এই গল্পের সময়কাল বহু বছর পূর্বের । আমেরিকার নিউ জার্সি শহর । ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় । এবছর এইসময় এখানে তুষারপাত বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকটাই বেশি । চারিদিকটাই প্রায় বরফে ঢাকা আর এর ফলে চতুর্দিকে হারহিম করা কনকনে ঠান্ডা । কিছুদিন পর পালিত হবে " বড়দিন " উৎসব । এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রত্যেক বাজার-হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার প্রচুর ভিড় । আবার সাধারণত একটু উচ্চ বৃত্তদের ভিড় অন্য একটি বাজারকে কেন্দ্র করে , --- " ক্রীতদাস কেনা-বেচার বাজার " ।

আমেরিকাতে তখন ক্রীতদাস প্রথার কারবার রমরমিয়ে চলছে । বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলিতে অসহায় নিগ্রো শিশু , পুরুষ , নারীদের শেকল দিয়ে বেঁধে রেখে দাস হিসেবে দরদাম করে বিক্রি করা হতো । বেয়াদপি দেখলে সারা শরীরে পরতো চাবুকের ঘা । দাস হিসেবে ক্রয় হবার পর এই সব নারী পুরুষদের দিয়ে করানো হতো অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ আর বিনিময়ে জুটতো আধপেটা খাবার কিংবা অনাহারে দিন কাটানো । আর প্রায়শই চলতো বিনাকারনে সারা শরীরে চাবুকের বেত্রাঘাত । বেশি বেয়াদপি করলে আর কঠোর শাস্তি হিসেবে যাতে দাসটি শুয়ে বিশ্রাম করতে না পারে তার জন্য ক্রীতদাসটির গলায় পরিয়ে দেওয়া হতো ছুঁচোল বড় বড় কাঁটাওয়ালা লোহার বেল্ট আর সঙ্গে অমানুষিক নির্যাতন । এই ভয়ংকর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেকে নিজেকে শেষ করে দিত আর যারা পালিয়ে যেত , তারা যদি পরে আবার ধরা পরতো তখন তাদের পিঠে , গালে গরম লোহার ছেঁকা দিয়ে কিছু একটা লিখে দেয়া হতো যাতে আবার পালিয়ে গিয়ে ধরা পরলে বোঝা যেত সে পূর্বের কোন মালিকের ক্রীতদাস ছিল । ..... এই গল্পের পটভূমি সেইরকম একটি সময়ের যখন এই দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কিংবা স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকবার জন্য জোরদার আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে । চারিদিকে এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবার জন্য স্বাধীনতার দামামা বেজে উঠেছে ।

জন ম্যাকলিন মনেপ্রাণে ছিলেন এই বর্বর দাসপ্রথার বিরুদ্ধে আর এই আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন । সেই সময় তাঁর অনেক নিজের চেনাজানা লোক , বন্ধুবান্ধবের বাড়ীতে ক্রীতদাস রাখা হতো । একদিন এক শীতের সকালে তিনি নিউ জার্সির এক ক্রীতদাস বাজারের সামনে দিয়ে আসছিলেন , দেখলেন রাস্তার দুপাসে এই কনকনে শীতের সকালে শিকল দিয়ে অৰ্ধ উলঙ্গ অবস্থায় সব দাসদের বাঁধা রয়েছে বিক্রির জন্য । বিক্রেতা চাবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে । দরদাম করে দাস কেনাবেচা হচ্ছে । চলতে চলতে হটাৎ ম্যাকলিন দেখলেন - একজন নারী দাসকে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে । বেআব্রু শরীরটায় দেখা যাচ্ছে আগুনের ছেঁকা দেবার চিহ্ন অৰ্থাৎ পূর্বের মালিক তাকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে ধরে এনে দ্বিতীয়বার কিংবা তারপরের বারের জন্য অন্য লোকের কাছে বিক্রির জন্য এই বাজারে পাঠিয়ে দিয়েছে । জন ম্যাকলিন বিক্রেতাকে বললেন - এই নারীদাসকে আমি কিনতে চাই , এর দাম কত ? বিক্রেতা বললো - এই নারীদাসটি কিছুক্ষণ আগে বিক্রি হয়ে গেছে , একটু পরে এসে এর নতুন মনিব একে নিয়ে যাবে । তুমি অন্য দাস পছন্দ করো । জন ম্যাকলিন বললেন - অমি এই নারীদাসটিকেই চাই , যত ডলার লাগুক আমি দিতে প্রস্তুত । বিক্রেতা একটু চিন্তা করে বললো - ঠিক আছে , আমার বিক্রি করা নিয়ে কথা , তুমি যখন বেশি দাম দিতে প্রস্তুত , তবে আমি তোমার কাছেই ওকে বিক্রি করলাম । .... বিক্রেতা মুচকি হেসে বললো - -বয়সটা সামান্য একটু বেশি কিন্তু ওর শরীরটা দেখেছ বেশ তাগরাই আর খুব আকর্ষণীয় । এই নারীদাসকে দিয়ে তুমি খুব খাটাতে পারবে আর তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী এর আকর্ষণীয় শরীরটাও খেয়াল খুশি মত ভোগ করতে পারবে ।

জন ম্যাকলিনের স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠলো আজ থেকে কয়েকবছর আগের একটি ঘটনা । তিনি আমেরিকায় নাম করা এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অৰ্থনীতির অধ্যাপক । বাস্তববাদী আর যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রবণতা । বাড়ীতে তাঁর স্ত্রী আর বছর খানেক বয়েসের একমাত্র কন্যা । একেবারে সুখের সংসার । হটাৎ করে তাঁর সুখের সংসারে নেমে এলো এক ভয়ংকর বিপর্যয় । ভয়াবহ এক গাড়ী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তাঁর স্ত্রী । মাতৃহারা ছোট শিশু কন্যাটিকে নিয়ে তিঁনি তখন সম্পূর্ণ দিশেহারা । এর মধ্যে ঘটলো আর একটি দুর্ঘটন । স্ত্রীর মৃত্যুর দিন পনেরো পর তাঁর শিশু কন্যাটি এক ভয়ংকর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পরলো । হাসপাতালে চিকিৎসার পর বাড়ীতে ফিরে তার ঠিকমত পরিচর্যার দরকার হয়ে পরে । এদিকে বাড়ীতে শিশুটিকে দেখভাল করবার জন্য অন্য কোন লোকও নেই । জন ম্যাকলিনের দাদা থাকতো নিউ অর্লিয়েন্সে । স্বভাবে , ব্যবহারে তাঁর দাদা ছিল তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত । ম্যাকলিনের দাদার বাড়ীতে ছিল দুজন ক্রীতদাস । সব কিছু শোনার পর দাদা ম্যাকলিনকে বললো - আমার বাড়ীর একজন ক্রীতদাসীকে তোমার বাড়ীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার অসুস্থ ছোট মেয়েটাকে দেখাশুনা করবার জন্য । তোমার মেয়ে সুস্থ হয়ে গেলে আবার ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও । তবে সাবধান , এই নারী দাসটি অত্যন্ত বেয়াদপ । প্রায় সবসময় ওকে দিয়ে কাজ করবার জন্য আমাকে চাবুক মারতে হয় । তোমার বাড়ীতে কাজের সময় বেয়াদপি করলে তুমিও ওকে চাবুক মারবে । ম্যাকলিন দাদার থেকে এই কথা শোনার পর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে অনেকক্ষণ চিন্তা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবশেষে সম্মত হলেন ক্রীতদাসীটিকে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে আসবার জন্য ।

জন ম্যাকলিন গাড়ীতে উঠে কুকুরের মত বাঁধা লোহার শেকলটা মারিয়ার শরীর থেকে খুলে দিয়ে নিজের গায়ের গরম কোর্টটা মারিয়ার গায়ে চড়িয়ে দিয়ে কোমল ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন -- কেমন আছ মারিয়া ? অনেকদিন পর তোমার দেখা পেলাম । আসলে আমি একটা দরকারি কাজে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম , তোমাকে দেখেই আমি চিনতে পারি , আর ..... , ম্যাকলিনকে থামিয়ে কিছুক্ষন চুপ করে আস্তে আস্তে মাথাটা নেড়ে মারিয়া বোঝাতে চাইল সে ম্যাকলিনকে চিনতে পেরেছে । একটুক্ষণ পর এক করুণ চাহুনি দিয়ে এক ভয়মিশ্রিত গলায় কাঁপা কাঁপা ক্ষীণস্বরে মারিয়া বললো -- তুমি কি আমাকে তোমার বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে তোমার দাদার মত নিষ্ঠুর ভাবে অকারণে আমার সারা শরীরে চাবুক মারবে ? ম্যাকলিন এক মমতা ভরা চাহুনি দিয়ে মাথা নেড়ে বললেন -- ' না ' । একটুক্ষণ চুপ থেকে মারিয়া জিজ্ঞাসা করলো -- তোমার ছোট মেয়েটা এখন কেমন আছে ? তার অসুখের সময় তাকে সুস্থ করে তোলবার জন্য আমি প্রায় তিন মাস তোমার বাড়ীতে ছিলাম । আসলে তোমার ছোট মেয়েটার প্রতি আমার ভীষণ একটা মায়া পরে গিয়েছিল । তোমার বাড়ীতে আমি খুব , খুব আরামে ছিলাম তোমার ছোট মেয়েটিকে নিয়ে । ছিল না অত্যাচার , ছিল না চাবুকের ঘা । ভালভাবে খেতে আর ঘুমোতে পারতাম । সত্যি বলতে সেই তিন মাস আমি ছিলাম পুরোপুরি স্বাধীন , পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত । তিন মাস বাদে আবার তোমার দাদার কাছে যখন ফেরত গেলাম শুরু হলো প্রবল অত্যাচার আর তার সাথে অকারণে চাবুকের মার । ..... একদিন এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাড়ী থেকে পালিয়ে গেলাম । কিন্তু কোথায় আর যাব ? চারিদিকে সব হিংস্র নেকড়ের দল । একদিন ধরা পরে গেলাম । আর তারপর আমার যে কি অবস্থা হল , সেটা আমি আর বর্ণনা করতে পারছি না । গায়েতে পরলো জ্বলন্ত লোহার ছেঁকা আর অমানুষিক নির্যাতন । তারপর একদিন তোমার দাদা বাড়ীতে নিয়ে এলো নতুন এক নারী ক্রীতদাস আর আমাকে পাঠিয়ে দিলো ক্রীতদাসদের বাজারে বিক্রি করবার জন্য । এরপর বহুহাত বদল হয়ে আবার চলে এলাম এই ক্রীতদাস বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে । আসলে কি জান , আমাদের এখন আর চোখ থেকে জল বার হয় না , অনেককাল আগেই সব জল শুকিয়ে গিয়েছে । এই সমাজে আমাদের মত মানুষদের স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকবার কোন অধিকার নেই ....... , থাক আমার কথা । এবার বলো -- তোমার ছোট মেয়ে এরিনা এখন কেমন আছে ? আর একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করছে , তুমি এত বেশি ডলার খরচ করে কেন আমাকে কিনলে ? ম্যাকলিন শান্ত ভাবে বললেন -- বাড়ীতে চল , সব বলবো ।

বাড়ীতে ঢোকা মাত্র ছোট্ট এরিনা মারিয়াকে দেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু একটা চিন্তা করে এক লাফ দিয়ে মারিয়ার কোলে ঝাঁপিয়ে পরে একেবারে পরম আনন্দে জড়িয়ে ধরল । ম্যাকলিন মারিয়ার দিকে এক পরম তৃপ্তি ভরা দৃষ্টি দিয়ে বললেন -- শুধুমাত্র এই কারনেই আমি তোমাকে বেশি ডলার খরচ করে শয়তান লোকগুলোর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছি । সেদিনকার কথাগুলি আজও আমার মনে জ্বলজ্বল করছে । তুমি সেদিন নিঃস্বার্থ ভাবে মাতৃস্নেহ , মমতা , ভালোবাসা দিয়ে আমার ছোট মাতৃহারা মেয়েটিকে ভয়ংকর অসুখের থেকে সুস্থ করে তুলেছিল সে কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না । তোমার এই ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না । তুমি সেদিন আমার মেয়ের পাশে না থাকলে আমি হয়তো আমার মেয়েকেই হারাতাম । তুমি আমাদের বাড়ী থেকে দাদার বাড়ীতে চলে যাবার কিছুদিন পর আমি তোমার খোঁজ করেছিলাম , জানতে পারলাম দাদা তোমাকে বিক্রি করে দিয়েছে । একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ম্যাকলিন সরাসরি মারিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন -- আমি তোমার প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে একটা কাজ করতে চাই । তুমি কি সম্মতি দেবে ? মারিয়ার অবাক চাহুনির নিরাসন ঘটিয়ে জন ম্যাকলিন ধীরে ধীরে বললেন -- আমি আগামীকাল চার্চে গিয়ে তোমাকে আমার স্ত্রী রূপে বরণ করে নেব । এই কথা শুনে ক্রীতদাসী মারিয়ার যে চোখের জল অনেকদিন আগেই শুকিয়ে গিয়েছিল , আজ আবার নতুন করে ঝর্নার মতন চোখের থেকে ঝরতে লাগল । তবে এ চোখের জল অত্যাচারের নয় কিংবা চাবুকের ঘা খাবার জন্য নয়, ক্রীতদাসীর জীবনে ঘর বাঁধার আনন্দে আর অবশ্যই স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকবার অসীম আনন্দে । এযেন বহুকষ্টের পর জীবনে নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করা ।