পুরো আকাশ জুরে ঘন কালো মেঘ, বৃষ্টিও হচ্ছে প্রচুর।
বৃষ্টির একটানা বর্ষনে- রিমঝিম শব্দটাও কেমন নেশা ধরিয়ে
দিচ্ছে এ মনে। বাতায়নের ফাকে প্রবাহিত বাতাসের হিমেল
স্পর্শে ক্ষনে ক্ষনেই শিহরিত হচ্ছি আমি। ইচ্ছে করছে
জীবনের সব পিছুটান ভুলে- বয়ে চলা মেঘের সঙ্গী
হয়ে দিগন্তে হাড়িয়ে যাই.......
কিন্তু পরক্ষনেই বুকের একপাশটায় মৃদূ চাপা আর্তনাদ-
আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সুদূর অতীতে ফেলে
আসা কোন এক শ্রাবন সকালে। সেদিন বৃষ্টি ছিলনা। আকাশে
ঘনীভূত এতো বেশি মেঘের আনাগোনাও ছিলনা। সেই
সুন্দর আর মায়াময় পরিবেশেও অচিন কোন ঝরের
আশঙ্কায় কিছুতেই স্থির হতে পারছিলাম না আমি...।
ঝরটা শুরু হলো ঠিক তখন থেকে, যখন মুঠোফোনের
ঐ প্রান্ত থেকে এক বেদনার্ত নারী কন্ঠ প্রতিধ্বনি হয়ে
ধাক্কা মারতে লাগল আমার কর্ণ-কুহুরে, "I am sorry M আমি
পারিনি।"
তারপর....

কেমন যেন একটা সুক্ষ্ম যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছিল বুকের
ভিতরটায়। সীমাহীন ধুসরতায় ছেয়ে যাচ্ছিল পুরো
পৃথিবী। হৃদয়ের আকাশ জুরে পুন্জীভূত কালো মেঘ
গুলো- উদভ্রান্ত ঝরো হাওয়ার সাথে থেকে থেকেই
গর্জন করে যাচ্ছিল, আর স্বপ্নীল দু'চোখে সেকি
অবিরাম বর্ষন...!! সেই বিধ্বংসী ঝরো হাওয়া আর
দু'চোখের প্রবল বর্ষনে আমার স্বপ্নের পৃথিবী-
আস্তে আস্তে ডুবে যেতে থাকল অন্তহীন বেদনার
নীল সাগরে।

একটু খুলেই বলি......

জেলা শহড় থেকে অনেকটা দুরে, ভারতীয়
সীমান্তের গাঁ ঘেসে দাড়িয়ে থাকা ছায়া সুনিবীর একটি গ্রাম
'শাপলাদিঘী'। এখানেই এক নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে
আমার জন্ম। তখন পর্যন্ত পরিবারের কেউ উচ্চ শিক্ষিত না
হলেও খুব ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়েছিল আমার
প্রাথমিক শিক্ষা জীবন। একান্তই নরম স্বভাব ও শান্তশিষ্ট হওয়ার
কারনে কারো সামান্য আঘাত আর বিদ্রুপাত্মক কথায় কেঁদে
একেবারে চোখ মুখ লাল করে ফেলতাম বলে ' ফ্যাদ-
কাদুরে' (আঞ্চলিক শব্দ) নামে আমার ব্যাপক পরিচিতি ছিল।
সম্ভবত এ কারনেই সহপাঠীরা আমাকে খেলায় নিতনা।
আমারও ভাল লাগতনা তাদের কানামাছি আর গোল্লাছুটের
বিরামহীন ছোটাছোটি। তাই অলিন্দের একপাশে ঠায় দাড়িয়ে
নানাবিধ বিমূর্ত ভাবনায় অতিবাহিত হতো আমার ক্লাসের বাইরের
সময়টুকু। পরবর্তীতে যে ভাবনার সিংহ ভাগ অস্তিত্ব দখল
করে নিয়েছিল পরম যত্নে লালিত- সদ্য বেড়ে ওঠা এক
শিশির সিক্ত গোলাপের কলি। যে গোলাপের ঘুমিয়ে থাকা
রহস্যময় হাসি দেখে দেখেই হাড়িয়ে যেতে লাগল
আমার শান্তশিষ্ট কৈশোর...।

প্রকৃতি যেভাবে পালাবদল করে, তেমনি ছন্দপতন ঘটল
আমার দৈনন্দিন জীবনে। একদিন সকাল বেলা..... নাস্তা
শেষে স্কুলে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি, বাবা ডেকে
বললেন, " আজ আর তোমাকে স্কুলে যেতে
হবেনা।" তিনি আম্মু আপুসহ পরিবারের সবাইকে ডাকলেন।
অতঃপর আমাকে দেখিয়ে বললেন, "শহড়ে ওর জন্য আমি
নতুন একটি স্কুল ঠিক করেছি, সেখানে থাকা খাওয়া ও
পড়াশোনার সুন্দর ব্যবস্থা আমি নিজেই দেখে এসেছি,
আমার ভালও লেগেছে, আমি চাই কালকেই ওকে ওখানে
রেখে আসতে।" এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলেই বাবা
আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় আমি একেবারে 'থ' বনে গেলাম।
পরিবারের কেউ আজ পর্যন্ত বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে যায়নি।
অবশ্য সেটার প্রয়োজনও হয়নি কখনও। যদিও আমার চাবা
একেবারেই মাটির একজন মানুষ। তার চাল- চলন, কথাবার্তা অতি
সাধারণ হওয়া সত্ত্বেও সারাক্ষন এক অন্য রকম গাম্ভীর্যতা
তার চোখে মুখে বিদ্যমান। তথাপি তিনি আমাকে অতিশয়
স্নেহ করেন। এতোটাই স্নেহ করেন যে, আজ
পর্যন্ত তিনি আমাকে ধমকের স্বরে কিংবা চোখ রাঙ্গিয়ে
কোন কথা বলেন নি। সুতরাং এমন বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে
যাবার চিন্তা করাটাও আমার কাছে অশোভনীয়।

তাই বাধ্য ছেলের মতো সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম, অনিচ্ছা
সত্ত্বেও কেমন একটা অস্ফুট স্বর কন্ঠ নালী চিড়ে
বেড়িয়ে এলো, " আমি যাব- বাবা।".... .. যেতে চাইলাম ঠিক
আছে, কিন্ত প্রত্যহ বিকেলে গোলাপের সেই চিরায়ত
রুপটাকে যে আর দেখতে পাবনা? এটা মনে হতেই ভিতরটা
যেন কেমন মোচর দিয়ে উঠল। সেটা আমি ছারা আর কেউ বুঝতে পারলনা।

যা' হোক, পরিবারের সবার নিরব সম্মতি পেয়ে পরদিনই বাবা
আমাকে রেখে আসলেন। নতুন জায়গা, প্রায় সব মুখই
অচেনা, মনটা কেমন বিষাদে ভরে উঠল। রাতে কিছুতেই
দু'চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। বাবা- মা, বড় আপু,
ছোট ভাই- একে একে সবাইকে মনে হতে লাগল।
দক্ষিণা সমীরণে নেচে ওঠা গোলাপের সেই অপরুপ
ছবিটুকু ক্ষনে ক্ষনেই ভেসে উঠতে লাগল মনের
পর্দায়। তাতে কিছুতেই আর চোখের পানিকে সংবরণ
করতে পারলাম না। ওহ! সেকি অহেতুক কান্না.....!!!
ভাবলাম কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাব। কিন্তু কত অমাবস্যা- কত পূর্ণিমা
অতীত হয়ে গেল, কোন ভাবেই তাকে মন থেকে
সরানো গেল না। একেবারে দাগ কেটে রইল.........।

তারপর....... দীর্ঘদিন পর যখন গাঁয়ে ফিরে এসেছি, তখন
সে আর সেই ছোট্ট ফুলের কুঁড়িটির মতো নেই। একটু
একটু করে সেউ আজ ডানা মেলে হাওয়ায় ভাসতে শিখে
গেছে। তার আধো- প্রস্ফুটিত রুপ, বসন্ত এনে দিয়েছে
পুরো বাগান জুরে। মাত্র একটি বারই আমি তাকে পূর্ণরুপে
দেখেছি। তার রুপের বর্ণনা দেবার বিশেষ ইচ্ছা করিনা। হয়ত
পারবোও না। তার অবাধ চাহনি আর উচ্ছল হাসির রোশনিতে-
বুকের পাজরে জমিয়ে রাখা মিথ্যে স্বপ্নের ক্ষিন
প্রদীপটুকু মূহুর্তেই প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। কিছুতেই
আর নিজেকে স্থির রাখতে পারিনা.....।

অবুঝ মন কেন এমন স্বপ্ন দেখছে, যা হয়ত কোনদিন
পূরণ হওয়ার নয়। তাছারা প্রকৃতির এই মানুষ গুলোই বা কোন
চোখে দেখবে কিশোর- হৃদয় দিগন্তের এ আবির
খেলা। আর সব বাধা পেড়িয়ে তার কাছে পৌছা সত্ত্বেও
সে যদি আমাকে গ্রহণ না করে, তখন? পরাজয়ের গ্লানি
বয়ে বেড়ানোর এতটুকু শক্তিও কি আছে আমার? আর
যাকে এতোটা প্রাণভরে ভালবাসি, সেও কি এতোটা নিষ্ঠুর
হতে পারবে.?
মনের মাঝে কত প্রশ্ন, কত পরিকল্পনা ফিরে ফিরে
আসে- কিন্তু দ্বিধা-জড়তার অবসান হয়না। হায়! প্রেমের এ
কেমন মধু যন্ত্রণা...!!!

অবশেষে সব দ্বিধা - জড়তার অবসান
ঘটিয়ে আমার অন্তরাত্মার আরতিটুকু তার কাছে পৌছানোর
ব্যবস্থা করা হলো;
পাওয়া আর না পাওয়ার মাঝখানে দাড়িয়ে থাকার যন্ত্রণাময় সুখ
সেদিনই আমি প্রথম অনুভব করেছিলাম। সীমাহীন
অস্থিরতায় সইতে হয়েছিল একটা একটা করে বুকের পাজর
খয়ে যাবার বেদনা।
অবশেষে- সে অস্থিরতা শেষ হয়েছিল সেই বেদনার্ত
নারী কন্ঠ দিয়ে, "I am sorry M, আমি-"।
তারপর কি ঘটেছিল সেটা আর নাইবা লিখলাম। থাকনা কিছু কথা
অগোচরেই, অন্তরালে....।