এ মাসের সংখ্যা ছিল নবান্ন।নবান্নের সব চেয়ে আকর্ষনীয় বিষয় হল আমন ধান,আর কৃষকের উৎসব।গল্পটিতে উঠতি যুবকের সাথে,নবান্নের আমন ধানের মওসুমে ঘটে যাওয়া,করুন এক কাহিনি ফুটে উঠেছে।সুতরাং বলব বিষয়ের সাথে সামঞ্জ্যের সাথে সাথে সার্থক একটি গল্প হয়ে উঠেছে দশ কাঁঠা জমি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ অক্টোবর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৩২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - নবান্ন (অক্টোবর ২০১৯)

দশ কাঁঠা জমি
নবান্ন

সংখ্যা

নাজমুল হুসাইন

comment ২  favorite ০  import_contacts ৩৬

ঘ্যাচ করে উল্টে গেল বাম তর্জনীর নখ শুদ্ধ গোটা কর অব্দি।ফিনকি দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এলো যুবা রক্তের তাজা উন্মাদনা।মুহুর্তেই করুন আর্তনাদে লহিতাভা ধারণ করলো কাঁদামাটি আর ঘাসের গালিচা।বাতাসের গন্ধে যেন ভেসে গেল আহ!উহ!ইসরে…হাই আল্লাহ!নখ শুদ্ধ যে উল্টে গেল!রক্তাক্ত কাঁচিটাকে জমিতে আছড়ে ফেলে,কাটা আঙুল খানি ডান হাতের মুঠিতে চেপে সোজা আলের দিকে দৌড়ে গেল মানিক চাঁদ।কোন ক্রমেই যেন আটকে রাখা গেল না রক্তধারা,ঢের বেড়ে গেল টগবগে নালী ভরা রুধীর শ্রোত!তবুও হতবুদ্ধি হল না সে,কেবল যা করতে নিতান্ত বাধ্য হল,তা হল আলের উপর থেকে একটু দূর্বা নিয়ে,মুখে চিবিয়ে ছিন্ন হওয়া আঙুলের ডগায় চেপে,দাঁতে দাঁত খিচে,দম বন্ধ করে,অনুচচ স্বরে একটা কোকানীর মত দিলো সে। খুব সম্ভবত কাটা বা ক্ষত স্থানে এন্টিসেপটিক জাতীয় কিছু লাগালে দুপ করে জ্বলে ওঠার মত যে অনুভুতি হয়,সেই যন্ত্রনা প্রকৃত ক্ষত বা ঘায়ের চেয়েও যেন ঢের যন্ত্রণাপদ।আর তাই হয়তবা এমন করে উঠলো সে। যদিও সংগোপনে ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো রতন,তবুও এদিক সেদিক একবার তাকিয়ে কি যেন একটা দেখে নিয়ে,ফের কুকিয়ে উঠে,ঠোট জোড়া হাঁসের ঠোটের মত বাঁকা করে,মুখের গরম বাতাস দিয়ে ফু দিতে লাগলো কেটে ছিড়ে থেবড়ে যাওয়া অংশটিতে।কিছুটা স্বস্তিবোধ পাবার জন্যই বোধ হয় এমনটি করলো সে।অতঃপর কোমরে জড়ানো ছেড়া গামছাটা খুলে,দাঁত দিয়ে একটুখানি টেনে ছিড়ে কাটা আঙুলের মাথায় জড়িয়ে দিতে দিতে আবার বিড়বিড় করে কি যেন বলে উঠলো।প্রথমবার ঠিকঠাক মত বোঝা না গেলেও দ্বিতীয়বার স্পষ্ট শোনা গেল,হালকা গোঙানির সুরে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো মাইনকার বাচচা মাইনকা!উহ!ইশরে!আঙুলটা গেছেরে,আঙুলটা গেছে।এত ধার কেউ দেয় নাকি নতুন কাঁচিতে এয়্যা!যদিও কাঁচির ধার যাতে কোন অবস্থাতেই কম না হয়,সে ব্যপারে তাগাদা দিতে গত হপ্তায় কম করে হলেও চার চারবার হাঁপড় ঘরে ধর্ণা দিতে হয়েছে তাকে।এই কথাটি মনে পড়তেই হঠাৎ কেমন যেন খানিকটা শীতল হল এবার।কেটে যাওয়া হাতের কম্পনও কিছুটা কমে এলো বোধহয়।রক্ত বন্ধ হয়েছে গামছার ছেড়া টুকরো দিয়ে বেঁধে দেয়ার পরই।কিঞ্চিৎ লজ্জার ছাপ পরিদৃষ্ট হল তার মুখাবয়বে।ফলে নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিল এই ভেবে যে,অসাবধানতার বশেই আঙুল কেটে দফারফা হয়ে গেছে,আর যাই হোক কামার দার এ ব্যপারে কোন দোষ ত্রুটি অবশ্য একদমই নেই।খামখা তাকে এমন গালি গালাজ করা যে মোটেও উচিৎ হবে না।।তওবা!তওবা!গালাগাল করছি কেন?দোষ যা ছিল,সে তো কেবল নিজেরই।
রুক্ষ কাক ফাটা দুপুরে হঠাৎ এমন অনাকাংখিত ঘটনায় প্রচন্ড বিব্রত হল সে।বেশ খানিকটা রক্তও ঝরেছে কাটা জায়গা থেকে,ফলে জল তেষ্টায় গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে এসেছে।দূরের স্যালো মেশিন থেকে নালা বেয়ে বেয়ে জল গিয়ে পড়ছে তারই পাশের জমিতে।নবান্নের এই ভর দুপুরে সারা গায়ের মাঠ জুড়ে,কেবল মাথা গজিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বেড়ে ওঠা গোছা গোছা সবুজ ধানের সারি।আর তার উপর অসম্ভব আহ্লাদে ঠিকরে পড়ছে সোনালী রঙের বেয়াড়া সূর্যটা।যে আলের উপর সে বসে পড়েছিল সেটি আসলে একটি নালার এক পার্শ্ব ছিল মাত্র।সদ্য উঠে আসা পরিষ্কার জলের শ্রোত নালাটির পেট পুরে তড়তড় করে বেয়ে চলেছে নজু কাকার আধমরা ধান ক্ষেতের দিকে।আধ শোয়া অবস্থায় এক পাশে একটু বেকে হালকা কুজো হয়ে নিজের শুকনো মুখ খানা নালার স্বচ্ছ জলে ডুবিয়ে দিল মানিক চাঁদ।আহ!কি শান্তি!বড্ড দুমড়ে মুচড়ে পড়েছিলাম যেন।কলিজাটা যেন পরম তৃপ্তি পেল এতক্ষনে।তৃষ্ণা মিটতেই তার মনে পড়লো,জমির অর্ধেকটা নিড়োনো এখনো যে বাকি!সন্ধ্যের আগেই বাকিটুকু নিড়িয়ে সার সেচ দিতে হবে জমিতে,নইলে যে কোনভাবেই ফলন বেশি পাওয়া যাবে না এবার।হাতে টাকা কড়ির যা অবস্থা,তাতে করে স্যালো মেশিনের জল এ বছর যে আর কপালে জুটবে না তা ঢের জানা রয়েছে!হারু কাকা সাফ সাফ বলে দিয়েছে,বাকিতে কারো জমি ভিজোতে পারবে না এবার।ফলে জমি সতেজ রাখতে কেবল ওই একটা উপায় হাতে রয়েছে,আর তা হল পাশের বিল থেকে বালতী ভরে ভরে জল এনে,কোন রকমে ছিটিয়ে দেয়া আর কি।এতে করে হয়তবা মনের শান্তি পাওয়া যাবে কিছুটা,কিন্তু না যাবে জমির ফাঁটল বন্ধ করা,না যাবে ভালো ফসল পাওয়া।নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও কেবল অর্থাভাবে গত দু মওসুমে এই একই কাজ করতে হয়েছে তাকে।বলাচলে সার-সেঁচ কোনটিই ঠিক ঠাক মত পায়নি জমি খানি,তবুও প্রতিবার এত ফসল ওর বুক থেকে আহরিত হয়েছে,যা অন্য কোন জমি থেকে হয়নি আজ অব্দি।অযত্ন অবহেলার পরেও,যে জমি এত ফসল দিয়ে থাকে,তাকেই তো সেরা জমি বলতে হয়।হ্যা এ মাঠের সেরা জমি খানিই যে তার!এক কথায় সোনার জমি।এ গায়ের কত জনের যে চোখ লেগে রয়েছে জমিটার প্রতি,তার ফিরিস্তি দেয়া আপাতত সম্ভব নয়।

বেশি উঁচুও নয়,বেশি নিচুও নয়,বর্ষা এলে যেমন প্রচুর জল জমে থাকে না,আবার শুষ্ক মৌসুমেও জমির মাটি থাকে কিঞ্চিৎ ভেজা ভেজা।না এঁটেল মাটি,না বেলে মাটি,খাঁটি দোঁয়াশ মাটি যাকে বলে,মানিক চাঁদের জমি খানি যেন পুষ্টি গুনে এখনো সতেজ প্রাণবন্ত।অথচ তার যত্ন আত্নী কেবল আগাছা মুক্ত রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বারোমাস।বছরে তিনটে ফসল হয় চৌকোনা সমান দশ কাঁঠার জমি খানিতে।
সবে মাথা খাড়া করে ফুল দিতে শুরু করেছে ওটি।হয়তবা হপ্তা খানিকের মধ্যেই সদ্য গজানো শিষ থেকে মুক্তোর মত ছড়িয়ে পড়বে দুধে ধানের ছড়া।রুপোলী ধানের বেড়ে ওঠার মহরত চলবে আরো কিছুদিন,অতঃপর যৌবন পেরিয়ে কেবল সোনালী রুপেই পরিপক্ক হবে ছড়া গুলো।এর পর কাটরে,বিচলী ফেলরে,শুকিয়ে এলে মুঠি বাঁধরে,জালি ফেলরে,হয়তবা মাথায় নচেৎ গরুর গাড়িতে করে বাড়ি নাওরে,তক্তিতে ঝেড়ে ঝেড়ে শুকিয়ে চিমসে যাওয়া ধান আর বিচলী আলাদা কররে।এর পর দখিনা বাতাসে ফেলে হুড়ো নাড়া সরালেই কেবল ডাসা ডাসা পাকা ধান পাওয়া যাবে।সেই ধান কিছুটা বাজারে বিক্রি করবে মানিক চাঁদ,বিজ হিসেবে রেখে দিবে কিছুটা,কিছুটা সেদ্ধ করে চাল বানাবে সারা বছর ধরে খাবার জন্য,এছাড়া দান করার নিয়ত রয়েছে তার।নিয়ত ঠিক নয়,বাবার জন্য মানত করেছিল সে।
দু মওসুম আগে,সেদিন রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা,রাত তখন কতদূর গড়িয়েছিল ঠিক মনে নেই এখন।তবে তখনো বাঁশি বাজাচ্ছিলেন তিনি।আহা!কি মধুর সুরে তিনি বাঁশি বাজাতেন।দূর গায়ের লোক পর্যন্ত এসে ভীড় জমাতো পাগলকর সে বাঁশির সুর শুনবার জন্য।হঠাৎ করেই খক খক করে কেশে উঠলেন বাবা,কফের সাথে বেরিয়ে এলো কয়েক খাবলা রক্তের দলা।বুকটা চেপে ধরে ডাক দিলো বাবা মানিক চাঁদ।আমি তখন ও ঘরের কোনে পাতা একটা অর্ধ ভাঙা টেবিলে বসে স্কুলের জন্য অংক কষছিলাম।দৌড়ে ছুটে গেলাম বাবার কাছে,আমার হাত খানি ধরে বলে উঠলেন বুকের ভেতর কেমন জানি করেরে বাবা,কেমন জানি করে!মুখটা উপুড় করে দিয়ে আবার কেশে উঠলেন,ফের গলা বেয়ে বেরিয়ে এলো তাজা রক্তের দলা।তীব্র যন্ত্রনায় বাবা আমার ছটফট করছিলেন তখন।মায়ের মুখের পানে চেয়ে বললাম,হাসপাতালে নিতে হবে যে মা।আঁচলে মুখ লুকিয়ে রাখা মায়ের চোখের সে জল আমায় সেদিন বলে দিচ্ছিল,ঘরে যে পয়সা কড়ি কিচ্ছুটি নেই!ছুটে গেলাম ও পাড়ার কবির কাকার বাড়ি,প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গ্রামের মধ্যে কেবল ওই একটি লোকের কাছেই যাবার মত পরিবেশ ছিল তখন।বাঁশি বাজিয়ে আয় উপার্জন করতেন বলে,বলা চলে একঘরে করে রাখা হয়েছিল বাবাকে।কেউ যেমন মেলামেশা করতেন না তার সাথে,তেমনি কাউকে মিশতেও দিতেন না গায়ের মাতুব্বরেরা।ফলে যেখানে সেখানে হাত পাতলে লাভ যে কিচ্ছুটি হবে না, ঢের জানা ছিল সে সময়।আর তাই,বাবার একমাত্র বন্ধু কবির মাঝিকেই সবকিছু খুলে বললাম ছুটে গিয়ে।সমস্ত কথা শুনে ওই রাতেই তিনি ভ্যান গাড়ি নিয়ে আমার সংগে বেরিয়ে এলেন চট জলদি।পূর্বে নৌকা বাইতো কবির মাঝি,গাঙ শুকিয়ে যাবার পর,ভ্যান গাড়ি চালায় এখন।
ওই ঘোর বিপদের মুহুর্তে মনে মনে আল্লাহকে ডেকেছিলাম আর পণ করেছিলাম,বাবা যদি সুস্থ হয়ে ওঠে,তবে দশ সের ধান দেব এতিম খানায়।কবির কাকাকে সংগে নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি,মানুষের জটলা বেধে গেছে উঠোনে।কাঁদা মাটিতে অর্ধ ভেজা অবস্থায় বাবার মাথাটি বুকে চেপে মা আমার কাঁদছে!পেছন থেকে যেন আমার কাঁধে হাত রেখে বলল হায়াত শেষ বাবা,হায়াত শেষ!তাকিয়ে দেখি গামছা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আমাকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন স্বয়ং কবির কাকা।বুঝলাম,মানত আমার কবুল হয়নি আল্লাহ পাকের দরবারে।দাফণ কাফন সেরে স্থীর করলাম মানত যখন করেছি,শোধ আমাকে করতেই হবে।কিন্তু কেমন করে তা সম্ভব?ঘরে যে খাবার চাল পর্যন্ত নেই!
বাবাকে হারাবার পর,এই কিশোর বয়সেই সংসারের গুরু দ্বায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হল আমায়।ফলে অনিচ্ছা সত্বেও লেখাপড়ার অধ্যায় বন্ধ দিতে হল জীবনের তরে।দেখতে দেখতে দুই দুটো মওসুম পেরিয়ে গেল, বাবাকে হারাবার ধকল সামলে উঠেছি যেন,এমনকি তার রেখে যাওয়া ঋনের বোঝা শোধ হয়ে এলো প্রায়।ভালোই ভালোই মওসুমটা পার করে,ধান গুলো ঘরে তুলতে পারলে হয়,আর কোন দুঃখ থাকবে না আমাদের,পাওনা টাকার জন্য চোখ রাঙাবে না কেউ,মানতটাও শোধ দিতে পারব হয়তবা।সব চেয়ে বড় কথা হল,মাকে এবার শহরে নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাতে পারব নিশ্চয়।কাল ক্ষেপন যে আর করতে চাই নে অন্তঃত মায়ের বেলাতে।
বাবা চলে যাবার পর,এই দুবছরে আমি যেন কিছুটা যুবক হয়েছি,দাঁড়ি গোফ গজাতে শুরু করেছে আমার।কেন জানি বাবার মত বড্ড বাঁশি বাজাতে ইচ্ছে করে ইদানিং।কেন জানি বাবারর মত পাগল করা সুরের মূর্ছনায় পাগল করে দিতে মন চায় রুপোলী জোছনায় ঘুরে বেড়ানো জোনাক পোকাদের।বড্ড সাধ জাগে ভেঙচি কাটা সেই মেয়েটিও শুনুক আমার বাঁশের বাশির নিশি জাগা সুর।
হ্যা হারু কাকার মেয়ে শেফালি,দেখা হলেই পথ আগলে দাঁড়ায়,আমার পাণে চেয়ে ভেঙচি কাটে।কেমন যেন থতোমত খেয়ে উঠি আমি,লজ্জায় লাল হয়ে পড়ি যেন।হুর পরির মত হাসতে থাকে তখন।ইচ্ছে করে ইস!সারা জীবন ধরে যদি এমন ভেঙচি কেটে যেত শেফালি,অমন মধু মাখা হাসি হেসে যদি পাগল করতো আমায়!হায়রে কপাল!মাটিতে শুয়ে কি আর অমন আসমানী শুকতারা ছোঁয়া যায়?
নানান সব কল্পনা করতে করতে,জমিরর আলের উপর অমন ঠাডা পড়া রোদের মধ্যেই কখন জানি ঘুমিয়ে পড়লো মানিক চাঁদ।যখন ঘুম ভেঙে জেগে উঠলো সে,সূর্যটা তখন অভিমান করে তার গতি পথে ফিরে যেতে শুরু করেছে।একটু পরেই সন্ধ্যে নেমে আসবে।হারু কাকার স্যালো মেশিনের ভটভট আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না।নালার পানিও শুকিয়ে এসেছে প্রায়,কাঁচি মাথাল হাতে কাউকে আর দেখা গেলনা সারাটা মাঠে,কেবল দুটো দুষ্ট ছেলেকে দেখা গেল,নিজ নিজ গরু নিয়ে রসিকতা করতে করতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।মানিক চাঁদ বুঝতে পারলো আজ আর ভুঁই নিড়োনো সম্পন্ন করা গেল না।তাছাড়া খুধায় কেমন যেন চোঁ চোঁ করছে পেট।সেই সকালে এক মুঠো গমের ছাতু খেয়েছিল নুন ঝালে ডলে,দিন গড়ড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো প্রায়,এতক্ষন কি আর অতটুকু খাদ্য মজুত থাকে পেটের মধ্যে?তার উপর আঙুলের ডগা শুদ্ধ গেল উলে!আঙুলের কথা মনে হতেই চোখ গেল কাটা হাতের দিকে।বড্ড ফুলেছে হাত খানা,এত ভীষণ দরদ হয়েছে যে,একটু নাড়াচাড়া লাগলেও যেন ব্যথা লাগছে ঢের।অবস্থা যা বেগতিক,তাতে করে এ হপ্তায় যে আর মাঠে আসা তার পক্ষে সম্ভব হবে না,তা সে ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।অগত্যা গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে মাথাল কাঁচি বগল দাবা করে বাড়ির পানে ফিরে চলল মানিক চাঁদ।

সেই গোধুলি লগ্নে বাড়ি ফিরতেই ভিষণ জ্বর এলো ওর গায়ে,সারাটা গা যেন ভাঁপে পুড়ে যেতে লাগলো।ভিষণ রকমের কাঁপুনি শুরু হল জ্বরের তোড়ে।এই প্রচন্ড গরমের মধ্যেও গায়ে যে লেপ কাঁথা চাপতে হল তার!ছেলের শিওরে বসে সারা রাত নিদ্রাহীন কাটলো মায়ের।অঘোর থেকে যখন কিঞ্চিৎ হুশ ফিরে এলো মানিক চাঁদের,ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের পরোষ পেয়ে মায়ের তখন কেবল ঝিমুনি এসেছিল।এক ঝাটকায় লাফিয়ে উঠে বলল,মা তোমার শরীর এমনিতেই বেশি ভালো নয়,খামখা কেন এমন রাত জেগে বসে রয়েছো?এখন একটু বিশ্রাম নাও,আমি ঢের ভালো আছি,শিঘ্রই ভালো হয়ে যাবো নিশ্চয়।যদিও ছেলের কথায় মায়ের মনে সাই দিলনা বিন্দু মাত্র,তাই পরিক্ষা করে দেখবার জন্য ফের কপালে হাত রাখলো মা,যে কাজ সে গত রাতে কিছুক্ষন পর পরই করেছে,আর জলের পুল্টিস দিয়ে ঠান্ডা করবার চেষ্টা করেছে বার বার।ছেলেটা তার সারা রাত অঘোরে কেবল নানান সব ভুল ভাল বকেছে।ফলে বড্ড দুঃশ্চিন্তার কালো ছায়া ঘিরে ধরেছে তাকে,ঝড়ে যার ঘর ভেঙেছে,সিদূরে মেঘ দেখলে তার পরাণ যে এমনিতেই কাঁপে!কপালে হাত দিতেই ফের শিউরে উঠে বলল ও আল্লাহগো…!জ্বর তো দেখি ঢের বেড়ে গেছে,ওরে মানিক সোনা আমার,আহারে…!
মাকে দুঃশ্চিন্তা আর ভয়ের মধ্যে ফেলতে চায় না মানিক চাঁদ।তাই শুষ্ক ঠোটে হাঁসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল খামখা দুঃশ্চিন্তা করছো মা,বললাম তো আমি এখন দিব্বি ভালো আছি,অত ভয় পেয়ো নাতো!যদিও মানিক চাঁদ সেদিন সান্তনা দেবার চেষ্টা করেছিল মাকে,কিন্তু অবস্থা এতটাই বেগতিক হয়ে গিয়েছিল যে,তার আশা প্রায় ছেড়েই দিতে হয়েছিল যেন।অবশেষে হপ্তাখানিক পর,ধীরে ধীরে জ্বর কমতে শুরু করে তার।মোটের উপর হপ্তা দুইতো লেগেইছিল,পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে ওর।বিছেন ছেড়ে উঠতে না উঠতেই ফের কাঁচি মাথাল হাতে ছুট দিলো মাঠের পানে।কারণ ওর মন যে কেবল পড়ে রয়েছে ধানী জমিতে!মায়ের কোন নিষেধ বারণ কিছুই শুনলো না সে।

গায়ের পূব দিকের পথ ধরে সোজা অর্ধ মাইল হেঁটে গেলেই,রাস্তা থেকে কয়েক জমি দূরে,কাজলা বিলের ধারে,মানিক চাঁদের দশ কাঁঠা জমি।কাচা মাটির রাস্তাটা অবশ্য গ্রাম পেরোবার পরেই,বুকের দুধার দিয়ে অবারিত সবুজের সমারাহো বয়ে নিয়ে চলেছে,দূরের কোন গায়ের সীমানায়।যেদিকে দুচোখ যায়,কেবল গোছা গোছা ধান গাছ আর বুকের উপর অসম্ভব আহ্লাদে কেলিয়ে পড়া ধানের শিষের বায়ু কীর্তন চলছে যেন জমি গুলোর দুধে ধানের ছড়া বেশ শক্ত হয়ে উঠেছে এ কদিনে।এই অবারিত সবুজের দিকে চাইলে,পরম তৃপ্তিতে বুকটা যেন ভরে ওঠে অনায়াসে।পাজোর জোড়াতে জমাট বাঁধে সুখের বাতাস।কি দুরাবস্থা যে হয়েছে জমি খানির কে জানে?সম্বল যা আছে,স্বপ্ন যা দেখা তা তো কেবল ওই দশ কাঠা জমি ঘিরেই।অমন বিশ্রিভাবে হাত কাটার ফলে যা পয়মল হবার হয়েছে,এখন ভালোই ভালোই জমিটার যত্ন আত্নী করতে পারলেই হয়।হঠাৎ করেই নিজের জমি খানির কথা মনে পড়লো তার।নগ্ন পায়ে হাঁটতে হাঁটতে,রাস্তা হতে এক পায়ো পথে নেমে গিয়ে,কয়েকটি জমির আল মাড়িয়ে,হারু কাকার স্যালো মেশিন পেরিয়ে,বড় নালাটির পাড়ে দাঁড়াতেই,বিষ্ময়ে হতভম্বের মত কিছুক্ষন এক দৃষ্টে চেয়ে,বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে উঠলো মানিক চাঁদ।হাই আল্লাহ!এসব কি দেখছি আমি?এ জমি কি আমার সেই জমি?আগাছার আস্ফালনে ধানের গোছা চেনা বড় দায়,ভুঁই জুড়ে শ্যামা ঘাস আর মাজরা পোকা বসত বাড়ি গড়েছে যেন।যে জমির মাটি সারা বছর থাকে পঁচ পঁচে কাঁদার মত নরম,তার বুকে এমন সব বড় বড় ফাঁটল যেন,এক নদী জল দিলেও পূর্ণ হবে না ওর অন্তঃক্ষত।গাছে না আছে বাড়,শিষে না আছে পুষ্টি,সার সেঁচের অভাব আর অবহেলায় এমন দশা হয়েছে জমিটির,যে সারা মাঠে সবুজের ভিড়ে কেবল অর্ধ মৃত,কিছুটা হলদে,কিছুটা ফ্যাকাশে,এই এক খানা জমি চেনা যায় অতি সহজে।নিমেষেই খান খান হয়ে গেল মনের যত আশা,যত অনুপ্রেরণা ছিল উবে গেল সব শরতের মেঘের মত।মাথাল কাঁচি ফেলে,ধপাস করে আলের পরে বসে পড়লো মানিক চাঁদ।দূর থেকে শোনা গেল,কে যেন বলছে,নিড়নি দিয়ে জল দেরে ব্যাটা জল দে,চিন্তে করিসনে,আবার খাড়া হয়ে যাবে তোর ধানের রোয়া।জমির আগাছা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে সান্তনা দিলো হারু মুন্সি।মোনটা যেন বিষিয়ে ছেদিয়ে উঠলো মুহুর্তেই।মুখখানা আলতো ভাবে বাঁকিয়ে,বলে উঠলো তোমার অতো দরদ দেখাতে হবে না।অতঃপর মুখ খানা ঘুরিয়ে নিজের জমির দিকে চেয়ে,বিড়বিড় করে বলে উঠলো কঞ্জুস একটা!গজব পড়ুক তোর স্যালোর উপর।গজব পড়ুক।
অত্যন্ত বিষন্ন মনে মাথায় মাথাল চেপে,কাঁচি হাতে নিয়ে জমিতে নেমে পড়লো মানিক চাঁদ।শুরুতেই কিছুটা কষ্ট হচ্ছিলো তার,কাটা হাতে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করছিলো যেন,দুপাই নিড়নোর পরই ফের হাত খুলে যেতে শুরু করে।ঝড়ো গতিতে কাঁচি চলতে থাকে,একের পর এক শ্যামা ঘাসের সাথে অন্যান্য আগাছা কেটে ছিড়ে জমির বুকের উপর থেকে যেন মৃত্যু দূত সরিয়ে দিতে লাগলো মানিক চাঁদ।কাজের ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় সব ফাঁটল,পা দিয়ে চেপে চেপে কোন রকমে বন্ধ করে দিতে লাগলো সে।কয়েক পাই নিড়নোর পরই মনের মধ্যে ফুর্তি ফিরে এলো তার।পুরোনো দিনের কথা,পেছনের দুঃখ গাঁথা,এমনকি জমিটার দূর্দশার কথা সব কিছু ভুলে গেল।দুপুর গড়াতে না গড়াতেই জমির অর্ধেক আগাছা সাফ করে ফেলল মানিক চাঁদ।আগাছা মুক্ত হয়ে ধানের গোছা গুলো যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো আবার,দেখে বড্ড তৃপ্তি লাগলো প্রাণে।কোন প্রকার বিরতী ছাড়া,সূর্যটা বেয়াড়া হওয়া অব্দি নিড়নি চলতেই থাকলো।হঠাৎ কার যেন অট্ট হাঁসিতে কিঞ্চিৎ থমকে দাঁড়ালো কাঁচির ধারালো গতির খিপ্রতা।ঘর্মাক্ত আর ভেজা ভেজা শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে।আকাশে বাতাসে আবার ভেসে বেড়াতে লাগলো সেই চিরচেনা অট্ট হাসির ঝিলিক।মানিক চাঁদ ভিষন লজ্জা পেয়ে বসে পড়লো গাছের আড়ালে,তা ছাড়া যে আর উপায় ছিল না।কারন ও হাসি যে আর কারো নয়,শেফালির!শেষবার যে হাসিটা সে হেসেছে,তা কেবল তাকে দেখতে পেয়ে।ধানি জমি থেকেই শোনা গেল,কই গো মানিক চাঁদ,বাপজানে ডাকে তোমারে,খাইবানি গো,বুট ঝালের সাথে জবের ছাতু?আধ বসা অবস্থায় এক গোছা শ্যামা ঘাসে পোচ লাগিয়ে,মানিক চাঁদ বলে উঠলো বাপ ঝি মিলে খাও গিয়ে,জবের ছাতু আমি খাই না।ফের হেসে ওঠার শব্দ শোনা গেল।শেফালি চেচিয়ে উঠে যেন বলল,বাপজান আপনার খাটুনে বুড়ো জবের ছাতু খায় না,দুটো বুট ঝাল দিয়ো তাকে,বড্ড খেপেছে বোধ হয়।অতঃপর আবার ফিক করে হেসে উঠে,নুপুর বাধা পায়ের গোছা নাড়িয়ে,আল পেরিয়ে গেল শেফালি।
সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা,ছেলে ছোকরা কাউকে মানে না দেখছি!যাক গে বাঁচা গেল,বিদেয় হয়েছে সত্বর।হাঁফ ছেড়ে দিয়ে,মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠলো মানিক চাঁদ,আচ্ছা ওকে দেখে এত ভয় কিসের?কিসের অত ভয়?ধ্যাত্তিরিকা কি সব আজে বাজে ভাবছি,স্থীর থাকা কাঁচি হতে চোখ সরিয়ে,উপরে তাকাতেই বলে উঠলো সূর্য যে ঢলে পড়লো বলে!ঢের কাজ বাকি রয়েছে,ওসব সিঁকেই তোলা থাক এখন,বলেই ফের পোচ লাগালো ঘাসে,পাইয়ের পর পাই সাফ করে চলল মানিক চাঁদ।পেছন ফিরে তাকাবার ফুসরত টুকু রইলো না আর।কাঁচি চালাতে চালাতে মনে মনে স্থীর করে ফেলল,আগাছা পরিষ্কার হলেই নালী কেটে বিল থেকে জলের ব্যবস্থা করবে সে।জল চুইয়ে না দিয়ে কেবল মাত্র ছিটিয়ে দিলে গাছ বাঁচানো যাবে না কোন ভাবেই।আর সে কাজ আজই করবে সে।তাতে দিন পেরিয়ে রাত নেমে এলেও কিচ্ছুটি ক্ষতি হবে না তার।অন্য উপায় যদিও একটা রয়েছে,তবুও ওই হারু মুন্সির মত অমন একটা নির্দয় কঞ্জুসের হাতে পায়ে ধরবে না সে জলের জন্য।নানান সব ভাবনার মাঝে কখন যে শেষ পাই নিড়িয়ে ফেলল মানিক চাঁদ,ঠওর করতে পারলো না যেন।খুশিতে মনটা ভরে উঠলো তার।জমাট বাধা আগাছার স্তুপ দেখে কিছুটা খিস্তি করলো ঘাসের উপর,এখন কেমন লাগে?আমার জমিতে হানা!কেমন লাগে এখন?
কোমরের গামছা খুলে ঘামে ভিজে যাওয়া মুখ খানা মুছে নিয়ে,গামছাটি আবার কোমরে জড়িয়ে নালি কাটার কাজ শুরু করলো সে।সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল,ঘোর অন্ধকার নেমে এলো চারিদিকে।পুরো মাঠ যেন নিরব হয়ে উঠলো।চারি দিকে সবুজ ধানের গন্ধ,ঝিঝি পোকার আলো আঁধারি খেলা,আর সেই সাথে নাকে ভেসে এলো কাজলার পচা কাঁদার গন্ধ।অর্থাৎ নালী কাটা বুঝি শেষ হল প্রায়,আর দু কোঁদাল কাটলেই,জলের দেখা মিলবে হয়তবা।আর তাই এখানেই বড় গর্ত করে,সেখান থেকেই জল সেঁচে নালীতে ফেলতে হবে,সেই জল নালী বেয়ে গিয়ে পড়বে জমিতে।তবে তার আগে কিছুটা ইউরিয়া আর ফসফেট ছিটিয়ে দিতে চায় সে,কবির কাকার কাছ থেকে হাওলাত করা টাকা দিয়ে,চুরি করে সার কিনেছে মানিক চাঁদ।যদিও এ ব্যপারে কিছুই জানে না মা।জানলে হয়তবা আর যাই হোক সার কেনা হয়ে উঠতো না ওর।জমিতে সেঁচ দেবার পূর্বে,ওই সার গুলোই ছিটিয়ে দেবে ও।গর্ত তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে,আত্ন তৃপ্তি নিয়ে,মনের সুখে সিটি বাজাতে বাজাতে প্রায় অর্ধ রাত পার করে,সেদিনের মত বাড়ি ফিরে গেল মানিক চাঁদ।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠে সার গুলো মাথায় চেপে মায়ের অগোচরেই মাঠের পানে ছুট দিল সে।সংগে করে নিয়ে গেল কয়েকটা শুকনো বাঁশের কোঞ্চি।ওগুলো দিয়ে পাখি বসার জায়গা করে দিবে।পোকা নিধনের জন্য এ ছাড়া যে আর বিশেষ উপায় নেই তার।অবশ্য পোকা দমনের জন্য আরো দুটো বুদ্ধি ভেবে রেখেছে সে।সেঁচের কাজ শেষ হলেই কেবল বাকি দুটো বুদ্ধি কাজে লাগাবে বলে স্থীর করলো,কোঞ্চি পুতে দিতে দিতে।প্রথমত বিল থেকে কিছু ব্যাঙ সংগ্রহ করে জমিতে ছেড়ে দেওয়া,কারন পোকা মাকড় খেয়ে কিছুটা সাহায্য করবে উভচরটি।দ্বিতীয়ত জমিতে ঘুরে ঘুরে আক্রান্ত পাতা মলে দিয়ে পোকা দমন করা।যাইহোক কোঞ্চি গুলো নির্দিষ্ট দুরত্বে পুতে দিয়ে,সার ছিটিয়ে,সেঁচের কাজে হাত দিল সে।কয়েক মুহুর্ত পরেই এক জোড়া ফিঙে এসে ঠায় নিলো কোঞ্চি গুলোর একটিতে।পোকা খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামলো যেন খেঁচর দুটি।বুদ্ধিটা তাহলে কাজেই লাগলো বটে,হাসির রেখা ফুটে উঠলো মানিক চাঁদের মুখে।সেঁচের কাজ সম্পন্ন হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বুদ্ধিও কাজে লাগালো সে।ফলও আসতে লাগলো হাতেনাতে।সেঁচের কাজ চলতে লাগলো প্রতিনিয়ত,অল্প দিনের মধ্যেই হালচাল পালটে গেল দশ কাঁঠা জমির।গায়ের চাষীরা অবাক বিষ্ময়ে চেয়ে থাকে জমি খানির পানে।গোছা গোছা ধান গাছ,সবাইকে ছাড়িয়ে যেন মাথা খাড়া করে দাঁড়ালো।শীষে ভরা ধানের ছড়া গুলোর ভারে যেন নুয়ে পড়বার মত অবস্থা হল গাছের।এত ভালো ধান আর কোন দিন ফলে নি জমি খানিতে,অথচ এইতো কদিন আগেও যেন মনে হচ্ছিলো,কয়েক পাজা খড় আর কিছু চিটে ধান ছাড়া কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়।মাঠের সেরা জমিটি ফের সেরা অবস্থানেই ফিরে এলো।ইতমধ্যে হলদে হতে শুরু করেছে ধানের ছড়া,কাঁচা পাকা গন্ধে মন মাতোয়ারা হয়ে ওঠে মানিক চাঁদের।খুব শিঘ্রই হয়তবা কাঁচি চালাতে পারবে সে।এই দশ কাঁঠা জমির জন্যই কেবল এবারের নবান্ন তার জন্য হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আর যে তর সইছে না তার,কারন জমি থেকে প্রাপ্ত ধান বেঁচেই,মাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য শহরে যাবে সে।দিন দিন মায়ের অবস্থাও বেশ সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে যেন।কিছুদিন যাবৎ বাবার মত কাশির সাথে রক্ত উঠছে তার ও।জমিতে পোচ লাগাবার পূর্বে,শেষবারের মত সেঁচ দিয়ে তরা করে বাড়িতে ফিরে গেল মানিক চাঁদ।

ধানের মওসুম শুরু হয়ে যাবার পর ধান কাটার জন্য বড্ড লোকের অভাব দেখা দিলো।দু চার জন যা পাওয়া যায়,মূল্য ঢের বেশি চায়।মন প্রতি মাত্র পাঁচশত টাকায় ধান বিক্রি হচ্ছে বাজারে,অথচ সেই একই ধান কেটে ঘরে তুলতে গেলে,জন প্রতি গুনতে হবে সাতশত টাকা।এ যে বড় অনাচার!গরিবের পেটে লাথি মারার এ আবার কেমন ফাঁদ?গরিব দিয়েই গরিবের নাশ!এই অনাচার মেনে নেয়া যায় না,আর তাই বাধ্য হয়ে সারা গায়ের চাষীরা কিসের যেন বণ ডেকেছে।মানিক চাঁদ ওসব ধর্ম ঘটের ধার ধারে না,নিজের জমির ধান নিজেই কাটবে সে,তার তো কেবল ওই অতটুকু জমি।অনায়াসে সব কাজ সম্পন্ন করতে পারবে সে।
হঠাৎ করেই সারা দেশ কেমন যেন উত্তাল হয়ে উঠলো।অধিকার আদায়ে সোচচার হয়ে উঠলো সবাই।হারুন মুন্সি,কবির কাকা,নুরু মাস্টার,নজু মাঝি,সবাই গিয়ে যোগ দিয়েছে চাষী বাঁচাও আন্দলোনে।বড্ড ইচ্ছে থাকা সত্বেও কোথাও যেতে পারলো না মানিক চাঁদ।আর তা কেবল তার মায়ের অসুস্থতার দরুন।দিন যত যেতে লাগলো,মায়ের অবস্থা যেন আরো সংকোটাপন্ন হয়ে উঠলো।যদিও জমির ধান এখনো কিছুটা কাঁচা,তবুও স্থীর করলো কালই পোচ লাগাবে সে।মায়ের চিকিৎসার জন্যে সম্বল তো কেবল ওই দশ কাঁঠা জমি খানি।
একদিকে মায়ের জন্য দুঃশ্চিন্তা অপর দিকে নতুন ধান কাটবার জন্য বিচলিত মন,হৃদয়ের এমন শিহরন সারা রাত ঘুমোতে দিলো না তাকে।ভোর হতে না হতেই,মাথাল কাঁচি হাতে মাঠের পানে ছুট দিলো মানিক চাঁদ।মনের মধ্যে নানান সব চিন্তা গিজ গিজ করে উঠলো তার,কোন পাশ থেকে পাই শুরু করবে,কয় গোছা মুঠো দিয়ে বিচলি ফেলবে।কয়দিন ধরে শুকোবে রোদে,বিচলি বাড়ি উঠাতে কি উপায় সে গ্রহণ করবে,মাথায় বোঝা বহন করে,নাকি কঞ্জুসটার গরুর গাড়ি ধার চাইবে সে।হাজারটা ভাবনা ভাবতে ভাবতেই মাঠে পৌছে গেল মানিক চাঁদ।
মেশিন ঘর পেরোতেই আচমকা থতোমতো খেয়ে উঠলো সে।এক মুহুর্তের জন্য কেবল মনে হল,পথ ভুল করে ফেলেছে বোধহয়,পরক্ষনেই চতুর্পাশ্বে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভাবতে লাগলো না ঠিক জায়গাতেই তো এসেছি।ও…ও…ওই…তো আমার দশ কাঁঠা ধানি জমি!কিন্তু অমন ধোঁয়ার মত লাগছে কেন?হলদে হয়ে উঠা সোনালী ধানের ছড়া দেখতে পাচ্ছি না কেন?তা…তা… তাহলে কি…?
বিভিশিখা ময় রুপ নিয়ে চোখ জোড়াতে যা ভেষে এলো তা কেবল নিকোষ কালো মেঘের মত রাশি রাশি ধোঁয়া,আর তাপালে ভাঁপ দেয়া সেদ্ধ ধানের ঘ্রাণ।দাও দাও করে জ্বলে ওঠা লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে সারাটা মাঠ জুড়ে।চোখের সামনেই যেন খই ফুটে চলেছে এ গা থেকে ও গায়ের বুকের উপর দিয়ে।চাষীরা ধানের ন্যায্য মুল্য না পেয়ে,সযত্নে লালন পালন করে গড়ে তোলা স্বপ্নের সোনালী পাকা পাকা গন্ধময় আমন ধানে আগুন লাগিয়েছে গত রাতে!কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পোড়া মাটির উপর বসে পড়লো মানিক চাঁদ।এখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার।গত কালও যে জমিতে সারি সারি পাকা ধানের ছড়া ঝুলেছিল,আজ সেখানে পোড়া পাজার রুক্ষ প্রাণে হৃদয় পোড়া গন্ধ!
হঠাৎ দূরে কাঁচা রাস্তায়,গায়ের ওদিক থেকে কাউকে ছুটে আসতে দেখা গেল।কুয়াসা ভেদ করে আরো নিকট বর্তী হলে স্পষ্ট চেনা গেল,শেফালি!পড়িমরি করে ছুটে আসছে মাঠের পানে।আজ আর নেই সেই মুচকি হাসি,না আছে ঘুঙুরের শব্দ,না কোন প্রকার ভেঙচি কাটলো আজ।কেমন যেন হতাশা আর দুঃশ্চিন্তার বলি রেখা ফুটে উঠেছে তার কিশোরী মুখে।রাস্তায় দাড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে শংকিত গলায় ডেকে উঠলো,মানিক চাঁদ,শিগগির বাড়ি চলো গো,শিগগির বাড়ি চলো,কাকিমা কেমন যেন করছে……

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement