বলছি - আমার কথাগুলি কি তোমার কানে যাচ্ছে ? বলি , এই সংসারে যত কাজ , যত দায়িত্ব সবই কি আমার ? সকাল হতে হতেই রান্নাঘরে ঢুকে চা করা , সকালের জলখাবার তৈরি করা , ঘরদোর পরিষ্কার করা এরপর রান্নার যোগার করা । কতবার বলেছি - মেয়ে এবারে এম.এ. পাস করেছে , মেয়ে কিন্তু এখন বড় হয়েছে , এবার মেয়ের জন্য একটি সুপাত্রের খোঁজ কর । কার কথা কে শোনে ? সেটা ও আমাকেই খোঁজ করতে হবে !! কেন ? বাবা হিসেবে তোমার কি কোন দায়িত্ব নেই ? কোন চিন্তা-ভাবনা নেই ? সামনের বারান্দায় খবরের কাগজটা পড়তে পড়তে পুলক স্ত্রীর সব কথাই শুনতে পেয়েছে । তবু না শোনার ভান করে বললো -- দীপালি , তুমি কি কিছু বলছো আমাকে ? তোমার কি চা করা হয়ে গেছে ? দীপালি এই কথা শুনে আরো রেগে গিয়ে রান্নাঘরের থেকে ঝাঁঝালো গলায় বললো -- চা হয়ে গেছে , নিজে এসে নিয়ে যাও । বলি , কটা বাজে তোমার খেয়াল আছে ? ৮টা অনেকক্ষণ বেজে গেছে , এবার দয়া করে বাজারে যাও । এরপর বাজারে গেলে পচা মাছ আর পরে থাকা বাসী সবজিগুলি কিনে আনতে হবে । কাল রাতে তোমাকে পই পই করে বলেদিলাম , আজ বিকেলবেলা যারা আমাদের মেয়েকে দেখতে আসছেন , তাঁরা রাত্রিবেলা আমাদের বাড়িতে খেয়ে যাবেন । আমরা তাঁদের সেইভাবেই নিমন্ত্রণ করেছি । তাঁদের কি আমরা পচা মাছ খায়াবো ? পুলক বললো - আরে বাবা , এই যাচ্ছি বাজারে । রান্নাঘর থেকে দীপালি বললো - সেতো আমি বুঝতেই পারছি .... । কখন তুমি বাজারে যাবে আর কখন আমি রান্না করব আর কখন যে ঘর-দোর পরিষ্কার করবো , তা শুধু ভগবানই জানেন !!

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে পুলকের উদ্দেশ্যে বললো - আমি কত ভাল ভাল সম্বন্ধের খোঁজ নিয়ে এলাম , তুমি আর তোমার গুণধর মেয়ে মিলে কোন আমলই দিলে না । যতবার মেয়ের বিয়ের কথা তোমাকে বলি , ততবারই তুমি বলো - মেয়ে আমাদের আরও একটু বড় হোক । বলি , তোমার খেয়াল আছে এই বৈশাখে মেয়ে ২৩ পার করে ২৪শে পরবে । আর মেয়েটা ও হয়েছে তেমনি , বিয়ের কথা বললেই বলে - এখন নয় , আরো কয়েকদিন পর । আবার যুক্তি দেখায় - আমার বন্ধু সোনালীর এখনো সম্বন্ধ দেখা শুরুই করে নি । দীপালি আপন মনে গজগজ করতে করতে বললো - আরে বোকা মেয়ে , ভালো করে খবর নিয়ে দেখ , ওর বাবা-মা তলেতলে ঠিকই সুপাত্রের খোঁজ করে চলেছে । কোনদিন হটাৎ করে শুনবি , সোনালীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । আমার এই কথা তখন তুই মিলিয়ে নিস । কতবার বলেছি - সোনালীর সঙ্গে অতো পীড়িত করিস না । ও মেয়ে মহা ধুরন্ধর , তোকে এক হাটে কিনে আর এক হাটে বিক্রি করে দেবে । এবার বেশ চিৎকার করে পুলককে বললো - আর বসে না থেকে দয়া করে বাজারে যাও । মেয়েটাও হয়েছে বাপের মত , এখনও পরে পরে ঘুমাচ্ছে । অন্তত আজকের দিনে মাকে একটু সাহায্য করবে , সেটা ওর চিন্তাতেই নেই । খুব ভাল করে জানে আজকে বাড়িতে লোকজন আসবে ।

তুলিকা ঘুম চোখে উঠে বড় একটা হাই তুলে মাকে বললো - সকালবেলা থেকে এত চেচামেচি কেন করছ ? দীপালি বললো - দেখতো কটা বাজে ! , এত বেলা অবধি না ঘুমিয়ে আমাকে তো একটু সাহায্য করতে পারিস । তুই তো জানিস , আজ তোকে পাত্র পক্ষের লোকজন দেখতে আসছে । বেশ খানিকটা গদগদ হয়ে বললো - আমি বলাতেই তোর ফুলমাসি এই ভাল সম্বন্ধের খবরটা দিয়েছে । আমি মনে মনে যেমনটা চেয়েছিলাম , সম্বন্ধটা ঠিক সেইরকম । ছোট সংসার , বাবা , মা আর তাঁদের একটি মাত্র ছেলে । কলকাতায় নিজেদের বাড়ি , গাড়ি আর ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার । মোটা টাকার মাইনেতে কলকাতায় এক নামি আই. টি. কোম্পানিতে কাজ করে । শুনছি , সামনেই নাকি বিদেশে যাবে । দেখিস , ওরা যখন তোকে দেখতে আসবে তখন আবার কোন বেচাল কথা বলিস না । ওদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করিস । ভাল করে ভেবে দেখতো , ভাল ভাল সম্বন্ধগুলিকে তুই না না অজুহাতে বাতিল করে দিয়েছিস । তুলিকা এবার মজা করে বললো - তুমি আর একদম চিন্তা করো না । এবার ফুলমাসির দেওয়া সম্বন্ধের সঙ্গে আমি বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসবো । আর একটা কথা , আমি সোনালীকে আসতে বলেছি সেইসময় । মা আবার রেগে গিয়ে বললো - কেন ? সোনালী আবার সেই সময় এসে কি করবে ? এইসব ব্যপারে বাইরের কোন বন্ধু-বান্ধবকে ডাকার কোন দরকার নেই । তাতে ফল ভাল হয় না । তুলিকা হালকাভাবে বললো - সোনালী এসে আমাকে একটু মেক-আপ করে দেবে আর এছাড়া সেই সময় তোমাকেও একটু সাহায্য করবে । কথাগুলি দীপালির একেবারেই মনঃপুত হলো না , মেয়েকে বললো - আমার কিন্তু তোর ঐ বন্ধুকে একেবারেই ভাল মনে হয় না । মুখে কোন কথা বলে না কিন্তু একেবারে তেলা শয়তান । তুলিকা বললো - তুমি মিছে মিছে ওকে দোষারোপ করছো , তুমিতো জান ওই আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী । দীপালি এবার সস্নেহে তুলিকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো - সত্যি সত্যি তোর বিয়েটা হয়ে গেলে ঘরটা আমাদের একেবারে শুন্য হয়ে যাবে ....।

সন্ধ্যেটা বেশ সুন্দর ভাবে কেটে গেল । পাত্রের বাবা , মা আর পাত্র নিজে তুলিকাকে যে তাঁদের পছন্দ হয়েছে , সেটা তাঁরা জানিয়ে ও দিলেন । পুলক আর দীপালির ইচ্ছে এই পরিবারের সঙ্গে শুভ কাজটি করতে , বিশেষ করে এত ভাল পাত্র আর তাঁদের পরিবার । হাসি , হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হবার পর পাত্রের বাবা মা বললেন - দেখুন , আমরা যখন দুই পরিবার মিলে ঠিকই করেছি এই শুভ কাজটি করবার জন্য , তাই আমাদের মনে হয় ওরা বরং নিজেদের মধ্যে বসে একটু গল্পগুজব করে নিক । বুঝতেই পারছেন এখন দিনকাল সব পাল্টে গেছে । পুলক আর দীপালি হাসতে হাসতে বললো - আপনারা ঠিকই বলেছেন । এখন তো আর আমাদের যুগ নয় , এখন হচ্ছে পরিবর্তনের যুগ । দীপালি তুলিকাকে বললো - তোরা বরং পাশের ঘরে গিয়ে কথাবার্তা বল , আমরা ওনাদের সঙ্গে কিছু দরকারি কথাবার্তা বলে নিই । তুলিকা , সোনালী আর পাত্র নিজেদের মধ্যে হাসি , ঠাট্টার সাথে গল্পগুজব করার পর মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদান হোল নিজেদের মধ্যে ।

