বন্ধুত্ব

বন্ধুত্ব (নভেম্বর ২০২২)

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১১
  • 0
  • ২২৪
গল্প - বন্ধুত্ব

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত 

বিশ্ব বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের ভাবনায় - " বন্ধু হচ্ছে দুটি হৃদয়ের একটি অভিন্ন মন " । কথায় বলে - প্রকৃত বন্ধু কিংবা বন্ধুত্ব এমনই এক মূল্যবান পাওয়া যাকে কখনোই কোন দাম বা অর্থ দিয়ে বিচার করা যায় না । বন্ধুত্বের কোন জাতিভেদ , বয়স কিংবা স্থানকাল নেই । দুটি আত্মার মধ্যে মনের মিল হয়ে থাকলে দুটি মানুষের মধ্যে যে সুমধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে , সেটাই হচ্ছে সত্যিকারের বন্ধুত্ব । 
আজ আমার অন্তরের ভালবাসার একজন মানুষের কথা এই গল্পে বলবো , যিনি ক্ষনিকের সময়ের জন্য হলেও , তিঁনি হয়ে ছিলেন আমার একজন পরম ভালবাসার বন্ধু । 

আমেরিকার শিকাগো শহর । " ইউনিয়ন " রেলওয়ে স্টেশন । একেবারে ঝকঝকে - তকতকে স্টেশন চত্বর । ট্রেনটি একেবারে ঘড়ি ধরে ঠিক সময় স্টেশন থেকে ছেড়ে দিল । আমার গন্তব্য স্থল -- " ব্লুমিংটন নরমাল " স্টেশন । দুরন্ত গতিতে ট্রেন ছুটে চলেছে । দুপাশে দেখা যাচ্ছে সুন্দর সুন্দর সাজানো গোছানো ছোট , বড় নানা ধরনের বাড়ী । কোনটার সামনে আবার নানা ধরনের ফুলের গাছ কিংবা আয়তনে ছোট নিজেস্ব " সুইমিং পুল " ,  আবার কখনো গাছ গাছালিতে ভরা ফাঁকা অঞ্চল । রেললাইনের পাশ বরাবর লুকোচুরি খেলার মতন দেখা যাচ্ছে হাইওয়ে রাস্তা । একে একে সুমিট , জোলিয়েট , দায়িয়েট , পনটিয়েক স্টেশনগুলিকে অতিক্রম করে " ব্লুমিংটন নরমাল " স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলাম । দুর থেকে দেখতে পেলাম -- গেটের সামনে আমার আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন - " ওয়েলম্যান সাহেব " । পুরোনাম - রবার্ট ওয়েলম্যান । আমাকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরে বললেন -- চল , বাড়ীতে চল । সেখানে গিয়ে প্রাণখুলে গল্প করা যাবে । তুমিতো জানো আমি তোমার কথা আমার স্ত্রীকে সবই বলেছি । তিনিও তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন । তোমার সঙ্গে , তোমাদের দেশ সম্পর্কে গল্প করবার জন্য । মিনিট পনেরোর মধ্যে আমরা ওয়েলম্যান সাহেবের বাড়ীতে পৌঁছে গেলাম । বিরাট বাড়ীটার সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা নিয়ে সবুজ ঘাসের প্রসস্থ লন ( Ranch - style house ) । বাড়ির সামনেটা বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য ফুলের টব দিয়ে সাজানো । আধ্যাত্মিক মনভাবা সম্পন্ন মিসেস ওয়েলম্যান হাসিমুখে অভ্যর্থনা করে আমাকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেলেন । ভাল ভাল নানা ধরনের খাবারের সাথে বিভিন্ন বিষয়ের উপর গল্প করে দিনটা বেশ সুন্দর ভাবে কেটে গেল । আধ্যাত্মিক নমস্য মানুষজনের আলোচনার প্রসঙ্গে মিসেস ওয়েলম্যান বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দ , শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ , মাদার তেরেসা ছাড়াও আরো অনেক আরাধ্য ব্যক্তিজনের সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহ আর গভীর শ্রদ্ধার কথা জানতে পেরে অভিভূত হয়ে গেলাম । কথা প্রসঙ্গে এটাও জানালেন ওয়েলম্যান সাহেবের সঙ্গে আমার আলাপ হবার পর তিঁনি আমার মত একজন প্রকৃত বন্ধু পেয়ে খুব খুশি । আমিও খুব খুশি ওয়েলম্যান সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়ে । তাঁদের সুন্দর আতিথেয়তা, আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম । তাঁদেরকে আন্তরিক ভাবে আমন্ত্রণ জানালাম আমাদের দেশে আসবার জন্য । 

শিকাগো শহরে বিশাল এক শপিং মল আছে। বিভিন্ন জিনিসের হরেক রকমের সম্ভার । প্রচুর লোকজন এখানে আসেন শপিং করবার জন্য । প্রধান ফটকের সামনে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যেক লোকজনকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করেন আর শপিং করবার জন্য ফাঁকা ট্রলিটি এগিয়ে দেন । সময় কাটানোর জন্য প্রায় প্রতিদিন সন্ধেবেলা এই শপিং মলে এসে নানা ধরনের নতুন নতুন জিনিসপত্র দেখবার সাথে সাথে আমার হাঁটাহাঁটির পর্বটিও ভাল ভাবে সমাধা হোত । রোজ এখানে আসবার ফলে শপিং মলে ঢোকবার , বেরোবার জন্য ফটকের সামনে দাঁড়ানো সদা হাস্যময় এই ওয়েলম্যান সাহেবের সঙ্গে আমার ভালভাবে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । বয়েস প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি । কিন্তু চলনেবলনে তিনি যেন চির যুবক । প্রথম পরিচয়ে তাঁর সুন্দর ব্যবহার , তাঁর কোমল হৃদয় আমার মনকে জয় করে নিয়েছিল । ক্রমে ক্রমে তাঁর সঙ্গে আমার এক মধুর বন্ধুত্বের মেলাবন্ধন তৈরী হয়ে গিয়েছিল । কথাবার্তায় জানতে পেরেছিলাম তাঁর কাজের সুবিধার জন্য তিনি শিকাগোতে থাকেন । তাঁর নিজের বাড়ী " ব্লুমিংটন " শহরে । সেখানে মিসেস ওয়েলম্যান একাই থাকেন ।তাঁর সঙ্গে গল্পের মাধ্যমে আমেরিকা দেশটা সম্পর্কে অনেক অজানা বিষয় জানতে পেরেছিলাম আর সত্যি অবাক হতাম তাঁর বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিশাল জ্ঞানের ভান্ডারের পরিধি দেখে।

একদিন কৌতূহল বশত সরাসরি ওয়েলম্যান সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম -- এই বৃদ্ধ বয়সে এত কষ্ট করে কেন কাজ করেন ? তিনি মুখে কিছু বললেন না শুধু একটু হাসলেন । পরে জানতে পারলাম প্রকৃত কারনটা । নিজের অবস্থা খুবই সচ্ছল । তাঁর দুই ছেলে প্রতিষ্টিত ডাক্তার । কাজের সূত্রে পরিবার নিয়ে একজন নিউইয়র্কে আর একজন বোস্টনে থাকে । ছুটি-ছাটাতে তাঁরা মা বাবার কাছে আসে । সময় পেলে তাঁরাও ছেলেদের কাছে যান । নিজে চাকরি করতেন আমেরিকার গভরমেন্টের খুবই উচ্চ পদে কাস্টটমস ডিপার্টমেন্টে । আমাকে এটাও বললেন -  এই বিদেশে আমার যদি কোন রকম সাহায্যের প্রয়োজন হয় , আমি যেন তাঁকে নির্দ্বিধায় জানাই । চাকরি থেকে অবসর নেবার পর এই শপিং মলে কাজ করছেন । এখান থেকে যে ডলার উপার্জন করেন তার পুরোটাই প্রতিমাসে একটি ক্যান্সার হাসপাতালে গরীব মানুষদের চিকিৎসার জন্য দান করে দেন , শুধু তাই নয় , প্রত্যেক সপ্তাহে এখানকার কাজের ছুটির দিনে হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে । লোকটির প্রতি শ্রদ্ধা , ভালোবাসার টানে উনি আমার কাছে ছিলেন একেবারে নিজের আপনজন । প্রায় রোজই মলে গিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলার পর মনটা খুব ভাল লাগতো । কোন কারনে শপিং মলে যেতে না পারলে মনটা ছটফট করতো ওয়েলম্যান সাহেবের সঙ্গে কথা বলার জন্য । পরে দেখা হলে আমার মলে না আসার কারন জিজ্ঞাসা করতেন । প্রায়ই বলতেন -- সব ধর্মেই ঈশ্বর বিরাজমান । বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাঁকে বিভিন্ন নামে স্মরণ করেন । জাতিভেদ বিচার না করে মানুষকে ভালবাসো , মানুষের সেবা করো , মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজ করেন । ঈশ্বর তাঁকে যতদিন কাজ করবার শক্তি দেবেন , ততদিন তিনি এইভাবে মানুষকে ভালোবেসে সেবার কাজ করে যাবেন । 

ওয়েলম্যান সাহেবকে যেদিন বললাম -- এবার আমি আমার নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি । উনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার হাত দুটো চেপে ধরে বললেন -- তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে , তোমার সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভাল লাগতো । ভাল থেকো । নিজের দেশে ফিরে গিয়ে আমার কথা যেন ভুলে যেওনা । আমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখো । এক অজানা অনুভূতিতে দুজন দুজনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলাম আর অনুভব করলাম আমাদের দুজনের চোখেই অশ্রু ধারা । 

নিজের দেশে ফিরে এসে ওয়েলম্যান সাহেব আর মিসেস ওয়েলম্যানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম । হটাৎ করেই একদিন খবর পেলাম ওয়েলম্যান সাহেব হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহা বিশ্বের মায়া ত্যাগ করে অন্য জগতে চলে গেছেন । মিসেস ওয়েলম্যানের থেকে জানতে পারলাম মৃত্যুর আগে তিঁনি আমার খোঁজ করেছিলেন । নিজের অজান্তেই দুগাল ভরে অশ্রু নেমে এলো । মনে হলো এক পরম আত্মীয় , গভীর শ্রদ্ধার , ভালবাসার এক বন্ধুকে হারালাম । হারালাম এমন একজন কোমল হৃদয়ের মানুষকে যাঁর হৃদয়টি ছিল শুধু অফুরন্তর ভালবাসা আর কোমলতায় ভরা । তিনি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেও আমার মন থেকে এই সহৃদয় বন্ধুটি কোনদিনও হারিয়ে যাবেন না । 

কাজী নজরুল ইসলামের কথায় ---

" তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু ।
আমরা অবোধ , অন্ধ মায়ায় তাই তো কাঁদি প্রভু ।।
তোমার মতই তোমার ভুবন
চির পূর্ণ , হে নারায়ণ !
দেখতে না পায় অন্ধ নয়ন তাই এ দুঃখ প্রভু ।। "
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
doel paki অভিনন্দন।
অনেক অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।
এইচ আর এম প্রান্ত ভালো লেগেছে।
অনেক ধন্যবাদ । ভাল থাকবেন ।
Dipok Kumar Bhadra সুন্দর লিখেছেন। ভোট দিলাম।সময় পেলে Sahitya Biggan Wave siteটি দেখবেন এবং লেখা পাঠাবেন।
অনেক ধন্যবাদ সময় নিয়ে গল্পটি পড়বার জন্য । অবশ্যই wave site টিতে যাব । ভাল থাকবেন ।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

জীবনে সত্যিকারের বন্ধু এক মূল্যবান পাওয়া। আজ সেইরকম এক অতি প্রিয় বন্ধুর কথা এই লেখার মধ্য দিয়ে লিখবার চেষ্টা করেছি।

১২ আগষ্ট - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ৩৮ টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১১

বিচারক স্কোরঃ ২.০১ / ৭.০ পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "নারী তুমি জয়িতা”
কবিতার বিষয় "নারী তুমি জয়িতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৩