লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৮ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ২৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমাদের ছিনিয়ে আনা বিজয় (ডিসেম্বর ২০১৬)

বাংলাদেশের জন্মকথা
আমাদের ছিনিয়ে আনা বিজয়

সংখ্যা

রওনক নূর

comment ০  favorite ১  import_contacts ৪৭১
চন্দনাকে ইদানিং খুব বিরক্ত দেখায় সবসময়। ওর অভিযোগ ছিল অনুপ ওকে আর আগের মত ভালোবাসেনা। অনুপ চন্দনার কথা গ্রামের সবাই জানে। ছোট বেলা থেকে অনুপ-চন্দনা একসাথে বড় হয়েছে, লেখাপড়া করেছে। পাশাপাশি বাড়ী হবার জন্য একসাথে বেড়ে উঠা ওদের। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হবার পর চন্দনা থেকে যায় গ্রামে আর অনুপকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠানো হয় ঢাকায়। প্রথমে অনুপ যেতে চায়নি চন্দনাকে ছেড়ে। দুই পরিবারের সম্মতিক্রমে ওদের বিয়েও ঠিক হয়ে আছে। মেয়ের বয়স যথেষ্ট হয়েছে ভেবে চন্দনার বাবা-মাও খুবই চিন্তিত ছিলেন। তবে অনুপের বাবা-মা ও চায় ওদেরকে এক করতে। মোটামুটি জোর করেই অনুপকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠানো হয়। প্রথমদিকে প্রতি মাসে বাড়িতে আসত আর চন্দনাকে চিঠি লিখতো প্রতিদিন। বেশ কিছুদিন হল অনুপ যেন কেমন পরিবর্তন হয়ে গেছে। চিঠি লেখাতো দুরে থাক বাড়িতে আসার কথাও ভুলে গেছে। গত ছয় মাসে একবারো বাড়ীতে আসেনি অনুপ। চন্দনাও অভিমান করে আর চিঠি লিখেনা। এদিকে চন্দনার আর অনুপের বাবা-মা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে ওদের বিয়ের জন্য। কি যে করছে ছেলেটা তা নিয়ে সাধন পালের চিন্তার শেষ নেয়। সাধন পাল অনুপের বাবা। ঢাকায় গিয়ে শুনে আসছে ছেলে তার নাকি কি সব রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে। আজকাল কি যে সব অধিকার নিয়ে কথা বলে ছেলেটা সাধন পাল তা বুঝতেও পারেনা। এদিকে মাধবী (অনুপের মা) ছেলেকে দেখার জন্য পাগলপ্রায়। কতদিন ছেলেটাকে দেখেনা, এজন্য অনুপের বাবাকে বলে ছেলেকে চিঠি পাঠাতে যেন তাড়াতাড়ি গ্রামে চলে আসে। দুইবার চিঠি পাঠিয়েও অনুপকে আনা গেলনা গ্রামে। বাধ্য হয়ে সাধন পাল অনুপকে মিথ্যা বলে চিঠি পাঠান “তোর মা ভীষন অসুস্থ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আয়।” মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে অনুপ বাড়িতে আসে এবং এসে দেখে বাবা তাকে মিথ্যা লিখেছে, তার মা সুস্থই আছেন। এতদিন পর ছেলেকে পেয়ে মাধবী জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। তাই অনুপ তাকে আর কিছু বলতে পারেনা।
দুই দিন হয়ে গেল অনুপ বাড়ীতে এসেছে। কিন্তু চন্দনার কোন দেখা নায়। অনুপ অবশ্যই জানে কতটা অভিমান করেছে মেয়েটা। মেয়েটা যে তাকে খুব বেশি ভালবাসে। বিকালে গৌতম-বিদিশা আসছিলেন অনুপের সাথে দেখা করতে। তারা পরিস্কার বলে দিয়ে গেছেন যে এইবার অনুপ চন্দনাকে বিয়ে না করলে তারা অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবে। এটা শুনে অবশ্য অনুপ কিছু মনে করেনি কারন সব বাবা-মায়েরই বিবাহ উপযুক্ত কন্যা থাকলে চিন্তা হয়। তার উপর গ্রামের লোকতো আর কথা শুনাতে কম করেনা। তবে অনুপ অবাক হয়েছিল যে মেয়েটা তার বাড়ী আসার কথা শুনলে পাগলের মত ছুটে আসতো সে আজ তার বাবা মায়ের সঙ্গেও আসলোনা। খুব কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা।
চন্দনা ঘরে দরজা লাগিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলো। অনুপ ওদের বাড়ীতে এসেই ওর ঘরের দিকে গেল। দরজা বন্ধ দেখে অনেক্ষন ধরে ডাকতে থাকলো। ভিতর থেকে চন্দনা কোন উত্তর দিলনা। যখন অনুপ বললো, “থাক তুই, আর তোকে ডাকবোনা” কথাটা শুনে দৌড় দিয়ে চন্দনা দরজা খুলে অনুপের হাতটা ধরে ঘরে টেনে আনলো। তারপর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলো। অনুপের মনে হচ্ছিলো অনেকদিন ধরে জমে থাকা কালো মেঘ যেন আজ বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। আধা ঘন্টা চলতে থাকলো চন্দনার বৃষ্টি ঝরানো। অনুপ চন্দনাকে বুঝিয়ে বললো যে কেন সে চিঠি লেখার সময় পায়নি আর কেনই বা সে বাড়িতে আসতে পারেনা। দেশের অবস্থা ভালনা পশ্চিম পাকিস্থানিদেও অত্যাচার দিনে দিনে বেড়েই চলছে। পাকিস্থান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্থান বাঙ্গালি জনগনের উপর শুরু করে অত্যচার আর নিপীড়ন এবং বঞ্চিত করে তাদের নায্য অধিকার থেকে। কিন্তু আর কতদিন আমরা বাঙ্গালিরা অত্যচারিত হব। তাই আমাদের অধিকার আদায়ে পশ্চিম পাকিস্থানের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে। আমরা মা ও মাটিকে রক্ষার প্রয়াসে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আর নিজেদেরকে বিলিয়ে দেবনা, অধিকার আদায়ে জীবন দিয়ে হলেও এদেশকে রক্ষা করব। সব কথা শুনে চন্দনার চোখে জ্বল চলে আসলো। চন্দনা বলে, আমাকে ক্ষমা কর অনুপ আমি তোমাকে শুধু শুধু ভুল বুঝেছি। আর আমি সবসময় তোমার সাথে আছি। এদেশকে রক্ষা করা আমার, তোমার, আমাদের সকলের দায়িত্ব।


রাতে বাবা-মায়ের সাথে খেতে বসেছে অনুপ। মাধবী অনুপকে বললো এবার তোকে বিয়ে করতেই হবে। আর এসব অধিকার, সংগ্রাম,আন্দলোন বাদ দিয়ে এবার নিজের জন্য একটু ভাব। অনুপ কিছুক্ষন চুপ করে রইলো আর তারপর যা বললো তাতে মাধবীর আর কিছু বলার ছিলনা। অনুপ বললো “মাগো তুমি অসুস্থ শুনে পাগলের মত ছুটে এসেছি। আর তুমিই তো শিখিয়েছিলে এদেশ আমার মাতৃভূমি, আমার মা। তাহলে মাকে বিপদে রেখে আমি কিভাবে শান্ত থাকতে পারি বলতে পারো।” মাধবী কিছুই বলেনি আর, চুপচাপ ওরা খাওয়া শেষ করলো।

হঠাৎ দেশের অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় চন্দনার নিরাপত্তার কথা ভেবে তার বাবা-মা মেয়ের বিয়ের জন্য সাধন পালকে জোরাজোরি করতে লাগলো। অনুপকে বিষয়টা জানানো হলে সবকিছু বিবেচনা করে বিয়ে করতে সম্মত হয়। বিয়ের পর স্বপ্নের মত চলছিল ওদের এক একটা দিন। ১লা মার্চ ১৯৭১ সালে বিয়ে হয় অনুপ-চন্দনার। পাগলের মতো ভালবাসতো দুজন দুজনাকে। এরমাঝে ঢাকার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্থানিরা যে কোন সময় আক্রমন করবে । এর মধ্যে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্থানিরা ঢাকায় বর্বর আক্রমন শুরু করে প্রতিবাদে বাঙ্গালিরা পাল্টা আক্রমন শুরু করলে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ । যুদ্ধের কিছুদিন যেতেই ১০ই এপ্রিল গঠন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার যা ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত। ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠনের পর মুক্তি যদ্ধেও গতি বৃদ্ধি পায়। সকল শ্রেনির বাঙ্গালিরা দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় অনুপও আর ঘরে বসে থাকতে পারেনা। চন্দনা নিজেই দেড়মাস বিয়ে হওয়া স্বামীকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়। শুধু অনুপকে বলে, “কথা দাও লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ফিরে আসবে।” যুদ্ধে যাবার আগে অনুপ বাড়ী থেকে সুসংবাদ শুনে যায়। ঘরে যে তার নতুন অতিথি আসবে।

শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ি যুদ্ধ, এদেশটাকে শত্রুমুক্ত করবার যুদ্ধ। লাল সবুজের বিজয়ী পতাকা নিয়ে ফিরে আসবে বাংলার দামাল ছেলেরা এটাই সবার আসা। হায়েনারা বাঙ্গালির রক্তচুষে নিতে মত্ত হয়ে উঠে। অনুপ ও সবার মত শপথ নিয়েছে রক্ত দিয়ে হলেও রক্ষা করবে এদেশটাকে। মনে জিদ আর যুদ্ধ জয়ের আকাঙ্খা থাকলেও চোখের সামনে ভেসে উঠে প্রিয়তমার মুখখানা। কি করছে অসুস্থ শরীরের মেয়েটা। নতুন অতিথি আসবে যখন তখনতো তার স্বামীর বুকে থাকার কথা ছিল। অথচ দেশের জন্য সে তার নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে স্বামীকে যুদ্ধে পাঠিয়েছে।

বেশ কয়েকবার শত্রুবাহীনি অনুপের খোজে ওদের বাড়ীতে এসেছে। অনেক শাসিয়ে গেছে অনুপের বাবা-মা আর স্ত্রীকে। এদিকে চন্দনার শরীরও বেশ ভারী হয়ে গেছে। সবাই সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকে কখন কি হয়। ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১, সকাল থেকে অনুপের মনটা বেশ খুশি ছিল। নয় মাস রক্তক্ষয়ি যুদ্ধে জয়ি হয়েছে বাঙ্গালী। চন্দনাকে কখন দেখতে পাবে সে। অন্যদিকে আজ সকালেই চন্দনা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছে। সাধন পাল তাড়াতাড়ি মাসি ডাকতে যায়। মাসি চন্দনার ঘরে ঢুকে।

১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১, পশ্চিম পাকিস্থানিরা নিশ্চিত হেরে যাবে বুঝতে পেরে এদেশের সব গুনিজন, লেখক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র এবং মেধাবীদের ধরে নিয়ে যায়। এদেশটাকে মেধাশুন্য করার জন্য সবাইকে নিঃশংসভাবে হত্যা করে। এদিন অনুপকেও সন্ধ্যা ছয়টা পয়তাল্লিশ মিনিটে তুলে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্থানি হায়েনারা। লাল-সবুজের স্বাধীন দেশটাকে দেখা হয়না আর অনুপের। রক্তের দাম দিয়ে কিনে দেয় এদেশটাকে আমাদের জন্য। সবুজ এ দেশে রক্ত দিয়ে লাল হয়ে, লাল-সবুজ এর দেশের জন্ম দেয়, নাম তার বাংলাদেশ। এদিকে মাসি ঘর থেকে বের হয়ে সবাইকে খবর দেয় চন্দনা- অনুপের ঘর আলো করে এক ফুট ফুটে কন্য জন্ম নিয়েছে।
এই কন্যা আর কেউ নয়, এটা আমাদের বাংলাদেশ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement