লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ মে ১৯৯৪

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমুক্তিযুদ্ধ (ডিসেম্বর ২০১৫)

মানচিত্র
মুক্তিযুদ্ধ

সংখ্যা

Wares Nabil

comment ১  favorite ০  import_contacts ৬৩
১৩ আগস্ট, ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তানের ছোট্ট একটা গ্রাম। গভীর রাতে একটা হোটেলে বসে খাবার খেয়ে নিচ্ছিলেন মমিন খাঁ, আফসার আর করিম। পাকিস্তান আর্মি আগেই ওদের খবর পেয়ে গিয়েছিল। ফোর্স নিয়ে তারা চারদিক ঘেরাও করে ফেলেছে। হঠাৎ দরজা ভেঙে ঢুকে পড়লো কয়েকজন। ভাতটা মুখেও তুলতে পারলেন না মমিন খাঁ। পেছন থেকে হঠাৎ শার্টের কলার চেপে ধরলো একজন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলেন আফসার আর করিম। দৌড়ে গিয়ে পাশের বিলে ঝাঁপ দিল ওরা। আর্মিরাও পেছনে ছুটলো। এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়লো পানিতে। শেষপর্যন্ত ধরা পড়লেন মমিন খাঁ। তাকে নিয়ে আসা হল কমান্ডারের কাছে। মমিন খাঁ'র থুতনির দাঁড়ি টেনে ধরলেন কমান্ডার।

- বেল্লিকের ঘরে বেল্লিক, ওঠা-বসা করস মালাউনগো কথায়, আবার দাঁড়ি রাখসোত সুন্নতি।

মমিন খাঁ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কমান্ডার তাকে ঘিরে ঘুরলেন কতক্ষণ। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে বসলেন সামনের চেয়ারে।

- তোকে ছেড়ে দিব আমি। তবে একটা শর্ত। তোদের পুরো দলের আস্তানা কোথায় এটা বলবি। তারপর খোদার কসম, তোর গায়ে একটা ফুলটোক্কাও লাগবে না কথা দিলাম।

মমিন খাঁ শান্ত ভঙ্গিতে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিল কমান্ডারের মুখে। কমান্ডার পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছলেন। তারপর কোমর থেকে রিভলভার তুলে মমিন খাঁ'র পায়ে গুলি করলেন। মমিন খাঁ হাত বাঁধা অবস্থায় বসে পড়লেন। অন্য দুজন সেনা তাকে আবার টেনে দাঁড় করালো। কমান্ডার দ্বিতীয় বারের মত জিজ্ঞেস করলেন, আস্তানা কোথায়? আমি শুনেছি দিঘীরপাড়ের কোনো একটা জায়গায়। জায়গাটা কোথায়?

মমিন খাঁ হেসে আরেক দফা থুতু ছিটিয়ে দিল। কমান্ডার নিজ হাতে মমিন খাঁর মাথায় গুলি করলেন।

আনিস। মমিন খাঁ'র ছেলে। ক্লাস এইটে পড়ে। তবে স্কুল এখন বন্ধ। সারাদেশে যুদ্ধ হচ্ছে। আনিস জানে দেশে কি হচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তান ওদের ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। নির্বাচনে হেরেও ক্ষমতা দিতে চায়না। এমন বেহায়া জাতির জন্য আমাদের যুদ্ধ। কিন্তু তারচে বেশি খুশির খবর এটা, দেশ স্বাধীন হলে স্কুলে উর্দু ভাষা শেখার ক্লাসটা আর করতে হবেনা। তখন দেশে আর কোনো উর্দু থাকবে না।

আনিস খবরটা জানলো পরদিন সকালবেলায়। তার বাবা মারা গেছে। আনিস একেবারে থমকে গেল। মনে হল সবকিছু একেবারে থেমে গেছে। মা তখন সারা উঠোন জুড়ে দাপাচ্ছে। করিম চাচা মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাবা এইতো গতকালই বলে গেল, ব্যাটা, মন দিয়ে পড়বি। দেশ স্বাধীন হলে নতুন স্কুলে ভর্তি করাবো তোকে। নতুন দেশের গন্ধ নিতে নিতে স্কুলে যাবি প্রতিদিন। দেখবি সে গন্ধ কত আনন্দের।

আনিস একটুও কাঁদলো না। ও যেন হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেছে। ও যদি ভেঙে পড়ে তাহলে মা কে দেখবে কে? আনিস ঘরে ঢুকে পড়ার টেবিলে বসলো। উর্দু শেখার বই টেনে বের করলো। দেশলাই দিয়ে পুরো বইটা জ্বালিয়ে ফেলে দিল। আনিস জানে, দেশ স্বাধীন হবে। এই বইটা আর প্রয়োজন নেই।

জামিল। আনিসের বন্ধু। সে বিরক্ত মুখে বসে আছে। আনিসের হাতে ছোট একটা বাক্স। বেশ কিছুদিন যাবৎ বাক্সটা আনিসের হাতে হাতে। জামিল অনেকবার জানতে চেয়েছে ভেতরে কি, কিন্তু আনিস প্রতিবারই রহস্য করে হাসে। কিছু বলেনা। জামিলের খুব রাগ হয়। এখনো হচ্ছে। তারা একটা জারুল গাছের মগডালে বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। হঠাৎ আনিস শুরু করে।

- আজ রাতে মুক্তিবাহিনী আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করবে।
- তুই জানিস কিভাবে?
- লোকমুখে শুনলাম।
- কি আর হবে!
- এবার একটা কিছু হবে দেখিস।

দু বন্ধু কেউ কোনো কথা বললো না। নিঃশব্দে হেঁটে বাড়ি চলে গেল।

রাত ১১ টা। আনিস একটা ঝোপের ভেতর লুকানো। এখান থেকে আর্মি ক্যাম্প পুরোটা দেখা যায়। মুক্তিবাহিনী আক্রমণে যাবে উত্তর দিক দিয়ে। সেভাবেই রণকৌশল তৈরি হচ্ছে। আফসার চাচারা পজিশিন নিতে শুরু করেছে। কিন্তু একটা সমস্যা হল। আর্মি ক্যাম্প থেকে দুজন একজন করে সেনা বেড়িয়ে পড়তে শুরু করছে। হঠাৎ বোঝা গেল তারা ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। তাহলে কি ওদের কথা জেনে গেছে আর্মি? এটা গোপন মিশন ছিল। কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়। মুক্তি কমান্ডার শহীদ চাচা হাতের ইশারায় পিছিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন সবাইকে। সবাই পেছাতে আরম্ভ করলো। আর্মি ক্যাম্প থেকেও কোনো গোলাগুলি এখনো শুরু হয়নি। তারাও পুরোপুরি নিশ্চিত নয় মুক্তিবাহিনীর ব্যাপারে। তবে তারা এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। এখন হঠাৎ গোলাগুলি শুরু করলে পুরো মিশন বিফলে যাবে। কেউ একটা গুলি ছুড়লো না। তবে তারা বিপদে পড়েছে। আর্মি দ্রুত এখানে চলে আসছে। এখান থেকে বেড়িয়ে পড়তে হবে। এখন সবচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় দরকার মুক্তিবাহিনীর। হঠাৎ চারদিকের স্তব্ধতা ভেঙে "জয় পাকিস্তান। জয় পাকিস্তান" চিৎকারে হাত উঁচু করে আর্মি ক্যাম্পে ছুটলো একটা ছেলে। আনিস।


আনিস চিৎকার করে বললো, স্যার মুক্তিবাহিনী স্কুল মাঠের পেছন দিয়ে বাজারে ঢুকছে। আমি দেখেছি। প্রায় ৫০ জনের একটা দল।

আর্মি ঘুরে গেল। কয়েকজন ঘুরে স্কুল মাঠের সামনে পজিশন নিল। আর কিছু সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো। কমান্ডারের নির্দেশে গ্রেনেডও ছোড়া হল সেখানে। ব্যাংকার থেকে আরো সেনা বেড়িয়ে এল। ওদিকে মুক্তিবাহিনীর দলটা নিরাপদে সড়ে গেল। আফসার চাচাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে আসলেন শহীদ চাচা। চোখের সামনে ছেলেটা বিপদে পা দিল। তিনি একেবারে ভেঙে পড়লেন। মুক্তিবাহিনী নতুন ছক কষতে লাগলো।

আর্মি কমান্ডার বুঝে গেলেন ঘটনা কি হয়েছে। তিনি রাগে জ্বলে যাচ্ছেন। সামান্য একটা পুঁচকে ছোড়ার জন্য এত বড় একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ছেলেটা তার সামনেই বসা। তিনি তাকিয়ে দেখছেন আনিসকে। হঠাৎ ওর চুল ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন।

- এই হারামীর বাচ্চা, সবাই কই বল? তা নাহলে একেবারে মাথায় গুলি করে দেব।

আনিস একদলা থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বললো, কোনো বিদেশি কুত্তার কাছে আমি আমার নামও বলবো না।

কমান্ডার কিছু বললেন না। একটা চাকু দিয়ে আনিসের একটা আঙুল কেটে দিলেন। আনিস ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো।

কমান্ডার এবার শান্ত মুখে জিজ্ঞেস করলেন, বল ওই হারামীর বাচ্চারা সব কই?

আনিস মুখ তুললো এবং দ্বিতীয় বারের মত থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বললো, এটা পূর্ব-পাকিস্তান নয়, এটা বাংলাদেশ। আমি বাঙালি। কোনো বাঙালি তার দেশ আর মায়ের সাথে কখনো বেঈমানি করেনা। জয় বাংলাদেশ। জয় বাংলাদেশ। জয় বাংলাদেশ।

কমান্ডার একটি একটি করে আনিসের আঙুল কাটলেন। কিন্তু একটা কথাও আর বের করতে পারেননি।

পরেরদিন পহেলা ডিসেম্বর। আনিসের লাশ ভাটিবাড়ির পুকুরে ভাসতে দেখা গেল। একটা কোমল মুখ। হাতে কোনো আঙুল নেই। বুকের বা পাশে গুলি করেছে ওরা। জামিল তা দেখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। একা একা অনেক দূরে চলে গেল আনিস। ওকে কিচ্ছু জানালো না। খুব অভিমান হল জামিলের। সেই বাক্সটা আনিসের পকেটেই পেল জামিল। তুলে নিল বন্ধুর যত্নে রাখা সেই বাক্স। কিন্তু খুলে দেখলো না। প্রতিজ্ঞা করলো দেশ স্বাধীন হলে এই বাক্স খুলবে।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বিকেলবেলা প্রথম আনন্দের সংবাদটা পায় জামিল। পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন। এটা এখন আমার বাংলাদেশ। আমার স্বাধীন বাংলাদেশ।

জামিল খুব কাঁদলো ওর বন্ধুর জন্য। শেষে বের করে আনলো আনিসের সেই বাক্স। অনেকক্ষণ হাতে চেপে ধরে থাকলো। তারপর বাক্স খুললো। একটা পতাকা। বাংলাদেশের পতাকা। স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকা।মাঝখানে স্বাধীন দেশের মানচিত্র। সঙ্গে একটা ছোট্ট চিরকুট।

" আমি জানি বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমার স্বাধীন দেশের মানচিত্রটা তোদের কাছে রেখে গেলাম। দেখিস, একটা হায়েনার আঁচড়ও যেন না লাগে এই মানচিত্রে।"

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement