দাম্ভিক মানে অহংকারী। অহংকারীর অহংকার পতনের মূল। অপরদিকে বিনয়ী বা কোমল সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র। অাম গাছ এবং ইউক্যালিপটাস দুটি গাছের রূপক চরিত্রে মনুষ্য সমাজের দুটি চরিত্র অংকনের চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে দাম্ভিকের পরিনতি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ২২টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭২

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - দাম্ভিক (জুলাই ২০১৮)

বড়াই
দাম্ভিক

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭২

এস জামান হুসাইন

comment ১৬  favorite ০  import_contacts ৩৩০
এক
পাকা রাস্তা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার পরে গ্রামের শেষ মাথায় নদীর কিনারায় ঠায় দাড়িয়ে আছে দুশো ফুট উঁচু ইউক্যালিপটাস। এখানেই মোড়ল বাড়ি। আশে পাশের দুই চারটে গ্রাম থেকে দেখা যায় এই গাছ। গ্রামের নাম বাঘপাড়া হলেও এই গ্রামটিকে সবাই বড়গাছ পাড়া নামেই চিনে। গ্রামে যদি কোন আগুন্তক মোড়ল বাড়ি খোঁজে, দূর থেকে এই বড় গাছটি দেখিয়ে দিলে তার মোড়ল বাড়ি খোঁজে পেতে সামান্যতম অসুবিধেও হয় না।
ইউক্যালিপটাস গাছের প্রতিবেশী হয়ে দাড়িয়ে আছে একটি আম গাছ। আম গাছটি মোটামুটি বড়। তবে ইউক্যালিপটাস গাছের তুলনায় কিছুই না। প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে আম ধরে এই গাছে। আম খেতে খুবই মিষ্টি এবং সুস্বাদু।
দুই গাছের মধ্যে যেমন মিল রয়েছে তেমনি রয়েছে অমিল। সুখ দুঃখের কথা হয় দুই গাছের মধ্যে নিয়মিত। স্বভাব চরিত্রের মাঝেও রয়েছে অনেক পার্থক্য। ইউক্যালিপটাসের স্বভাব রুক্ষ ও অহংকারী, কারও উপকার করলে বলে বেড়ায় সারা জীবন। অন্য দিকে আম গাছের চরিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বিনয়ী, কোমল, নিরহংকারী।
সকালের সোনালী রোদ সবার আগে গায়ে লাগে ইউক্যালিপটাসের। সুন্দর মেঘমুক্ত আকাশ। পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙে সবার। কলকল রবে বয়ে যায় নদীর স্বচ্ছ জল। ইউক্যালিপটাস স্বগর্বে আম গাছকে ডেকে বলে,
“ও ভাই, আম গাছ! ঘুম ভাঙে নাই। আমিতো সেই কোন সকালে উঠেছি, তুমিতো অলস, জানো, সকাল বেলার হাওয়া হাজার টাকার দাওয়া। সকালের সোনালী ঝলমলে রোদ সবার আগে আমার গায়ে লাগে। তুমিতো বেটে, আমার হাটুর সমান।”
ইউক্যালিপটাসের চেঁচামেচিতে স্থির থাকতে পারল না আম গাছ। সে জবাব দিতে লাগল,
“সেই কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভেঙেছে আমার। পাঁচ জোড়া পাখির বসবাস আমার ডালে। তাদের ঘুম ভাঙার সাথে সাথে আমার ঘুম ভাঙে। আর তোমার গায়ে তো পাখি বসতেই দাও না। যেদিন ভোরে সোনালী রোদ দেখা যায় না, আকাশ থাকে মেঘলা সেদিন তো তোমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হয়। তোমার দ্বারা কারও উপকার হয় না।”
ইউক্যালিপটাস ক্ষেপে গিয়ে বলে, “কিযে আবল তাবল বকতেছ, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি হলাম উচ্চতার প্রতিক। আমার মত উচ্চতা তোমার আছে নাকি? আমার নামে পরিচিত এই গ্রাম। আশে পাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে দেখা যায় আমাকে। এই গ্রামের মোড়ল বাড়ির অবস্থান জানান দেই আমি। মোড়ল বাড়ির মেয়ে যখন শ্বশুর বাড়ি থেকে নৌকাযোগে ফেরার পথে দূর থেকে আমাকে দেখে তখন সে খুশিতে আত্মহারা হয়। আর তোমাকে তো চশমা দিয়ে খুজে বের করতে হয়।”
কথায় কথা বাড়ে। আম গাছ আর চুপ থাকে না। সে বলে,

“মোড়ল বাড়ির মেয়ে আমার আম খেয়ে খুব খুশি। এই গ্রামের ছোট বড় সকলেই আমার আম খাওয়ার জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকে। এই আমের খ্যাতি মোড়ল বাড়ির মেয়ের শ্বশুরঘর পর্যন্ত আছে। ফল তো দূরের কথা তোমার এমন ছায়াও নেই যাতে পথচারী বসে বিশ্রাম নিতে পারে। রাখাল ছেলে দুপুরবেলা আমার ছায়ায় বসে বাঁশি বাজায়। গাছে উঠে ছেলেমেয়েরা খেলা করে। পথচারীরা আমার ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়, যাওয়ার সময় আমার ডাল ভেঙে আঁঠা নিয়ে যায়।
কথা বলতে বলতে দুপর হয়। কথা আর শেষ হয় না। ইউক্যালিপটাস বলে, “আমার কাঠ খুবই শক্ত ও টেকশই। টিনের ঘরে ব্যবহৃত হয় এই কাঠ। অনেক লম্বা হওয়ায় সকলের পছন্দ। তুমি থাকো ঘরের মেঝেতে, দেয়ালে আর আমি থাকি উপরে। তুমি বেঁচে থাকতেও নিচে থাকো, মরে গেলেও নিচে আর আমি জীবিত অবস্থায়ও উপরে থাকি মরে গেলেও উপরে থাকি।
আম গাছ জবাব দেয়, “ভাই ইউক্যালিপটাস, অহংকার কর না, অহংকার পতনের মূল। অহংকারীকে সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন না। তুমি যে কি উপকার কর মানুষের, তা আমি জানি। তুমি মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণ অক্সিজেন খেয়ে ফেলো। তোমার আশে পাশে কোন ফসলের চাষ হয়না, ফসলের ফুল হয় ফল হয় না, ফল হলেও সে ফল পরিপক্ব হয় না।”
ইউক্যালিপটাস বলে, “তুমি নিজেকে মহৎ বলে জাহির করতে চাও। পঞ্চাশ বছর থেকে আমি এই এলাকায় স্বগর্বে দাড়িয়ে আছি। আগামী পাঁচশত বছরেও আমার সমান হতে পারবে না। ঝড় বৃষ্টিতেও আমার কিছুই হবে না।
আম গাছ আর কথা বাড়ায় না। শুধু বলে “ভাই, অহংকার করা ভাল না।”
দুই
ভোর পাঁচটা। অমাবস্যার রাত। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। শোঁশোঁ করে ঝড়োবাতাস বইছে। বাতাসের গতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউক্যালিপটাস আম গাছকে ডেকে বলছে, “ভাই, আমার খুব ভয় পাচ্ছে।”
“ভয় পেওনা, ইউক্যালিপটাস। কিচ্ছু হবে না।”, অভয় দিয়ে বলে আম গাছ।
বাতাসের গতি আর কমছে না। গাছপালা নুয়ে নুয়ে পরে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে। পাখির বাসাগুলো ভেঙে যাচ্ছে, বাবুই পাখির বাসাগুলো দোলনা খেলছে। হঠাৎ শুরু হলো কড়াত মড়াত শব্দ। আকাশে বিজলী চমকাচ্ছে সমানতালে।
ধীরে ধীরে আকাশ ফর্সা হয়। ঝড় - বাতাসও কমতে থাকে। কান্নার শব্দ ভেসে আসে। ইউক্যালিপটাসের কমর ভেঙে গেছে। তাই সে কাঁদছে। আম গাছ ডেকে বলে, “ভাই, বলেছিলাম না, “অহংকার পতনের মূল,” দাম্ভিকতা সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন না, তুমিতো আমার কথায় পাত্তাই দেও নাই। এখন আর কিছুই করার নেই।
ইউক্যালিপটাস আম গাছের কথাগুলো মনে করে নিরবে কাঁদে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement