পাহাড়ী নদী কতটা খরোস্রোতা, কতটা হিম তা সরেজমিনে গিয়ে না দেখলে বা স্পর্শ না করলে বোঝানো কঠিন। ডিসেম্বরে যখন নদীর মাতামাতি থাকেনা, পানি এতটাই স্বচ্ছ যে, পানির দশ হাত নীচের একটি আধুলি চিনতেও ভুল হয়না; তেমনি অনুমানে পরিমাপ করাও সম্ভব হয়না যে, গভীরতা কতখানি।

অনাদি কাল থেকে নদী মানুষের আত্মার সাথে মিশে আছে। কবিগণ নদীকে নারীরূপে চিত্রকল্প এঁকেছেন। হয়তো নারীর মোহ নদীতেও আছে তাই নদী নারী হয়ে উঠেছে।

নারীর গন্ধে নাকি হাঙর আসে, খেতে নাকি মোহে সে এক জটিল অধ্যায়; তবে হাঙরও শান্ত হয় এটা অবিদিত নয়।

উপকূলীয় ম্যাপের মত নদীর বুক চিরে বড় বড় পাথরগুলো কোথাও উঁকিমারছে। কোথাওবা পাথরে হাল্কা বাঁধা পেয়ে কুলুকুলু ধ্বনি তুলছে পানি। কোন পাথর হালকা পীত বা গাঢ় পীত কালারে আচ্ছাদিত।পাথরের যে অংশে রোদ কিরীট পরায় ও অংশটুকু ডুরান্ড লাইনের মত আঁকাবাঁকা দাগ ও অমসৃন।

এমনি একটি পাথরের উপর সিজান প্রতিদিন এসে বসে। কোনদিন সকাল বেলা কোনদিন বিকেল বেলা। হটাৎ করে কোনদিন ভরদুপুরেও আসে; সেদিন আয়েশ করে পানিতে সাঁতার কাটে।

সিজান যে দিকটায় প্রতিদিন একবার করে এসে পাথরটির উপর বসে, সেদিকটায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। পাড় ঘেষে কিছু দূরে একটি বাজার রয়েছে তবে লোক সমাগম খুবই নগন্য। বাইরের দর্শনার্থীরাও এখানে আসে পাহড়ী নদীর রূপ দেখবে বলে। সেও অনেক কম নদীাট সীমান্তে বলে।

নদীর উত্তর পাড়টা দক্ষিণের মত ঢালু নয়;বেশ খাড়া। পাথরময় পাড় বেয়ে উপরে উঠা আদৌ সম্ভব নয়। দেড় থেকে দু’শ ফিটের মত হবেখাড়া পাড়। পাড়টি অন্য একটি দেশের সীমানা বরাবর এবং বেশ ক’টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠির বাস। আশ্চর্যরকম সভ্যতার ছোঁয়া এখানে। দূর থেকে গাছের ফাঁক দিয়ে নানা রঙের দ্বি-তল ত্রি-তল ভবনগুলো উঁকি দিয়ে আছে তা মনকে বিমোহিত করে। ইউথক্যালিপটাস, শাল সেগুনের অত্যুচ্চ উপরে লতানো গাছে হাজার রকম ফুল আর বুনো গন্ধ তাতে ভ্রমর আর ছোট ছোট পাখির কলতান; যেন ভূস্বর্গ। গ্রামটির নাম লিথিয়ান। এব্র এই গ্রামেরই মেয়ে, বাবা থমাস।

আধুনিক সময়ে পৃথিবীর নানা দেশের পাহাড়ী অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির গ্রামে সভ্যতার আলো না ফুটলেও এই লিথিয়ান গ্রামে ইলিক্ট্রিসিটির ছোঁয়ায় আধুনিক সভ্যতার পরিচয় পেয়েছে। আর এর রূপকার এব্র। এখানে মেয়েদের শিক্ষার জন্য গড়ে উঠেছে স্কুল এব্র সেটা নিজে তদারকি করে।

এব্রর মা নেই। এব্র শুনেছে তার জন্মদানের সময় তার মা মারা গিয়েছে। এব্রর বাবা মা নিঃসন্তান ছিলেন । এফআইভি পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের জন্য সপরিবাওে এসেছিল থমাস। এই প্রজেক্টের কর্ণধার ছিলেন ডঃ সেম্বু এবং তিনি এই দম্পতির উপর প্রয়োগ করেসফল হন। এব্রর সাথে তার এক ভাইও জন্মেছিল, ডঃ সেম্বুর কারসাজিতে এব্রকেই শুধু বোঝিয়েছে থমাসের কাছে। অস্ত্রপ্রচারের জটিলতায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এব্রর মা মারা যায়। এব্রর ভ্রুন পরিচয় ছিল বি-০০৫২।

এব্রর বাবা থমাস বহু বছর পর গ্রামে ফিরেন। ততদিনে এব্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছে। গ্রামে এসে গ্রামের উন্নয়নের কাজে লেগে যায় এবং দু’বছরের মধ্যে গ্রামের চেহারা পাল্টে দেয়।

ডঃ সেম্বুর ঘরেও ঘটে এক বিপর্যয়। ডঃ সেম্বু সিজানকে নিজের মত করে গড়ে তুলেছিলেন। গবেষণাগারের পুরনো ফাইলপত্রে সিজান একটি নথির সাথে নিজের যাবতীয় ফিজিক্যাল আর্টিক্যালের মিল খুঁজে পায়। বিষয়টি বাবার সাথে শেয়ার করলে বাবা ডঃ সেম্বু সব কিছু খুলে বলে সিজানকে। তখন থেকেই বাবা প্রতি অনিহা ভাব জন্মে সিজানের।

ডঃ সেম্বু সেদিনের পত্রিকার পাতায় চোখ মেলতেই হালকা শক খায়। পত্রিকার শিরনামে বড় বড় করে লেখা- “এক বিশ্বসুন্দরীকে মা দাবী করেছেন এক যুবক,ফেসবুকে ভাইরাল।” বিশ্বসুন্দরী কি করেছেন তার বিবরণ না থাকলেও যুবকের প্রয়োজনীয় নথি না থাকাতে হার মানে যুবক। ডঃ সেম্বুর মন হু হু করেউঠে যুবকের নাম সিজান দেখে। ছ’মাস হল সিজান তার বাবাকে ছেড়ে চলে গেছে।

সিজানের পাগলামী তখন চরম্ েযখন যেখানে কোন নারী দেখলে আবেগে কাছে আসে বৈরী আচরন করে ফেলে কিন্তু কেউ জানেনা তার মনের রহস্য।

-দুই-

আজ সকাল থেকে সিজান নদীর বুকে চরজাগা বড় পাথরটির উপর বসে আছে। বেলা যত বাড়ছে ততই আজ তার অসহায়ত্ব বাড়ছে। আজ নদীটিকেও বড় শুনশান ঠেকছে সিজানের কাছে। মাছরাঙা যাতীয় কোন পক্ষীটিও নেই । হয়তো নদীতে কোন মাছ নেই,তাই; নয়তো.....সে কারণ সে জানেনা।

এখন নদী শান্ত। আরশির মত চকচকে পানি বুকে নিয়ে ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে। খাড়– পানিতে পা ডুবিয়ে সিজান ভাবছে বর্তমান আর অতীত। কত ঝড়তুফানই না বয়ে যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে।

সিজান লক্ষ্য করছে দু’দিন থেকে পাড়ের উপর দ্বি-তল ছাতে একটি মেয়ে কাপড় শুকোতে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছে; মুখাবয়ব দূর থেকে তেমন বোঝা না গেলেও মেয়েটি যে সুশ্রী সিজানের তাতে কোন সন্দেহ নেই।সাদা ধবধবে বসনে যেন সাদা মেঘের ভেতর কুন্তলরাশি কালমেঘে ছেয়ে আছে।কেশবন্ধনীতে কি যেন একটা জ্বলছে তার বিচ্ছুরিত ক্ষীণ আলো এখানটা পর্যন্ত ঠিকরে আসছে। সিজান কতক্ষণ তাকিয়েছিল মনে নেই তবে সূর্য্য তখন পর্যন্ত আগুন বরাবর হয়ে উঠেছে।

সিজান আনেক কসরত করে ২০০ফিট ইউথক্যালিপটাস গাছটির মাথায় উঠে আসে শরীরের অনেক অংশে আঁচড়ে ছিড়ে যায়। এখান থেকে দ্বি-তল ভবনটি আরও ৫০ ফিট উচুতে। মেয়েটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটি লম্বা রশি ঝুলিয়ে দিলে সেটা বেয়ে উপরে ওঠে সিজান। উপরে এসে সিজানের অদ্ভুদ রকম ভাল লাগে; অসম্ভব রকম সুন্দর গ্রামটি; অদ্ভুদ ডিজাইনের সব বাড়িঘর। সব থেকে অদ্ভুদ সুন্দর মেয়েটি।

কথায় সিজান বুঝতে পারে মেয়েটি ভাল ইংরেজি জানে । তারপর দু’জনে বেশকিছু বিষয়ে কথাবার্তা বলে । বসার ঘরে রেখে মেয়েটি পানীয় বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।এই ফাঁকে বসার ঘরে দামী দামী লেখকের ইংরেজি বইগুলো তার নজরে পড়ে। পাশেই দামী পাথরে কারুকাজ করা ছবি, নীচে লেখা ‘সিনেথ এব’্র।

নবীনেরা সিজানকে স্বাগত জানালেও পৌঢ়দের মুখে চিন্তার ভাঁজ। তখন থেকেই পরিচয় হয় তরুণ মিথের সাথে। মিথ এব্রর ভাল বন্ধু। দু’জনে গ্রামে একটি স্কুল চালায়।

এ গ্রামের মানুষ যেমন সহজ সরল তেমনি তাদের রয়েছে কিছু অদ্ভুদ নিয়ম কানুন। এখানে ভালবাসাকে মেনে নেয়া হয়না। কোন ভালবাসা প্রকাশ পেলে তাদের চরম মূল্য দিতে হয়। মূল্যটা এরকম- যুগলদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একজন কে আঙুলের মাথা কেটে সে রক্তের ¯্রােত নদীর ¯্রােতের সাথে মেশাতে হয়। যতক্ষণ রক্ত চলে ততক্ষণ নানা বাদ্য বাজিয়ে আনন্দ করা হয়।

মিথ ভীষণ রকম ভালবাসতো এব্রকে কিন্তু মিথ কোনদিন সাহস করেনি তবে এব্র ভালবাসে সিজানকে মিথ সেটা জানতো। কঠোর নিয়মের কথা সিজান অবশ্য আগেই মিথের কাছে থেকে জানতে পেরেছে। তবে মেয়েদের সয়ম্বর অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল সে সমাজে।

সিজানও এব্রর প্রতি দুর্বল ছিল তবে কিসের টানে সিজান সেটা জানেনা। নারীত্ব নাকি ভাতৃত্ব,নাকি মাতৃত্ব। একটা মোহ সারাক্ষণ তাকে ঘীরে রাখে।

কাল এব্রর সয়ম্বর গ্রহণ অনুষ্ঠান। গ্রামের যুবকগণ আজ মহা আনন্দিত। সিজান ও মিথ এক অবাক কান্ড করে বসে। তারা পরস্পর ছদ্মবেশ ধারণ করে। সয়ম্বর সভায় সিজানকে মাল্য দেয় এব্র।

আজ মিথের বিচার। এব্র জানে কোনদিনই সে সিজানকে পাবেনা তাই সে নিজেই প্রায়শ্চিত্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরের দিনই প্রায়শ্চিত্তের দিন ধার্য করা হয়।নদীর পাড় আজ নানা বাদ্যে মুখরিত।নদীর মাঝখানে বড় পাথরটিতে এব্র নত মুখে বসে আছে,ডানে বায়ে মিথ ও সিজান। তাদেরকে বেঁধে রাখা হয়েছে। এব্র অচেতন। তাকে দু’জন যুবতি গোছের মেয়ে ধরে আছে; আর এব্রর ডান হাতের পাঁচটি কাঁটা আঙুল রক্ত ঝরে পানিতে পাঁচটি ধারা তৈরী করে ¯্রােতে প্রবাহিত হচ্ছে। যেন পঞ্চনদের পাঁচটি ধারা এক শৈল হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে অজানায় ভেসে চলেছে কোন এক মায়ার রাজ্যে।