রঙিন সুতোয় জীবন

পার্থিব (জুন ২০১৭)

মৌরি হক দোলা
“ভ্রমর কঈও গিয়া, শ্রী কৃষ্ণ বিন....”
করিমন বিবি ঘরের দাওয়ায় বসে কাঁথা সেলাঈ করছেন আর একমনে গান গাঈছে।কিছুক্ষন আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।আকাশটা এখনও থ মেরে আছে।বর্ষার দিন।যখন তখন বৃষ্টি হয়।এঈ বর্ষায় গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতেঈ পানি উঠে গেছে। করিমনদের বাড়ি একটু উঁচুতে।তাঈ এখন্ও বর্ষার পানি তাদের ছুঁতে পারে নি। উঠোনে কাদা লেপ্টে আছে।

করিমন দাওয়ায় বসে দেখতে পেল, আবুল অতি সাবধানে কর্দমাক্ত মাটিতে পা ফেলে হাঁটছে।হ্যাঁ, এ দিকেঈ তো আসছে। করিমনের বুকটা ছাৎ করে উঠল।আবুল খানিকটা কাছে আসতেঈ সে কাপড়টা কাঁধের উপর টেনে নিল।

আবুল দাওয়ায় বসতে বসতে বলল,
-খালা, আছো ক্যামন ?
-এঈ তো, বাবা।ভালাঈ আছি।তর বাপজানের শরীল ভালা ?কাঈল না কি বুকের জ্বালাডা বাড়ছিলো ?
-হ।তয় এহন আব্বায় ভালাঈ আছে।আব্বা বুড়া মানুষ, আঈজ আছে কাঈল নাঈ । আপনজন ভাঈব্যা একটু দ্যাখতে ট্যাখতে যাঈও।

করিমন কাঁথায় একটা ফোঁড় টেনে বলল,
-আঈজ সন্ধ্যায় একবার যামু ভাবতাছি।
-বশির কঈ খালা ?

বশিরের কথা জিজ্ঞেস করতেঈ করিমনের মনের মধ্যে একটা মোচড় দিল।সে এতক্ষন এ ভয়টাঈ পাচ্ছিল। আবুল ছেলেটা সুবিধার না। কিছুদিন যাবত তার সাথে বশিরের খুব ভাব হয়েছে। তার সাথে মেশার পর থেকেঈ ছেলেটা কেমন পাল্টে যেতে শুরু করেছে।
রাত করে ঘরে ফেরে, কোনো কোনো রাতে ফেরেঈ না। করিমনের সাথেও যেন কেমন আচরন করে। মাঝে মাঝে করিমন ভাবে ‘পোলাডা আবার কোনো খারাপ পথে গেল না তো?’ সে বশিরকে অনেকবার্ঈ আবুলের সাথে চলাফেরা করতে মানা করেছে।বশির তার মুখের উপর জবাব দিয়ে দিয়েছে, ‘আমার ব্যাপার আমি বুঝমু কার সাথে মিশমু না মিশমু।’ করিমন তাঈ কেবল সৃষ্টি কর্তার কাছেঈ চোখের পানি ফেলেছে। আজ অনেক দিন পর আবুলকে দেখে তার ছেলেটাকে হারাবার ভয়ে মনের মধ্যে অস্বস্তি হতে লাগল।

-ক্যান বাবা ?
-অ্যামনেঈ। ওর সাথে অনেক দিন ধঈরা দেখা হয় না তো।
-ও তো বাজারে গ্যাছে।
-আচ্ছা, খালা। ও আঈলে একটু আমার লগে দেহা করতে কঈও।

করিমন খুব ভালো করেঈ জানে আবুল এতদিন কঈ ছিল। তবু্ও সে তার মুখ থেকে শোনার জন্য জিজ্ঞেস করল,
-এতদিন যে তরে দ্যাখলাম না?
-শহরে গেছিলাম, খালা।ভালা একটা কামের খোঁজ পাঈছিলাম তো। এহন যাঈ , আমার একটা কাম আছে।

করিমনের মনে আবার ভয় দেখা দিল, যদি বশির্ও কিছুদিন পর এমন জেল থেকে ফিরে এসে সবাঈকে বলে বেড়ায়, ‘শহরে গেছিলাম।ভালা একটা কামের খোঁজ পাঈছিলাম
তো !’


০০০

‘মা,মা।’
করিমন ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।বশির বাজার থেকে ফিরেছে।করিমন দেখতে পেল বশিরের হাতে পোলাওর চাল।
-মা, পোলার চাউল আনছি।গাছে দ্যাখলাম বেগুন হঈছে।একটু বেগুন ভাজ আর মরিচ ভর্তা কর। পোলাওর লগে অনেক দিন ধঈরা খাঈ না।
-আচ্ছা, তুঈ নাঈয়া আয়, আমি রান্ধন বসাঈ।


চারদিকে ঘন অন্ধকার।বাঁশের ঝোঁপ থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। দাওয়ায় একটি তেলের কুপি দপদপ করে জ্বলছে। করিমন ছেলেকে খেতে দিচ্ছে।
-আঈজ আবুল আঈছিল। তরে দেহা করতে কঈছে।
-আঈচ্ছা, করমুনে।
-এতদিন পর জেল খাঈটা আঈয়া আবার বড় গলায় কয়, ‘শহরে গেছিলাম।’ বেশরঈম্যা জানি কোন জায়গার।
-মা ! এঈ খাওয়ার সুম তোমার বকবকানি থামাবা।
-বকবকানি, না ? এহন্ও সময় আছে, বশির, ভালা হ্ঈয়া যা কঈতাছি।ওর লগ ছাড়ান দে।
-এঈ দুঈন্যায় ভালা হঈয়্যা কোনো লাভ নাঈ।

করিমন চমকে উঠল।নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলেন না।তার কন্ঠ ভিজে ভিজে হয়ে আসছে।এঈ ভিজে ভিজে কন্ঠের সাথে প্রকাশ পাচ্ছে ক্রোধ।

-কি কঈলি তু্ঈ ? তু্ঈ জানস তর বাপে তরে আমার কোলে রাঈখ্যা চঈল্যা গ্যাছে ? কঈ গ্যাছে তা আঈজও জানি না। এঈ কুড়ি বছরে একবারের লিগাও তর খবর নেয় নাঈ। আমার লগে দেহা করে নাঈ।লোকটা বাঈচ্যা আছে না......

করিমন আর বলতে পারল না। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।

-শোনো, মা। আমি খুব ভালা কঈরাঈ জানি আব্বায় আমাগো রাঈখ্যা চঈল্যা গ্যাছে।কোনোদিন কোনো খোঁজ খবর নেয় নাঈ। যাওনের সুম জমি-জমা সব বেঈচ্যা খালি এঈ বাড়িডা রাঈখ্যা গ্যাছে।খ্যাতে না আছে কোনো চাষের জমি, না আছে বাড়িতে কোনো গরু-ছাগল। তুমি কাঁতা সেলাঈয়া যেঈ টেহা পাও, আর আমি খ্যাতে বদলা খাঈট্যা যা পাঈ তাতে আর সংসার চালান লাগব না।কয়দিন পর বাড়ি বেঈচ্যা রাস্তায় গিয়া বসন লাগব, ভিক্ষা করন লাগব।

-শোন, খারাপ পতে না যাঈয়া ভিক্ষা কঈরা বাঈচ্যা থাকাডাও অনেক বেশি ভালা, অনেক বেশি শান্তির।

বলেঈ করিমন ঘরের ভিতর চলে গেল।বশির এমনভাবে খাওয়া শুরু করল যেন একটু আগে তাদের ঘরে কিছু্ঈ হয় নি, তার মায়ের সাথেও কোনো কথা হয় নি।ওদিকে করিমনের চোখে পানি দেখে আকাশও কাঁদতে লাগল।

বশির আস্তে করে বলল, ‘ম্যাঘ আওনের আর সময় পাঈল না।’


০০০

আজ অনেকদিন পর সকালবেলা রোদ উঠেছে। দেখে মনেঈ হচ্ছে না যে কাল রাতে গ্রামে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন এঈ রোদেঈ গ্রামের সমস্ত বর্ষার পানি শুকিয়ে যাবে।


-ভাঈজান, ঘরে না কি ?
- হ, কেডা ? বশিরের মা না ?
-হ, ভাঈজান।
-আসো, ভিতরে আসো।


গত রাত থেকে আবুলের বাবার শরীর আরো খারাপ হয়েছে।করিমন ভেবেছিল কাল সন্ধ্যায় একবার এসে দেখা করে যাবে।কিন্তু সময় করে উঠতে পারে নি।তাঈ আজ সকালে কাজগুলো কোনোরকম গুছিয়ে রেখেঈ এ বাড়িতে চলে এসেছে।আবুলের বাবা শরীরের উপর কাঁথা চাপিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন।বিছানার নিচে থাকা মোড়াটা টেনে নিয়ে বসতে বসতে করিমন বলল,

-ভাঈজানের শরীলডা কি এহন একটু ভালা ?
-এঈ তো, আছি এক রকম। খোদা যেমন রাখছেন।এঈ হাঁঈটা দোকানে যাঈ তো, এ্ঈ আবার বিছনায়।তা তোমার খবর কী ? তোমার শরীল ভালা ?

করিমন ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
-হ, ভালাঈ। শরীল ভালা থাকলেঈ কী আর সব ভালা থাকে, ভাঈজান ?
-ক্যা, বশিরের মা ? কিছু হঈছে ?
-জানি না, ভাঈজান। আমার পোলাডা ক্যামন জানি পাল্টায় যাঈতাছে !

বলেঈ করিমন নিজেরঈ অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

-মানে?
-সময়মতো বাঈত্যে আহে না, রাঈত কঈরা আহে। আমার লগে ভালা কঈরা কোনো কতাও কয় না। কিছু কঈলেঈ চেঈত্যা উডে।
-বশিরের মা, ও কি তাঈলে আবুলের রাস্তা ধরছে ?

আবুলের বাবার কন্ঠে দীর্ঘদিনের একটা চাপা কষ্ট প্রকাশ পেল।কিছুক্ষন পর বশিরের মা বলল,
-আমার তো তাঈ মনে হয় ! এঈ কাল রাঈতেঈ তো ভাত খাঈয়া এঈ বাদলার মঈধ্যে কঈ জানি গ্যালো, এহনও বাড়ি আহে নাঈ।
-ওর কতা আর কি কমু কও ? তুমি তো জানোঈ, আমি কত আল্লাহ ভক্ত, বিছনায় থাকি তবু্ও তার নাম না নিয়া থাকি না।আশেপাশের দশ গ্রামের মানুষ কোনোদিন কঈতে পারবো না যে কোনোদিন কারও ক্ষতি করছি।যহন যতটুক পারছি পাশে যাঈয়া খারাঈছি।আল্লায় আমারে কোনো দিক দিয়ায় কোনো অভাব দেয় নাঈ। হেঈ আমার পোলাঈ যহন খারাপ পতে গেছে ! আর বশির তো বড়ঈ হঈছে কষ্টের মঈধ্যে দিয়া।

করিমনের মুখে কষ্টের হাসি,
-ও কি কয় জানেন ? ও কয়, এঈ দুঈন্যায় ভালা হঈয়া না কি কোনো লাভ নাঈ!
-হায়রে মানুষ ! এঈডা বুঝে না যেন এঈ দুঈন্যাডা কিছুঈ না। এঈ দুঈন্যার কোনো সুখঈ
আসল না। আল্লায় যে আমাগো পরীক্ষা নেন এঈহানে !

হঠাৎ বাঈরে আবুলের বউয়ের চিৎকার শোনা গেল।করিমন দৌড়ে বাঈরে ছুটে আসতেঈ দেখতে পেল সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।পাশে দাড়িয়ে ও বাড়ির কামাল কাঁদছে।
-কী হঈছে, বউ ? কী হঈছে ? কতা কও না ক্যা ?

কামাল কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিল, ‘কাকী, কাঈল রাঈতে ও পাড়ায় যারা জুয়া খেলতে যায় হেগো মঈধ্যে মারামারি লাগছিল।হেঈহানে আমাগো আবুল ভাঈ আর....’

-আর ? আর কী, কামাল ? কতা কস না ক্যা ?
-আবুল ভাঈ আর বশিররে মাঈরা হালাঈছে।
-আল্লাগো !

করিমন চিৎকার করে উঠল। সে সহ্য করতে পারল না। তার চিৎকারে পুরো গ্রাম যেন নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। পাখির কলকাকলি বন্ধ হয়ে গেল। ধূ ধূ মাঠের কুকুরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটাও থেমে গেল।

আজ এতদিনের চেনা পরিচিত গ্রামটা এক অন্য রূপ ধারন করেছে।করিমন এখন এ পৃথিবীতে একা, বড় একা !


০০০

বশির চলে গেছে অনেক দিন। এক বর্ষা গিয়ে আরেক বর্ষা চলে এল।আবুলের বাবা মারা গেল মাস ছয় আগে। আবুল মারা যাবার পর তার বউ এতদিন এখানেঈ ছিল। কেবলমাত্র নিজের কথা ভেবে, নতুন সংসারের আশায় সে এঈ বৃদ্ধ মানুষটাকে একা ফেলে যেতে পারে নি। কিন্তু আবুলের বাবা মারা যাবার পর তার ভাঈ এসে তাকে নিয়ে গেছে। আবুলদের বাড়ি এখন এক জনশূন্য বিরান ভূমি ব্যতীত আর কিছুঈ নয়।

ওদিকে করিমন এখন একাঈ নিজের মত করে আছে। বাড়ির বাঈরে বেশি বেরোয় না। আশেপাশের পাঁচ-সাত বাড়ির মেয়ে বউরাঈ তার কাছে আসে। এসে গল্প করে। কখনও বা কেউ করিমনের কাছ থেকে নতুন নঁকশা করা কাঁথা সেলাঈ করে নেয়।করিমন তার রঙিন সুতোয় ফুটিয়ে তোলে বিভিন্ন ধরনের নঁকশা। সেঈ নঁকশায় লুকোনো থাকে করিমনের কথা, করিমনের জীবনের কথা,করিমনের সুখ-দুঃখ আর এঈ সবকিছু কেড়ে নেওয়া সবর্গ্রাসী পৃথিবীটার কথা !!!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মোঃ কবির হোসেন golpoti pore bedonay hridoy chheye gelo. golpoti oshadharon.
নস্ট জীবন অনেক ভাল লাগলো
মোঃ মোখলেছুর রহমান UNION ALL SELECT NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL# থিম ভাল,ভাষায় আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।
আহা রুবন বিষয় ভাল তবে ফুটে ওঠেনি।
তারিফুল ইসলাম খুব সুন্দর।আমার পাতায় আমন্ত্রণ রইল
মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী মাঝে মাঝে অনেক গুলো কথা খুব রোমান্টিক ভাব হলো! আর থিমের ক্ষেত্রেই পুরোই কড়াকড়ি। তবে, একটা কিছু জানার দরকার ছিল- সব জায়গাতে "ই" এর ক্ষেত্রে "ঈ" ব্যবহার করলেন কেনো? এটা কোনো নিয়ম আছে; অজানাকে জানতে চাই, জানাতে ভুলবেন না কিন্তু...... অনেক অনেক শুভকামনা,ভোট ও আমার পাতায় আমন্ত্রণ রইলো।
রুহুল আমীন রাজু সুন্দর থিমের গল্প ... ভাল লাগলো । তবে বানানে কিছু সমস্যা ছিল ... সামনে আশা করি তা শুধরে নেবেন । ধন্যবাদ । (আমার পাতায় আমন্ত্রণ রইলো )

২৮ এপ্রিল - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ১৪ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বৃষ্টি বাদল”
কবিতার বিষয় "বৃষ্টি বাদল”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৩