পাত্রের বাবা মা বললেন - আজকের এই সন্ধেটা আমাদের খুব ভালই কাটলো । হাসতে হাসতে বললেন - আমরা এবার আমাদের ঘরের লক্ষীকে পেয়ে গেলাম । এবার তবে আমরা উঠি । পাকা কথাতো আমাদের মধ্যে হয়েই গেল । আপনারা এর মধ্যে একদিন আমাদের বাড়িতে আসুন । আলোচনা করে বিয়ের তারিখটা ঠিক করে নেওয়া যাবে । পাত্রপক্ষ চলে যাবার পর , বাড়িটা ফাঁকা হতে দীপালি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভগবানকে স্মরণ করে বললো - যাক , এবার ভালয়ভালোয় শুভ কাজটা যেন তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়ে যায় ।

সপ্তাহ দুয়েক পার হয়ে গেল তবু পাত্রপক্ষের বাড়ি থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই । দীপালি পুলককে বললো - কি হলো , বলতো ? ওদের এত আগ্রহ এই শুভ কাজ করবার জন্য , অথচ এখন তাঁরা একেবারেই চুপ । পুলক বললো - তুমি অযথাই টেনশান করছো । আরে , বিয়ে বলে কথা , ওঁদেরতো অনেক কাজকর্ম আছে , আর তাছাড়া ..., পুলককে থামিয়ে দীপালি চাপা স্বরে বললো - আমার কিন্তু একটু অন্যরকম লাগছে । আজকে সকালবেলা আমি নিজে ওনাদের বাড়িতে ফোন করেছিলাম । প্রথম কয়েকবার ফোনটাই ধরলেন না । তারপরে একবার ফোনটা ধরে আমাদের পরিচয় জানার পর এমন ব্যবহার করলেন যেন আমাদের চেনেনই না । পুলক বেশ চিন্তিত হয়ে একটু ভেবে বললো - তুমি বরং তুলিকাকে জিগ্যেস করে দেখ ওর সঙ্গে পাত্রের ফোনে কোন কথা হয়েছে কিনা ? তুমি সেদিন বলেছিলে তুলিকা তার মোবাইল নাম্বার পাত্রকে দিয়েছিল । দীপালি বললো - ঠিকআছে , আমি তুলিকার সঙ্গে কথা বলবো । হটাৎ দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দীপালি পুলককে বললো - দেখতো এই সন্ধ্যেবেলা আবার কে এলো ? পুলক দরজা খুলে দেখলো - সোনালীর বাবা আর মা ।

সোনালীর বাবা , মাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে । সোনালীর বাবা ব্যাগের ভিতর থেকে বিয়ের কার্ডটা বের করে পুলকের হাতে দিয়ে বললেন - আপনাদের সকলের আশীর্বাদে সোনালীর বিয়েটা হটাৎ করেই ঠিক হয়ে গেল । পাত্রপক্ষ একেবারেই দেরি করতে চাইলেন না । পাত্র আবার বিয়ের পরেই সোনালীকে নিয়ে বিদেশে চলে যাবে । পরিবারটি খুব ভাল । বাবা , মা আর তাঁদের একটিমাত্র ছেলে । ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার । কলকাতায় আই .টি. সেক্টরে মোটা মাইনেতে চাকরি করে । নিজেদের বাড়ি , গাড়ি - মানে খুবই সচ্ছল অবস্থা । সত্যি কথা বলতে ওরা নিজেরাই দেখে শুনে এই বিয়েটা করছে । খুব অল্প কয়েকদিন হলো ওদের মধ্যে আলাপ পরিচয় হয়েছে । আপনারা কিন্তু সবাই আগে আগেই যাবেন । তুলিকাকে বিয়ের একদিন আগেই আমাদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে । তুলিকা কোথায় ? সে বাড়িতে নেই ? দীপালি বললো - ও একটু বেরিয়েছে , এখুনি এসে পরবে । আমরা তাহলে এবার উঠি । হাতে তো আর বিশেষ সময় নেই , এই অল্প সময়ে অনেক কাজ শেষ করতে হবে ।

পুলক , দীপালি আর তুলিকা ভাল করে বিয়ের কার্ডটি পড়ে বেশ অবাকই হোল । দীপালি মনে মনে যে ব্যথিত , সেটা তার কথাতেই প্রকাশ পাচ্ছিল । ফুলমাসীর আনা সম্বন্ধের সঙ্গে সোনালীর কি করে বিয়ে হচ্ছে !!! আর সবচেয়ে বড় কথা এই পাত্রপক্ষ তাদের বাড়িতে এসে তুলিকাকে পছন্দ করে বিয়ের ব্যপারে একেবারে পাকা কথা দিয়ে গেলেন আর পাত্র নিজে তুলিকাকে পছন্দ করে , কথাবার্তা বলে ফোন নাম্বার পর্যন্ত নিয়ে গেল । হটাৎ এমন কি ঘটলো যে তাদের কোন খবর না দিয়ে একেবারে সোনালীর সঙ্গে এই বিয়ে পাকা হয়ে গেল । কিন্তু কেন এমনটি হলো , তার প্রকৃত কারনটি কিছুতেই পুলক কিংবা দীপালি বুঝে উঠতে পারছিল না । কেউ না বুঝুক , তুলিকা অনুমান করতে পেরেছে প্রকৃত কারনটা । সেদিন পাত্রের সঙ্গে গল্পগুজব করার ফাঁকে , মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদানের সময় সোনালী পাত্রের মোবাইল নাম্বারটা জানতে পারে । হয়ত সোনালী তুলিকাকে কিছু না জানিয়ে পাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে , আর নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে এইরকম একটা ভাল ছেলেকে বাগিয়ে নিয়ে একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছে । হয়তো তুলিকা ও তাদের পরিবার সম্বন্ধে বানিয়ে বানিয়ে অনেক মিথ্যে কথাও সে পাত্রকে বলেছে ।

এতদিনে তুলিকা বুঝতে পারলো তার মার কথাগুলিই সত্যি হলো । মা তাকে বহুবার বলেছে - সোনালী মেয়েটা কিন্তু ভাল নয় , ওর সঙ্গে মেলামেশাটা তুই কম কর । বিশেষ করে পাত্রপক্ষ যে দিন তোকে দেখতে আসছে , সেদিন তুই ওকে বাড়িতে ডাকিস না । তুলিকা মার কথা শোনে নি বরং সোনালীকে বিশ্বাস করে তার সমস্ত কথা সোনালীর সঙ্গে শেয়ার করেছে এমনকি পাত্রপক্ষ তাদের বাড়িতে আসার দিন সরলমনে তাকে বাড়িতে আসতে বলেছে । কিন্তু এই বিশ্বাসের প্রতিদান সোনালী এমন ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেবে সেটা সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি । একবার ভাবলো - মাকে বিয়ে ভেঙ্গে যাবার প্রকৃত কারনটা জানিয়ে দেবে , আবার ভাবলো মা হয়তো এতে কষ্ট পেয়ে চোখের জল ফেলবে । সারা বাড়িটায় খুশির আলোর রোশনাই আর সানাই এর সুরের বদলে গ্রাস করলো একরাশ হতাশার শূন্যতা , চরম এক নিস্তব্ধতা । তুলিকা একান্তে চোখের জল মুছতে মুছতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সোনালীর " সোনালি " কালিতে লেখা " শুভ বিবাহের " কার্ডটি দেখতে লাগলো ...