"বাংলা আমার মাতৃভাষা-
ভাষাই দেয় এগিয়ে চলার প্রেরণা,
স্মরণ করি আন্দোলনের দিনগুলি-
সারা বিশ্বের কাছে স্বর্ণাক্ষরে লেখা,
ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারী"
স্কুলের প্রবীণ মাস্টার মশাই ক্লাসে এসে ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন- তোমরা সবাই আগামীকালের দিনটির বিষয়ে অনেকটাই অবগত। আজ সেই বিষয়ে তোমাদেরকে বলবো "মাতৃভাষা" সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক কাহিনী। আগামীকাল ২১শে ফেব্রুয়ারী। বাঙালি জাতির চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। এই দিনটিতে দেশের সর্বত্র ভক্তি, শ্রদ্ধা সহকারে পালিত হবে "মাতৃভাষা" দিবস। আমরা যে ভাষায় কথা বলি কিংবা যে ভাষা নিয়ে আমরা গর্বিত, সেই ভাষাকে "মাতৃভাষা" হিসেবে স্বীকৃতি পেতে করতে হয়েছিল অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।
এই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে। পরবর্তীতে এই আন্দোলন যখন এক কঠিন সংগ্রামের রূপ পেল তখন আমি হাই স্কুলের ছাত্র। কিছুটা আবেগ প্রবণ হয়ে তিনি বললেন- আজও সেই আন্দোলনের চিত্র চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে। সারাটা ক্লাস রুমে এক গম্ভীর পরিবেশ। সবাই উদগ্রীব ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানবার জন্য। মাস্টার মশাই স্মৃতির জোয়ারে অনেকগুলি বছর পিছিয়ে গিয়ে শুরু করলেন ....
গভীর রাত। বিগত বছরগুলির মত জনমানবহীন রাস্তায় পুলিশের টহলদারি গাড়িগুলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পাশে অবস্থিত শহীদ মিনারের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ভোর হচ্ছে। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। বিগত বছরগুলির মত এবারও বহু মানুষ ফুল দিয়ে, প্রণাম জানিয়ে তাঁদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। আজ থেকে অনেক বছর পূর্বে এই জায়গায় এমনকি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ঘটে গিয়েছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এইযে শুনশান রাস্তাগুলি শহীদ মিনারের চরিদিকে রয়েছে, সেদিন এরা সবাই শহীদের রক্তে স্নান করে এক কঠিন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ছিল সাক্ষী। তারিখটা ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বরেণ্য মানুষদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে।
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করলো। ব্রিটিশরাজ এই দেশ ছেড়ে চলে যাবার সময় ভারতবর্ষকে খন্ডিত করে দিয়ে গেল। এর ফলে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো। ভারত আর পাকিস্তান। তখন থেকেই মূলত সৃষ্টি হলো ভাষা বিতর্ক। সেই সময় পাকিস্তান রাষ্ট্র, পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান এই দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারা ছিলেন তাদের বেশির ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী। নানা ধরনের অপকৌশলে তারা পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন, শোষণ করতো।
পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বঙ্গ নিয়ে যা বর্তমানে পৃথিবীর মানচিত্রে এক স্বাধীন রাষ্ট্র "বাংলাদেশ" হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করবার জন্য অনেকগুলি পন্থার মধ্যে একটি হলো "উর্দুকে" রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রয়োগ করা। ১৯৪৭ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে "উর্দুকে" পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র "উর্দু" ব্যবহারের প্রস্তাব করা হলো।
পরিসংখ্যান হিসেব অনুযায়ী সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। নানা রকম ছলেবলে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের নেতারা ঘোষণা করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে "উর্দু"। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই অন্যায় ঘোষণার বিরূদ্ধে গর্জে ওঠে। শুরু হতে থাকে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন। ক্রমে এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। দাবানলের মত ছড়িয়ে পরতে থাকে সর্বত্র।
বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে সমগ্র বাঙালি জনসাধারণ এর বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। মাতৃভূমির মাতৃভাষার পক্ষে এত বড় আন্দোলনে গোটা দেশের বাঙালিরা সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন। স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকে এই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে মার্চ মাসে আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পায়। অবশেষে এই ভাষা আন্দোলনের চরম প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।
এই প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষজন পুঁথি পড়ে জানতে পেরেছেন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। কিন্তু এখনো অনেক বয়স্ক মানুষজন জীবিত আছেন যাঁরা সেই সময় কৈশোরের উদ্দীপনায় সক্রিয় ভাবে সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে মাতৃ ভাষাকে রক্ষা করতে শামিল হয়ে ছিলেন। আবার অনেকে পরোক্ষ ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সম্মিলিত ভাবে ইতিহাস গড়েছেন।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮, বৃহস্পিবার) "উর্দুকে" রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে, বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে সেদিনের আন্দোলন বাঙালি জাতিকে দিয়েছিল অন্যায়, অবিচার, ও শোষণের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামের শক্তি। বাংলা ভাষা আমাদের মুখের ভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা। এই ভাষাকে রক্ষা করতে সেই সময় স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, বড়লোক থেকে গরিবলোক সবাই এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন।
এইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেড়িয়ে এলে পুলিশ তাদের উপর নির্মম ভাবে নির্বিচারে গুলি চালায়। অনেক ছাত্র তখনই মারা যায়। তাদের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। মাত্র সাত আট জনকে চিহ্নিত করা গেলেও বাকি ছাত্রদের লাশগুলো সঙ্গে সঙ্গে উধাও করে ফেলা হয়। সারা রাজপথ হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র। শুরু হয় পুরো পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ। মানুষজন তখন একেবারে মরিয়া। কোন বিরোধী শক্তি তাদের দাবিয়ে রাখতে পারেনি। সাধারণ মানুষ এমনকি ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে মেয়েরা ভয়কে দূরে সরিয়ে রাস্তায় নেমে এর প্রতিবাদ শুরু করে। পুলিশ যথেচ্ছ ভাবে কাঁদনে গ্যাস, লাঠি চার্জ আর ব্যাপক হারে ধরপাকড় শুরু করে।
এই রকম অস্থির পরিস্থিতিতে কিছু ছাত্র এই বিষয়ে আইন সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পরেই পুলিশ ছাত্রাবাসে ঢুকে গুলিবর্ষণ করে। এই ভাবে ক্রমাগত বিক্ষোভ, ধরপাকড়, গুলি বর্ষন চলতে থাকে এই ভাষা আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার জন্য। একটা সময় বাঁধ ভাঙা আন্দোলনের তীব্রতায় বিরোধী পক্ষ পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অবশেষে জয় হয় সাধারণ মানুষের, জয় হয় মাতৃভাষা বাংলার।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙ্গালীরা অনেক রক্ত ঝরিয়ে যে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদে সর্ব সম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সমগ্র দেশের মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পূর্বের ন্যায় এবারও একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে নানা অনু্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করবেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভাষা আন্দোলন দিবস কিংবা শহীদ দিবস হিসেবে। খুব সকাল থেকে সব বয়সের মানুষজন শহীদ মিনারে এবং দেশের সর্বত্র এক ভাব গম্ভীর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফুল সমেত শ্রদ্ধা জানাবেন।
বাংলা ভাষার জন্য সমগ্র বাঙালি গর্ব বোধ করে, অহংকার বোধ করে। এই ভাষা দেশকে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার দিয়েছে। ভাষা দিয়েছে "বন্দেমাতরম", ভাষা দিয়েছে "জনগনমন", ভাষা দিয়েছে "বিদ্রোহী"। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনেক কালজয়ী গান, কবিতা ইত্যাদি। যেমন- উল আলম চৌধুরীর কবিতা "কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি", শামসুদ্দিন আহমদের গান "ভুলব না ভুলব না, আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না", আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর গান "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো" ইত্যাদি।
স্কুলের প্রবীণ মাস্টার মশাইয়ের দুচোখ অশ্রুতে ভরা। চোখের অশ্রু মুছে নিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের বললেন, আমার এই অশ্রু গর্বের। যাঁরা আমাদের এই মাতৃভাষার জন্য কঠিন সংগ্রাম করেছেন, যাঁরা তাঁদের মূল্যবান প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদেরকে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই। সেই সমস্ত বীর শহীদদের জানাই আমাদের প্রণাম। তাঁদেরকে চোখে না দেখতে পেলেও তাঁদের উপস্থিতি সব সময় আমরা অনুভব করি।
এই ভাষা আন্দোলনে শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত একটি বিখ্যাত গান ....
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো,
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু
গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি।।
আমার সোনার দেশের
রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।"
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
ঐতিহাসিক ২১ শে ফেব্রুয়ারী - মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে লেখবার প্রয়াস। (তথ্য সংগৃহীত)
১২ আগষ্ট - ২০১৭
গল্প/কবিতা:
৫২ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
প্রতি মাসেই পুরস্কার
বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।
লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন
-
প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৬