , যাব মা আর ভাইদের নিয়ে কলকাতা । ভাইয়ের দুটো বাচ্চা আমাকে কি ভালবাসে জানেন না ।ওরাই আমার বেঁচে থাকার প্রেরনা ।'
বিলকিস জাহান বলেন , ' যত যাই বলেন নিজের সন্তান আর ভাইয়ের সন্তান এক হয় না । '
নীরা তাকে কিছু বলার আগেই একজন স্টুডেন্ট এল বই জমা দিতে , সে তাকে বলল , ' বইটা মাঝখানের সেলফে রাখবে । '. তারা দুজনেই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । বিলকিস জাহান বলেন, 'আমার এখন ফাস্ট ইয়ারের সাথে ক্লাস আছে ,যাই জ্ঞান বিতরন করে আসি ।'
সবার সাথে হাসিমুখে থাকলেও নীরা তার মনের গোপন দুঃখের কথা গোপনই রাখতে চায় । সবাই মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবে তার কেন স্বামী সন্তান নেই ।
তার হৃদয়টা যে ভাঙ্গা , সে যখন অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী ছিল তখন তাকে ওপেন হার্ট সার্জারী করতে হয় দিল্লীতে একটা হাসপাতালে । সাদাফ আর ও একই ডিপার্টমেন্টে পড়ত । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের লাইব্রেরী সাইন্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র ছিল সে । নীরার স্বভাবের কারনেই সবাই ওর প্রতি আকৃষ্ট হত । সাদাফ খুব ভাল আবৃত্তি করত । কালচারাল প্রোগামে সে সব সময় পার্টিসিপেট করত ।সাদাফ নিশ্চয়ই বিয়ে করে সুখী হয়েছে ।
সেদিনের কথা ওর মনে আছে । ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন । নীরা আর আলিয়া ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে গল্প করছিল । শেষ বিকেলের মায়াবি আলোয় চার পাশটা ভরে গিয়েছিল । সাদাফকে তাদের দিকে আসতে দেখে , আলিয়া নীরাকে একটা খোঁচা দিয়ে বলল ,দেখ কে আসছে । নীরা অপ্রস্তুত না হয়ে নীচু গলায় বলল ,তুই দ্যাখ আমার সময় নেই ।' তারপরে উঠে দাড়িয়ে বলল , 'আমি বাসায় যাবাে , তুই থাক ।'
সাদাফ বলল , ' নীরা বসো , তোমাকে আমার কিছু বলার আছে ।' আক্কেলমন্দ কে ইশারাই কাফি , আলিয়া কেটে পড়ল । নীরা হেসে বলল , ' সাদাফ ভাই ভাল আছেন আপনি ?'
' না ভাল নেই , রাতে ঘুমাতে পারছি না ।' সাদাফ বলেঙ
' তো ডাক্তারের কাছে যান ভাই ।অসুস্হ হলে কে দেখবে আপনাকে ?' নীরা বলল ।
' কেন তুমি দেখবে । আমি তোমাকে খুবই পছন্দ করি নীরা । আমার আব্বু-আম্মু অনেক ভালো মানুষ । তারা তোমাকে মাথায় করে রাখবে ।' সাদাফ আবেগের বশে নিজেকে সামলাতে না পেরে নীরার হাত ধরে কথাগুলো বলল । নীরার মনে হলো বেঁচে থাকাটা সত্যিই আনন্দের যখন কেউ তোমাকে ভালবাসে । নীরা এটাও জানে আবেগ দিয়ে জীবন চলে না । বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন । স্বপ্ন আর বাস্তব এক নয় ।
সে ধীরে ধীরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো । বলল , ' সাদাফ ভাই আপনি খুব ভাল একজন মানুষ । একটা মেয়েকে খুশি রাখবেন আমি জানি । ' একযটু থেমে সে বলল , ' আপনি আমার কিছু ই তো জানেন না ।'
' তোমাকে আমি চিনি , সব জানি আমি তোমার । ' সাদাফ বলে ।
' আমি ভার্সিটিতে আসিনি কয়েকদিন আপনি জানেন ?'নীরা জিজ্ঞাসা করে ।
' হ্যাঁ জানি , আয়েশা বলেছে । তোমার মায়ের শরীর খারাপ ছিল, তোমরা দিল্লী গেছিলে । এখন কেমন আছেন উনি ?' সাদাফ বলে ।
' আম্ম্া ভাল আছেন । আমার ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে । এমন একটা মেয়েকে আপনার ফ্যামিলিতে মেনে নেবে ?'নীরা নিজেই বলল ,' সব মেয়েই চায় স্বামী সন্তান নিয়ে নিজের সংসার করতে । সুখী হতে । আমি জানি আপনি চাইলেও আপনার পরিবারের সবার কথা ভেবে আপনি আমাকে গ্রহন করতে পারবেন না ।'বলে নীরা তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না তার অবাক দৃষ্টির সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে আসে । তার এখন মন থেকেই চাওয়া আল্ল্াহ যেন সাদাফ কে সুখী রাখেন। সবাইকেই আল্লাহ যেন ভালো রাখেন । নীরা এখন নিজের সুখের চেয়ে মানুষের কল্যানে জীবন উৎসর্গ করবে ভেবে নেয়। অন্য মানুষকে সুখী করার মধ্যে আনন্দ আছে । দিনে রাতে কারো বিপদে হলেই নীরা ছুটে যায় , যথাসাধ্য সাহায্য করে ।
দারোয়ানের ডাকে সম্বিত ফেরে নীরার । সে বলে , ' ম্যাডাম বাসায় যাবেন কখন ? কলেজ তো ছুটি হয়ে গেছে । '
নীরা বলে , ' ভাল আছেন দারোয়ান ভাই ? আপনার ছোট মেয়ের কি অবস্হা ?'
গত মাসে দারোয়ানের মেয়ের ডেঙ্গু ধরা পড়ে । নীরা তাকে তিন হাজার টাকা দেয় মেয়ের চিকিৎসার জন্য ।
দারোয়ান উত্তরে বলে , ' জী ম্যাডাম এখন ভাল আছে আপনাদের দোয়ায় । আপনার কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে আপা ।' কৃতজ্ঞতার স্বরে জানায় সে ।
' আরে না দারোয়ান ভাই কি বলেন , মানুষের উপকার তো মানুষই করবে । আসলে তো সব কিছু করেন আল্লাহ , আমরা তো উসিলা মাত্রা।'নীরা লজ্জিত কন্ঠে বলে ।
' আপনার টাকাটা তো পুরোটা এখনও শোধ করতে পারি নাই । সামনের মাসে দিয়ে দিবো আপা ।'.দারোয়ান রশিদ কুন্ঠিতভাবে জানায় ।
' কোন সমস্যা নেই ভাই । যখন ইচ্ছা দেবেন । টাকার জন্য আমি মরে যাচ্ছি না ভাই ।' নীরা তাকে আশ্বস্ত করে বলল ।
দারোয়ান বলল ,' আপা ছাতা আনছেন ? রোজ এই সময় কিন্তু বৃষ্টি আসে । '
নীরা বলে ,' না ভাই ভুলে গেছি । একটা রিকশা ঠিক করে দেন আপনি আমাকে ।'
দারোয়ান নীরাকে বসতে বলে রিকশা খুজঁতে থাকে । নীরা লক্ষ্য করেছে , দারোয়ান, আয়া, এই শ্রেনীর মানুষেরা তাকে কেন যেন বেশি ভক্তি শ্রদ্ধা করে । কলেজের দারোয়ান, আয়াদের সে কোন কাজে বললে তারা খুব যত্নের সাথে তা করে দেয় । এই নিয়ে অন্য টিচাররা ,বিশেষ করে বিলকিস জাহান ওর আড়ালে নাকি বলেন , নীরা টাকা দেয় তো তাই ওর দাম দেয় আয়া -দারোয়ানরা । হয়ত তাই ঠিক নীরা ভাবে কে জানে !? কলেজের থেকে ওর বাসার দুরত্ব আধা ঘন্টা । কলেজ থেকে বাসায় ফিরতেই ওর দুই ভায়ের ছেলে দৌড়ে আসে ।
' ফুপু কি আনছ ? কি আনছ ? '
নীরা প্রতিদিনই কলেজ থেকে বিকেলে ফেরার পথে ভাইয়ের বাচ্চা দুটোর জন্য খাবার কিনে আনে । আজকে সে কিছু কিনতে পারে নি, এক বৃষ্টির জন্য দুই অন্যমনস্ক থাকার জন্য খেয়াল হয়নি ।


সুমনা ভাবি এসে বাচ্চাদের তাড়া দেয় , ' এই তোমরা ফুপুকে বিরক্ত কোর না । হাত মুখ ধুয়ে রেস্ট নেবে তারপর কথা বলবে ।' এই সুমনাকে নীরা নিজে পছন্দ করে ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেয়। রিয়াজ নীরাকে বিয়ে না করিয়ে নিজে বিয়ে করতে চায় নি । নীরা নিজেই উদ্দ্যোগী হয়ে ভাইকে বিয়ে দেয়। সুমনা অনেক যত্ন করে নীরাকে আর নীরার মাকে । সকালে নাস্তা না খেয়ে কোনদিনই সে নীরাকে কলেজে আসতে দেয় না । টিফিন দিয়ে দেয় দুপুরে খাবার জন্য । যেদিন সকালে টিফিন দিতে পারে না সেদিন সে দুপুরের আগেই কলেজে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসে ।
নীরাকে সে নিজের বোনের মত ভালবাসে । সুমনার প্রতি নীরার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । সুমনা ওর ভাইয়ের
জীবনটা ভরিয়ে দিয়েছে , সুখে আনন্দে । বিয়ের পরে সে আর রিয়াজ অনেক চেষ্টা করেছে নীরাকে বিয়ে দেয়ার । তার ননদিনী তো রূপে গুণে অতুলনীয়, তাকে ছেলেরা প্রথম দর্শনেই পছন্দ করে ফেলে । তারা যখন শুনে মেয়ের ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে, তার পর তারা আর যোগাযোগ করে না । শেষ মেষ নীরা বলেছে , ' ভাইয়া তোমরা এসব বন্ধ করো । যে কদিন বাঁচবো তোমাদের সঙ্গে থাকতে চাই । আমাকে টাকা খরচ করে বিয়ে দেয়ার চেয়ে যা আমার ভালো লাগে তাই করতে দাও । বিয়ে দিয়ে নতুন করে অশান্তি ডেকে এনো না তোমরা ।''

রাতে খাবার পর অনেক গল্প হয় , রিয়াজ একটা বেসরকারী ব্যাংকে চাকরী করে । সারাদিন পরে রাতে খাবার টেবিলে একসঙ্গে খাবার খাওয়া আর গল্প হয়, হাসি মজা করে । এসময়টা খুব আনন্দ করে রাতের খাবার খাওয়া দাওয়া হয়। মাঝে মাঝে তারা বাইরেে খেতে যায়। বেশিরভাগ সময় নীরাই সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে নিয়ে আসে । খাওয়ার পরে নিজের ঘরে ঘুমাতে এল । ও আর ওর মা একসাথে ঘুমায়। ঘুমাতে যাওয়ার মায়ের প্রেশারের অষুধটা নীরা খাওয়ায় দেয়। নীরা জিজ্ঞাসা করে , ' আম্মা কিছু কিছু বলবা আমাকে ?'
আম্মা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললেন , ' তুই কি এমনই থাকবি মা ? ঘর সংসার করবি না আর !'
নীরা বলে উঠে, ' আম্মা কি বল তুমি ? আমার অবস্হা তো তুমি জান । আমাদের দেশে কি এমন কোন ছেলে জন্মাইছে যে আমার এই শারীরিক অক্ষমতাকে স্বীকার করে আমাকে আপন করে নেবে ? তুমি তো জান মা ছেলেরা নিজেরা যাই হোক বউকে হতে হবে সর্বগুনে গুনান্বিত্বা । আমি তো তা হতে পারব না । স্বাভাবিক মেয়ের মত তো আমার জীবন হবে না । আমি বাকি জীবন এভাবেই কাটাতে চাই। সমাজ সেবা করতে ভাল লাগে আমার । এতিম বাচ্চাদের সাহায্য করে আনন্দ পাই আমি। রোটারি ক্লাবের কাজ করি , দুস্হ মানুষের রুটি রুজির ব্যবস্হা করতে ইচ্ছা করে মা । অসহায় মানুষকে সুখী করে আমি যদি শান্তি পাই তাহলে অসুবিধা কি আম্মা বল ? আমি কি অন্যায় করছি
কোন?' নীরা বলল ।
আম্মা নীরাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িতস্বরে বলেন , ' না মা , তুই যা করছিস ভালই করছিস । আল্লাহ তোর মনে শান্তি দেন । সুখশান্তিতে ভরে থাকুক তোর জীবন ।'
আম্মা ঘুমিয়ে পড়লেও নীরা জেগে থাকে একা । আম্মা কে মুখে বললেও আসলেই কি তার জীবনে কোন কষ্ট নাই ! এই ব্যথা তো তাকে একাই বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ।এই কষ্টের ভার নীরা কাউকে দিতে পারবে না ।

আব্বা অনেক জ্ঞানী ছিলেন । পুলিশ অফিসার হলেও তিনি সৎ আর দায়িত্ববান ছিলেন । ঘুষ খাওয়া আর অনৈতিক কাজ থেকে ইচ্ছা করলেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন পুলিশ অফিসাররা তার জ্বলন্ত প্রমান ছিলেন আব্বা ভাবল নীরা । আব্বার বলা একটা গল্প নীরার এখন মনে পড়ল । গল্পটা ছিল এমন । ''অনেক কাল আগে একজন দরিদ্র লোক বাস করতেন এক পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় । তার কাজ ছিল পানি বহন করার ।তার দুইটি পাত্র ছিল , একটা লাঠির মাথার দুই প্রান্তে সে পাত্র দুটো ঝুলিয়ে কাঁধে করে পানির পাত্রগুলো ভরে পানি বয়ে নিয়ে যেত । রোজ তাকে পানি নিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে আসতে হতো । দুইটা পাত্রের মধ্যে একটা ছিল কিছুটা ভাঙ্গা । পানি নিয়ে যেতে যেতে ভাঙ্গা পাত্রটি প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে যেত , আর যেটি ত্রুটিহীন পাত্র ছিল সেটা কানায় কানায় ভরা থাকত আর সুন্দরভাবে পানি পৌঁছে দিত ।এভাবে দরিদ্র লোকটা রোজ তার মনিবের বাড়িতে এক পাত্র আর আধা পাত্র অর্থাৎ দুই পাত্রের জায়গায় দেড় পাত্র পানি পৌঁছে দিতেন । ভালো পাত্রটি তার এই কাজটি ভালভাবে করতে পেরে খুব গর্বিত আর আনন্দিত থাকত । অন্যদিকে ভাঙ্গা পাত্রটির মন ভেঙ্গে যেত সে ভালভাবে কাজ করতে পারত না বলে । এভাবে অনেকদিন পানি বহন করার পর ভাঙ্গা পাত্রটি সেই দরিদ্র লোকটার কাছে তার ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চাইল । সে বলল ,' আমি আমাকে লজ্জিত ও হতাশ , আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই।' দরিদ্র লোকটা বলল ,' তুমি কেন লজ্জিত হচ্ছো ?'
পাত্রটি বলে ," তুমি রোজ কত কষ্টকরে রোজ আমাকে বয়ে নিয়ে যাও, নদী থেকে আমাকে পানি ভরে দাও আর তোমার মনিবের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমি অর্ধেক পানি ফেলে দেই ।এক পাশের ফাটলের জন্য , অনেক পানি ঝরে পড়ে আমার দোষে ।'
লোকটা তার পাত্রটাকে সান্ত্বনা দিয়া বলল, 'মন খারাপ কোর না। হয়তো এর মাঝেও ভালো কিছু আছে যা তুমি এখন বুঝতে পারছ না ।'
ভাঙ্গা পাত্রটি তবুও তার অপরাধবোধ আর লজ্জা কাটাতে পারল না ।যদিও লোকটার বলা কথাগুলো তার মনটা শান্ত করে দিল ।মন খারাপ করেই সে প্রতিদিন লোকটার সাথে যেতে লাগল পানি বয়ে আনতে , আর পথ চলতে চলতে চুইয়ে পড়তে লাগল পানি ঐ ফাটল দিয়ে , পাত্রটির কান্নাও মিশে যেতে লাগল ঝরে পড়া পানির সাথে ।পাত্রটি পথে যেতে যেতে আশেপাশে দেখতে লাগল, সবাই কত ভালো আছে সুখে আছে , কি চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল সকাল , পাহাড়ি পথের পাশে নাম না জানা কত শত ফুল ফুটে আছে । সকালের রোদে ,কোমল হাওয়ায় তারা হেলছে ,দুলছে ,খেলছে । ' সবাই ভাল আছে, অথচ আমার এত কষ্ট কেন ' ভাবল পাত্রটি ।এই ভাবতে ভাবতে রোজকার মত আজও ধনী লোকটার বাড়িতে সে অর্ধেক পানি পৌঁছে দিল ।
ফেরার পথে সে আবারও নিজের ব্যর্থতার জন্য দরিদ্র লোকটার কাছে ক্ষমা চাইলো । তার মন খারাপ দেখে লোকটা একটু থেমে পথের পাশে ফুটে থাকা পাহাড়ি ফুল ছিঁড়ে এনে দিল তাকে ।" দুঃখ করো না। আমি আগে থেকেই তোমার এই ত্রুটির কথা জানি , তাই যাবার বেলায় প্রতিদিন তোমাকে আমার কাঁধের একই দিকে বয়ে নিয়ে যেতাম ।আর যেতে যেতে তুমি তোমার ফাটল দিয়ে পানি ঝরিয়ে ঝরিয়ে যেতে ,কখনও কাঁদতেও।এভাবে পথের এক পাশে তুমি প্রতিদিন তুমি পানি দিতে,দেখো পথের ঐ দিকে চেয়ে ! কত শত সুন্দর ফুল ফুটে রয়েছে ! তুমিই তো তাদেরকে পানি দিয়েছ , অথচ পথের অপর পাশে চেয়ে দেখো !ধূলো পাথর ছাড়া কিচ্ছু নেই , কোনো ফুলও ফুটে নি ।''

এই ধরনের অনেক গল্প আব্বা করতেন । মন ভালো করে দেয়ার গল্প । আল্লাহ নিশ্চয়ই অকারনে মানুষকে সৃষ্টি করেন নি , জগতের সব কিছু ই সৃষ্টি করা হয়েছে কোন না কোন কারনে । নীরা নিজেকে নিয়ে আর ভাবতে চায় না । বাকি জীবনটা সে এভাবেই সবাইকে নিয়ে কাটাতে চায় । কারো কারো জীবন হয় মোমবাতির মতন নিজেকে ক্ষয় করে অন্যের জন্য আলো জ্বালানো ।।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement