এবারের গল্পের বিষয় শিশু। আমার গল্পেও একটি শিশুর আগমনকে ফোকাস করা হয়েছে। শিশুর একটি মায়ের কষ্টকে ভুলিয়ে দেবার ক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। মরণের দান সম্ভব সেটিও এই গল্পের পটভূমিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। কিছু সত্য ঘটনা এবং কিছু কাল্পনিক বিষয়ের সমন্বয় ঘটেছে এই গল্পে। শব্দের গঠণ আরও ভালো হতে পারতো। সময় বেঁধে দেয়ায় ব্যস্ততার কারণে একদিনেই লিখতে হলো। পাঠাবার পর এডিটের সুবিধা থাকলে অবশ্যই নেবো সেই সুযোগটি। এডিটিংই গল্পকে জীবন্ত করে তোলে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২২ অক্টোবর ২০১৯
গল্প/কবিতা: ৯টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

আগমন
শিশু

সংখ্যা

শিল্পী জলী

comment ১  favorite ০  import_contacts ৫৪
বার বার নিকিতার ফোনটি বেজে যাচ্ছে। ভাইব্রেশনে থাকায় শব্দ না হলেও আলোর ঝলকানির প্রতিফলন ঘটছে বার বার । বাধ্য হয়ে চুল কাটার ফাঁকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে সে। কে ফোন করছে এমন? মাম সুজানের ফোন, এই অসময়ে? মামেরতো জানার কথা আজ তার স্কাজিউল ফুল। ক্লায়েন্টের সামনে সে কী করে কাজের মাঝে ফোন রিসিভ করবে? নিজেদের বিজনেস হলেও এপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে হেয়ার ড্রেসারের কাজ করে সে। যদিও আরও দু’জন হেয়ার ড্রেসার আছে তবু কাজের মাঝে ফোন রিসিভ করা শোভা পায় না। তাছাড়া, প্রতিটি কাস্টমারই নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে আসেন চুল কাটাতে, অথবা কালার বা হাইলাইটস করাতে, হয়ত অতি সংক্ষিপ্ত সময় থাকে হাতে। কখনও লাঞ্চ বাদ দিয়ে, কখনও বা কাজে যাবার পথে, অথবা ছুটির দিনটিতে নানা ব্যস্ততার মাঝে নিজের জন্যে একটু সময় বের করে। জীবনের এই দিকটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই গভীরভাবে উপলব্দি করতে হয়েছে নিকিতা।
ফোনকে ইগনোর করে আবার কাজে মননিবেশ করে সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় এই ক্লায়েন্টের চুল কাটা শেষ হতেই ভেতরের রুমে গিয়ে মামকে দু’মিনিটের জন্যে কল করে জানবে সে, কেন বার বার ফোন করেছেন তিনি।
ওদিকে ফোন বেজেই চলেছে। একেবারে বিরামহীন। সেই দেখে কাস্টমার বললেন, তোমার ফোন বাজছে, চাইলে ধরতে পারো।
হায় মাম, এই অসময়ে ফোন? চুল কাঁটছিলাম, তাড়াতাড়ি বলো, কেন ফোন করছো এত?
আজ আর কাজ করতে হবে না। এখনই আসছি সেলুনে, তোমাকে পিক করতে। এর মাঝে পারলে বাঁকী এপয়েন্টমেন্টগুলোও ক্যান্সেল করে ফেলো। শুধু আজ নয়, পুরো সপ্তাহেরই। সময় কম হাতে।
কী যে বলো, নতুন বিজনেস, এমন করলে কী বিজনেস টিকবে? সবে দাঁড় করিয়েছি , কাজে মনোনিবেশ করা জরুরি। আর তুমিই বা আসতে চাইছো কেন এই অসময়ে? আমার গাড়িইতো সাথে আছে, কাজ শেষে নিজেই বাড়ি ফিরতে পারবো।
এখনই আসছি, বলে ফোন কেঁটে দেন মা। আর নিকিতা হ্যালো হ্যালো করতে থাকে। না কানেকশন নেই। নিজেই আবার কল ব্যাক করে । না, ফোনও ধরছেন না আর।
পনের মিনিটের মাথায় ছোটবোন ন্যাটালিকে নিয়ে মা হাজির। নিকিতা কাস্টমারের চুল ডাই করছিল। তারই ফাঁকে একবার চোখ তুলে তাকায়। চুলের রকমারি টানে একেবারে পা এলিয়ে দিয়ে কাস্টমার চোখ বুজে আছেন তখন।
ষোল বছরের ন্যাটালি আজই প্রথম কাজে জয়েন করেছিল। দু’ঘন্টাও যায়নি তার, তাকেও তুলে আনা হয়েছে। ভুরু কুচকে যায় নিকিতার। ভাবছে, মায়ের এহেন আচরণের কারণ কী? আজ তার কী হলো এমন? কাজ কী আর থাকবে ন্যাটালির?
ন্যাটালির মুখ থমথমে। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে তার, গাল গড়িয়ে কেমন বুকের কাছের পুরো গেঞ্জি ভিজে গিয়েছে। নাকও লাল টকটকে, মাঝে মাঝে নাক টানছে সে আর টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছে। হাতও যেনো কাঁপছে। চোখ দু’টো ফোলা, ঠোঁটও। হয়ত সারা পথই কেঁদেছে। ক্ষণে ক্ষণে গভীর করে শ্বাস টানছে সে, যেনো পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছে না। একবার ওর সাথে চোখে চোখ মেলাবার চেস্টা করে ব্যর্থ হলো নিকিতা। না ন্যাটালি আজ তাকাচ্ছে না ওর দিকে। মামও কোন কথা না বলে আরেক হেয়ার ড্রেসারকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ভেতরের রুমে । তার মিনিট দুয়েক পরেই রোজমেরী এসে নিকিতার কাজের দায়িত্ব বুঝে নেয়। বলে, তুমি আজ যাও। আমিই সামলে নেবো সব।
রুমের উপসি্হত সবার উদ্দেশ্য মা বললেন, একটু ইমারজেন্সী আছে, তাই এখনই যেতে হচ্ছে, দুঃখিত!
নিকিতাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ‘এসো’ বলে মা বাইরে বের হয়ে যান দ্রুততার সাথে। ন্যাটালিও পেছন পেছন মাকে অনুসরণ করে। কি যে করো না, বলবেতো কী হয়েছে ,বলতে বলতে মায়ের পিছু নেয় নিকিতাও।
পার্কিংলটে নিজের গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই মা বলেন, আজ আর ওটা নয়, আমার গাড়িতে এসে বসো। পরে গাড়িটিকে বাসায় নেবার ব্যবস্হা করা যাবে। এরই মধ্যে ন্যাটালি পেছনের সিটে উঠে বসেছে। নিকিতা সামনের ড্রাইভারের পাশের সিটে ওঠে বসে। মা ড্রাইভিং সিটে। সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে নিকিতা জিজ্ঞেস করে, এখনতো বলো কী হয়েছে? কেন কাজ বাদ দিয়ে এভাবে আমাদেরকে নিয়ে…
কথা শেষ হবার আগেই মা বলেন, আগে একটু পানি খেয়ে নাও তারপর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শোনো এবং বোঝার চেষ্টা করো। পানির বোতল বাড়িয়ে ধরেন তিনি। ইচ্ছে না থাকলেও কথা না বাড়িয়ে ঝটপট কয়েক ঢোক পানি খেয়ে ফেলে নিকিতা। এরই মাঝে গলাটি কেমন শুকিয়ে গিয়েছিল,ঠান্ডা পানি ভেতরে যেতেই অনুভূত হয় তার। মায়ের দিকে ঘুরে বলে, এবার বলো মাম।
আমাদের খুব কঠিণ সময় নিকিতা। কী যে হয় বলা যায় না। সবাইকে একসাথে থাকতে হবে এখন, একে অন্যের শক্তি হয়ে, সবাইকে শক্ত হতে হবে।
কেন, বাবার কী কিছু হয়েছে? চাকরি চলে গিয়েছে ? অথবা কোন দূর্ঘটনা?
বাবা ঠিক আছে। তবে…
মা দম নিচ্ছেন। অস্হির হয়ে নিকিতা জিজ্ঞেস করে, তবে কী? বলছো না কেন কি হয়েছে? এত সময় নিচ্ছো কেন? বলো না মাম কি হয়েছে?
মায়ের গলা বুজে আসে। কথা বলতে গেলেও কোন স্বর বের হয় না। শুধু আ আ শব্দ বের হচ্ছে। যেনো বোবায় ধরেছে তাকে। কয়েকবার কাঁশি দিয়ে গলা পরিস্কার করে নেন তিনি। অতঃপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, এক্সিডেন্টই, আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে এখন।
কেন?
ঘন্টা খানেক আগে ডেনা ফোন করেছিল।
ড্যাড নিকের এক্সিডেন্ট হয়েছে?
দুই পাশে মাথা ঝাঁকান মা ‘না’।
তাহলে কী সাইমনের?
হুম, বাসার সামনে নাকি মটরবাইক চালাচ্ছিলো পেছনের চাকায় ভর করে, সামনের চাকা উঁচুতে ছিল তখন, যেমন প্রতিদিন চালায়।উল্টে যায় বাইক। হেলমেট ব্যবহার করেনি আজ। রাস্তায় পড়েছিল জ্ঞান হারিয়ে। রক্তে ভেসে যায় রাস্তা। প্রতিবেশী দেখে নাইন ওয়ান ওয়ান কল করেছে। দশ মিনিটের মধ্যে এ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি এসে তাকে নিয়ে গিয়েছে ইমারজেন্সীতে। তারাই কল করেছিল নিক-ডেনাকে। ডেনা ফোন করে জানিয়েছেন আমাদের। তারাও এতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছে গিয়েছেন। খবর পেতেই তোমার ড্যাড চলে গিয়েছেন হাসপাতালে আর আমি এসেছি তোমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে। অবস্হা তেমন ভালো নয়, মাথায় আঘাততো, বলা যায় না কী হয়!
কিযে বলো মাম? কিছুই হবে না ওর। এই সকালেইতো আমাকে লাঞ্চ রেডি করে দিয়েছে। স্যান্ডউইচ, আপেল, ইয়োগার্ট, আর পিচ। বলেছিল, ড্যাডকে নিয়ে আজও ফিশিংয়ে যাবে যদি কিছু ট্রাউট ধরতে পারে। আগের শনিবারতো কিছুই পায়নি। বন্ধুর কাছে থ্রি পয়েন্ট লেকের খোঁজ পেয়েছে ও। ওখানে নাকি ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ধরা পড়ে। কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে তার। মনে হচ্ছে হার্টটি যেনো জাম্প করে হঠাৎ বাইরে বের হয়ে আসতে চাইছে। কান দিয়ে কেমন গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে। হাপাচ্ছে নিকিতা। কিছুক্ষণ এমন চলতে থাকলে তাকেও হয়ত ইমারজেন্সীতে যেতে হবে । সেই সুযোগ তার আর নেই এখন। মাম হাত বাড়িয়ে ধরেন তার হাতটি।
সাইমনে পাশে আজ তাকেই প্রথম দাঁড়াতে হবে । এতদিন সে যেমন তাকে সাহস দিয়েছে, আগলে রেখেছে ঠিক তেমন করে। গভীরভাবে দম নেয় সে। হাতপা আরও কিছুটা এলিয়ে দিয়ে বসে, যেনো হার্টবিটের গতি কিছুটা ধীর হয়। এরই মাঝে চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। ঝাপসা চোখে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে। সারি সারি ক্রিসমাস গাছ শো শো বাতাসের শব্দে ছুটে যাচ্ছে পেছনের দিকে দ্রুততার সাথে। সওর/পঁচাওর মাইল বেগে ছুটছে গাড়িটি। পরিস্কার নীল আকাশ। এক ঝাঁক হাঁস উড়ে যাচ্ছে আকাশ দিয়ে পশ্চিম বরাবর, কোয়াক কোয়াক শব্দ তুলে। হয়ত খাবারের খোঁজে। নাকি নতুন আবাসের সন্ধ্যানে?
এক বছরও হয়নি সাইমনের সাথে নিকিতার বিয়ে হয়েছে। মোট ছয় বছরের যোগাযোগ, তবুও মনে হয় এই তো সেদিন। প্রতিদিনই কেমন নতুন করে ধরা দিচ্ছিলো সে। দু’জন দু’জনকে জানছিল। জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষ সে। এক মুহূর্তও কী কাঁটিয়েছে দু’জন দু’জনকে ছাড়া? পাখির মত করে নিজের মুখের চকলেট মুখে পুরে দিতো সে তার মুখে। সেবার চুলের হাইলাইটস করতে গিয়ে কেমন পুরো চুলই কালার করে ফেলে। একেবারে চুল কেটে চুলের স্টাইল চেঞ্জ করে ঠিক করতে হয়েছিল সেই চুল। কাজ থেকে আসতেই প্রতিদিনই হাতপা ম্যাসাজ, ড্রিঙ্ক বানিয়ে মুখে তুলে দেয়া, আরও কত কী? শুধু কী নিকিতার জন্যে, তার মাম, ড্যাড, বোন সবার সাথেই সাইমনের কেমন আলাদা একটি সম্পর্ক ছিল। তাকে পেয়ে বাবামা যেনো একটি ছেলে পেয়েছিলেন, আর ন্যাটালি একজন ভাই। নিজেদের ছেলে না থাকার কষ্ট আর ছিল না তাদের। ওর যদি কিছু হয়!
জেসনকে নিয়ে মাঝে মাঝেই সাইমন চলে যেতো ফিশিং বা হাইকিংয়ে। নিকিতার কাজের সময়টিতে সুজানকে গ্রোসারি করতে নিয়ে যাওয়া, হাউজ কিপিং, লন্ড্রি, ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট সবকিছুই। ন্যাটালিকেও সকার কোচিংয়ে নিয়ে যেতো সে-ই।
নিকিতার বয়স তখন সবে সতের। গলায় রকমারি মালা পরে লাফ দিয়ে গাছের ডাল ধরে ঝুলতে গিয়ে ডাল ভেঙ্গে পড়ে যায় সাইমন । নিকিতা এবং তার দুই বান্ধবী খিল খিল করে হেসে ওঠে সেই দেখে। কিছুই হয়নি ভাব দেখিয়ে কেমন কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে যায় সে। অথচ তার ডান হাতের কুনুইটি কেঁটে গিয়েছিল তার, ঝর ঝর করে রক্ত ঝরছিল কিন্তু বুঝতেই দেয়নি ওদেরকে। পনেরটি সেলাই লেগেছিল। পরে সবই জেনেছে নিকিতা। সেই থেকে কেমন মায়া পরে যায় ছেলেটির প্রতি। তারপর থেকেই চুপি চুপি দেখার শুরু। সাইমনও কী মায়া জড়িয়েছিল সেদিনই? নইলে বার বারই কেন সে তার সামনাসামনি পড়ে যেতো? দুষ্টুমি করতে করতেই কেমন পরিকল্পনাহীনভাবে ভালোবাসায় জড়িয়ে যায় তারা। আর বয়স উনিশ হতেই একসাথে থাকতে শুরু করে আলাদা এ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে।
সাইমন মাত্র এক বছরের বড় নিকিতার অথচ সংসারের অধিকাংশ দায়িত্বই সে নিয়ে নিয়েছিল কাঁধে। কলেজের পাশাপাশি দু’টো কাজ করতো, সপ্তাহে ছ’দিন। নিকিতাও পড়ালেখার পাশাপাশি স্টারবাক্স কফিশপে কাজ নেয়। অর্থনৈতিক টানপোড়োন কমাতে সাইমন নিজে ক্লাস নিতে থাকে আবার নিকিতাকেও সাহস যোগায় তার পাশে থাকবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তার সহযোগিতার কারণেই হেয়ার ড্রেসারের কোর্সটি নিতে ভর্তি হয় সে। ক্লাস-কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বলতে গেলে বাসার কিছুই করেনি এতদিন। সাইমনই সামলাতো সব। মাত্র তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফলে তারা গত বছর নিজেরাই বিয়ের খরচ জমিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করতে পেরেছে। বিয়ের আগে লোনে একটি বাড়িও কিনেছে। সাইমনই বাড়ির ডাউন পেমেন্ট জমিয়েছিল ডাবল কাজ করে। আবার নিকিতার হেয়ার ড্রেসারের লাইসেন্সও হয়ে গিয়েছে এরই মাঝে। কষ্টের দিন শেষে সবে যখন উঠে দাঁড়িয়েছে তারা, এরই মাঝে এমন দূর্ঘটনা? আর ভাবতে পারে না নিকিতা।
আজ পাঁচ’দিন হলো হাসপাতালে সাইমন। কমাতে। মেডিকেল সাপোর্ট নিয়ে কোনমতে টিকে আছে। এখনও একবারের জন্যেও চোখ খুলে তাকায়নি। ডাক্তারও কোন আশার বাণী দিতে পারছে না। ক্ষণে ক্ষণে নিকিতারও হাতপা অবশ হয়ে আসে। কোন শক্তি নেই যেনো শরীরে। কান্নাও করছে না সে। শুধু কাঁচের জানালায় তাকিয়ে থাকে যদি যন্ত্রপাতির ফাঁকে একবারও সাইমনকে দেখতে পায়।
ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। ডাক্তার বলেছেন, ব্রেন ডেড, আশা নেই। তবুও আশা হারাতে চায় না নিকিতা। যদি একবার জীবনে ফিরে আসে সে। হাতপা না হয় নাই থাকলো, শুধু জীবন থাকলেই চলবে তার। সেটুকু আশাও দিতে পারছেন না ডাক্তার।
এরই মাঝে একজন ডাক্তার এসে তাদেরকে ডেকে নিয়ে গেলেন বিশাল এক কক্ষে। হাসপাতালের প্রোটোকল মোতাবেক তাদেরকে জানানো হলো, সাইমন এন্ডারসন, বয়স চব্বিশ আর বেঁচে নেই। সর্বাওক চেষ্টা করেও তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। জানতে চায় তারা এখন আর কী করে সাহায্য করতে পারেন এই পরিবারটিকে কঠিণ এই সময়টিতে? নিক এবং ডেনা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের একমাত্র ছেলে সাইমন, এই বয়সেই এমন করে চলে গেল। তাদেরও এখন বয়স হয়েছে , শরীরের তত কষ্ট সইবার ক্ষমতা নেই অথচ তেমন কেউ আর নেইও। তাদেরকেই এখন সাইমনের শেষ যাত্রার ব্যবস্হা করতে হবে। যেই সন্তান এতদিন সর্বকাজে পাশে ছিল, সেই আজ শেষ।
নিকিতা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ডাক্তারের দিকে। ডাক্তার কী বললেন কিছুই তার মাথায় ঢোকেনি। মাথা কাজ করছে না মোটেই। হাতপা কেমন ঠান্ডা হয়ে আসছে। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে। সোফায় হেলে পরে নিকিতা। টানা কয়েকদিন ঘুমহীন, খাওয়াহীন অবস্হায় কেটেছে। তবুও আশা ছিল সাইমন ফিরে আসবে। আজ যখন সেই আশাটুকুও শেষ হয়ে গেলো তখন রাজ্যের দূর্বলতা এসে ভর করে শরীরে। ডাক্তারের চিকিৎসায় জ্ঞান ফিরে আসে নিকিতা। স্যালাইন চলছে।
সাইমনের সৎকারের ব্যবস্হা করতে হবে। নিকই সব দায়িত্ব নিয়েছেন নিজের কাঁধে। জেসনও সাথে আছেন। একবার নিকিতার খোঁজ নিচ্ছেন, আবার নিকের পাশে ছুটে যাচ্ছেন। এজেন্সীকে ফোন করা হয়েছে। তারাই অর্ডার অনুযায়ী সব ব্যবস্হা করবে। পাঁচদিন পর সৎকার। এ ক’দিন এজেন্সীই ব্যবস্হা করবে লাশ সংরক্ষণের।
এরই মাঝে নানা রকমের সংস্হা এসে হাজির। শোকবার্তার পাশাপাশি সাইমনের অরগান ডোনেশনের উপকারিতা নিয়ে কথা বলছেন তারা। চব্বিশ বছরের একটি মৃতের বডি মানুষের কতটা উপকারে আসতে পারে, সেসব। না সাইমন ডোনেট করে যায়নি তার বডি। সে সময় প্রকৃতি তাকে দেয়ওনি। তবে তার পরিবার চাইলে এখনও কিছু অর্গান ডোনেট করতে পারেন মানবতার খাতিরে। এমন কী পুরো শরীরও।

আজীবন পরোপকারী ছিল সাইমন। আজ যখন তারই অর্গান প্রার্থনা করা হচ্ছে নিকের পক্ষে আর পুরোপুরি না করা সম্ভব হলো না। তার সন্তানের শরীরের কিছু অংশও যদি বেঁচে থাকে অন্যের অস্তিত্বে, এও বা কম কিসে? তাছাড়া একবার সন্মতি দিতেই কেউ দৃষ্টি ফিরে পাবে, কেউ চেহারা, কেউ বা লিভার। পুরো জীবনই পাল্টে যাবে তাদের। কী করে অমত করবেন তিনি?
হ্যা বলতেই অতিরিক্ত ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে চারিদিকে। নানাবিধ আইনকানুন পালন করে মেডিকেলের ডোনেশনের কার্যক্রম চলছে। দম নেবার সময়ও আর নেই যেনো। ইতিমধ্যেই সাইমনের বডি অপারেশন থিয়েটারে স্হানান্তর করা হয়েছে। চোখ, কিডনি, হার্ট, লিভার, ফেস সবই ডোনেট করা হবে। সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ। চারিদিকে অবিরত ছোটাছুটি ।
নিকিতা সার্বক্ষণিক ডাক্তারের তও্বাবধানে রয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে কাউন্সিলার তার সাথে কথা বলছেন, যেনো এই শোক সামলে নিতে সক্ষম হয় সে। তারই মাঝে ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, আর কী কিছু করতে পারি তোমার জন্যে? নিকিতা বলে, সাইমনের সাথে আমার সংসারতো এখনও পূর্ণ হলো না। ও আমাকে কথা দিয়েছিল আজীবন সাথে থাকবে। দু’বছর পর আরেকটু সাবলম্বী হতেই বাচ্চা নেবার প্লান ছিল। সেওতো হলো না আর? এতোদিন আমি সাইমনের সাথে বেঁচেছি এখন ওর বাচ্চার সাথে নতুন করে আবার বাঁচতে চাই। আমাকে সেই উপায় করে দাও, প্লিজ।
সাইমনের কনসেন্ট আছে কিনা নিকিতাকে স্পার্ম ডোনেট করার, জিজ্ঞেস করতেই জ্ঞান হারায় নিকিতা।
না জীবিত অবস্হায় সাইমন তেমন কোন ডক্যুমেন্ট করে যায়নি। তাই আইনগত ভাবে এটা করার উপায় নেই, যদি না সাইমনের মামড্যাড এতে মত দেন । ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক নিকিতার বাবা জেসন ছুটে যান নিকের কাছে। নিক বলেন, আমিতো আর কিছুই করতে পারবো না। বড় বেশী ক্লান্ত আমি, অন্যান্য ডোনেশন এবং লাশের সৎকার নিয়ে। এই ডোনেশনটি কার্যকর করতে হলে আইন-কানুন, সংরক্ষণ পদ্ধতি সবটুকুই আপনাকেই হ্যান্ডেল করতে হবে। এমন কী ডেনার মতামতও। জেসন ছুটে যায় ডেনার কাছে। বোঝান আপনার মত পেলেই একটি প্রাণ আবার ফিরে আসবে এই পৃথিবীতে সাইমনের হয়ে, নতুন রূপে। একটিবার যদি মত দেন তাহলে নিকিতার প্রাণও বেঁচে যায়।
নিকিতার সাথে ডেনার সম্পর্কও গভীরই। দু’জনই হেয়ারড্রেসার। একই সেলুনের পার্টনার তারা। যখন তখন একজন আরেকজনের বাসায় ছুটে যায়। তবু ডেনা ঠিক বুঝতে পারছে না এই ডোনেশনের পরিণতি কী ? মাত্র বাইশতেইশ বছরের একজন সিঙ্গেল মাম কতটা দায়িত্ব পালন করতে পারবে একটি শিশুর? অথচ সময়ও হাতে তেমন নেই যে একটু ধীরেসুস্হে পদক্ষেপ নেয়া যায়। চব্বিশ ঘন্টার আগেই স্পার্ম সংরক্ষণের ব্যবস্হা নিতে হবে যদি এই ডোনেশনকে কার্যকর করতে হয়। দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই মত দেন তিনি।
মত পেতেই ক্যালিফোর্নিয়ার কাইরো ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করেন জেসন। কন্টাক্ট হতেই তাদের এজেন্ট লেগে যান পদ্ধতিমাফিক স্পার্ম কালেকশন এবং সংরক্ষণের কাজে। সরাসরি টেস্টিকেলস থেকে স্পার্ম কালেকশনের ব্যবস্হা নেয় তারা। আটষট্টিটি ভায়াল সংরক্ষণ করেছে। এক বছরের জন্যে সংরক্ষণের চুক্তি। খরচ তত কম নয়। তবে অনেকগুলো ভায়াল হওয়ায় কিছুটা ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। আপাতত জেসনই যাবতীয় খরচ বহণ করছেন। ছ’মাস পর ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের মাধ্যমে নিকিতার গর্ভধারণের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
স্পার্ম সংরক্ষণের ব্যবস্হা হতেই সাইমনের পরিবার শোক আর আশার আলোয় ঘোরপাক খেতে থাকে। নাতির মুখ যদি দেখতে পায় কিছুটা কষ্ট হয়ত কমবে তাদের। নিকিতারও ঐ একই দশা,সাইমনের শোকে যখন মুহ্যমান হয়ে পরে সন্তানের আশায় তখন আবার শক্তি ফিরে পায় শরীরে।হ্যা, ছেলে সন্তানই চাই তার, একেবারে সাইমনের মত। তাকে ধরে রাখতে না পারলেও সন্তানের মাধ্যমেই তার সওাকে ফিরিয়ে আনবে সে এই পৃথিবীতে, যেমন করেই হোক।
এক মাসও হয়নি সাইমন-নিকিতার বাড়ি অন সেলে চলে গিয়েছে। নিকিতার একার পক্ষে ঐ বাড়ির মাসিক পেমেন্ট তিন হাজার ডলার বয়ে বেড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পরামর্শ করে ড্যাড ব্যবস্হা নিয়েছেন নিকিতার বাড়ি বিক্রির। বাড়ি বিক্রি হলে ব্যাংকের ঋণ চুকিয়ে লভ্যাংশ পঞ্চাশ/ষাট হাজার ডলার হয়ত হাতে আসবে তাতেই যদি আইভিএফের খরচ উঠে যায়।
বাড়ি খালি করার কাজে নিকিতাকে সাহায্য করছেন সুজান। এতদিন সাইমনের কাপড়চোপড় আর ধোয়া হয়নি। এখনও কেমন সাইমনের গন্ধ জড়িয়ে আছে কাপড়গুলোতে। মন চাইছে না কাপড়গুলো ধুতে। তবু কিছু কাপড় আর না ধুলেই নয়। সুজানও প্রস্তাব করেন লন্ড্রি করে দেবার। নিকিতা বিশেষ কিছু কাপড় এবং ড্রেস বেছে বেছে ধুতে দেয় মাকে। বক্সার, প্যান্টস, জিন্স, এবং ব্যাচেলর পার্টির কিছু কাপড়।
পরিস্কার শুকনো কাপড়গুলো ফেরত পেতেই নিকিতা কেচি দিয়ে কাঁটতে শুরু করে টুকরো টুকরো চৌকোণা করে। সেই দেখে সুজান চিৎকার করে উঠেন, কী করছো এসব? কাঁটছো কেন কুচি কুচি করে? নিকিতা উওর দেয়, এগুলো দিয়ে ব্লাঙ্কেট বানাবো কেভিন এন্ডাসনের। ছেলেকে দেয়া বাবার একমাত্র উপহার।
ইতিমধ্যেই বাড়ি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। কিছুদিন নিকিতা বার্থ কন্ট্রোলের উপর ছিল । ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের মাধ্যমে সন্তান পেতে হলে তার শরীরের পুরো সিস্টেমকেই ডাক্তারের নখদর্পণে নিয়ে আসতে এই পদক্ষেপ। শরীরের নানাবিধ চেকও করা হয়েছে, প্রেগনেন্সীকে বহণ করতে সক্ষম কিনা যাচাই করতে। প্রি-নেটাল ভাইটামিন নিয়মিত খাচ্ছে সে।
উন্নত মানের একাধিক এগ পেতে ডাক্তার FSH ও LH এর পরিবর্তে পরামর্শ দিয়েছেন FSH ও লো ডোজ HCG হরমোন বহণকারী ঔষধ সেবনের, এগ বা ফলিকলকে ইস্টিমুলেইট করতে। ফ্রেশ ট্রান্সফারের পরিবর্তে ফ্রোজেন ট্রান্সফার করা হবে তার। এতে ইউটেরাসের লাইনিং পুরোপুরি তৈরী হয়েছে কিনা সেটা যেমন নিশ্চিত হবার সুযোগ থাকবে, তেমনি সময় হতেই রেডি এমব্রিও/ভ্রুণ পাওয়া যাবে। এমন কী প্রথমবার ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত এমব্রিও ও সংরক্ষণে থাকবে তখন, পরবর্তী সাইকেলে ব্যবহার করতে। ইউটেরাসের লাইনিং তৈরীতে ডাক্তার ওরাল এসট্রোজেন ব্যবহার করছেন। আর লাইনিং যেন এমব্রিয়কে ধারণের জন্যে যথাযথভাবে তৈরী হয় সেটা নিশ্চিত করতে ওরাল প্রজেসটারন সেবন এবং প্রজেসটারোন ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে তাকে। মাম সুজান অথবা ড্যাড জেসন নিকিতার বাটচিকে প্রতিদিনই ইনজেকশন দিচ্ছেন।
এসট্রোজেনের ব্যবহারে একটু এদিকওদিক হলে তেমন ঝুঁকি না থাকলেও প্রোজেসটারনের ব্যবহার সঠিক হওয়া আবশ্যক। এমন কী সেবনকালীন সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। নইলে গর্ভপাত ঘটে যাবার ঝুঁকি থাকবে। লাইনিং ঠিকমত তৈরী হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হতে এনড্রোমেট্রিয়াল রিসেপটিভিটি এ্যারে (ERA) টেস্ট করা হবে ইউটেরাসের লাইনিংয়ের স্যাম্পল নিয়ে যদিও এটা সচরাচর প্রথমবারের চেষ্টায় করা হয় না, বিশেষ করে যাদের ওজন খুব বেশী নয় তথাপি চ্যান্স বাড়াতে নিকিতার ক্ষেত্রে করা হচ্ছে। এছাড়া, সুস্হ শিশু পেতে এমব্রিওর প্রিইমপ্লানটেশন জেনেটিক টেস্টও (PGS/PGT) করানো হয়েছে। এই টেস্টের মাধ্যমে এটাও জানার সুযোগ থাকে, সন্তান ছেলে না মেয়ে।
মোট তেতত্রিশটি এগ ম্যাচিউর হয়েছিল নিকিতার। অজ্ঞান করে বিশেষভাবে তৈরী নিডেলের মাধ্যমে সেগুলোকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অতঃপর ইনট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশনের মাধ্যমে সরাসরি একটি করে স্পার্ম এগ গুলোর আবরণ, জোনা প্যালুসিডাকে ভেদ করে সরাসরি এগের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। পেটরি ডিশে এগ এবং স্পার্ম কাছাকাছি রেখেও কনভেনশনাল পদ্ধতিতে ইনসেমেশন ঘটানো যেতো কিন্তু ডাক্তার সেই পদ্ধতি সাজেস্ট করেননি নিকিতার ক্ষেত্রে। এই পদ্ধতিতে অন্তত দশ লক্ষ স্পার্ম দরকার হয়।

ছয় দিন হলো তেতত্রিশটি এগের মধ্যে স্পার্ম ঢুকিয়ে এমব্রিও তৈরী করা হলেও এখন টিকে আছে মাত্র সাতটি এমব্রিও। ঐ সাতটি এমব্রিওরই জেনেটিক টেষ্ট ক্লিয়ার। সেল বিভাজন যথাযথ। একটি এমব্রিওকে মাইন্যাস এক দশমিক একানব্বই ডিগ্রি সেলসিয়াসের লিকুইড নাইট্রোজেন থেকে বাইরে এনে মেডিকেলের ভাষায় থ (বরফ থেকে তরল) করা হচ্ছে।বাঁকী ছ’টি এমব্রিয় আপাতত লিকুইড নাইট্রোজেনেই সংরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতে ব্যবহারের লক্ষ্যে। অথবা গবেষণার কাজেও নিযুক্ত হতে পারে সেগুলো।
অপারেশন টেবিলে নিকিতা শুয়ে আছে। তার পেটটি সাইমনের কাপড় দিয়ে তৈরী নানা রঙের ব্লাংকেটে আবৃত। যেনো সাইমনই জড়িয়ে ধরে আছে। মুত্রথলিটি পুরোপুরি পূর্ণ। এরই মাঝে আলট্রাসাউন্ড করা হবে। নিষেধাজ্ঞা ছিল মুত্র ত্যাগের। ব্লাডার পূর্ণ থাকলে নাকি এমব্রিও ট্রান্সফার সহজ হয়, আলট্রা সাউন্ডের সময় ইউটেরাসটি পরিস্কার নজরে আসে। ইনটেসটাইন বা অন্যান্য অরগান ক্ষতিগ্রস্হ হবার ঝুঁকি কমে।
নিকিতা মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আলট্রাসাউন্ডের গাইড নিয়ে লম্বা সুঁই ঢুকে যাচ্ছে তার জরায়ুতে। পজিশন ঠিক হতেই একটি দলা ঝুপ করে বেড়িয়ে এলো সুঁইয়ের মাথা থেকে তার জরায়ু মাঝে। পুরো প্রক্রিয়াটিতে দশ মিনিটও সময় লাগেনি। এরই মাঝে বপণ হয়ে গেল একটি নতুন সম্ভাবনার।
এখন শুধু অপেক্ষার পালা। পুরো দুই সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই নিকিতা ছুটে যায় ব্লাডার খালি করতে। এতক্ষণ আঁটকে রাখায় বড্ড চাপ দিচ্ছিলো পেটে।
গুণতে গুণতে সবে আজ পনের দিন হলো। দিনগুলো যেনো আর কাটছিলোই না। বড় দীর্ঘ এই অপেক্ষার প্রহর। আশানিরাশার দোলায় দোদুল্যমান ।
প্লানমাফিক গতকালই মাকে নিয়ে ক্লিনিকে গিয়ে ব্লাড স্যাম্পল দিয়ে এসেছে নিকিতা। মুত্র নয়, রক্তের মাধ্যমেই গর্ভধারণের পরীক্ষা হবে তার । এটাই আইভিএফ পদ্ধতির নিয়ম। আজই রেজাল্ট পাবার কথা। হাসপাতাল থেকে এখনও কোন ফোন আসছে না। ওদিকে খবর জানতে নিক বার বার ফোন করছেন। জেসন ক্লিনিকে ফোন করেও কোন উওর পায়নি। কেউ রিসিভ করে না তার ফোন।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো। ভয়ে ধক্ ধক্ করছে নিকিতার বুক। তবে কি আর হলো না এবার? এরই মাঝে কলিংবেল বেজে উঠে। কে এলো আবার এসময়? পাশে বসা জেসন উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেন। নীল-গোলাপি বেলুন হাতে পুরো ক্লিনিকটিম বাসায় এসে হাজির। আর বলতে হয়না কিছুই । অজান্তেই নিকিতার হাত চলে যায় পেটে। তবে কী আবার ফিরে এলো সাইমন, নিজের মাঝেই, আরও আপন হয়ে? হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে নিকিতা। জেসন জড়িয়ে ধরেন তাকে।
যদিও চলাচল করতে ভয় ভয় লাগে নিকিতার তবুও নিজে গিয়েই সংবাদটি দিয়ে এসেছে ডেনাকে। তার অনুমতি না পেলে হতো না এসব। খবর শুনতেই ডেনা জড়িয়ে ধরেন পুত্রবঁধূকে। সন্তান হারালেও এখনও বন্ধন অটূট তাদের, নাতি আসবে পৃথিবীতে!
আজকাল সুযোগ পেলেই ফুল নিয়ে সাইমনের কবর দেখতে যায় নিকিতা। পরিস্কার করে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে কবরটি। নানারকম ডেকোরেশন ঝুলিয়ে দেয় চারদিকে। সাইমনের বড় বেশী পছন্দের ছিল রকমারি ডেকোরেশন। বসে বসে আপনমনে কথাও বলে।
আজও গিয়েছিল। দেখলো কবরে অচেনা একগোছা ফুল। কেউ হয়ত রেখে গিয়েছে। ভেবে পায় না কে সে? গত কয়েক মাসে যারাই এসেছেন তাকে সাথে নিয়ে। কাল তাহলে কে এসে এমন ফুল রেখে গেল?
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, এখনই বাসায় ফিরতে হবে। উঠে দাঁড়ায় নিকিতা। পেছন ফিরতেই ধাক্কা লাগে তার। চোখ তুলে দেখে লম্বা,প্রশস্ত কাঁধের এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে, তারই দিকে চেয়ে। চোখ দু’টো যেনো বহু দিনের চেনা। এত মায়া কেন এই চোখে? তবে কি ? জ্ঞান হারায় নিকিতা।
এরই মাঝে খবর রটে গিয়েছে সন্তান হবার আগেই ব্রান্ডন এসে গিয়েছে নিকিতার জীবনে। এক কান দু’কান করে সে খবরডেনার কানেও পৌঁছে। এই ভয়টিই ছিল তার। অল্প বয়সী একটি মেয়ে কখন আবার কী করে বসে! এতই যদি প্রেম ছিল তার তবে এ ক’টা দিনও কী আর একা থাকতে পারতো না সে? অন্তত বাচ্চাটি হওয়া পর্যন্ত। বাইরের এক ছেলে আশেপাশে ঘুর ঘুর করবে সারাক্ষণ, কেমন অস্বস্তিকর একটি পরিস্হিতি তার জন্যে ! তাও বাচ্চা হবার আগেই। অভিমানে দিন দিন নিজেকে গুটিয়ে নেন ডেনা। নিকিতার সাথে ডেনার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। কয়েকবার ফোন করেও নিকিতা আর যোগাযোগ করতে পারেনি।হাল ছেড়ে দেয় নিকিতাও।

ছেলে সন্তান হয়েছে নিকিতার। খবর পেতেই ছুটে আসেন ডেনা নাতিকে দেখতে। একেবার যেনো সাড়ে পঁচিশ বছর আগের সেই সাইমন, তেমনই কপাল, চুল, হাতের মুঠি। খুশীতে চোখ ভিজে যায় তার। দেখেন, নিকিতা ছেলেকে চুমু খাচ্ছে আর বলছে, আমাকে ছেড়ে গেলেই কী যেতে দেবো?
নিকিতার পাশে এক অচেনা যুবক দাঁড়িয়ে।ভুরু কুচকে যায় ডেনার। তবে কি এই সেই ? এখানেও? এই সময়? কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কয়েক কদম পা বাড়াতেই ছেলেটি কাছে এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। বড় বেশী আন্তরিকতায় ভরা সেই স্পর্শ! চোখ দু’টোও কেমন মায়ায় ভরা, একেবারে ছলছল করছে। যেনো সাইমনের সেই কান্নাভেজা চোখ দু’টো। কেঁপে ওঠে মায়ের মন। ঢলে পরার আগে মুহূর্তেই ব্রান্ডন ধরে ফেলে ডেনাকে। তাকেই যে এখন এই পরিবারটির হাল ধরে রাখতে হবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement