লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ১৯টি

সমন্বিত স্কোর

২.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৬৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

অর্ধজন্মের অর্ধমানব
উপলব্ধি

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৯৮

তুহেল আহমেদ

comment ৯  favorite ০  import_contacts ৭৭২
অন্ধকার নামছে চারিদিকে। শীত ততো পড়েনি, তবু আজকের সেই ভোর থেকেই কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। আর এখানে?
নাহ, মেঘলা আকাশের কোন প্রভাব পড়ে না এখানে, এই বাড়িতে। ছোট্ট একটি বাড়ি, ঝুপড়ি বাড়িই বলা চলে। তিন দিক দিয়েই উঁচু টিলা আর ঝুপ, এই ঝুপের জন্য ভর দুপুরেও আলো পৌঁছায় না।
সন্ধ্যা নামছে বাহিরে, ধীরে। মাটির ঘরের মাটির বারান্দার মাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা এক রক্ত মাংসের মানুষ। ঠিক মানুষ বলা যায়! লোকটা স্বাভাবিক মত চলতে পারে না! জীবনের বেঁচে থাকা যুদ্ধের যোদ্ধাহত এক সময়কার কর্মঠ জোওয়ান, যে ভারী ভারী কাজ একাই করে ফেলতো সিদ্ধ হস্তে, আর আজ সেই তাকেই কেউ কাজে নিতে চায় না!
ওহ! ওকে ডাকবেই বা কেন? ও কি আর আছে!
কালের বিবর্তনে এক অসুস্থ শরীরে পরিনত হয়েছে। এখন ওকে হাঁটতেও হয় পা টেনে টেনে। ডান পায়ের নিচের গোড়ালি আর আঙুলের অংশ পঁচে গলে যাচ্ছে যেন দিনকে দিন। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই লোকটার। ভ্রুক্ষেপ দিলেই বা চলবে কিভাবে? উনুনে আগুন জ্বালতেও যেখানে ভাবতে হয় সেখানে আবার পা!
আজ আবার অন্য ব্যাপার। লোকটার স্ত্রীর প্রসব ব্যথা উঠেছে, সেই সূর্য ওঠা ভোর থেকেই। বিকেলের দিকে ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় পাশের গ্রামের দাই কে ডেকে আনা হয়েছে। জ্বলন্ত প্রদীপের আলোয় ঘর্মাক্ত করুন চেহারা দেখা যাচ্ছে। ঠিক স্পষ্ট নয়, তবু। টিলার ঝোপঘেরা এই ছোট্ট বাড়িতে অন্ধকার নামছে, আর অন্ধকার ছাড়িয়ে প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছে এক অসহায় স্রষ্টার চিৎকার, সভ্যতার জন্মধাত্রী এক মায়ের। এই মুহূর্তে এই বাড়িতে আছে লোকটা, লোকটার বাক প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে, এক দাই আর পাশের বাড়ির এক মহিলা। এই কয়টি প্রাণ নিঃশ্বাস ফেলছে এই ঝুপড়ি বাড়িতে।
আরো একটি প্রাণ আছে, যেটা এখনো প্রাণ হয়ে উঠতে পারে নি অবশ্য। শুধু কচি দুটি পা দিয়ে সভ্যতা সৃষ্টির জানান দিচ্ছে, আমিই সভ্যতা আমিই এক! একটু পর পর পা দোলাচ্ছে। মহিলা দুজনে সেই কতক্ষণ ধরেই চেষ্টা করছেন এই নব্য মানবকে পৃথিবীর আলো দেখাতে, কিন্তু না। উনারা পারছেন না। স্বাভাবিক নিয়মের থেকে উল্টো কিনা! চেষ্টা চলছে। অন্ধকার ঢেকে নিচ্ছে সব, চিন্তা ক্লিষ্ট আঁখিতে বসা লোকটার চোখের কোণে আটকে থাকা জল, লুকিয়ে যাচ্ছে আঁধার রংয়ে।
এই ঝুপড়ি বাড়ির আরো দুটি প্রাণ আছে, লোকটার ষোড়শী মেয়ে আর বছর দশের ছেলে। ওরা গিয়েছে আরোও এক দাই মাসীর খোঁজে। যারা আছে ওরা কিছু করে কুলে উঠছে না, গলা অব্দি এসে আটকে আছে বাচ্চাটা!

-
রাতের প্রথমদিক, ঝুপড়ি ঘরের আটসাঁট বিছানায় অবচেতন এক মহিলা পড়ে আছে নিস্তেজ হয়ে। তার ঠিক পাশে কচি একটা বাচ্চাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, পাশের বাড়ি থেকে একটু আগের আনা চার্জ লাইটের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কচি গলা, থুতনির রক্তাভ ত্বক!
নিঃশ্বাস! নাহ, তা আর নেই, অর্ধ জন্ম হওয়া এই মানবটির আর পৃথিবীর আলো দেখা হয়নি, বুক টেনে নেয়া হয়নি এই কালো পৃথিবীর ঘৃণা ভরা বাতাসের অক্সিজেন।
তাই ভালো। অর্ধ পৃথিবীর ছোঁয়া পাওয়া সেই অর্ধ মানব মায়ের জঠরের ভালবাসা পেয়েছে। পৃথিবীর আলো পাওয়ার পূর্বেই কি এক করুণ নির্মমতার ইতিহাসে পরিনত হলো সে! সেটা কল্পনা করা যায়! আসার পথেই থেমে গেলো তার যাত্রা! এই অবস্থায়ই ফিরে যায় সেখানে, যেখান থেকে সে এসেছিল।
-
কিছু সময়ের ভিতরেই আশেপাশের লোকজনের আগমনে বাড়ি ভরে যায়। মুরব্বী ধরনের লোকেরা কথা শোনাচ্ছে,
'কিরে বেটা তুই? বউয়ের এই অবস্থা! আর দিনে একবার কাউরে ডাকবারও পারলি না! এমনে তো ঘুর ঘুর করছ্ সারাদিন'
'টাকাই কি সব? এতো খারাপ হই গেছে তো যেকোন জায়গা থিকাই কিছু টাকা নিয়া হাসপাতালে লই যাতি পারতি না? সরকারি হাসপাতাল কি বন্ধ হই গেছে নাকি!'
জীবন যুদ্ধের যোদ্ধাহত লোকটি একদৃষ্টে আঁধারে তাকিয়ে ছিল, চোখে ছল ছল করছে এক সমুদ্র চাপা কষ্ট, দারিদ্র্যতার সীমায় বেঁচে থাকার কষ্ট। অবশেষে একপাশে চোখ রেখেই বলে,
'আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে, হিটা নিয়া ভাইবা কি হবে? আমি তো তাঁর দিকাই তাকায় ছিলাম। সে কিছু করে নাই, আমার আর কি করার?'

হঠাৎ করে বৃষ্টি নামে, সেই ভোর থেকে জমতে থাকা কান্না গুলো অবশেষে ঝরালো আকাশ। মধ্যরাতের প্রদীপের আলোতে এই ঝুপড়ি বাড়ির নিচের দিককার রাস্তার পাশের মাটিতে শুইয়ে দেয়া হয় বাচ্চাটিকে, চিরতরে। গতরাতের এই সময়ে ও খেলছিলো মায়ের আদরে, কোমলতায়! আর আজ?
আবার বৃষ্টি শুরু হয়, ঠিক বৃষ্টি না। ঝড়, তুমুল ঝড়। কষ্টে যেন ফেটে পড়ছে কালো আকাশের বুক।
-
ভোরের আলো জাগছে, ঝোপঘেরা টিলার ফাঁক হয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়ছে রাস্তার পাশের মাটিতে, সেখানে চোখে ভাসছে ঘাসের মাঝের বেড়া ঘেরা কিছু সাদা মাটির অংশ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement