রাতের খাবার সেরে রেস্টুরেন্ট থেকে মাত্র রাস্তায় পা ফেলেছি—অমনি ফোন বেজে উঠল, ‘ফেরার পথে একটা কাপড় কাচার বল সাবান এনো।’
‘ঠিক আছে।’
হাঁটতে শুরু করি। হঠাৎ খেয়াল হয় ফোনটা তো চার্জ ফুরিয়ে বিকেল হতে বন্ধ। ‘হ্যাঁ বন্ধই তো!’ তাহলে ফোন এল কীভাবে? হয়ত চাপ লেগে ওপেন হয়ে থাকতে পারে, লো চার্জ তাই কথা শেষে ফের বন্ধ হয়ে আছে।

বাসার সামনের মোড়ের দোকান থেকে ‌ঝুমার কথা মত বল সাবান কিনে ঘরে ঢুকি। শরীর, জামা-কাপড় দিয়ে ঘামের দুর্গন্ধ ছুটছে। এতক্ষণ টের পাইনি, বন্ধ ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। শাওয়ার নিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ডিম লাইট জ্বেলে শুয়ে পড়ি। সপ্তাহ হয় অন্ধকার ঘরে বড় অস্বস্তি বোধ করি। আগে চোখে সামান্য আলো পড়লে ঘুম আসতে চাইত না। এই নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই মন কষাকষি চলত। আসলে ইদানীং ঝুমা যে-কোন মতামত আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। আমি অবাক হয়ে দেখি। আমার অসুবিধার কথা কখনও চিন্তা করে না সে। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না মোটেই। ওর প্রমোশন হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আচরণ কেমন দিন দিন বদলে যেতে শুরু করেছে। সেদিনের কথা খুব মনে আছে— প্রমোশনের সংবাদ শুনে প্রথমে বেশ খুশি হয়েছিলাম, প্রমোশন মানে তো কয়টা টাকা বেশি পাওয়া। কিন্তু টাকা বৃদ্ধির ফলে ঝুমা যেন বদলে গেল চোখের পলকে। বাজে খরচা বাড়িয়ে দিল, মোটা একটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে লাগল বিউটি পার্লারে। অফিসিয়াল ট্যুর যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছে। বলে, ‘নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। সবাই কে দেখিয়ে দিতে হবে না? আমার যোগ্যতা কতটুকু। দেখবে দেখবে দুদিন পর ওদের চোখ কপালে তুলব, তারপর আমার পায়ে নামাব।’
‘কে কে যাচ্ছ?’
‘তুমি কি আর সবাই কে চিনবে? সাইফুল সাহেব আমাদের লিডার।’
হ্যাঁ আমি ওই নামটাই জানতে চাচ্ছিলাম—ঐ ব্যাটা তো যাবেই—সে না হলে কি আর ট্যুর হয়। কেন যেন লোকটাকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। একথা সত্যি যে সাইফুল লোকটা ঝুমাকে পদন্নোতি পেতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবু লোকটা যখন ‘আরে জুবায়ের সাহেব যে...’ বলে করমর্দন করতে হাত ঝাঁকুনি মারে, আমার পিত্তি জ্বলে ওঠে। তার কেলানো দাঁতগুলো দেখে আমার ছুঁচোর কথা মনে পড়ে যায়। আর ছুঁচোর মতই সারা গা দুর্গন্ধে ভরা। পুরো শিশি পারফিউম ঢেলেও গন্ধটা দূর করতে পারে না।

দু চোখে হালকা ঘুম নেমে এসেছে কেবলই। দৃষ্টি টেবিলে পড়তেই চোখ ছানাবড়া। যেখানটায় বল সাবানটা রেখেছি দেখি সাবানটা নেই, সেখানে একটা কাটা মুণ্ডু! উত্তেজনায় কখন বিছানায় উঠে বসেছি, বুঝিনি।
‘কেমন আছো তুমি?’
কাটা মুণ্ডুটা কথা বলে ওঠে। কথা বলার সময় কান দুটো নড়ছে। টেবিলটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কালচে রক্ত ফোঁটা ফোঁটা টেবিল গড়িয়ে মেঝেয় পড়ছে। ভয়ে আমার দম বন্ধ হবার উপক্রম।
‘একটু চা খেতে ইচ্ছে করছে...খাওয়াবে? না আমিই যাচ্ছি...’
বলে কী! সাবানটা চা খেতে চায়! ভাল করে চোখ রগড়াই—না সত্যিই সাবানটি কোথায়? ‘ওটা তো...’
সমস্ত শরীরের রোম দাড়িয়ে গেছে, রোমকূপগুলো ফুলে সারা গা ঘামাচিতে ভরে উঠেছে। তোতলাতে তোতলাতে মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে গেল ‘হরলিক্সের...’ আমায় বাধা দিয়ে হেসে মুণ্ডুটা বলে ‘আমার জানা আছে। তুমি কি চা খাবে?’
আমি কী করব, কী বলব বুঝতে না পেরে ঢোক গিলে মাথা হেলাই। মুণ্ডুটা হঠাৎ শূন্যে উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। আমি দুচোখ বন্ধ করে ফেলি। কিছু সময় পর শুনতে পাই ‘এই নাও তোমার চা, ধরো। আর চোখ বন্ধ করে এত কী ভাবছ?’
আমি চোখ খুলে দেখি আমার মুখের সামনে কাটা মুণ্ডুটা শূন্যে হাসছে। পিরিচসহ ধূমায়িত চায়ের কাপ দুটো শূন্যে স্থির হয়ে আছে। সে মুচকি হাসে—চোখ মারে আমাকে। একটি কাপ পিরিচ থেকে উঠে গিয়ে মুণ্ডুটার ঠোঁটে কাত হয়ে যায়। সে বেশ শব্দ করে সুড়ুত করে চা টেনে নেয়।
‘তুমি খাও। দেখো ভাল হয়েছে।’
আমি হাত এগিয়ে পিরিচটা ধরি। আতঙ্কগ্রস্ত হাত কাঁপতে কাঁপতে কাপ তুলে ধরি, ঠোঁটের কাছে। সে আবার মুচকি হেসে আমায় চোখ মারে। আমি পেছিয়ে যাই।
‘খাও। দেখো ভাল হয়েছে।’
হ্যাঁ সত্যি চা-টা দারুণ হয়েছে— একদম ঝুমার হাতের চায়ের মত।
‘এটা কি ঝুমা বানিয়ে দিয়েছে?’
সে হা হা করে হেসে ওঠে। আমি একদম জড়সড় হয়ে পড়ি।
‘ঝুমাকে কোথায় পাব? সে তো মামাত বোনের কাছে বেড়াতে গিয়েছে। তাই না? তুমি তো বাড়িওয়ালীকে কাল তাই বললে।’
গলা, চোখ, নাক থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে বিছানায়। হঠাৎ লক্ষ করলাম, চোখ দুটো টকটকে লাল। সেটা এত জ্বলজ্বলে যে চোখে তাকালে চোখ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। আর চোখ বরাবর দুটো গহ্বর— সেখানটায় রক্ত টগবগ করে ফুটছে, ধোঁয়া উঠছে। আমি চিৎকার দিয়ে কাপ-পিরিচ ছুঁড়ে দেই। আশ্চর্য সেটা কোথাও আছড়ে না পড়ে একটা ধুতরা ফলে রূপান্তরিত হয়। সেটা সারা ঘর ঘুরতে ঘুরতে সাই করে আমার মুখের ভেতর ঢুকে গলায় আটকে যায়। গলায় মোচড়াতে থাকে। আমি খক খক করে কাশতে থাকি। হয়ত জোরেই কাশির শব্দটা হয়েছে— পাশের ফ্ল্যাটের ভাই ‘এমন অদ্ভুত শব্দ কীসের?’ জিজ্ঞেস করে স্ত্রীকে। মুণ্ডুটি হঠাৎ বিরাটাকৃতির জিহ্বা বের করে আমার গাল চাটতে থাকে। ভারী বিশ্রী গন্ধ তাতে, আঁশটে ধরণের— ধারাল শিরিশ কাগজের মত। গাল জ্বলতে শুরু করে, বুঝতে পারি গাল ছড়ে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। চপচপ করে সে রক্ত পান করতে থাকে আর বলে ‘বেশ স্বাদ! ইদানীং লবণ বেশি খাচ্ছ।’
আমার গালে আরও ঠেসে চুষতে থাকে। নিশ্বাসে পচা মরা-মানুষের গন্ধ! আমার গা গুলিয়ে ওঠে। তারপর আমার ঠোঁটে জবজবে রক্তে ভেজা ওর ঠোঁট ডুবিয়ে লম্বা একটা চুমু খায়।
‘লক্ষ্মী-সোনা ভাল থেকো...’
ফের চোখ মারে আমায়। বড় বড় সূচলো দাঁত বের করে ভেঙচি কাটে এবার। একটা চড়চড় কাপড় ছেঁড়ার শব্দের মত অনেকটা, তারপরই মুণ্ডুটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আমার হাত-পা হিম হয়ে আসে। কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকি।

সকাল পর্যন্ত ঘুমতে পারলাম না। মন থেকে কিছুতেই ভয় সরছে না। জানালায় আলোর ছায়া দেখা দেয়। মোরগ গলাবাজি শুরু করে। একটু একটু করে ভয় কাটতে থাকে। সারা রাত নির্ঘুম কেটেছে—দু চোখ ভারি হয়ে আসছে। উঁহু কে এল আবার? একটু ঘুমব তারও উপায় নেই। ‘কে? দুধ লাগবে না।’ আবার ঠক ঠক। আরে বাবা কলিং বেল আছে তো, কোথাকার গেঁয়ো ভূত রে বাবা! দরজা খুলে দেখি পুলিশ! ‘দেখি ওনারা কী প্রয়োজনে এই সাত সকালে...’