নিঃস্বার্থ ভালবাসা

ভালবাসার গল্প (ফেব্রুয়ারী ২০২৪)

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
  • ১৪
  • ১০৩
ভারতবর্ষের পশ্চিমে অবস্থিত এক অখ্যাত গ্রাম - " সোনাইপুর "। এই গ্রাম আর এখানকার বর্তমানের বসবাসকারী লোকজনদের দেখলে মনে হবে আধুনিক সভ্যতার থেকে এরা বেশ কিছুটা পিছিয়ে। এই গ্রামটিতে আসতে হলে এক অখ্যাত রেল স্টেশন " খিরোদপুরে " নামতে হবে। সারাদিনে একটি মাত্র ট্রেন এই স্টেশনে ভোর রাতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়ায়। এরপরে এক ক্রোশ পথ পায়ে হেটে ছোট একটি বাজার। সকালের দিকে দুই - এক ঘন্টার জন্য কেনাবেচা চলে। বাজারের সামনে থেকে গরুর গাড়ি চড়ে মেঠো পথ ধরে প্রায় দুপুরবেলা " তালপুরা " গ্রামে পৌঁছে সেখান থেকে ধানি জমির আলের পথ ধরে পায়ে হেটে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর " সোনাইপুর " গ্রাম।

এই গ্রামের বর্তমান যুগের বেশিরভাগ ছেলে মেয়েরা পড়াশুনা , চাকরি - বাকরি , ব্যবসা বাণিজ্য করবার তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র পুরোনো আমলের বয়স্ক কিছু লোকজনেরা গ্রামকে ভালবেসে গ্রামেই রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন ফুলবানু। ফুলবানুর বিয়ে হবার পর যখন সে এই গ্রামে আসে তখন তার বয়স ১৫ । আজ অবধি এই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোনো জায়গায় সে যায় নি। ফুলবানুর একমাত্র ছেলে রাজকুমার কলকাতায় পড়াশুনা শেষ করে সেখানে ছোটোখাটো একটি চিকিৎসার সাজসরমঞ্জামের ব্যবসা করে। রাজকুমারের পরিবার বলতে তার স্ত্রী পুস্পা আর ছোট একটি কন্যা রাবেয়া। কিছুদিন আগে রাজকুমারের বাবা মারা যাওয়াতে ফুলবানু একাই গ্রামে থাকে। ফুলবানু তার ছেলে অন্ত প্রাণ। অনেকবার ছেলেকে বলেছে কলকাতায় গিয়ে তার কাছে থাকবার জন্য। পুস্পার তীব্র আপত্তিতে সেটা সম্ভব হয়নি। গ্রাম্য সরল মানুষটিকে সে কখনোই চায়নি তাদের সংসারে এনে রাখতে। ফুলবানুর এই গ্রাম ছাড়া বাইরের জগতটা দেখবার কোন সুযোগই হয় নি। ফুলবানুর নিজের বাপের বাড়ির দিক থেকে একমাত্র কন্যা হওয়ায় সে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর জমিজমার মালিক আবার তার স্বামীর দিক থেকেও স্বামীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর স্থাবর , অস্থাবর সম্পত্তির বর্তমান মালিক ফুলবানু। ফুলবানু আর তাঁর স্বামীর ইচ্ছেতেই তাদের ছেলে এই অজ পাড়াগাঁয়ের পাঠশালাতে না পড়ে কলকাতার স্কুল কলেজে পড়াশুনা করে বড় হয়েছে। যেদিন রাজকুমার গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় যায় পড়াশুনা করতে সেদিন ফুলবানু জলভরা চোখে আশীর্বাদ করে বলেছিল তোকে ছেড়ে থাকতে আমার খুবই কষ্ট হবে। তুই ভালভাবে যখন প্রতিষ্ঠিত হবি তখন আমি কিন্তু তোর কাছে গিয়ে থাকবো। 

দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বছর পার হয়ে গেছে। সংসারে অনেক পরিবর্তন হয়েছে আর ফুলবানুর বয়সও অনেকটা বেড়েছে । ছেলেকে দেখবার জন্য সবসময অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে কিন্তু ছেলের সময় হয় না মা কে দেখতে আসার। সে তখন তার বউ , মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত। হটাৎ করে একদিন রাজকুমার খবর পেলো তার মা খুব অসুস্থ। এই অসুস্থতার জন্য তার মাকে নাকি গ্রামে সবাইমিলে একঘরে করে রেখেছে। স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে রাজকুমার গ্রামে এসেছে মাকে দেখতে। অনেকদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে ফুলবানু জড়িয়ে ধরে বললো - তুই এতো দিন পরে এলি বাবা ! আমিযে রোজ তোর পথ চেয়ে বসে থাকি। সবাই বলছে আমার নাকি অসুখ হয়েছে কিন্তু কি অসুখ সেটা আমাকে কেউ বলেনি। আমিতো পুরোপুরি সুস্থ। জানিস , আমাকে সবাই একঘরে করে রেখেছে। আমি এখানে ভাল নেই , আমাকে তোর কাছে নিয়ে চল। তোর বাবা মারা যাবার পর তুই আমার একমাত্র ভরসা। কিছুদিন আগে পুকুরে স্নান করার সময় সবিতা আমার বা হাতটা দেখে বললো - তোমার বা হাতে একটা " ঘা " হয়েছে। আমাদের গ্রামে ডাক্তার , হাসপাতাল কোনো কিছু না থাকায় গোপীনাথ ওঝাই আমাদের একমাত্র ভরসা। গোপীনাথ ওঝা আমাকে দেখে বলেছে - যা বলার আমি তোমার ছেলেকেই বলবো। তোমার ছেলেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সঙ্গে দেখা করতে বল। 

রাজকুমার গোপীনাথ ওঝার থেকে জানতে পারলো তার মার " কুষ্ট " রোগ হয়েছে। এই রোগ অত্যন্ত খারাপ আর ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে। গ্রামের সবাই জানে বলেই ওনাকে এক ঘরে করে রাখা হয়েছে। ফুলবানু অবশ্য জানেনা তার যে " কুষ্ট " রোগ হয়েছে। গোপীনাথ ওঝা বললো - তোমার মাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। রাজকুমারের বৌ পুস্পা শহরের আধুনিক মেয়ে। গ্রামের প্রতি , বিশেষ করে তার শ্বাশুড়ি মা ফুলবানুর প্রতি কোনো টানই নেই। পুস্পা সব শুনে বেশ কিছুটা চিন্তা করে বললো - তুমি তোমার মাকে বলো চিকিৎসার জন্যে তাকে বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভারতের দক্ষিণ দিকে যাওয়ার যে কোনো ট্রেনে উঠে গভীর রাতে কোনো একটা স্টেশনে গাড়ি দাঁড়ালে তোমরা নেমে পরবে। তোমার মাকে বসিয়ে রেখে বলবে হাসপাতালে যাবার জন্য তুমি গাড়ি ঠিক করতে যাচ্ছ। একটু আড়ালে থেকে যেই ট্রেন ছাড়বে তুমি তোমার মাকে ফেলে রেখে ট্রেনে উঠে পরবে। তোমার মা আর কোনোদিনও ফিরে আসতে পারবে না। কারন তিনি কিছুই চেনেন না শুধু নিজের গ্রামের নাম ছাড়া। তারপর না খেতে পেয়ে ভিক্ষে করতে করতে একদিন রাস্তায় মরে পরে থাকবে। তোমার মার বিপুল সম্পত্তির মালিক তুমি হয়ে যাবে যদিও পরে তুমিই পেতে কিন্তু আমার এখুনি চাই। রাজকুমার শুনে বললো এটা আমি করতে পারবো না। পুস্পা রেগে গিয়ে নিজের কদার্য রূপটা প্রকাশ করে চিৎকার করে বললো তোমাকে করতেই হবে। আমি কখনোই আমার ছোট মেয়েটার সঙ্গে একই ঘরে ওই রকম " কুষ্ট " রুগীকে এনে তুলতে পারবো না। আর ভাল হাসপাতালে রেখে পয়সা খরচ করে চিকিৎসাও করবো না।

ফুলবানু ট্রেনে যেতে যেতে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলো এতো তাড়াহুড়ো করে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস ? এই প্রথম আমি গ্রামের বাহিরে এসে রেলগাড়ি চড়লাম। রাজকুমার অন্য মনস্ক হয়ে বললো - তোমার এক কঠিন অসুখ হয়েছে সেইজন্য আমরা বড় হাসপাতালে যাচ্ছি। অনেক রাতে আমরা সেখানে পৌঁছাব। ফুলবানু বললো - আমি কিন্তু হাসপাতালে থাকব না। এক করুন দৃষ্টি দিয়ে বললো এবার কলকাতায় গিয়ে তোকে , বৌমাকে আর আমার আদরের নাতনিকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবো। 

গভীর রাতে কোনো এক অজানা , অচেনা স্টেশনে গাড়ি দাড়াতে কোনো কিছু না দেখেই ফুলবানুকে নামিয়ে নিয়ে বললো - মা , তুমি এই বেঞ্চিতে বসো। আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। ফুলবানু দেখলো বিকট এক হুইসেল দিয়ে রেলগাড়িটা চলতে শুরু করল আর তার ছেলে রাজকুমার দৌড়ে এসে রেলগাড়িতে উঠে পরলো। এই দৃশ্য দেখে ফুলবানু চিৎকার করে ছেলের উদ্দেশে বললো - আমাকে একলা ফেলে রেখে তুই কোথায় চলে যাচ্ছিস ? আমিতো কিছুই চিনি না। একটা সময় বুঝতে পারলো তার প্রান প্রিয় ছেলে তাকে এই গভীর রাতে প্রায় নির্জন স্টেশনে একলা ফেলে রেখে পালিয়ে গেল। প্রকৃত অবস্থাটা বুঝতে পেরে ফুলবানু হাপুস নয়নে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। এই শীতের গভীর রাতে যেকজন ট্রেন থেকে নামলেন তাদের মধ্যে একজন বেশ লম্বা , সুন্দর স্বাস্থ্য ফুলবানুর ছেলের থেকে বয়েসে সামান্য বড় , ফুলবানুকে জিজ্ঞাসা করলেন কান্নার কারনটা কি ? ফুলবানুর থেকে সবকিছু শুনে লোকটি বললেন - আপনি আমার সঙ্গে আসুন। 

লোকটি ফুলবানুকে সঙ্গে নিয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘরে যেতেই স্টেশন মাস্টার উঠে দাড়িয়ে নমস্কার করে বললেন - আপনি এসে গেছেন এবার আমরা একেবারে নিশ্চিন্ত। আপনি তিনদিন ছিলেন না , এখানকার লোকজন একেবারে হাপিয়ে উঠেছিল। আপনি আমাদের কাছে ভগবান। এই ছোট মফস্বল শহরে আপনার মত গুনি ডাক্তার পেয়ে আমরা ধন্য আর গর্বিত। লোকটি স্টেশন মাস্টারকে ফুলবানুর ঘটনাটা জানিয়ে বললেন - ওনাকে দেখে হটাৎ কেন জানিনা আমার মায়ের মুখখানি চোঁখের সামনে ভেসে উঠলো। ওনার কথার থেকে বুঝলাম উনি নাকি এক খারাপ রোগে আক্রান্ত তাই ওনার একমাত্র ছেলে বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করবার নাম করে ঘর থেকে বের করে এনে গভীর রাতে এই স্টেশনে মিথ্যে কথা বলে নামিয়ে একলা রেখে পালিয়ে গেছে। ওনাকে আমি বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখছি অসুখটা কি , তারপর ওনাকে সুস্থ করে বাড়ী ফেরাবার চেষ্টা করবো। 

জায়গাটা অতি মনোরম। সকাল হয়েছে। চারিদিকের সবুজ পাহাড়ে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পরেছে। ভোরের বারান্দায় বসে ডাক্তার কৈলাশ শর্মা আর তাঁর স্ত্রী লতিকা শর্মা চা খেতে খেতে গতকালের ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ডাক্তার শর্মা স্ত্রীকে  বললেন - আমি একটু পরেই রোগী দেখতে ব্যস্ত হয়ে পরবো। তুমি একবার ওনার সঙ্গে কথা বলে জেনো ওখানকার ডাক্তার কি রোগের কথা বলেছেন। আমি ফাঁকা হলে ওনাকে ভালভাবে পরীক্ষা করবো। লতিকা বললেন - আমি ওনার সঙ্গে কথা বলবো। আমি যাচ্ছি তোমার ব্রেকফাস্ট তৈরী করতে। 

পুস্পা উৎফুল্ল হয়ে রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করলো - তোমার মাকে কোন স্টেশনে নামিয়ে দিলে ? রাজকুমার বললো - স্টেশনের নামতো দেখিনি। গভীর রাতে একটা স্টেশনে ট্রেন দাড়াতে আমরা নেমে পরলাম। আমি যখন মাকে ফেলে রেখে ট্রেনে উঠলাম , মা খুব কান্নাকাটি করে আমাকে ব্যাকুল ভাবে ডাকছিল তাঁকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য। পুস্পা বললো - সবাইকে বলবে আমাদের মা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। বেশ কিছুদিন পরে বলবে উনি হাসপাতালে মারা গেছে। তোমার মা আর কোনোদিনও ফিরে আসতে পারবে না কারন তিনি কিছুই চেনে না। 

ডাক্তার কৈলাশ ফুলবানুকে ভাল ভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর কোন রোগই নেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ। বহুবার জিজ্ঞেস করায় ফুলবানু বললেন - তাদের গ্রামে ডাক্তার , হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিছুই নেই। পুকুরে স্নান করার পর তাঁর বা হাতে একটা " ঘা " মতন হয়। গ্রামের গোপীনাথ ওঝা ওটা দেখে বলেন আমার নাকি খুব খারাপ আর ছোঁয়াচে এক রোগ হয়েছে। যা কিছু বলার সেটা তিনি আমার ছেলেকেই বলবেন। গ্রামের এক দিদি আমাকে চুপিচুপি বললো আমার নাকি " কুষ্ঠ " রোগ হয়েছে। গোপীনাথ ওঝার থেকে খবরটা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পরে তারপর একটা সময় গ্রামে সালিশী সভায় আলোচনা করে আমাকে একঘরে করে দেওয়া হয়। আমার ছেলেটা বোধহয় গোপীনাথ ওঝার কথা বিশ্বাস করে আর তার বৌয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে এই অচেনা জায়গায় আমাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে। ডাক্তার কৈলাশ বললেন - মা , আপনার হাতের ক্ষতটা আমি দেখেছি। আমি দেখেই বুঝতে পেরেছি এটা কুষ্ট রোগ নয়। আপনারা পুকুরে স্নান করেন হয়তো কোনো বিষাক্ত পোকা - মাকড় কামড়ে দিয়েছিলো। আমি যে মলমটা আপনাকে দিয়েছিলাম সেটা ব্যবহার করেতো কমেও গেছে। আমি শুধু ভাবছি আপনার ছেলে ঐরকম এক ভন্ড ওঝার কথা শুনে কোনো ভালো ডাক্তার না দেখিয়ে একেবারে আপনাকে ঘর থেকে বের করে এনে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে গেলো !!

দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা মাস পার হয়ে গেছে। প্রথম দিকে ডাক্তার কৈলাশ আর তার স্ত্রী খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে , নানা ভাবে চেষ্টা করেছিল ফুলবানুকে তার ছেলের কাছে পৌঁছে দিতে। শুধু গ্রামের নাম বলে খোঁজ করে সেটা সম্ভব হয় নি। ফুলবানুর মাতৃ সুলভ আচরনে কৈলাশ আর লতিকা একেবারে অভিভূত। ক্রমে ফুলবানুর প্রতি তাদের এমন মায়া পরে গেলো তারা তাঁকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে পারতো না। তারা বললো - তুমি আমাদের মা। তোমাকে কোথায় যেতে হবে না , তুমি আমাদের কাছেই থাকবে। প্রায় রোজ রাতে ফুলবানু শুয়ে নিজের ছেলের কথা চিন্তা করে চোখের জল ফেলতো। লতিকা বোঝাতো যে ছেলে তোমাকে রাস্তায় ফেলে রেখে চিকিৎসা করাবার ভয়ে পালিয়ে যায় তার কথা চিন্তা করে কান্নাকাটি করো না। যদি কখনো ওকে কাছে পাই আমরা একেবারে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব। 

পাঁচ বছর পর -----

ব্যথাটা সন্ধেবেলা থেকে শুরু হয়েছে। সঙ্গে আনা ওষুধ খেয়েও কমছে না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথাটাও বাড়ছে। নির্ধারিত হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় কাল দুপুর হয়ে যাবে। ব্যথার চিৎকারে ট্রেনের সহযাত্রীরা নিরুপায় আর চিন্তিত হয়ে সহানুভুতির সঙ্গে বললেন - মেয়েটা ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছে । আপনারা বরং সামনের যে স্টেশনে গাড়ি দাঁড়াবে সেখানে নেমে যান। সেখানে নিশ্চই হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের সন্ধান পেয়ে যাবেন। প্রায় গভীর রাতে ট্রেন একটা স্টেশনে দাড়াতে বাধ্য হয়ে মেয়েকে নিয়ে তার বাবা , মা অচেনা অজানা স্টেশনটায় নেমে পরলো। স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলো স্টেশনের কাছেই ভাল একজন ডাক্তার আছেন। আর তাঁর ছোট একটি চিকিৎসা কেন্দ্রও রয়েছে। রাত বেরাতে প্রয়োজন হলে তিনি রোগীও দেখেন। স্টেশন মাষ্টার একজন লোককে বললেন - এদেরকে এক্ষুনি আমাদের ডাক্তার বাবুর কাছে নিয়ে যাও। এনারা এখানকার কিছুই চেনেন না। 

ডাক্তার বাবুর ওষুধের গুনে ব্যাথাটা এখন আর নেই। সারা রাত জেগে থেকে মেয়েটির চিকিৎসা করেছেন। মেয়েটির বাবা , মার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলেন এনারা কলকাতায় থাকেন। ভাল চিকিৎসার জন্যে দক্ষিণের নাম করা এক হাসপাতালে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঝপথে গভীর রাতে এখানে নামতে বাধ্য হন। ডাক্তার বাবু বললেন - আপনাদের মেয়েকে পরীক্ষা করে আমি আন্দাজ করেছি ওর কি হয়েছে ! কাল দুপুরে ওর কয়েকটি রিপোর্ট পেলে আরো ভাল ভাবে বুঝতে পারবো। আমার আন্দাজ যদি ঠিক হয় তবে ওকে আর চিকিৎসার জন্যে অন্য কোথাও নিয়ে যাবার প্রয়োজন নেই। আমি কয়েকটা ওষুধ দেব আর তাতেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। ভোর হয়ে আসছে এবার আপনারা বিশ্রাম করুন , জলখাবার খান। আমার এখানে সব ব্যবস্থা করা আছে। আমি এরপরে অন্য রোগীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকব। আপনাদের কিছু প্রয়োজন হলে আমার স্ত্রীকে বলবেন। একটু পরেই উনি আসবেন। আর একটা কথা - প্রত্যেকদিন সকালবেলায় আমাদের মা সবার মঙ্গলের জন্য পুজো করেন। মাও আসবেন পুজোর ফুল আপনাদের সবার মাথায় ছুঁয়ে মঙ্গল কামনার জন্যে । 

রাজকুমার আর তার স্ত্রী পুস্পা তাদের ফেলে দেওয়া মাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে এখানে এই অবস্থায় দেখে একেবারে ভূত দেখার মত চমকে উঠল। ফুলবানু বাঁধ ভাঙা জলের স্রোতের মতো কাঁদতে কাঁদতে রাজকুমার আর পুস্পাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বললো - আমি যে তোদের আমার প্রাণের থেকেও বেশি ভালবাসি। তবে কেন আমাকে একলা ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলি ? এতগুলো বছর আমি রাতে ভাল করে ঘুমাতে পারি নি। তোদের আর আমার আদরের নাতনি রাবেয়ার কথা ভেবে রোজ রাতে চোখের জল ফেলি। কৈলাশ আর তার স্ত্রী লতিকা আমার সন্তানতুল্য। তারা যদি সেদিন আমার পাশে না দাঁড়াতো , আমাকে আশ্রয় না দিত , আমি তবে অনাহারে রাস্তায় পরে মরে থাকতাম। আজ ওরা আমাকে মায়ের আসনে বসিয়ে ভক্তি, শ্রদ্ধা করে। কৈলাশ আর লতিকা সমস্ত ঘটনাটি শুনে বললো - আপনারা আপনাদের দেবীতুল্য মায়ের প্রতি যে কাজটা করেছেন সেটি অত্যন্ত অন্যায় আর অপরাধমূলক। শাস্তি হিসেবে আপনাদের দীর্ঘ সময়ের জন্যে জেল হতে পারে। এক হাতুড়ে ওঝার থেকে " কুষ্ট রোগ " শুনে অন্য কোন ভাল ডাক্তার না দেখিয়ে একেবারে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেলেন। আসলে আপনাদের মা পুকুরে স্নান করার সময় হয়ত কোন পোকা কামড়াবার ফলে একটা ঘায়ের মত হয়েছিল। ওটা কুষ্ঠ রোগ ছিল না। দিন দুয়েক ওষুধ লাগাতেই সেরে যায়। আমাদের মা নেই বলে ওনাকে আমরা আমাদের মায়ের আসনে বসিয়েছি। কষ্টের থেকে একটা কথা বলি - আপনারা ইচ্ছে করলে আর মায়ের সম্মতি থাকলে ওনাকে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন। 

পুস্পা কাঁদতে কাঁদতে ফুলবানুর দুপা জড়িয়ে ধরে বললো - মা , সব দোষ আমার। আমার জন্যে আজ আপনার এই অবস্থা। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। রাজকুমার আর পুস্পা হাত জোড় করে ডাক্তার কৈলাশ আর লতিকাকে বললো - আপনারা আমাদের বড় দাদা , দিদির মত। মা আপনাদের কাছেই থাকবে আর আমরাও আমাদের দাদা , দিদির কাছেই থাকবো। শুধু মাঝে মাঝে ব্যবসার কাজের জন্যে কলকাতায় যেতে হতে পারে। ভালবাসার প্রকৃত অর্থটা আজ আপনাদের থেকে শিখলাম। মানুষকে সেবা করা , ভালোবাসা দিয়ে আপন করা সেটাও আজ নতুন করে জানলাম। মায়ের প্রতি আমরা যে ব্যবহার করেছি সেটা গুরুতর অন্যায় আর ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ কিন্তু মা সেসমস্ত মনে না রেখে আমাদের কাছে টেনে নিয়ে ভালবাসায় ভরিয়ে দিলেন। আজ এই শিক্ষাই নিলাম মায়ের সন্তানদের প্রতি ভালবাসার কোন বিকল্প হয় না , এ ভালবাসায় কোন ভেদাভেদ নেই। মায়ের ভালোবাসা সীমাহিন , অমর আর অক্ষয়। 

পুস্পা এবার ডাক্তার কৈলাশ আর তার স্ত্রীকে বললো -  মায়ের অনুমতি নিয়ে আমরা একটা কথা বলি , আমার বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ি মিলে প্রচুর স্থাবর , অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলি আমাদেরই। এতদিন ভাবতাম সম্পত্তি , টাকা পয়সা থাকলে ভাল থাকা যায়। আজ বুঝলাম সম্পত্তি , টাকাপয়সা দিয়ে সুখ কিংবা ভালবাসা পাওয়া যায় না। আমরাও এই সেবার কাজে যুক্ত হয়ে আমাদের সমস্ত সম্পত্তি আপনাদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি করা এই চিকিৎসা কেন্দ্রে মানুষজনের চিকিৎসা , সেবার কাজে দান করে দিতে চাই। শুধু একটাই প্রার্থনা - সৎ ভাবে থেকে আমরা যেন মানুষজনদের ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে পারি।

ফুলবানু দুচোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে দুই ছেলে , দুই বউ আর আদরের নাতনিকে জড়িয়ে ধরে বললেন - পুস্পা তার ভুল বুঝতে পেরে ঠিকই বলেছে । আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আজ আমার খুব খুশির দিন। তোদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আজ আমি পেয়ে গেলাম ভালবাসায় ভরা পরিপূর্ণ এক আনন্দের সংসার। 
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী সুন্দর, সুখপাঠ্য ও সুসাহিত্য। সৃজনশীল লিখনীতে ভীষণ মুগ্ধ।
Faisal Bipu অসাধারণ লিখেছেন দাদা
অথই মিষ্টি শ্রদ্ধেও ... আপনি অনুপম সুন্দর লিখেছেন ।।
রবিউল ইসলাম স্যার আপনার গল্প সত্যি অনেক সুন্দর হয়।ঔ বার গল্প পড়ে কেঁদেই দিয়েছিলাম। এইবারও সুন্দর লেখেছেন। সত্যি আপনি চমৎকার লিখেন।
ভাই, তোমার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম।
রুহুল আমীন রাজু সুন্দর লিখেছেন গল্পটি। শুভকামনা নিরন্তর

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

সন্তানের প্রতি মায়ের নিঃস্বার্থ ভালবাসাকে নিয়ে এই গল্পটি লেখবার চেষ্টা করেছি।

১২ আগষ্ট - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ৪৪ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "মুক্তির গান”
কবিতার বিষয় "মুক্তির গান”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৪