পড়াশোনা করার প্রবল ইচ্ছা ও স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে মাত্র দশ এগারো বছর বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয় রবিনকে। মায়ের সুখের কোল ছেড়ে তাকে ঘুমাতে হয় বড় শহরের কোনো এক রাস্তায়। তখন মাঝ রাতের অন্ধকারে সে ফিরে যায় তার সেই চিরচেনা গাঁ, অমলপুরে। তার জীবনের গল্পগুলো নিয়ে এলোমেলো চিন্তা করার সঙ্গী হয় সেই মাঝ রাত আর মাঝ রাতের আকাশের বুকে জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল তারাগুলো........
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ মে ২০১৮
গল্প/কবিতা: ১৩টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫৫

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

ইটপাথরের শহরে, ইটপাথরের জীবনে
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫৫

মৌরি হক দোলা

comment ২২  favorite ০  import_contacts ২১১
রবিনের অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আধো আধো চোখ মেলে তাকিয়ে সে ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখতে পায়। রাস্তার দু’ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো ক্রমাগত আলো বিকিয়ে মাঝ রাতের ঘন অন্ধকারকে দূরীভূত করার চেষ্টা করে চলেছে। আলোর চারধারে আঁধার, আঁধারের মাঝে আলো- রবিন আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায়। ওর দুই পাশে বল্টু, পবন, রনি, শাকিল…… সবাই শুয়ে আছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ওরা। কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেবল রবিন নিঃশব্দে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।
মাথার উপরে ল্যাম্পপোস্টের আলো। তাই উইপোকারা একে একে সেখানে গিয়ে জড়ো হয়েছে। মাঝে মাঝে একটা দুটো করে নেমে আসে রবিনের মাথা বরাবর। তখন ওরা ঘোরে, রবিনের মাথার চারপাশে অদ্ভুত শব্দ করে নেচে নেচে ঘুরে বেড়ায়। রবিন বিরক্তি প্রকাশ করে। একে তো এই এত রাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছে, তার উপরে উইপোকার নাচানাচি! শুধু নাচলে তো আর তার আপত্তি ছিল না, কেন যে এসব চোখেমুখে এসে পড়ে!
রবিন দু’হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে একটা বড় হাই তোলে। সে জানে, এখন আর ঘুম হবে না। প্রায়ই এমন হয় তার। ঘুমের জগতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে ফেলতে সেখান থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে আসে সে। তারপর আর সে জগতে প্রবেশ করা যায় না। তখন সে এই মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় অন্ধকারের খেলা দেখে। কেমন করে ঘিরে রেখেছে এই পৃথিবীটাকে! মাঝে মাঝে ওর মনে হয় রাস্তার ধারের এই কৃত্রিম আলোগুলো না থাকলেই বুঝি ভালো ছিল। নিকষ কালো অন্ধকারের মাঝে খুঁজে পাওয়া যেত ‘অমলপুর’কে।
রবিন তার কল্পনার জগতে ডুব দেয়। ফিরে যায় সেই চিরচেনা মাঠ, মেঠোপথ, বাঁশঝাড়, গ্রামের সঙ্গীসাথী, খেলার মাঠ আর…….. আর বরইতলায়। আর করিমচাচার চায়ের দোকানে। আর সেই ঘুড়ি ওড়ানোর বিকেলগুলোতে। যে বিকেলগুলো ছিল কতই না খোলামেলা, প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বসিত!

চোখ দু’টো খোলা থাকুক কিংবা বন্ধ- মায়ের মুখখানা সবসময়ই চোখের সামনে ভেসে থাকে। যেন সে তার খুব কাছাকাছি, সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে কখনো হাসছে, কখনো অজস্র কাজের চাপে চোখেমুখে সে কাজ করার এক বিরক্তিকর ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো বা হয়তো কোনো এক কারণে রবিনের দিকেই সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রবিন এ সবই তার চোখের সামনে দেখতে পায়। এক এর পরে এক মায়ের সাদাকালো কিংবা রঙিন মুখচ্ছবি।

রবিনের দু’চোখ ভরে জলের স্রোত প্রবলবেগে বেরিয়ে আসতে চায়। আসে না। শুধু দৃষ্টি বুলায় সেইসব চিরচেনা দিনগুলোর স্মৃতিপটে।
বিকেলবেলা সঙ্গীদের সাথে খেলতে খেলতে কখন যে সন্ধ্যের আঁধার চারপাশে জাল ছড়িয়ে দিল! রবিন যেন সেটি বুঝেই উঠতে পারে নি। সম্বিত ফিরে আসা মাত্রই সে উথালপাথালভাবে দৌড় দিল বাড়ির পথে। আজ একটা রণক্ষেত্র বাড়িতে সাজবেই সাজবে! বাড়ির মুখে গিয়ে পৌঁছতেই সেই চিরচেনা স্তম্ভিত মূর্তি। যা ভয় পেয়েছিল ঠিক তাই! সেই সন্ধ্যেতে এক পর্ব কোনো রকমে সমাধান হয়ে গেলেই বই নিয়ে বসে যায় সে। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের একটা গদ্য অতি উচ্চস্বরে পড়তে থাকে। মাও আর কিছু বলেন না।
কিন্তু রাতে খেতে বসার সময় মায়ের মুখখানা একেবারেই বদলে যায়। সেই স্নেহমাখা হাসি, ছেলের প্রতি সহজাত স্নেহ- রবিন বুঝতে পেরে যায় আজকের বিপদটাও তবে কেটে গিয়েছে। মা আর তার উপরে রেগে নেই।

কি সেই সব দিনের স্মৃতিকথা! রবিন দু’হাতে চোখের জল মোছে। তখন তার আবার মনে পড়ে যায় কালাম মামার বলা কথাগুলো। ‘তুই না ব্যাটা মানুষ ? এহনও যদি মার আঁচল ধইর্যার ঘুরঘুর করস তয় চলে ? সংসারের হাল ধরতে হইব না ? কই শহরে যাইয়া কামাই করবি, মার মুখে হাসি ফুটাবি- তা না! ঘরের মইধ্যে মার আঁচলের তলে পইড়া রইছে!’
গ্রাম সম্পর্কের এই কালাম মামার হাত ধরেই শহরের বুকে পাড়ি জমিয়েছিল রবিন। ছোট্ট বোন আর মা কে ফেলে রেখে এসেছিল সেই কোন অমলপুরের মাটিতে। মা কেঁদেছে, কেঁদেছে ছোট্ট, অবুঝ বোনটা আর কেঁদেছে সে নিজেও। রবিন আর তার মা কখনোই মন থেকে চায় নি যে সে এত তাড়াতাড়ি উপার্জনের পথে পা বাড়াক। রবিন চেয়েছিল পড়তে আর মা চেয়েছিল তাকে পড়াতে। রবিন পড়াশোনা করে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে- এই ছিল দু’জনেরই স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা। কিন্তু বাস্তবতা বড় বেশি নির্মম! অভাব বড় যন্ত্রণাদায়ক! সুখপাখি বড় বেশি দূরে!


আকাশের অজস্র তারাগুলো রবিন একটা দুইটা করে গুণতে শুরু করে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়………… এলোমেলো হয়ে যায়। একটি তারাই রবিন বার দুই করে গুণে ফেলে। আবার শুরু করে সে। নাহ্, এবারো এলোমেলো হয়ে যায় গণনা। ঠিকঠাকভাবে ঠাওর করতে পারা যায় না তারার মেলার তারাগুলোকে। সংখ্যায় যেমন অনেক বেশি, তেমনই অনেক বেশি কাছাকাছি অবস্থান করে সেগুলো। গুণতে গেলে রবিনের কপাল কুঁচকে যায়। মাথার পেছন থেকে মাঝ বরাবর, সেখান থেকে সামনে কপালের দিকটায়- কেমন যেন এক চাপের সৃষ্টি হয়। রবিন এত চাপ সহ্য করতে পারে না। এলোমেলো চিন্তারা তার মাথায় এসে ভর করে। সে সেই চিন্তার দলগুলো নিয়ে খেলা করে। এলোমেলো খেলা।
মাঝে মাঝে রবিনের মনে হয় ফুরফুরি, রঞ্জন, সবুজ- ওদের মতো যদি ওর বাবাও ওর কাছে থাকত তাহলে বুঝি আর ওকে এভাবে খোলা আকাশের নিচে শহরের বুকে মাকে ছেড়ে একা একা শুয়ে শুয়ে তারা গোণার এলোমেলো খেলা খেলতে হত না। এই বয়সে সংসারের হালও ধরতে হত না তাকে। একটা সুন্দর হাসিখুশি জীবন হত তার! সে পেত মায়ের কাছে শুয়ে থাকার পুরোনো সেই স্বাদ, ছোট্ট বোনটার সাথে খুঁনসুটিতে মেতে ওঠার স্বাদ, প্রতিদিন অন্তত পান্তা খাওয়ার নিশ্চয়তা আর একটা ছোট্ট চালাঘেরা আশ্রয়। যে আশ্রয়ে থেকে কি না ওই দূর আকাশের সবগুলো উজ্জল তারা একসাথে দেখতে পাওয়া না গেলেও নিজের মনকে বলা যায়, আমারো একটা ঘর আছে। আমারো ঘরে ফেরার তাড়া আছে।
হ্যাঁ, শহরের বুকে পা রাখার পর থেকেই রবিনের জীবনটায় কেমন যেন এক ছন্নছাড়া ভাব চলে এল। মামা তাকে ইট ভাঙার কাজে রেখে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে চলে গেলেন। তারপর আর একটিবারও সে রবিনের খোঁজ নিতে আসেন নি। রবিন কোথায় থাকবে, কি খাবে- এসব বলে দেওয়ার মতো কোনো দায়িত্ববোধও তার ছিল না। থাকলে নিশ্চয়ই সে তা বলে দিত!

রবিন এসব কথা ভেবে ভেবে নিজেকে প্রচন্ড কষ্ট দেয়। মামা কেন এমন স্বার্থপরের মতো কাজ করলেন ? অন্তত ছোট্ট একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা তো তিনি করে যেতেই পারতেন!
জগতের এতবেশি মারপ্যাঁচ রবিনের ছোট্ট মাথায় ঢুকে না। তাই সে বুঝতে পারে না মামার এই কাজের অর্থ। থেকে থেকে তার কেবল মায়ের কথা মনে পড়ে। ‘মা…….মা……’। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু হয় না। সে কাঁদতে পারে না। দু’চোখের কোণে জলগুলো এসে থমকে দাঁড়ায়।
এমন সময় রাতের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে ডেকে ওঠে কিছু কুকুর। ঘেউ…ঘেউ…ঘেউঘেউঘেউ….ঘেউ… দৌড়ে দৌড়ে বহুদূর চলে যায় তারা। তাদের আর দেখতে পাওয়া যায় না। রবিনের ভয় লাগে। সে উঠে বসে। এই ভাবনা সেই ভাবনা… ভাবতে ভাবতে কখন যে মাঝ রাত শেষ রাতের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে! তা সে একেবারেই বুঝে উঠতে পারে নি। বুঝতে পারার কথা মনেই আসে নি তার। কিছুটা দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর কানে এসে পৌঁছলে তার জ্ঞান হয়। ভালোভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে, সত্যি প্রায় ভোর হয়ে এল!

আবার নতুন সকাল, নতুন দিন। আর শুরু সেই এক যন্ত্রণার। যে হাতে একদিন সে শুধু বই, খাতা আর কলম ধরার স্বপ্ন দেখেছিল, সে হাতেই তাকে হাতুড়ির এলোপাথারি বাড়ি দিয়ে ইট ভাঙতে হচ্ছে। সে তার কোমল হাতখানা মুখের সামনে এনে হাই দেয়। তার এই ইটপাথরের শহরের ইটপাথরের জীবনে একদিন না একদিন কোমল হাত দু’টো ঠিক শক্ত হয়ে যাবে। সেদিন আর হয়তো আজকের মতো করে মায়ের জন্য কান্নাও পাবে না। আর সেদিন হয়তো সেও বুঝতে পেরে যাবে এই কঠিন, নিষ্ঠুর জগতে কালাম মামাদের চাহিদা। কে বলতে পারে, এই নির্মম জগতের চাহিদায় হয়তো তাকেও নাম লেখাতে হবে কালাম মামাদের দলে!!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement