লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১৩টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১৪০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকষ্ট (জুন ২০১১)

ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন
কষ্ট

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪০

ফাতেমা প্রমি

comment ১১৩  favorite ৯  import_contacts ১,৬৮৩
১।।
আমি অনেক ভেবেছি,আমার কাজটা মোটেও ভুল হয়নি। আমি ঠিক কাজটাই করেছিলাম। অনেকেই অনেক কথা বলেছে,ভেবেছে। অন্তত ছোট্ট ছেলেটার কথা নাকি আমার ভাবা উচিত ছিল। আমি নাকি স্বার্থপরের মত কাজ করেছি। এভাবে ৪ বছরের সংসার আর আড়াই বছরের ছোট্ট বাচ্চাকে ছেড়ে যাওয়াটা নাকি ঠিক ছিল না। মানুষ নিজে কোন খারাপ পরিস্থিতিতে না পরলে বোঝে না। কিছু কিছু পরিস্থিতি এমনো হয় যে আপাতদৃষ্টিতে অন্যায় মনে হওয়া অনেক কিছুই তাৎক্ষণিক ভাবে অনেক বেশী ন্যায় হয়ে যায়। আর আমি ত ইচ্ছে করে এতদিনের সাজান সংসার ছেড়ে যাইনি-বরং আকড়ে ধরেছিলাম পরম মমতায়, অনেক শক্ত বাঁধনে। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না, আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল সংসার ছেড়ে যেতে;আমাকে পরাজিত করা হয়েছিল নির্মমভাবে। তাই না চাইলেও টেনে হিঁচড়ে আমাকে স্বামী সন্তান ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

স্বামী বলে যাকে সম্বোধন করছি আজ আর বলতে বাধা নেই সে অমানুষ। সব ছেড়েই ত এসেছি এখানে - কিন্তু তারপরও চিন্তা হয় আমার বুকের মানিকটার জন্য। কত আদরেই না আমার বাবুকে এই পৃথিবীর আলোতে হাসিয়েছিলাম। সাজান বাগান গড়েছিলাম ঐ অমানুষ টাকে সঙ্গে নিয়ে।আমার সুখের পৃথিবীতে সাজানো বাগানটা তছনছ হয়ে গেল তাতে কষ্ট পাচ্ছি না,এখন বরং আমি ওই সংসারের চেয়ে অনেক অনেক সুখে আছি। কিন্তু আমার বাবুটা ভাল আছে ত?
রোজ রাতে তাকে এখন গল্প শুনিয়ে ঘুম পারাবার কেউ কি আছে ? ঝড় হলে বাবু ভয় পেত খুব। কিছুতেই ভয় কাটতো না ওর,আমার বুকের মধ্যে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকতো ঝড় না থামা পর্যন্ত। এখন ঝড় এলে আমার সোনা বাবুটাকে কে বুকে আগলে রাখে ?
যে অমানুষটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিলো সে বিশাল পয়সাওয়ালা, অনেক বড় শিল্পপতির একমাত্র পুত্র। তাই সেজ ফুফু যখন প্রস্তাবটা নিয়ে আসলেন কেউ আর না বলার সুযোগটাও পায়নি। না বলবেই বা কেন? আমারও পছন্দের কেউ ছিল না তাই আর দশটা সাধারণ বাঙালি মেয়ের মত আমিও রাজি হয়ে গেলাম। মিথ্যে বলব না,শুভদৃষ্টির বিনিময়ে আমি চমকে উঠেছিলাম,এমন সুপুরুষ কেউ আমার বর ভাবতেও আনন্দ হচ্ছিল। বান্ধবিরা অনেকেই অনেক সম্পর্কে জড়িয়েছে,দেখেছি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। ভেবেছি অমন উচ্ছল কোন যুবক আমার জন্য না; দশটা-পাঁচটা অফিস করা ভুঁড়িওয়ালা এক ছাপোষা মানুষের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। যার বৌয়ের চোখে চেয়ে কাব্য করার চেয়ে তরকারিতে লবন না হওয়ার বিষয় নিয়ে কথা বলার আগ্রহই থাকবে বেশী। আমার এই ধারণা একেবারে অমূলক ছিল তা বলব না,কারন দেখতে যে খুব সুন্দরি আমি তা না,বাবাও মধ্যবিত্ত একজন মানুষ। তাই যৌতুক-সৌন্দর্য সব দিক বিবেচনায় পাত্রি হিসেবে আমার খুব একটা গুরুত্ব ছিলনা,সেটা বেশ বুঝতে পারতাম।
আমার চেয়ে সুন্দরি হওয়া সত্তেও বড় আপার বিয়ে হল বয়সে প্রায় দ্বিগুণ একজনের সঙ্গে। যার বাংলাবাজারে একটা প্রেস আছে। দুলাভাই যখন বাসায় আসতেন বেশিরভাগ সময় বড় কোন মাছ নিয়ে হাজির হতেন। বড় মাছ তার খুবই প্রিয়।এসেই লুঙ্গি একটা পড়ে বিশ্রী ভঙ্গিতে আসন গেড়ে বসে পরেন রান্নাঘরে। কাটাকুটি থেকে আরম্ভ করে পুরো রান্নার শেষ পর্যন্ত তিনি রান্না ঘরে আসন গেড়ে বসে থাকবেন,ক্রেন দিয়েও তাকে টেনে তোলা ছিল অসম্ভব।বুঝতেই পারছেন কেন নিজের বর সম্পর্কে আমার এমন ধারণা ছিল।
একারণেই আমি তাকে দেখেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। শুধু যে তাকে দেখে অবাক হয়েছিলাম তাও না। তার প্রতিটি কাজ,প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মুগ্ধ হবার মত। বাসর নিয়ে বিবাহিত অবিবাহিত সবারই মোটামুটি গড়পড়তা একটা বাজে চিন্তা ভাবনা থাকে। শুনে শুনে আমারও একটা ধারণা জন্মেছিল। বিশেষ করে পাশের বাসার ভাবি জাতীয় মানুষগুলো গত কদিনে আমাকে রীতিমত একজন বিশেশজ্ঞ বানিয়ে ছেড়েছিল। যদিও তার চোখে চোখ পরতেই আমার বুকে অনেক সাহস পেয়েছিলাম,তাকে মোটেও ভয়াবহ মনে হচ্ছিল না।
একা একা বসে ছিলাম আমি-কিছু ফল,পানি আর অ্যাসপিরিন নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল সে,যেন অনেক দিনের পরিচিত এরকম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবার তুলে দিতে দিতে বললঃ
“সারাদিন নিশ্চয়ই কিছুই খাওনি,মাথাও ব্যাথা করছে তাইনা?”
আমিও বোকার মত মাথা নেড়ে গপগপ করে গিলতে লাগলাম,ভদ্রতা করে তাকে নিতে বলব,সেটাও ভুলে গেলাম। আসলে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কেমন মায়াময় চোখেই না ও তাকাচ্ছিল। খাওয়া শেষ হতেই সে আমাকে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বললে আমি যারপরনাই বিস্মিত হলাম,খুশিও হলাম।
২।।
কেউ একজন চুলে হাত বুলিয়ে আমাকে ডাকছিল,চমকে উঠে পড়লাম;প্রথমে বুঝতেই সমস্যা হচ্ছিল আমি কোথায়।ধিরে ধিরে আমার দিকে ঝুঁকে পড়া মুখটা দেখেই মনে পড়ল এটা হচ্ছে নাফিস চৌধুরীর বেডরুম এবং আজই আমাদের বিয়ে হয়েছে। চারপাশ দেখে মনে হচ্ছিল রাত তখন প্রায় তিনটা বা চারটা বাজে। তাহলে কি পাশের বাসার ভাবিদের কথাই ঠিক? শুরুতে ভাল মানুষের ভাব নিয়ে অবশেষে গভীর রাতে আক্রমণ? ভয়ে জড়সড় হয়ে আড়চোখে তাকালাম ওর দিকে। দেখলাম মিতিমিটি হাসছে সে, হাসতে হাসতেই বললঃ
“ কুম্ভকর্ণের নাম শুনেছি,আজ মহিলা কুম্ভকর্ণের সাথে পরিচিত হলাম।’’
আমি বোকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম,কথার পিঠে কথা বলতে পারিনা আমি। আমার হাত ধরল ও, বলল
“চলো তোমাকে একটা জিনিস দেখাই,চোখ বেঁধে যেতে হবে।”
সত্যিই আমাকে চোখ বন্ধ করেই যেতে হল,যখন চোখ খুললাম আমি অবাক হয়ে গেলাম। পুরো ছাদে এত সুন্দর লাইট ওয়র্ক,আমি শুধু বিদেশি ছবিতেই এমন দেখেছি। ছাদ জুড়ে ফুলের অক্ষরে আল্পনা করে লেখা “শিমু তোমাকে ভালবাসি”। কেউ এই কথাটা আমাকে আগে কখনও বলেনি, আসলে আমিই বলবার সুযোগ দেইনি। জীবনে প্রথম প্রেমিক পুরুষের এই বাক্য তাই অনুভুতিতে ভিত গেড়ে বসল; আমিও তোমাকে ভালবাসি নাফিস,মনে মনে বললাম।
দেখলাম তার হাতে একটা গীটার। অবাক হয়ে গেলাম, “আপনি গান জানেন নাকি?”
হেসে জবাব দিল সে, “একটু একটু জানি।”
তারপর সে বাজাল,গাইল।হাত ধরে বসে রইলাম,গান শুনলাম। অপার্থিব কোন স্বপ্নদৃশ্য মনে হচ্ছিল আমার। এত প্রেমময় কোন বাসর আর কারো জীবনে এসেছে আমার জানা নেই। কত গল্প,কত কথা। চুপচাপ শান্ত আমি যে এত কথা বলতে পারি,সে রাতেই আবিষ্কার করলাম। যখন ভোরের আলো দুর দিগন্তে ফুটে উঠল আমাদের তন্ময়তায় বাধা পড়ল,যেন হঠাৎ জেগে উঠলাম।
বললাম, “চলুন,উঠি।”
ও হাসল, “খুব বিরক্ত করে ফেলেছি মনে হয়?”
আমি অপ্রস্তত হয়ে গেলাম, “মোটেও না,বরং___”,কথা খুঁজে পেলাম না কোন।
“বরং কি?”
আমি চুপ।
“আচ্ছা,বলতে হবে না।”,বলল ও,“কিন্তু এটা বল-আমাকে কেমন লাগল তোমার?”
আমি এবারও চুপ।
“ঠিক আছে,এটাও বলতে হবে না”, হাসল সে; “তাহলে আমিই বলি তোমাকে কেমন লাগল।”
তারপর সুনিল-বরুনা,বনলতা কত কবিতা,কত কথা,কত গান।এভাবে আরও কত শত অর্থহীন বাক্যালাপে অর্থপূর্ণ সময় কাটালাম দুজনে তা আর না বললেও বোধ করি বুঝতে পারছেন আপনারা। আমিও আত্মহারা হয়ে ভাবছিলাম এত সুখ আমার জন্য মজুদ ছিল তাই বা কে জানত? এত সৌভাগ্য নিয়ে কটা মেয়ে জন্মেছে?
৩।।
সবার মনেই প্রশ্ন জেগেছে কেন এই সুখ রেখে আমি নির্বোধের মত স্বামী-সন্তান ফেলে পালালাম। আসলে আমার সুখ কবে কখন কেন যে দুখের কাহন হয়ে গেছে আমি নিজেও কি তা জানতাম! আর এত দ্রুত সব ছেড়ে যেতে হয়েছে,আমি সুযোগও পাইনি কাউকে বোঝাতে। সবাই কতই না ভুল বুঝেছে আমাকে। বড় আপা হয়ত কেঁদে গাল ফুলিয়েছে। দুলাভাই হয়ত এখনো বড় মাছটা মুখে দিতে গিয়ে ভেজা কণ্ঠে বলে, ‘শিমুটা যদি থাকত তাহলে কতই না ভাল হত,গাধাটা কেন এত সুখ ফেলে এভাবে পালাল?’ বাবা হয়ত আমার প্রসঙ্গ উঠলে মিছে রাগের ভান করে, “ওর নাম আমার সামনে কেউ নিবা না,ও আমার মেয়ে না।” আম্মা হয়ত এখনো গুমরে গুমরে কাঁদে আমার জন্য। আচ্ছা আমার বাবুটা কত বড় হয়েছে? আমাকে কি সে খুব খারাপ ভাবে? আর সেই অমানুষটা কেমন আছে? নিশ্চয়ই সে অশান্তিতে ভুগছে-এত অন্যায় করে কেউ কি ভাল থাকতে পারে? যদিও আমার চাওয়া ও ভালোই থাকুক।
আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টিতে বাবুর জন্ম হল,সে রাতে নাফিস আমার পাশে ছিল না। ব্যবসার কাজে তখন সে অনেক ব্যস্ত। তার সময়ই মিলত না বাড়ি ফিরবার। আজ দুবাই, কাল ব্যাংকক তো আবার নিউইয়র্ক। তাই বলে তার ভুল হত না বাবুর খোঁজটা নিতে। নিয়মমতো ফোন করত সে। আমিও ওর ফোন পেলে জমানো সব রাগ নিমেষে ভুলে যেতাম,অভিমান ভুলে কত গল্প যে করতাম। ও খুব একটা আগ্রহ দেখাত না,আমিই জোর করতাম,ফোন ছাড়তে চাইতাম না। একটু একটু করে সম্পর্কের সুর কেটে যাচ্ছিল অথচ আমি বোকা বলে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে হত ব্যস্ত মানুষ,এইজন্য কথা বলার সুযোগ নেই ।
বাবুকে নিয়ে খেলা করে দিন কেটে যাচ্ছিল ভালই । নাফিস যখন ফিরত আমরা বাবুকে নিয়ে লেকে,মলে,পার্কে কত কত জায়গায় বেড়াতে যেতাম। বাবুও ছিল বাপ ন্যাওটা,বাবাকে পেলে তার আর কাউকে লাগে না। নাফিসও বাবুকে পেলে মমতায় বুকে জড়িয়ে নিত। এই যে সুখের আনাগোনায় ভরা আমার আঙিনা,কবে কখন যে হায়েনার নখর আঁচড়ে খামছে আমার সুখের সংসারকে চিরে ফেলতে শুরু করেছে আমি একটুকু টেরও পাইনি।
হঠাৎ একদিন নাফিস বাসায় ফিরল উৎকট গন্ধ আর জড়ানো কথা নিয়ে। আঁতকে উঠলাম,ব্যবসার কাজে বিভিন্ন পার্টি তে ওয়াইন তাকে নিতেই হত জানতাম,তাই বলে পাঁড় মাতাল হয়ে গলা পর্যন্ত গিলে বাসায় ফিরবে এ ছিল চিন্তার বাইরে। এমন ছেলে সে না। এরপর প্রতিদিন দেখতাম তার এইসব অদ্ভুত কাণ্ড। কিছু বলতে পারতাম না,কারণ বলতে নিলেই রেগে যেত সে।
এই ঘটনার পর তার বাসায় ফেরা না ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতাম। সারাক্ষণ মনটা উচাটন থাকত ওর কোন সমস্যা হচ্ছে না তো? একা ড্রাইভ করে,কখনও কোন বিপদ না হয়! ধরেই নিলাম হয়ত ব্যবসায়ীক কোন জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে। জটিলটা কিছু ছিল,ব্যবসা ভালো যাচ্ছিলো না ওর। কিন্তু সেই জটিলতাটা যে তর তর করে বেয়ে মনে-মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে তা জানতে পারিনি।

৪।।
বেডরুমে অনেক্ষণ মোবাইল টা বেজেই চলেছে,নাফিস ধরছে না দেখে এগিয়ে গেলাম। স্ক্রিনে ভেসে উঠল “স্বপ্ন কন্যা”; খুবই অবাক হলাম। কারো নাম আবার এমন হয় নাকি? তাছাড়া ওকে তো বিজনেস রিলেটেড ছাড়া অন্য কেউ ফোন করে না। তাহলে এটা কে? হয়ত কোন উদ্ভট মানুষ,যে এরকম নামেই অভ্যস্ত। এরকম সাতপাঁচ ভাবছি সহসাই চমকে গেলাম,একটা বিশ্রি ভাবনা খেলে গেল মাথায়। মেয়েটা নাফিসের গার্ল ফ্রেন্ড না তো? ভাবনাটা মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ডে একটা হিম শীতল শিরশিরে অনুভুতির সিগন্যাল পাঠাল। ভয়,আতংক,জেলাসি কত কি যে একসাথে খেলে গেল! ওই মিশ্র অনুভুতির ব্যবচ্ছেদ করবার সময় পেলাম না,নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম; এত ছোট মন আমার? এইটুকুতেই এত কিছু ভেবে বসে আছি? তৃতীয় বার রিং হতেই ফোন রিসিভ করলাম। ও প্রান্তে মিষ্টি নারী কণ্ঠ বলে উঠলঃ
“নাফিস,আমি পুরো ওয়ান আউয়ার বসে আছি,রেস্পন্সিবিলিটি বলে কিছুই কি তোমার নেই?”
আমি তাকে থামালাম,
“আসলে আপনি যাকে ফোন করেছেন,সে ওয়াশরুমে। কিছু কি বলতে হবে?”
মেয়েটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,
“কে আপনি? নাফিসের কোন রিলেটিভ?”
আমিও কেন যেন স্বভাব বিরুদ্ধ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললাম,
“আমি কে সেটা নাফিসকেই প্রশ্ন করবেন।”
ফোন ছেড়ে আমার মনে হচ্ছিল আমার পৃথিবী আঁধারে ছেয়ে গেছে। ভয়াবহ কোন ঝড়ে আমি ভেসে যাচ্ছিলাম যেন-ভেঙ্গে পড়ছিল ভালবাসার ভিত্তি, বিশ্বাস-সঅঅব---- সব কিছু। নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হচ্ছিল।
নাফিস ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম,
“তোমার ফোন এসেছিল,এক ঘণ্টা নাকি বসিয়ে রেখেছ কাকে?”
“কে? দেখি মোবাইল”,হাত বাড়াল সে।
আমি কোন কথা না বলে গটমট করে চলে আসলাম। টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলাম আমি,পেছন থেকে নাফিস বলে উঠল,
“তোমাকে কে বলল ফোন রিসিভ করতে। এত ঝামেলা করো কেন?”
আমি ঝাঁঝালো জবাব দিলাম,
“কেন তাতে বুঝি অনেক কষ্টে গড়ে তোলা প্রেম নষ্ট হয়ে যাবে?”
নাফিস কেমন অবাক হওয়া কণ্ঠে বলল,
“তুমি তাই ভেবেছ! আশ্চর্য তো! আমাকে তোমার এমন মনে হল?”
আমার কেন যেন মনে হল পুরটাই ওর অভিনয়,আমাকে ভোলানর জন্য সুন্দর অভিনয়।
সম্পর্কটা আগেই অনেক দূরের হয়ে গিয়েছিল,এই ঘটনার পর দুজন দুই জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আমি প্রাণহীন পুতুলের মত কাটাতে লাগলাম দিনগুলো।
এই রকম এলোমেলো ভাবে আমার কত দিন-কত রাত যে কাটতে লাগল তার সঠিক হিসেব আজ আর আমার মনে নেই। বিয়ের পর দুটি বছর আমরা দিঘির জলে হংসমিথুন হয়ে ভেসে বেড়াতাম সেই সুখ স্মৃতিগুলো মনে পড়লেই কান্নার লহরী উঠত মনে।
৫।।
এরই মাঝে আমাদের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে নাফিস সব কিছু এড়িয়ে যেতে লাগল। এমনকি তার মাতাল হবার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে চরম অপমানিত হলাম, আমাকে অবাক করে দিয়ে গায়ে হাত তুলে বসল সে। আর মেয়েটার ব্যাপারে কথা বললে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রুপ নিত।
এর পর আর কোন রাখঢাক করত না সে, আমার সামনেই মেয়েটার ফোন আসত। আমি বৃথা ক্ষোভে চিৎকার করতাম। মেয়েটার ব্যাপারে রিঅ্যাক্ট করলেই আমার এতদিনের ভালবাসার মানুষটা তার স্বরূপ ভুলে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি ধারন করত। আমার উপর নেমে আসত চরম অত্যাচার, চরম কষ্ট। সভ্য সমাজের সভ্য প্রেমিক পুরুষটি তার শক্ত দুহাতে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিতে চাইত। শেষের কটা দিন এত বেশী ঘটত ব্যাপারটা,আমি তখন একেই নিয়তি ভেবে নিয়েছি। সারাদিন কথা বলতে পারতাম না তীব্র ব্যাথায়,রক্ত জমাট বাঁধা গলায় স্বর বেরুত না। তারপরও সহ্য করতে পারতাম না,আমার আসনে সে অন্য কাউকে বসাবে। এ যে কি যন্ত্রণা সেই দুঃখের মহাকাব্য শুধুই আমি বুঝতে পারি। এত যে শারীরিক কষ্ট -সব ছাপিয়ে মনের ব্যাথাটা প্রবল হয়ে উঠত। আমি তাকে হারালে মরে যাব এই একটি ব্যাথাই আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখতো সারাক্ষণ।

শুনেছি অভাব যখন দরজা আসে তখন ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়। আমাদের মন দরোজায় অর্থের অভাব দেখা না দিলেও প্রাণের অভাব ঘটেছিল-তাই ভালবাসা উবে যাচ্ছিল কর্পূরের মত । আমার চোখের সামনে আমার প্রাণের মানুষ আমাকে উপেক্ষা করছে-আমার মনে হত আমি পয়সায় কেনা একটা বাঁদি মাত্র। খাচ্ছি,থাকছি বের করে দিচ্ছে না এই যেন বেশী! আমার অন্তরে তার যে অভাব আছে সে বুঝতেই পারত না যেন। অথচ কত গান,গল্প,কবিতা! কত ছন্দময় রাত্রিগুলো! কত রাত যে না ঘুমিয়ে কেটে গেছে আমাদের,সেই অবুঝ প্রেম গুলো কোথায় চলে গেল? আমার দোষটা কি জানতে খুব সাধ জাগত।
নাওয়া,খাওয়ার কোন নিয়ম রইল না। সময়ের হিসেব ভুলে চোখের জল ফেলতাম আর ভাবতাম এখন কোথায় আমার নাফিস? ওই মেয়েটা আমার নাফিসের হাত ধরেনি তো? মেয়েটা ওর সাথেই কি ঘুরে বেড়াচ্ছে? খুব ইচ্ছে করত মেয়েটাকে খুঁজে বের করি- তারপর বোঝাই কেন সে আমাদের মাঝে এসে আমার জীবন এলোমেলো করছে? নাফিসকে এত বেশী ভালবাসতাম যে ওকে দোষ দিতে পারতাম না,মনে হত সব দোষ ওই মেয়েটার। ভাবতাম মেয়েটাকে তীব্র অপমান করি। মাঝে মাঝে মনে হত মেয়েটাকে খুন করে ফেলি। কত অদ্ভুত চিন্তায় যে সময় কাটাতাম। শুনলে আমাকে মানুষ খারাপ ভাবতে পারে,কিন্তু আমি তখন উন্মাদিনী।
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম- আমার পুরোপুরি যুদ্ধংদেহী মনোভাব। মুখোমুখি হব মেয়েটার। এভাবে ছেড়ে দেয়া যায় না। নাফিস আমার প্রেমিক না-স্বামী। তাই আমার অধিকার আমি এভাবে ছেড়ে দেবনা।
৬।।
বেশ কিছুদিন আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম । কিন্তু মেয়েটির কোন হদিস বের করা খুবই জটিল মনে হল,কারণ তার নামটাও জানিনা আমি। নাফিসের ফোনই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু পরম মমতায় যক্ষের ধনের মত নাফিস আগলে রাখত তার ফোন। তাই কোন উপায়ই বের করতে পারছিলাম না। একদিন নাস্তার জন্য ডাকতে যাচ্ছিলাম ওকে-আমাদের বেডরুমটাও ইদানিং আলাদা। ঢুকতে গিয়েই শুনলাম মোবাইলে কথা বলছে ও। কখনা যে কাজটা করিনা, তাই করলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগলাম কি বলছে সে। এবং সুযোগ পেয়ে গেলাম।
কথা শেষে নাস্তা না করেই তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে পড়ল ও-আমিও গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ওর পিছু পিছু। রাস্তায় একা একা গাড়ী নিয়ে বেরুনো আমার সেটাই প্রথম। অনেকটাই ঝুঁকি ছিল,তারপরও নিলাম ঝুঁকি। আসলে হারাবার ভয় ছিল না কোনো,তাই যে কোন ঝুঁকি নিতেও আপত্তি ছিল না আমার। গুলশান-২ থেকে ডানে মোড় নিলো আমার অতি পছন্দের নীল বিএমডব্লিউ টা। যা একসময় একান্তই আমাদের দুজনের ছিলো,লঙ ড্রাইভে যেতাম ঐ গাড়িতেই- অথচ আজ সে যাচ্ছে অন্য কারো জন্য।

আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো। তারপরও পিছু নিলাম। আজ যা হবার হবে, পরাজয় মেনে নিতে হলে নেব, তবু এর শেষ দেখা চাই আমার। শুনতে চাই সেই নির্বোধ নিষ্ঠুর ডাইনীটার কথা, যে আমার প্রেমের দুর্গ ভেঙে ফেলে সেখানেই নিজের সুখ সংসার পাততে চায়? কেমন সে মেয়ে? আদৌ সে মানুষ তো? আচ্ছা,ওদিকে কোথায় যাচ্ছে নাফিস? সামনেই ওয়েস্টিন,ঐ বেহায়া মেয়েটা ওকে ওখানে যেতে বলেনিত? বুকের মধ্যে ধুকপুকানিটা স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম। নাহ,গাড়িটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আটকে থাকা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আমার কি যে হয়েছিল সেসময়, সব কিছুতেই বাড়িয়ে ভাবতাম। হঠাৎ মনে হল ওর প্রেমের ব্যাপারটাও বোধ হয় বাড়িয়ে ভাবছি। আজ হয়ত দেখবো আসলে সেটা তেমন কিছুই না। সম্ভাবনা ক্ষীণ,তবুও প্রার্থনা করছিলাম খোদা তাই যেন হয়।
অবশেষে একটা অভিজাত ভিয়েতনামী রেস্টুরেন্টের সামনে থামল ওর গাড়ী। লাল অক্ষরে লেখা রেস্টুরেন্টের নামটা আমার চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিলো। এই ‘’Le Saigon’’ এ আমাদের বৌভাত হয়েছিল। আমার খুব হাসি পেল। কেমন মানুষ তুমি নাফিস? এইখানে কত স্বপ্ন বুনেছ আমাকে নিয়ে। আজ অন্য কাঊকে নিয়ে এখানে মিথ্যে ভালোবাসার বুলি আওড়াতে একটুও বাঁধবে না তোমার? নিজের প্রতি একটা ক্ষোভ হচ্ছিল কেন এটো অপমানের পরও ওর পেছনে ছুটছি আমি?
আড়ষ্ট হয়ে আসছিলো পাদুটো। নির্লজ্জের মত এভাবে পিছু নেয়াটা কি ঠিক হল? ভাবনাটা স্থায়ী হবার আগেই দেখলাম আমি হাঁটতে শুরু করেছি । ভেতরে ঢুকেই যে দৃশ্য দেখলাম তাতে যে কোন স্ত্রী’র মাথায় বজ্রপাত হবে। আমি মানতে পাড়ছিলাম না অন্য কোন মেয়ে ওর জীবনে আসতে পারে। আশে পাশে কোন মানুষ যে আছে সব ভুলে গেলাম। চীৎকার করে মেয়েটাকে বললাম,
“তুমি জানো এই মানুষটা আমার স্বামী? বলো জানো?”
মেয়েটা এমন ভঙ্গীতে তাকালো যেভাবে আমরা কোন বিষাক্ত কীটের দিকে তাকাই, কণ্ঠে বীষ ঢেলে সে বলল,
“হূ দ্য হেল উ আর? আমাকে ‘তুমি’ বলার মানেটা কি?”
আমিও ঝাঁঝালো জবাব দিলাম,
“তোমার মত একটা বেয়াদব মেয়েকে আপনি বলবারও কোন কারণ দেখছি না।”
আমি নাফিসের দিকে ঘুরলাম, “তুমি এক্ষণী বাসায় যাবে আমার সাথে,আর কখনো এই ডাইনীর সাথে কথা বলতে পাড়বে না।”
আমি ওর হাত ধরে টানতে লাগলাম গাড়ীর দিকে, যেন শক্তির জোড়েই আপন করে নেব। নিজের অধিকার আমাকে হারান শক্তি ফিরিয়ে দিলো। কিন্তু আমার সে অধিকার যে আরও আগেই শেষ হয়ে গেছে আমি বুঝতে পারিনি। নাফিস আমার হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর দুজনে মিলে আমাকে কতটা অপমান করল, আর সেখানে কি কুরুক্ষেত্র বেধে গেল সেকথা মনে করতে চাইনা আর। কান্না ভেজা আমি তক্ষুনি ফীরে গেলাম পুরনো ঠিকানায়। যার ভালোবাসার আশায় আমার এত কষ্ট, সে যদি আমাকে না চায় তাহলে কেন আমি পথের কাঁটা হব?
৭।।
বাসায় ফিরে কাঊকে কিছু জানালাম না। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ভুল ভাঙবে ওর? ফিরিয়ে নিতে আসবে আমাকে। প্রতিটি সেকেন্ড মনে হতো দীর্ঘ যুগ। শত চেষ্টা করেও মোবাইল থেকে দূরে যেতে পারতাম না। বার বার ডায়াল করে শুনতাম ‘সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না’। আমার মরে যেতে ইচ্ছে হত। এতকিছুর পরও ওকে অনেক ভালবাসতাম। একবার যদি ও এসে বলত আমি সেই অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু ও প্রান্তে কোন সাড়া নেই। কাঁদতে কাঁদতে তখন মৃতপ্রায় আমি।

একদিন সকালে আমি একা ছাদের কোণে বসে ছিলাম, প্রতিদিনের মতই গোপন কান্না চলছিলো। পেছন থেকে একটা হাত চোখ মুছিয়ে দিতেই চমকে উঠলাম, কারণ বাসায় কাঊকে এখুনি এই কান্না আমি দেখাতে চাইনি। পেছনে ফিরতেই অবাক হয়ে দেখলাম নাফিস দাঁড়িয়ে,আমার মনে হচ্ছিল আমি কোন স্বপ্ন দৃশ্য দেখছি। অনেক কথা, অভিমান অভিযোগ একসাথে বাক্য হয়ে বেরুতে চাইলো। সব মিলে তালগোল পাকিয়ে আমি দুর্বোধ্য কোন শব্দ উচ্চারণ করলাম,কান্নাটা আরও বেড়ে গেলো। আমাকে কিছুই বলার সুযোগ দিলো না ও। বুকে জড়িয়ে নিলো,আমিও সেই ভালোবাসায় নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। ধাতস্থ হবার পর ও আমাকে আগের মত অনেক অনেক ভালোবাসার কথামালায় জড়িয়ে নিলো। আমিও পুরোপুরি মাফ করে দিলাম ওকে, ভুল তো মানুষেরই হয়। ওকে ফিরে পেয়ে অনেক বেশী ভালো লাগছিল।
দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, কিছুদিনের মধ্যেই কোথাও ঘুরতে যাব। এতদিন ঘটে যাওয়া খারাপ সময়টাকে ভুলে যেতে এটা অনেক সাহায্য করবে। বরাবরই পাহাড় নাফিসের প্রিয়। আমার প্রিয় সাগর। তাই কক্সবাজার যাওয়াই ঠিক হল-সাগর পাহাড় দুটোই একসাথে পাব ওখানে। অনেক দিন পর সেরাতে শান্তি নিয়ে ঘুমুতে গেলাম নাফিসের বুকে।
৮।।
আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি হিমছড়িতে। কত যে পাহাড় চারদিকে,কী যে সবুজ। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম আমরা। দুদিন হল এসেছি এখানে, সেই আগের দিনগুলির মত ঘুড়ে বেড়াচ্ছি দুজন সৈকতে, পাহাড়ে। সাথে বাবুকে আনিনি,তাই কষ্ট লাগছিল। কিন্তু একান্ত দুজনের এই সময় কাটানোটা সত্যি খুব প্রয়োজন ছিল। পাহাড়ে উঠে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। দুপুরবেলা তাই পর্যটক কম এখানে। তারপরও কিছু মানুষ ছিল। আমি চাইছিলাম একটা নির্জন কোণে বসে দুজন কথা বলি। সামনে একটা পায়ে চলা পথ দেখলাম। বাওয়ালীদের চলার ট্রেইল হবে হয়ত, ওদিকটায় সিঁড়ি নেই তাই কেউ খুব একটা যায় না। ও বিরক্ত হবে ভেবেও বলে ফেললাম আমি ঐ পাহাড়টার ওপাড়ে যেতে চাই। ওর সমর্থন পেয়ে ওদিকে এগুতে লাগলাম। পাহাড়টার ওপাড়ে এসে অনেক ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লাম। কোথাও কেঊ নেই। আমরা চেঁচালেও কারো কানে যাবে না। এমনকি একটু নিচে বসেছি বলে কেঊ আমাদের দেখতেও পাচ্ছিলো না। আমি ঠিক এরকম নির্জন একটা জায়গায় ওকে চাচ্ছিলাম। আমি খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে বসে আছি-ভয় হচ্ছিল ঢাকায় ফিরলে আবার ঐ মেয়েটা ওকে ছিনিয়ে নিতে চাইবে না তো? প্রসঙ্গটা তূলতেই ও কেমন অস্বস্তি বোধ করছে দেখলাম। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ওকে গান করতে বললাম। নিজেকে অনেক সুখী মনে হচ্ছিল। ও গান শুরু করেও থেমে গেলো। মনে হল ও কোন বিষয়ে চিন্তিত।আমি তাকিয়ে আছি ওর দিকে। ও কি সত্যি ঐ মেয়েকে ভুলতে পেরেছে? হঠাৎ ওর সেল ফোনটা বেজে উঠতেই ও আড়ষ্ট ভাবে ফোন তুলে নিলো,
“আমি তো বলেছি, খুব দ্রুতই চলে আসব। না দেরী হবে না।”
ও প্রান্তে কিছু একটা শুনল, তার পর বলে উঠলো,
“এতটা কি না করলেই না?”
আমার সন্দেহ হল সে কার সাথে কথা বলছে? আমি আর কখনোই আমার নাফিসের সাথে কোন মেয়ের কথা হোক চাইনা। আমি ফোনটা কেড়ে নিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম স্ক্রিনে লেখা “স্বপ্ন কন্যা”। আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালাম,
“এখনও সে তোমার চোখে স্বপ্ন কন্যা? এখোণো তোমার এই মেয়ের সাথে কথা বলার প্রয়োজন আছে?”
নাফিস বলে উঠলো, “প্রয়োজন তো আছেই। আমি তাকে ভালোবাসি। আর এই ভালোবাসার পেছনে বড় একটা কারণ তাকে বিয়ে না করলে আমাকে পথে বসতে হবে। তার ইনভেস্টমেন্ট উঠিয়ে নিলে আমার আর রাস্তার টোকাইটার মধ্যে কোন পার্থক্যই থাকবে না। ”
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “আমাকে তাহলে কেন এখানে নিয়ে আসা? কেন মিথ্যে নাটক? টাকার জন্য এতই উতলা তুমি? তোমার নিজের তো কম কিছু নেই। তারপরও নিজের বৌকে ঠকিয়ে শুধু টাকার লোভে প্রেম করছ তুমি?”
নাফিস কেমন ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রইলো, ওর দৃষ্টিতে ভয় পেয়ে গেলাম আমি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওর হাতে একটা রিভলবার। আতঙ্কিত হয়ে গেলাম, “নাফিস আমাকে তুমি মেরে ফেলতে চাইছ?”
“এমনটা করোনা,প্লীজ! আমি বাবুকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। তোমাকে কখনো আর যন্ত্রণা করবো না।”
আমার ভয়ার্ত কণ্ঠে ভাবান্তর হল না অমানুষটার। সে তখন কোন নিশিতে পাওয়া মানুষ যেন। আমার কান্না তাকে স্পর্শও করল না, সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার থেকে বেড়িয়ে এল নিঃশব্দ বুলেট। এত কাছের লক্ষ্য ভেদে কোন সমস্যায়ই পড়তে হল না তাকে। লাল রক্তে ভিজে গেলাম আমি , এগুলো কি আমার সেই রক্ত যারা তখনও প্রতি কণিকায় অনুভব করে অমানুষটার ভালোবাসা? কোনো বোধ কাজ করছিলো না।
পাগলের মত জাপটে ধরলাম ওর হাত,
“ আমাকে ফেলে যেওনা, শেষ নিঃশ্বাস ফেলবার আগে পর্যন্ত তোমার হাত ধরে বসে থাকতে চাই আমি।”
ওর চোখে কোন অনুশোচনা, কোন কষ্ট দেখলাম না। আমার আটকে আসা নিঃশ্বাসের সাথে ঘড়ঘড়ে গোলায় বলে উঠলাম,
“তুমি কেন? কেন অন্য কাঊকে এই কাজটা করতে বললে না তুমি? আজীবন কত ভালো তোমাকে বেসেছি। কেন এমন করলে?”
আমার কোন কথা শুনার সময় তার ছিল না। আমার দুর্বল হাতদুটো ছাড়িয়ে নিলো সে। সামনে এগিয়ে যাচ্ছে ও। এত কষ্ট! এত কষ্ট! মৃত্যুর শীতল হাতের পরশ পেতে শুরু করেছি, বড় বেশী কষ্ট,আর কি তীব্র আতঙ্ক!
নাফিসকে পিছু ডাকলাম, “আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, আমার হাত টা একটু ধরবে? একা আমার খুব ভয় লাগবে-আমাকে ফেলে যেও না।”
নাফিস ফিরে এসে আমার হাত ধরল। আমার মনে পড়ছিল এই মানুষটাই একদিন এই হাতে ফুলেল অক্ষরে আল্পনা এঁকেছিল “ শীমু তোমাকে ভালবাসি।”
আমার চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আসছিল,আমি সর্বশক্তি এক করে ওর হাত আকড়ে ধরলাম,মনে হল ওর চোখে একটা করুণা ধারা। মনে হল সে আমাকে বাঁচাতে ছুটে যাবে এখুনি,বললামঃ “অনেক ভালবাসি তোমাকে-”
আমার কথা শেষ হবার আগেই অনেক জোড়ে এক ধাক্কাতে হাত ছাড়িয়ে নিলো ও। আমিও পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঐ নিচের সবুজ উপত্যকায় আছড়ে পড়তে লাগলাম। একসময় মনে হল চেতনা লোপ পেয়েছে আমার।

৯।।
অমানুষটা তখন হোটেলে ফিরে বাসায় জানিয়ে দিয়েছে আমি সকাল থেকে নিখোঁজ। ছোট্ট ঝগড়া হয়েছিল। তারপর আমি কোথায় চলে গেছি! দুশ্চিন্তায় তার হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে- কক্সবাজার ঢাকার মত নিরাপদ না, রাতে এখানে একা একটা মেয়ে বাইরে থাকলে যে কোন বিপদ হতে পারে । বাসার সবাই অবাক হয়ে ভাবছে এমন পাগলামি কেঊ করে? কোথায় গেলো শীমু? ফিরছেই না কেন? সে জানাল তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে!

আর আমি তখন পাহাড়ের নিচে একটা চোখা পাথর আর গাছের মাঝে আটকে আছি। প্রাণ বলে যা আপনারা বোঝেন তখনও তার কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। বাঁচার কি যে ইচ্ছে আমার হচ্ছিল সেই আকুতি আপনাদের বোঝাতে পারবো না। কারো পায়ের আওয়াজ আমার দিকেই এগিয়ে আসছিল। সাঁঝ ঘনিয়েছে তখন, হয়ত মৌয়াল বা বওয়ালিরা ঘরে ফিরছে। একটা অনুচ্চ স্বর বেরুতে চাইলো মুখ দিয়ে। কিন্তু সেই স্বর মুখ থেকে বেরোবার আগেই আমি নিজেকে সংযত করলাম। কারণ আমাকে লোকালয়ে নিয়ে গেলেও আমি বাঁচব কিনা সেটা অনিশ্চিত। কিন্তু আমার নাফিসের লাইসেন্স করা বুলেট আমার শরীরে। আমি ক্ষমা করলেও সেই বুলেট ওকে ক্ষমা করবে না। একটু গড়িয়ে ঘন ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নিলাম। ধীরে ধীরে পায়ের আওয়াজগুলো দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগলো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ঈশান আরেফিন
    ঈশান আরেফিন তোমাকে ধন্যবাদ আপ্পি
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • AMINA
    AMINA প্রমি!তুমি আমাকে` `prandhala shuvechcha hey sahittanuragi bondhu '-বলে শুভেচ্ছা জানানোতে তোমাকে আবার ধন্যবাদ।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি ঈশান আরেফিন> welcome ,ভাইয়া...
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি AMINA >> welcome .
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • মোঃ শামছুল আরেফিন
    মোঃ শামছুল আরেফিন আপুনি দেখুন তো কি ভোলামন আমার। আপনার গল্পটি আমার এত ভাল লেগেছে, অথচ ভুল করেই আগে প্রিয়তে যোগ করা হয়নি। আজ আমার প্রিয় লেখাগুলোর লিস্ট একবার চোখ বুলালাম। দেখি যে আপনারটি নেই। তাই এখন আবার এসে প্রিয়তে যোগ করে নিলাম।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি আরেফিন ভাইয়ামুনিটাকে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ...প্রিয়'তে জায়গা পাওয়া সহজ কথা না!! এই জায়গাটা সবসময় যেন পেতে পারি আল্লাহ্‌ আমাকে সেই তৌফিক দিন-এরকমভাবে ছোট ভাইয়ের ভালবাসার জোরে শুধু না-লেখার যোগ্যতায় যেন পাই-আল্লাহ্'র কাছে এই প্রার্থনা।।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • শাহ্‌নাজ আক্তার
    শাহ্‌নাজ আক্তার প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি যে সিমু মারা গিয়েছে . শেষে যখন বুজলাম , তখন হকচকিয়ে গেলাম আর এখানেই লেখকের সার্থকতা , এরকম অনেক সিমু আছে আমাদের এই সমাজে, যারা বুকে পাথর চাপা দিয়ে সবার সাথে হাসি-মুখে তাল মিলিয়ে চলছে ....খুব ভালো লিখেছ তুমি ,আমার হৃদয়ের গহিনে চিন...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • ফাতেমা প্রমি
    ফাতেমা প্রমি Shahnaj Akter >> আপু আপনাকে অনেক ধন্যবাদ গল্পটা পড়বার জন্য...
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুন, ২০১১
  • Akther Hossain  (আকাশ)
    Akther Hossain (আকাশ) ইচ্ছা করলে আরো গুছিয়া লিখেতে পারতে ভালো হয়েছে
    প্রত্যুত্তর . ৩০ জুন, ২০১১
  • মোহাঃ ফখরুল আলম
    মোহাঃ ফখরুল আলম ভাল লাগল।
    প্রত্যুত্তর . ২ জুলাই, ২০১১

advertisement