(এক)

আমি ছায়াকে খুব ভয় পাই।

ছায়াকে আমি খুব ভালবাসতাম। এখন আর ভালবাসি না। তার সাথে মজা করে খেলতাম। তার সাথে অনেক সময় কাটাতাম। এক সাথে এক পথে রোদেলা সকালে স্কুলে যেতাম। তাকে সাথে নানা বাড়ি যেতাম। একদিন আমি নানা বাড়ি যাব কিন্তু ওকে নিয়ে যেতে চাইলাম না। ছায়া বলল, “আমি তোমার সাথে যাবই। দেখি আমাকে ছেড়ে কিভাবে যাও?” আমি প্লান করলাম ওকে না বলেই আমি সন্ধার পরে যাব। সন্ধার পরে রওয়ানা দিলাম অন্ধকারে। ভালই লাগছিল ভেবে যে, “ছায়া জানতেও পারে নি।” কিন্তু কিছুক্ষণ পর আকাশে যখনি শশী উঁকি দিল তখনি ছায়া খিলখিলিয়ে হেসে বলল, “আমাকে তুমি বোকা ভেবেছ! আমাকে ফাঁকি দিয়ে তুমি নানা বাড়ি যাবে! আমি তোমার সাথে যাবই।”

কি আর করার তাকে সাথে নিয়েই গেলাম। কারন সে খুব ভয়ংকর জেদি। নানা নানী আমাকে খুব ভালবাসত। নানা বাড়ি গিয়ে সবার অজান্তে নানার পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি নোট বের করে নেই। নানা অনেক খোঁজাখুঁজি করল। আমাকে সন্দেহ করার কোন কারন নেই। কিন্তু ছায়া বেশরমের মত সব বলে দিল নানাকে। আমি ছোট হওয়ায় মাত্র দশটা ঘা পরেছিল আমার পিঠে। তখন থেকে আমি ছায়াকে খুব ঘৃণা করি। সে এখন আমার দুই চোখের কাঁটা। আমি তার সামনে তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারি না। যা কিছু বলি তার আড়ালে। তার মুখের উপর কিছু বলার সাহস আমার নেই। আমি তাকে খুব ভয় করি।

ছায়ার জ্বালায় আমি সকালে আরাম করে ঘুমাতেও পারি না। শীতের সকালে হালকা কুয়াশা ভেদ করে জানালা দিয়ে মিষ্টি রোদ গায়ে লাগার সাথে সাথে আমি পড়ার বইটি পাশে সরিয়ে রেখে লেপ দিয়ে মাথা মুড়িয়ে স্বপ্নের দেশে বেড়াতে যাই। আম, লিচু, মিষ্টি, দই কিছুই খাওয়া বাদ দেই নি। সুস্বাদু সব জিনিস খাওয়া শেষ করে কানে হেড ফোন লাগিয়ে গান শুনতে লাগলাম। ছায়া কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে একটানে লেপটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “সকালে লেখাপড়া বাদ দিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছ। পরীক্ষায় আন্ডা পাবে। বাবাকে সব বলে দিব।”

" আন্ডা পাওয়া ভাল। তবু ফেল করা ভাল না। তোমার পায়ে ধরি, বাবাকে কিছু বলিও না। "

মাত্র দশ লক্ষ টাকা উপরি দিয়ে সরকারি বড় অফিসের বড় বস হিসেবে যোগদান করেছি। ছায়া এখানেও বাঁধা দিয়েছিল। কিন্তু কোন কাজ হয় নি। কর্তৃপক্ষের নিকট সে অভিযোগও করেছিল। যাকে টাকা দিয়েছি সে অস্বীকার করেছে। অস্বীকার করবে না তো জেল খাটবে! চাকরি হারাবে! সে কি ছায়ার মত বোকা! শেষ বয়সে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে পথে পাগলের মত কাগজ কুড়িয়ে বেড়াবে!

ছায়া হেরে যাওয়ার শোকে তিন দিন আমার সাথে কথা বলে নি। আমি এই তিন দিন খুশিতে শুধু লাড্ডু খেয়েছি।

দিন ভালই যাচ্ছিল। তিন বছরেই ঢাকা শহরে ফ্লাটের মালিক। ব্যাংক ব্যাল্যান্স তো আছেই। জীবন ধারনের মান দিন দিন উন্নত হচ্ছে। সামনের মাসে প্রাইভেটকার কেনার পরিকল্পনাও করে ফেলেছি। প্রতি ফাইল পাশে মাত্র হাফ কেজি থেকে এক কেজি মানে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা মাত্র। প্রতিবার ছায়া বাঁধা দিয়েছে। কিন্তু আমি তার কোন বাঁধাই শুনিনি। বরং বারবার তার সাথে আমার ঝগড়া হয়; হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। সে হেরে গেছে প্রতিবার কিন্তু হাল ছাড়ে নি।

ছায়া এবার অভিযোগ করে দুদকে। দুদকের লোকজন এসে তদন্ত শুরু করে। আমি টাকা দিয়ে দুদক কে থামাতে চেয়েছি। কিন্তু তারা আমাকে পাত্তা দেয়নি। ছায়া তাদের সাথে ছায়ার মত লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে দোষী হিসেবে প্রমাণ করে।

আমি ছায়াকে খুব ভয় করি।

(দুই)

ছায়া কোন মেয়ের নাম নয়।

ছায়া কোন বিশেষ পরিধেয় বস্ত্রও নয়।

কোনও বস্তুদ্বারা আলোকরশ্মি বাধাপ্রাপ্ত হলে যে প্রতিবিম্ব পরে তাকেই ছায়া বলে। আর আমি যে ছায়ার কথা বলছি সেটা আমার নিজের ছায়া। আমি এই ছায়াকেই খুব ভয় করি।

নিজের ছায়াকে ভয় করে না এরকম মানুষ গুগলে সার্চ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু মানুষ কেন পৃথিবীর সকল জীবজন্তু নিজের ছায়াকে ভয় করে। কাক আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছায়াকে শত্রু মনে করে আয়নায় আক্রমন করে নিজের ঠোঁট ভাঙার রেকর্ড করে গিনিস বুকে নাম উঠিয়েছে। বনের রাজা সিংহ কুয়োর মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছায়া দেখে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায় কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। সরকার পর্যন্ত ছায়াকে ভয় করে। ছায়া সরকারের নাম পর্যন্ত সরকার সহ্য করতে পারে না। ছায়াকে ভয় করা ন্যাচারাল।আমি ও ছায়াকে ভয় করি।

(তিন)

দুই বছর থেকে বন্দি জীবন অতিবাহিত করছি। ছায়া মাঝে মাঝে এখানে আসে আমার সাথে দেখা করার জন্য। সে এখন আর প্রতিবাদ করে না। সে আফসোস করে, “আজ আমার কিছুই করার নেই। তুমি যদি আগেই আমার কথা শুনতে তাহলে তোমার এ অবস্থা হত না।”
"সত্যি তাই। আমি ছায়াকে খুব ভয় করতাম। এখনো ভয় করি। তাকে আমি আমার শত্রু মনে করতাম কিন্তু সে ছিল আমার প্রকৃত বন্ধু। সে ছিল প্রতিবাদী তাই তাকে আমি ঘৃণা করতাম; এখন তাকে ভালবাসি।"

এখন ভালবেসে লাভ কি!