আশা করি এই গল্পের বিষয়বস্তু সামঞ্জস্যপূর্ণতা রক্ষা করতে পেরেছে ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
গল্প/কবিতা: ২৩টি

সমন্বিত স্কোর

১.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ০.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

বিচারক
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ১.৯৮

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত

comment ২  favorite ০  import_contacts ২১৫
সকাল থেকেই আদালত চত্বরটা লোকে লোকারণ্য । বিচারক আজ সাজা ঘোষণা করবেন । এই মামলার সাজা শোনবার জন্য সবাই উদগ্রীব । দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার শুনানির খবর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রত্যেকেই জানতে পেরেছে আর মোটামুটি এও অনুমান করেছে এই জঘন্য , নৃশংস হত্যার সাজা কি হতে পারে !! শুধু সিলমোহর সমেত বিচারকের মুখ থেকে শোনার অপেক্ষায় । বেলা যত বাড়ছে উদ্দীপনার পারদ ততই বাড়ছে । একটা সময় মহামান্য বিচারক এজলাসে এসে নিজের চেয়ারে বসলেন । ঘরে চুড়ান্ত নিস্তব্ধতা । কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মহামান্য বিচারক বেশ গম্ভীর হয়ে বিচলিত ভাবে বললেন -- এই মামলার রায়দান আজ আমি দিতে পারছি না । আজ আমি হঠাৎই খুব অসুস্থ বোধ করছি । সাত দিন পর আমি এই মামলার রায়দান আর সাজা ঘোষণা করব । এই কথা গুলো বলে তিনি ধীরপায়ে এজলাস থেকে বেড়িয়ে গেলেন । নিস্তব্ধ ঘরটায় উপস্থিত সকলের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পরলো ।

উষ্ণ গুঞ্জনটা বেশ কয়েকদিন ধরেই প্রায় প্রতিটি গ্রাম-শহরে ছড়িয়ে পরেছে । উত্তেজনার উষ্ণতার প্রবাহ চারিদিকে । একটা থমথমে ভাব সকলের চোখেমুখে । প্রথমে অনেকেই ভেবেছিল খবরটা গুজব । অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি এলো সেই চরম দুঃখের দিনটি । দেশটা ভাগ হয়ে গেল ... । এতদিনের পূর্ব-পুরুষদের ভিটে ছেড়ে প্রায় শূন্য হাতে অজস্র লোকেদের মিছিল । যে যেদিকে পারলো পালাতে শুরু করলো । ট্রেনে , বাসে , স্টিমারে সর্বত্র মানুষের ভীড় । কোথায় তিল ধরবার জায়গা নেই । চারিদিকে এক ভয়াবহ উত্তাপ , পালিয়ে আসা পরিবারগুলির সব একেবারে ছিন্নভিন্ন অবস্থা ।

গোকুল মিত্রের পরিবার বলতে তাঁর সুন্দরী স্ত্রী কমললতা । কমললতা তাঁর থেকে প্রায় বারো বছরের ছোট আর তাঁদের একমাত্র ছেলে আদিনাথ । আদিনাথের বয়স বছর চারেক । একেবারে সুখের সংসার । প্রচুর পৈত্রিক সম্পত্তি । কোন কিছুর অভাব নেই । মহা আনন্দে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল । দেশ ভাগের পর সবকিছু ফেলে রেখে এক কাপড়ে শুরু হলো এক অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা । সকলের সঙ্গে গোকুল মিত্রের পরিবারও কোনক্রমে ট্রেনের কামরায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে লোকে-লোকারণ্য শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পৌঁছালো । সম্পূর্ণ এক অচেনা , অজানা জায়গা । তাঁদের গ্রামের অনেক লোকই এখানে এসে জড়ো হয়েছে । উদ্দেশ্য , কোন রিফিউজি ক্যাম্পে যদি থাকার জায়গা জোগাড় করা যায় । চারিদিকে ধাক্কাধাক্কি এক বিশৃঙ্খল অবস্থা । গ্রামে থাকাকালীন যে আন্তরিকতা আর ভালোবাসার উষ্ণতা ছিল এখানে এসে নিমিষের মধ্যে সব যেন উধাও হয়ে গেল । সবাই যে যার নিজের ধান্দায় ব্যস্ত । কয়েকটা দিন শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফর্মে কাটিয়ে অবশেষে অনেক খুঁজে তাঁদের একচিলতে জায়গা মিললো থাকবার জন্য ।

জায়গাটা শিয়ালদহ স্টেশন পার হয়ে বেলঘড়িয়ায় রেল লাইনের পাশে জল-কাদায় ভর্তি একটা খোলা মাঠে । চারিদিকে দুর্গন্ধ এক দুর্বিসহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ । যে যার নিতান্ত প্রয়োজন মত কোনরকমে থাকবার জন্য বাঁশ , বেড়া , হোগলা পাতা ঘিরে ঘর বানিয়ে নিয়েছে । নানা ধরনের সেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে । ত্রাণ শিবিরের থেকে দুবেলা ন্যূনতম খাবার বন্টন করা হয় । হাতে থালা আর বাটি নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় তাদের দান নেবার জন্য । এযেন এক অমানবিক , অকল্পনীয় অবস্থা । তারউপর নতুন এক উপসর্গ , বেআব্রু জায়গাটায় গোকুল মিত্রের সুন্দরী স্ত্রী কমললতার উপর খারাপ লোকেদের লোলুপ চাহুনি আর নানা আছিলায় বিরক্ত করা ।

ঘরে বসে থাকলে সংসার চলবে না । প্রতিদিনের মত আজও দুপুরবেলায় গোকুল মিত্র কাজের সন্ধানে কলকাতার দিকে বেড়িয়েছেন । কমললতা গেছেন ত্রাণ শিবিরের অফিসে খাবার জোগার করতে । ঘরে একা রয়েছে তাঁদের ছেলে আদিনাথ । দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার জোগাড় করে কমললতা ঘরে ফিরে দেখে আদিনাথ ঘরে নেই । চারিদিকে খোঁজ খোঁজ কিন্তু সবাই মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাকে আর পাওয়া গেল না । থানা-পুলিশ করেও কোন লাভ হলো না । মানসিক ভাবে ভীষণ ভেঙ্গে পরলো গোকুল আর কমললতা তাঁদের একমাত্র আদরের ছেলেকে হারিয়ে ।...... কি ভাবে আর কোথায় যে তাঁদের ছোট আদিনাথ হারিয়ে গেল তা বোধহয় শুধু ঈশ্বরই জানেন । স্মৃতি বলতে আদিনাথের ছোটবেলার একটা ফটো । একবার গ্রামের মেলায় গিয়ে এক ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবিটা তোলা । মনে পড়ে মেলাতে এক উল্কিয়ালার কাছ থেকে আদিনাথের ডান হাতের পাতায় ছোট একটি গোলাপ ফুল আঁকিয়ে দিয়েছিল ।

...........দেখতে দেখতে অনেকগুলি বছর পার হয়ে গেছে । এই কলকাতা শহরে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর থাকা হয়ে গেল । গোকুল মিত্র দমদমের কাছে থাকবার জন্য অতি সাধারণ একটি বাড়ী তৈরি করেছেন । ইদানিং নানা ধরনের ব্যাধিতে তিঁনি জর্জরিত । তবুও কোনরকমে একটি বেসরকারি সংস্থায় অতি সাধারণ চাকুরী করেন । শরীর যেন আর চলে না । স্বামীর চিকিৎসা আর সংসারের জন্য কমললতা বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত একটি অনাথ ছেলেদের হোমে করণিকের কাজ করেন । দুজনের সংসার কোনভাবে চলে যাচ্ছিল । কিন্তু বিপত্তি হল কমললতার এই বয়সেও তাঁর আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন । হোমের সুপারের নজর সবসময় তাঁর শরীরের উপর । মাঝে মাঝেই সুপার তাঁকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে থাকে । একেক সময় মনে হয় এই অস্বস্তিকর পরিবেশে চাকরী করবে না । সংসারের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়েই করতে হয় । মনে পড়ে ছেড়ে আসা ঘর-বাড়ীর কথা । প্রতিনিয়ত মনে পড়ে আদিনাথের কথা । কতগুলি বছর পার হয়ে গেছে । আদিনাথ এখন অনেক বড় হয়ে গেছে । কোথায় আছে , কি ভাবে আছে বা কাদের কাছে আছে , এসব চিন্তা করে সবসময় দুজনে চোখের জল ফেলেন । শুধু ভগবানের কাছে একটাই প্রার্থনা -- ছেলেটা যেখানেই থাকুক ও যেন ভাল থাকে , সুখে থাকে ।


ভগবান বোধহয় সবার কপালে সুখ দেন না । এক ঝড়-জলের সন্ধের রাত । অফিসের অনেকেই বেড়িয়ে গেছে । সুপারের নির্দেশ কমললতাকে হিসাবের একটা ফাইল আজ শেষ করতেই হবে । কাজটা শেষ করে সুপারের ঘরে ফাইলটা পৌঁছে দিতে গিয়ে দেখল অফিস প্রায় ফাঁকা । এই সুযোগে হটাৎ সুপার হিংস্র পশুর মত ঝাপিয়ে পরলো কমললতার শরীরের উপর । অনেক ধস্তাধস্তি পর জোরকরে শারীরিক ইজ্জত লুট করে সুপার কমললতার গলায় দুহাত শক্ত করে চেপে ধরতে , একটুক্ষণ তীব্রভাবে হাত-পা দাপিয়ে কমললতার শরীরটা নিথর হয়ে গেল ।

সবে সন্ধে হয়েছে । বিচারক রবীন পাঠক তাঁর বাড়ীর চেম্বারে অতি গোপনে তার একান্ত ব্যক্তিগত স্টেনোগ্রাফারকে আগামীকালের মামলার রায়দানের নোট দিচ্ছেন । দীর্ঘ বিচারপর্ব চলার পর আগামীকাল বিচারক তার " জাজমেন্ট " বা সাজা ঘোষণা করবেন । হটাৎ তাঁর ব্যক্তিগত আর্দলী এসে বললো -- স্যার , একজন বয়স্ক লোক আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে আর বলছে আপনার সঙ্গে দেখা করাটা অত্যন্ত জরুরী ... । বিচারক পাঠক একটুক্ষণ চিন্তা করে বললেন -- ঠিক আছে , ওনাকে আমার বৈঠকখানায় বসাও , আমি আসছি ।

বিচারক পাঠক ঘরে ঢুকে দেখলেন -- একজন শীর্ণকায় বয়স্ক লোক জড়োসড়ো হয়ে বসে রয়েছেন । তাঁকে দেখে ভদ্রলোক সজল চোখে কাঁপা হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললেন -- বাবা , আমি তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করব না । বয়স হয়েছে তাই হয়তো সব কথা গুছিয়ে বলতে পারব না । সেইজন্য এই চিঠি , এখানে সব লেখা আছে । চিঠিটা তুমি পোড়ো । এই বলে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন ।

চিঠিটা অনেকবার পড়লেন । মনে হচ্ছে সারা পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরছে । দুচোখে অন্ধকার দেখছেন । কোনক্রমে টেলিফোনটা ডায়াল করে বিহারে তাঁর বাবা , মার কাছে চিঠির বিষয়বস্তু জানিয়ে প্রকৃত সত্য ঘটনা জানতে চাইলেন । অনেকক্ষণ বাবা , মার সঙ্গে এই চিঠির বিষয়ে কথাবার্তার পর নিশ্চিত হলেন চিঠিতে যে ঘটনার কথা উল্লেখ করা আছে সবটাই একেবারে সত্যি । নিমেষের মধ্যে সবকিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল । সারাটা শরীর যেন অবস হয়ে গেছে । চিঠিটা আবারও পড়লেন --

বাবা আদিনাথ ,

....... কেস চলাকালীন আমি রোজই কোর্টে গিয়েছি । ভগবানের কাছে রোজ প্রার্থনা করছি কমললতার খুনীর যেন চরম শাস্তি হয় । তোমাকে দেখে প্রথম থেকেই আমার কিরকম যেন একটা সন্দেহ হয়েছিল । তুমি লেখা থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ বা হাত দিয়ে করছিলে । তারপরে আরো নিশ্চিত হই তোমার ডান হাতের পাতায় একটা গোলাপ ফুলের ছবি উল্কি দিয়ে করা । তুমি যখন খুব ছোট , তখন দেশে এক গ্রামের মেলায় আমি আর তোমার মা নিছক সখ করেই এই উল্কিটি করিয়েছিলাম । তবুও বলবো , তুমি তোমার বাবা , মার কাছে এই বিষয়ে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিও । আমি কিন্তু নিশ্চিত তুমিই আমাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলে - আদিনাথ । এইটুকু সান্তনা আমি আমার নিজের ছেলেকে কাছে না পাই তবুও আজ তাকে চোখের দেখা দেখতে পেলাম । আজ তোমার মা বেঁচে থাকলে তোমাকে পেয়ে কতটাই যে খুশি হতেন তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই । ভাগ্যের এমনই লিখন , তোমার মাকে যে লোকটা নৃশংস ভাবে খুন করেছে আজ তার বিচারক তুমি স্বয়ং নিজে । অনেক কথা বলার ছিল কিন্তু পারলাম না । কেন জানো , তোমাকে পেয়ে আনন্দে আমার সারা শরীর কাঁপছে । ভাল থেকো । অনেক বড় হও , এই আশীর্বাদ করি ।

ইতি , হতভাগ্য তোমার বাবা -- গোকুল মিত্র ।

কমললতা ত্রাণ শিবিরের অফিসে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে খাবারের জন্য । গোকুল মিত্র চাকরীর খোঁজে বেড়িয়েছেন । ছোট আদিনাথ ঘর থেকে গুটিগুটি পায়ে বেড়িয়ে কিছুটা ঘোরাঘুরি করে অবশেষে পথ হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকলো । এই জায়গাটায় বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরের অফিস । এইরকম এক ত্রাণ শিবির সংস্থার কর্ণধার রমেশ পাঠক । নিঃসন্তান রমেশ পাঠকের ছেলেটিকে দেখে মায়া হয় আর একরকম ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাকে তাদের বাড়ীতে নিয়ে যায় । তারপর থেকেই ছোট আদিনাথ পাঠক দম্পতির কাছে পুত্র স্নেহে মানুষ হতে থাকে । একসময় তার নাম হয় রবীন পাঠক । নিঃসন্তান পাঠক দম্পতি তাকে খুব আদর যত্নে মানুষ করেন । পড়াশুনায় সে খুবই ভাল । একটা সময় জুডিসিয়াল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে সরাসরি বিচার বিভাগের চাকরীতে জয়েন করে ।

রবীন পাঠক ওরফে আদিনাথের সারা শরীরে এক গভীর উত্তেজনা । ভগবানের এমনি বিচার আজ তাকেই বিচারকের চেয়ারে বসে তাঁর নিজের মাকে যে খুন করেছে তার বিচার করতে হচ্ছে । এসব কথা ভাবতে ভাবতে সারা শরীরটা যেন হিম শীতল হয়ে আসছিল আবার পরক্ষনেই এক অজানা আনন্দের উষ্ণতায় ভরিয়ে দিচ্ছিল সারাটা শরীর , এতদিন পরে নিজের আসল বাবা , মার পরিচয় জানতে পেরে । এই জগতের আসল বিচারক হলেন -- মহান করুণাময় ঈশ্বর ।


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement