লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ মার্চ ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৬)

মেলা
বৈশাখ

সংখ্যা

অজানা আমি

comment ০  favorite ০  import_contacts ২০২

ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেল বাসেদের । রাতে বাসে এতটা পথ ভ্রমণ । অনেকদিন পর একটা বড় ছুটি পাওয়া গেছে । আর সেটার সদ্ব্যবহার করতেই নিজগ্রামে ফিরে আসা । সঙ্গে স্ত্রী-পুত্র তো আছেই । ছোটবেলায় বাসে চড়লেই বমি করে দিত । এ সমস্যা অনেকেরই হয় । এদের মধ্যে অনেকের আবার মাইক্রোবাসে এই সমস্যা কম হয় । বাসেদের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে । মাইক্রোবাসে তার এই সমস্যা বেশী হত । বমি-সমস্যা এখন নেই । তবুও ছোটবেলার বাস ভ্রমণের ভয় ও ক্লান্তি এখনও দূর হয় নি ।

দাঁত ব্রাশ করতে করতে পুকুরপাড়ে চলে এল । সবুজ পানির পুকুর । পুকুরটা আকারে আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে । এখানে ছোটবেলার কত স্মৃতি জড়িত । কত লাফালাফি, সাতার প্রতিযোগিতা আরও কত কি । পুকুরটার একটা বিশেষত্ব ছিল । কয়েকদিন পর পর পানির রঙ বদলে যেত । এটা হত পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড় এবং গাছগুলোর পাতা পড়ে । এগুলো পচে ও শ্যাওলার কারণে সবুজ রঙ তৈরি হত । দুইএকদিন এই অবস্থা থাকার পর পাড়ার ছেলেদের লাফালাফির ফলে পানি ঘোলা হয়ে যেত । তার পরদিন দেখা যেত পরিস্কার পানি ।
পুকুরপাড়ে বসে বাসেদ পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়াচ্ছিল । ছেলের কথায় তার স্মৃতি রোমন্থনের বিঘ্ন ঘটল ।
“আব্বু ,কি করছ?”
“এইত বাবা, পুকুর দেখছি ।”

বাসেদের ছেলের নাম রাশেদ । ছেলেকে আব্বু ডাক শিখাতে চায়নি সে । ছেলে বাবাকে বাবা না ডেকে এইসব আব্বু, ড্যাড বলে ডাকবে কেন? তবুও ছেলে আব্বু ডাক শিখে গেছে তার স্ত্রীর কৃতিত্বে । এটাই নাকি এখনকার স্টাইল ।

রাসেদ আবদারের সুরে বলল, “আব্বু, মেলায় যাব ।”
ছেলের কথায় চমকে ওঠে বাসেদ । “মেলা! কিসের মেলা?” কথাটা বলেই অনেকটা লজ্জায় পড়ে যায় । আজ ১৪ই এপ্রিল । পহেলা বৈশাখ । পনের বিশ বছর আগে এই দিনটাকে ঘিরে কত উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল তার । এই উৎসাহ উদ্দীপনার কেন্দ্রে ছিল এই মেলা । মাস দেড়েক আগে থেকে দিন গোণা শুরু । সাথে সাথে টাকা জমানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া, বড়দের কাছ থেকে টাকা নেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হত । অথচ আজ সময়ের ব্যবধানে এই দিনটার কথা মনেই নেই তার ।
“ওরা যে বলল ।”
“ বিকেলে যাব রাশেদ । এখন খেলতে যাও ।”


ছেলেকে নিয়ে মেলার দিকে এগুচ্ছে বাসেদ । তাদের গ্রাম থেকে সাত আট কিলোমিটার তো হবেই । তার বয়স তখন সাত আট হবে । সেই সময় পর্যন্ত মেলার কথা মনে করতে পারে । তার আগে বাবা তাকে মেলায় নিয়ে গিয়েছিল কিনা তার মনে নেই । তারপর থেকে প্রতি বছর যাওয়া চলতই । কিন্তু পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়ার পর থেকে আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি । বছরে কয়েকবার বাড়ি যাওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সময়টাতে আর আসা হয় নি তার ।
রাস্তাগুলো এখন বেশ উন্নত । একটা মোটরচালিত ভ্যানগাড়িতে করে বাজারে চলে আসে তারা । মেলার আর বেশী দূর নাই । ছেলের চোখেমুখে নতুন কিছু দেখার আনন্দ । আর তার মস্তিস্কে চলছে পুরনো কিছু স্মৃতির রোমন্থন । আগে মেলা ছিল বাজার থেকে অনেকটা দুরে । মুল কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাবার উপায় ছিল না । ভ্যান-সাইকেলে ভর্তি । রাস্তা থেকে নেমে কিছু উঁচু জমি পার হতে হত । তারপর বেশখানিক্টা ধানি জমি পার হয়ে আবার কিছু উঁচু জমি । এরপর মাঠ । ঈদের নামাজ পড়ার কাজেও ব্যাবহার করা হত এই মাঠ । এই বিশাল মাঠ, একটু দূরের পুকুর এবং তার আশেপাশের জমিকে ঘিরেই গড়ে উঠত এই মেলা ।

পহেলা বৈশাখের দিন মেলা । অবশ্য তার আগের দিনেও মেলা বসে । তবে তা মেয়েদের জন্যে । কিশোর তরুণ এরাও অবশ্য যেত । হতে পারে তা বয়সের দোষ । বাড়ি ছাড়ার আগে বাসেদও দুই একবার গিয়েছে । নিতান্তই কৌতুহল বসে ।

বাজার থেকেই মূলত মেলা শুরু হয়েছে । এখানে বেশীরভাগই খাবারের দোকান । বড় ছোট নানান ধরণের মিষ্টি যেমন আছে তেমনি মুড়ি-মুড়কি বাতাসাও আছে । মাটির জিনিসপত্রের দোকানও আছে এখানে কিছু । বাজার থেকে বের হওয়ার রাস্তার পাশে খাট পালঙ্কের মেলা । বাসেদের স্পষ্ট মনে আছে মেলার এই অংশটা আরও কিছু দুরে উঁচু জমিগুলোতে থাকত । এখন মানুষ জমি দিচ্ছে না বলেই হয়ত বাজারে আনা হয়েছে ।

ছেলের দিকে তাকাল সে । এত মানুষ দেখে সে কিছুটা ভড়কে গেছে । রাশেদকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে বাজার থেকে বের হল । আগের ফাঁকা জমির বেশীরভাগই আর ফাঁকা নেই । অনেক বাড়ি দেখা যাচ্ছে । অন্য লোকদের অনুসরণ করে সে বাড়ি গুলোর পাশ দিয়ে ধানি জমিতে নেমে আসল ।

“ওইটাই মেলা?’’ রাশেদ জিজ্ঞেস করে । বাসেদ হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে । দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেলা অনেক ছোট হয়ে গেছে । মাঠ আর পুকুরপাড়েই সীমাবদ্ধ ।

জমিগুলো পেরিয়ে মাঠটায় উঠে আসে ওরা । ছেলেকে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেয় বাসেদ । মাঠের উপর চোখ বুলিয়ে নেয় । চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা । ভেতরেই ছোট শিশু আর মহিলাদের জিনিসপত্রের দোকান । একপাশে নাগরদোলা আর সার্কাস চলছে । অথচ তাদের সময়ে এই মাঠটা ছিল ফাঁকা । বড়রা ছোট বাচ্চাদের বসিয়ে রেখে যেত । সাথে কড়া নির্দেশ, কিছুতেই যেন এখান থেকে না নড়ে । ছোটরাও অন্য কোথাও যেত না । বড়রা পুরো মেলা ঘুরে এসে ছোটদেরকে নিয়ে যেত তাদের জন্যে জিনিসপত্র কিনতে । এরপর মিষ্টি, বাতাসা এসব কিনে আবার মাঠে রেখে যেত । এরপর বাজার-সদাই করে ছোটদের নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিত । এই মাঠ থেকে বের হতে বাসেদের প্রায় পাঁচ ছয় বছর লেগে গিয়েছিল । এই একটি কারণেই সে চেয়েছিল বড় হতে ।

“ আব্বু, ওইটা কি?” নাগরদোলাকে দেখিয়ে জানতে চায় রাশেদ । “ওইটা নাগরদোলা । তুমি চড়বা ওইটাতে ?” রাশেদ হাসিমুখে রাজি হয় । অথচ ভয়ে কোনদিন নাগরদোলায় চড়ে নি সে । একসাথে বাপ-ছেলের নাগরদোলার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল ।
ছেলেকে নিয়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে যায় বাসেদ । এই পুকুরকে নিয়ে কুসংস্কার আছে একটা । এখানকার পানি খেলে নাকি রোগ ভালো হয় । বেশ কয়েকবার সেও খেয়েছিল এই পানি । এতদিনেও লোকজনের এই ধারণার পরিবর্তন হয় নি । অনেক লোককেই দেখা যাচ্ছে হাত দিয়ে তুলে পানি পান করতে । অনেকে বোতলে করে ভরে নিচ্ছে । ছোটবেলার কথা মনে পড়ে হাসি পেল তার । “আব্বু, দেখ দেখ, লোকগুলো নোংরা পানি খাচ্ছে ”রাশেদ অবাক হলো । “ওরা বোঝে না তো তাই খাচ্ছে ”,সে উত্তর দিল ।

পুকুর পাড়ের এদিকে মাটির হাড়ি পাতিল ও অন্যান্য জিনিসপত্রের দোকান । প্রতি মেলা থেকে একটি করে হাতি, ঘোড়া কিংবা কুমড়া আকৃতির মাটির ব্যাংক কেনা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল । এক বছরে ওই ব্যাংকে পয়সা জমানো চলে । টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে হোক আর যে কোন ভাবেই হোক মুল লক্ষ্য ছিল পয়সা জমানো । কখনো নোট বেঁচে গেলে দোকান থেকে নোট বদলিয়ে পয়সা করে নেয়া, বছরশেষে ব্যাংক এ কার বেশী জমা হলো এইসব প্রতিযোগিতার কথা মনে পড়ে গেল । কি মনে করে বাসেদ একটা ঘোড়া আকৃতির ব্যাংক কিনল । রাশেদ জিজ্ঞেস করে, “এইটায় কি হয়, আব্বু?” “এইটা ব্যাংক । এইটাতে টাকা জমিও ।” ছেলেকে দেখে মনে হল সে খুশিই হয়েছে ।

আর একটু এগিয়ে গেলেই অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির সাথেই রয়েছে মাছ বেচাকেনার অংশটুকু । মেলার সবচেয়ে ভিড় এখানেই জমে । বাসেদ ছোটবেলায় বাবা চাচাদেরকে এই মেলা থেকে বড় বড় মাছ কিনে নিয়ে যেতে দেখেছে । চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সে এই জায়গাটাই তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। এইখানে একবার ঢুকলে আর মাটিতে পা ফেলতে হয় না । মানুষজন ঠেলেঠুলেই নিয়ে যায় ।

এতটুকু ছেলেকে নিয়ে এইখানে ঢোকার কোন মানেই হয় না । হাঁটতে হাঁটতে সে ছেলের হাত ধরে দীঘির অন্যপাশে চলে এল । এইখানে একটা মাজার আছে । ছেলেবেলায় দেখত এখানে দুই তিনজন লোক দরবেশ সেজে থাকত আর লোকজন টাকাপয়সা দিত । কিছুটা বড় হয়ে শুনেছে যে এই জায়গাটা ইজারা দেয়া হয় । এই জায়গাগুলো আগের মতই আছে । মানুষের শিক্ষার হার বাড়ছে । কিন্তু বিশ্বাসের জায়গাগুলো আগের মতই থেকে যাচ্ছে ।
পুকুর থেকে এখন তারা রাস্তার দিকে চলে আসল তারা । এর থেকে কিছু দূরেই ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হত । এইটা মনে হয় আর নেই ।
ছেলের দিকে দেখে মায়া লাগল তার । চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে । এখনই ফেরা দরকার সন্ধ্যা হয়ে আসছে ।


পিতাপুত্র সেই মোটরচালিত ভ্যানে করে বাড়ি ফিরছে । সাথে অনেক বড় একটা কাতল মাছ, কিছু খেলনা, জিলাপি, বাতাসা ইত্যাদি । বাসেদের জন্যে এটা ছিল তার স্মৃতি হাতড়ানোর একটা উপলক্ষ্য । আর তার ছেলের জন্যে এইটা সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা । বাসেদ ভাবতে থাকে তার শৈশব কৈশোর কেটেছিল এই গ্রাম্য পরিবেশে । আর ছেলের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো পরিবেশ ।
প্রকৃতির অত্যন্ত কাছাকাছি যায়গায় থেকে এক অকৃত্রিম পরিবেশে বড় হয়েছে তার প্রজন্ম । কিন্তু তার পরবর্তী প্রজন্ম বড় হচ্ছে একটি কৃত্রিম জগতে যেখানে আবহমান বাংলার বেশীরভাগ উপকরণই অনুপস্থিত।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement