লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯৮
গল্প/কবিতা: ২৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমুক্তিযুদ্ধ (ডিসেম্বর ২০১৫)

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি
মুক্তিযুদ্ধ

সংখ্যা

ইমরানুল হক বেলাল

comment ১  favorite ০  import_contacts ৩৭৪
মানুষের মধ্যে যে রকম প্রেম জেগে ওঠে সেই প্রেম কখনো কখনো এতটা তীব্র হয়ে ওঠে যে তখন একজন প্রকৃত মানুষ এই প্রেমের জন্য নিজের জীবন ত্যাগ করে বিলিন হতে পারে।এই প্রেম হতে পারে একজন নারীর প্রতি,হতে পারে মায়ের প্রতি,সন্তানের প্রতি, দেশের প্রতি। তবে মায়ের জন্য এবং দেশের জন্য যে প্রেমবোধ তার চারিদিক সাদৃশ্য খুবই নিবিড়। মায়ের গর্ব থেকে সন্তান পৃথিবীতে আসার পরই মায়ের আত্মার সঙ্গে সন্তানের প্রেমের বন্ধন তৈরি হয়ে যায়।যে মাতৃভূমির জলবায়ু আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা শিশু সেই দেশ বা মাটি হয়ে ওঠে তাঁর মাতৃভূমি।মায়ের দুধ পান করে যেমন সে জীবন ধারণ করে,বাড়ন্ত করে,তেমনি দেশের মাটি,আকাশ-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি, গাছ-পালা,লতা-পাতা তথা সমগ্র পরিপাটির ভিতরে সে বেড়ে ওঠে এবং অজান্তেই এক গভীর প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।এই দেশপ্রেম এবং মাতৃপ্রেম তাকে আর বিভাজিত করতে পারে না,পারে না এ বন্ধন ছিন্ন হতে।সন্তান যখন মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যায়,হৃদয়ের গভীরে এক শূন্যতা অনুভব সৃষ্টি হয়,চোখে জলে সিক্ত হয়ে ওঠে মন।তেমনি নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে যখন কেউ বিদেশ-বিভূয়ে পাড়ি জমায় তখন তার হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে ওঠে।আর ভিনদেশ হতে তাঁর হৃদয় কেবল সারাক্ষণ ছটফট করে কখন দেশে ফিরে যাবে।তার কিছুই আপেক্ষিক।এ সব কিছুর ভেতরেই সৃষ্টি আমাদের এই বাংলাদেশ।কিন্তু এত বছর পরও দীর্ঘকালের পথ পরিকল্পনায় আজ অনেক অভিমানের নালিশ কিংবা অনেক প্রশ্ন বুকের ভেতর জমা হয়ে আছে, সন্তান হয়ে দেশমাতৃকার জন্য আমরা কি করেছি?কতটুকু করেছি?যে জন্ম জননী মা আমাদের জন্ম দিয়ে হয়েছে সুমাহান, আর আমরা তার বুকে গর্ভধারণ করে কলংখ লেপন করেছি দেশমাতৃকার পবিত্র দেহে,নিজেরাই করেছি তাকে অপমানিত! দেশের বিবেক জাগ্রত আমরা, শুধু মৃত লাশ জেগে ও মৃত আমরা।
আজ আমি একজন মানুষের কথা বলব।
তিনি একজন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা।
তিনি হলেন আমাদের (শংকরাদহ) গ্রামেরই একজন কৃতী সন্তান বাদশা মিয়া।
অপরাক্ত বেলায় আমি চলেছি তার খোঁজে।
সেই ছেলেবেলায় এক যুগ আগে উনাকে কবে দেখেছি মনে নেই।
বড় হয়ে ওঠার পর আমাদের এলাকার বিভিন্ন জনের কাছ থেকে তার বীরত্বের কথা শুনেছি। এতগুলো বছর পর আবার তার সঙ্গে দেখা হবে।
আমাদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উনাদের বাড়ি। আমি গ্রামের আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে চললাম।
উনার বাড়ির ভেতর ঢুকেই সালাম বিনিময় করে পরিবারদের সাথে কিছুক্ষণ টুকিটাকি কথা বললাম। তার পর আমার উদেশ্য জানালাম। খানিকক্ষণ পরে উনার বড় মেয়ে এসে বললেন, ' আব্বা এসেছে, আপনি আব্বুর সাথে কথা বলেন। '
'আসসালামুয়ালিকুম চাচা। '
'ওয়ালিকুম সালাম। বাবা কে তুমি?কোথায় থেকে এসেছ? ...।'
আমার বাবা মার পরিচয় দেওয়ার ফলে উনি আমাকে চিনতে পারছিলেন,
সম্পর্কে উনি আমার দাদা হন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দক্ষিণ পাড়ার সুরূজ মিয়াঁর ছেলে বেলাল না ? আচমকা এমন কথা শুনে অবাক নয়নে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, জি দাদা,••••। একটি চেয়ার টেনে এনে বসতে দিলেন। তার পর বললেন, অনেক বছর পর তোমাকে দেখলাম, সেই কিশোর বয়সে তোমাকে দেখেছিলাম,তুমি তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছো। চেহারা ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তোমাকে তো এখন চেনাই যায়না।

শুনেছি তুমি নাকি একজন লেখক হয়েছো,
মুক্তিযুদ্ধ বিষয় নিয়ে তোমার অনেক লেখা গল্প পড়েছি, বাবা অনেক গুছিয়ে-গাছিয়ে লিখতে পারো তো তুমি। মাশাল্লা,আল্লাহ্ তোমাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখুক। বিদেশ থেকে কবে এসেছ বাবা?
এইতো দাদা দশ পনেরো দিন হলো।•••তার পর আমি প্রশ্ন করলাম, 'আচ্ছা দাদা,মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন কোথায় ছিলেন আপনি? তখন আপনার বয়স কত ছিল? আপনার পরিবারের মা-বাবা, ভাই -বোন, ছেলে সন্তান নিজ পরিবার সহ সবাই কোথায় ছিলেন? '
এ কথা গুলো বলা মাএই দেখতে পেলাম ওনার চোখ দু'টো জলে ভরে উঠল। তার পর ধীরে ধীরে ওনার আত্মাকাহিনী বলতে শুরু করলেন -
'আমরা পরিবারে ছিলাম তেরোজন।
এদের মাঝে অনেকজন বেঁচে নেই। সেই সময়কারে আমার বয়স ছিল চল্লিশের কাছাকাছি। আমার মেয়ে ছিল চারজন। বড় মেয়ে আমার ছোট ভাইয়ের বাড়িতে ভেড়াতে যাওয়াই বেঁচে গিয়েছিল। তিন মেয়েকে ঘরের ভেতর বেঁধে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছিল পাকিস্তানীরা।ছেলে ছিল তিন জন। তাঁরা যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। আমার বউ, দাদা -দাদী, মামা-মামী এদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে আর কারো সন্ধান পাইনি। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম যুদ্ধে যাওয়ায়। ......।'
বাদশা মিয়ার করুণ ইতিহাস শুনার
পর বেদনায় আমার ও
দু 'চোখের অশ্রু মুক্তোর মত দু 'গাল বেয়ে মাটিতে পড়ল। মনে হলো, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা কী নিঠুর আর বর্বর ছিল! ওরা মানুষ না হয়ে মায়াবি পৃথিবীতে দানব হয়ে জন্ম নিয়েছিল!
তা না হলে ওদের হাতে তিরিশ লক্ষ শহীদ সেদিন কেন প্রাণ দিতে হয়েছিল? তবুও বাদশা মিয়ার মত
মুক্তিযুদ্ধারা তাদের কাছে হার মানেনি।সেইদিন কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে, মৃত্যুকে পরাজয় করে করে এনেছিলেন একটি লাল সবুজের পতাকা। কারণ তাঁদের হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম।তারা জানতেন দেশকে ভালবেসে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে।প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধার আত্মাত্যাগ,অসহায় মানুষের কষ্টের হাহাকার নির্যাতিতাদের দুঃসহ বেদনা, বিন্দু বিন্দু রক্তের সমুদ্রের বিনিময়ে আজ আমাদের শেষ্ঠ অর্জন
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়।
আজ আমি শুধু মনে মনে একটা কথা ভাবি, -"আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি "
তবুও মুক্তিযুদ্ধ আমাকে আলোড়িত করে, রক্তে জাগায় শিহরণ! ছেলেবেলায় বাবা -মায়ের মুখে আর বইতে একাত্তরের বীরত্ব ও আত্মাত্যাগের ঘটনা পড়ে, আজ এই বৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধা লোকটার মুখে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা শুনে আমার ও মনে হয় আমি ও একজন মুক্তিযুদ্ধা।
বুঝতে পারি,মুক্তিযুদ্ধের বিজয় একটি জাতীয় পতাকা এবং বিরাট ও সুদূর প্রসারী।বাঙালি জাতীয় জীবনে এক আশচর্য অনুভূতিময় আনন্দ বেদনায় শিহরিত এক উজ্জ্বল দিন। বিশ্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ভিয়েতনামের পর আরেক গৌরব রচনা করেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের এ -এক লাল তারিখ। শ্রেয়োবোধ ও শুভবুদ্ধিকে অাশ্রয় করে আমরা প্রতিকূল ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। প্রতিটি বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মশাল করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে
যেতে হবে। "নিজেদের দেশপ্রেমে উদ্ভুত হতে হবে" হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস ঠেলে! প্রতেয়ে ও সাহসে বুক বেঁধে, পরিস্থিতির কাছে আত্মাসমর্থণ না করে প্রগতি ও পরিবর্তনের ধারায় অগ্রসর হতে পারলে আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন অর্থবহ হয়ে উঠবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement