লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ জানুয়ারী ১৯৯৫

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (মে ২০১৭)

মায়ের ভালোবাসা
মা

সংখ্যা

ওয়াহিদ আমিম

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৯৬
আজকের সকালটাও কাল রতের মতো কেমন যেন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঐ তো একটু আগে আব্বু ফজরের জন্য ডাকলেন। অন্ধকার থাকতেই অযু করে মসজিদে নামায পড়তে গেলাম। নামায পড়ে এলাম এই অল্প কিছুক্ষণ আগে। কিন্তু আমার কাছে অল্প মনে হলেও আসলে অল্প সময় যায়নি। তিন তিনটা ঘন্টা পার হয়ে গেছে। এখন বাজে সকাল আটটা। অথচ ফজর পড়া হয়েছে সেই ভোর পাঁচটায়। তিনঘন্টা মানে একশত আশি মিনিট, এই একশত আশি মিনিট সময় খুবই দ্রুত চলে গেল বলে মনে হচ্ছে কেন? নাকি আজ চলে যেতে হবে বলে এমন মনে হচ্ছে। নিজের ব্যাগ গুছাতে গুছাতে এসব ভাবছিলো তামিম।
ছোট্ট ছেলে তামিম। পরিবারের সবার ছোট বলে সবাই তাকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি দুরন্ত সে। মেধাবীও কম না। সে আগে বাড়ির কাছের একটা মাদরাসায় পড়তো। বছর খানেক আগে তাকে মধুপুরে মফস্বলের একটা মাদরাসায় ভার্তি করা হয়েছে। প্রথম যখন সেখানে পড়ার কথা তার কাছে পাড়া হয়, তখন সে বেশ আনন্দিত ও প্রফুল্লিত হয়েছিল বলেই মনে হয়। কিন্তু যেদিন তাকে ভর্তি করানোর জন্য আব্বু ও বড় ভাইয়া তাকে মধুপুরে নিয়ে আসে, সেদিন বাড়ি ছেড়ে নয় বরং আম্মুকে ছেড়ে যখন বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে তখন তার মনটা বিষন্ন হওয়া শুরু হয়। সেদিন মাকে ছেড়ে আসার সময় বহুকষ্টে চোখের জল কোনোমতে সে সংবরণ করতে পেরেছিল। আর আম্মুর চোখ থেকে নিজের অজান্তেই দু’ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাকে মাদরাসায় ভর্তি করে যখন মাদরাসায় রেখে আসার মুহুর্ত আসে, আব্বু ও বড় ভাইয়া তাকে অজানা একটা যায়গায়, অচেনা একটা পরিবেশে এবং অচেনা মানুষদের মাঝে রেখে যায়, তখন সেই বিদায়ের মুহুর্তে তার ছোট্ট মনটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল এবং চোখ থেকে তপ্ত অশ্রু বের হয়ে তার দুই কপোল ভিজিয়ে তা মাটিতে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। তামিম মাঝেমাঝে ভাবে, তার কাঁন্না দেখে সেদিন কি তার আব্বু ও বড় ভাইয়ার মন একটুও কাঁদেনি?
পরিবারের সবার সকালের খাওয়া শেষ। শুধু তামিম ও তার আম্মুর খাওয়া কেবল বাকী। তামিম একেবারে খায়নি বললে ভুল হবে। সে একবার খেয়েছে কিন্তু মাদরাসায় যাওয়ার আগে আরেকবার খাবে। আর আম্মু এখনো খাওয়ার সুযোগ পায়নি। তামিম চলে যাবে বলে কিছু পিঠা বানাচ্ছে। এই পিঠাগুলো স্পেশালী তামিমের জন্যই। এগুলো তার পছন্দের পিঠা। মাদরাসায় নিয়ে সে এগুলো খাবে। এছাড়াও তামিমকে দিয়ে দেওয়ার জন্য ডিম রান্না করা হয়েছে। একটি মুরগী জবাই করে চুলোয় বসানো হয়েছে ভুনা করার জন্য। আর এখানে খাওয়ার জন্য একটা ডিমের অমলেট করা হয়েছে এবং মাছ ভাজি করা হয়েছে। এ দু’টোয় তামিমের প্রিয় খাবার।
ওদিকে ব্যাগ গুছানোর শুরুর দিকে তামিমের মনটা বেশ ফুরফুরে থাকলেও গুছানো শেষ হয়ে এলে তার মনটা বিষন্ন হয়ে আসে। একটু পরেই সব প্রিয়জন আর প্রিয় মানুষদেরকে ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে। সে জানে না আরেকবার এসে বাড়ির সবাইকে দেখতে পাবে কিনা? গতবার তো বাড়ির সবাইকে ভালোই দেখে গিয়েছিল। কিন্তু এসে শুনে পাশের বাড়ির দাদা আর নেই। তিনি আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। খবরটা শুনে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। একটু কেঁদেছিল কিনা তা এখন আর মনে নেই। নিজের দাদাকে তো সে দেখতেই পারেনি। তার জন্মের আগেই তিনি আল্লাহর কাছে চলে যান। দাদার নাকি খুব আশা ছিল ছেলের ঘরের একটা নাতি দেখে যাওয়ার। কিন্তু তাঁর সে ভাগ্য আর হয়নি। অথচ আজ তাঁর অনেক নাতী-নাতনী। হয়তো দাদা বেঁচে থাকলে এতো নাতি নাতনী পেয়ে অনেক খুশি হতেন। নিজের দাদা নেই বলে পাশের বাড়ির দাদার প্রতি তার খুব মায়া ছিল। মাঝেমাঝে পাশের বাড়ির দাদাকেই সে নিজের দাদা বলে ভাবতো। তাই হয়তো সেই দাদার মৃত্যুতে তামিমের খুব খারাপ লেগেছিল।

তামিম! খেতে আয়।
রান্না ঘর থেকে আম্মুর ডাক ভেসে আসে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দশটা বেজে গেছে তা সে টেরই পায়নি। ভাবনার মাঝে সে এতই তন্ময় হয়ে পড়েছিল যে, আম্মু কখন রুমে এসেছে তা সে টেরই পায়নি। আম্মুর ডাকে সম্বিত পেয়ে সে রান্না ঘরে আসে খাওয়ার জন্য। ডিম ভাজি দিয়ে আম্মু ভাত বেড়ে দেন। তামিম খেতে শুরু করলে আম্মু লক্ষ্য করেন, প্রতিবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো আজকেও তার মন খারাপ। চেহারায় কেমন কেমন জানি কান্না কান্না ভাব। তামিমের জন্য আম্মুর মনটা কেঁদে উঠে। আম্মু নিজের কান্নাটা লুকিয়ে মাছ ভাজি ও মুরগির গোস্ত তামিমের পাতে তুলে দেন। দুই নলা খেয়েই তামিম বলে উঠে, আম্মু! আর খাবো না, খেতে ভালো লাগতেছে না। তখন আম্মু প্লেটটা নিয়ে নিজ হাতে ভাত মাখিয়ে তামিমের মুখে তুলে দেন। আর সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেতে থাকে। খেতে খেতে তার মনে হয়, মাদরাসায় গেলেই তো আর কেউ এতো আদর করে তাকে খাইয়ে দিবে না। খেতে ইচ্ছা না করলেও জোর করে ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে মুখে ভাত তুলে দিবে না। এসব ভাবনা তার ছোট্ট হৃদয়টাকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলে। তার হৃদয়ের কষ্টেরা যেন চেহারা দিয়ে বের হয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টায় মেতে উঠে। আম্মুর গলা ধরে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করে। একসময় নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে অনুচ্চ স্বরে সে কেঁদে উঠে। তার চোখে জমে থাকা অশ্রু কণারা ফোটায় পরিণত হয়ে গাল বেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে শুকিয়ে যায়।
আম্মু জানেন তামিম মাদরাসায় গিয়ে ভালো করে খেতে পারে না। অনেক সময় পেটে ক্ষুধা থাকলেও খায় না। না খেয়েও কষ্ট সহ্য করে থাকে। সেই কষ্টের কথাগুলো বাড়ি এসে সে অনায়েসে ভুলে যায়। কিন্তু যেদিন আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যায় সেদিন ভুলে থাকার শত চেষ্টা করেও ভুলতে পারে না। এসব কষ্টই তাকে বারবার কাঁদায়। বিশেষ করে মাদরাসায় যাওয়ার দিন বেশি করে কাঁদায়। আর সন্তানের কষ্ট পৃথিবীর বুকে কেউ বুঝতে না পারলেও মা ঠিকই বুঝতে পারেন। হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করেন। তাই তো সন্তানের কষ্টে মারাও আৎকে উঠেন। মাদের হৃদয় থেকে রক্ত ক্ষরণ হয়। তামিমের মতো কিংবা আরো বেশি করে মারও কাঁদতে ইচ্ছা করে। এক সময় মা অনুচ্চ স্বরে কেঁদে উঠে তামিমকে নানা কথা বলে সান্ত¦না দেন। ছেলের কান্না দেখে মা নিজেকে আর সংবরণ করতে পারেন না। তার চোখ থেকেও তামিমের মতো লবণাক্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গন্ডদেশ তা মাটিতে পড়ে একাকার হয়ে যায়। ভেজা মাটি দেখে চেনা যায় না কোনটা মা’র অশ্রু আর কোনটা তামিমের অশ্রু।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement