লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩
গল্প/কবিতা: ১০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার বাবা (জুন ২০১৫)

বাবার কাছে লেখা শেষ চিঠি
আমার বাবা

সংখ্যা

তৌহিদুর রহমান

comment ১  favorite ০  import_contacts ৬১৭
সময়টা ছিল সেদিন গ্রীষ্মের এক দুপুর। ওই সময়টাতে সাধারণত আমরা কেউ মেসে থাকতাম না। প্রতেকে যার যার নিজস্ব কাজে বাইরে ব্যস্ত থাকতাম। কেউ কলেজের ক্যাম্পাসে, কেউ অফিস-আদালতে, কেউ বা আবার ঢাকা শহরের রাস্তা ঘাটে। তো সেদিন আমার মনটা ভালো ছিল না বলে মেসে শুয়ে শুয়ে দুপুর বেলাটা অলস সময় কাটাচ্ছিলাম। আর ভাবছিলাম গ্রামের কথা, বাবার কথা, মায়ের কথা, ভুতোর কথা। ভুতো অামার বাবার পোষা কুকুর। বাবা ওকে অনেক ভালোবাসতেন। আমার মায়ের কথা আমার খুব বেশি মনে নেই। কেননা আমি ছোট থাকতেই আমার মা মারা গিয়েছিলেন। তারপর থেকে আমার বাবাই আমাকে লালন-পালন করেছিলেন। কখনো আমাকে আমার মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ল বাবাকে একটা চিঠি লিখতে হবে। জীবনে প্রথম একটা চাকরি পেয়েছি। সামনের মাসের পয়লা তারিখেই চাকরিতে যোগদান করতে হবে। এত বড় একটা খুশির সংবাদ অথচ বাবাকেই এখনো জানানো হয় নি। কথাটা ভাবতেই নিজেকে কেমন স্বর্থপর মনে হচ্ছিল। তাই কাগজ কলম নিয়ে তখনই বাবাকে চিঠিটা লিখতে বসে পড়লাম।
প্রিয় বাবা,
আশা করি তুমি ভাল আছ। আমিও ভাল আছি। তুমি তোমার গত চিঠিতে জানতে চেয়েছিলে আমি কোনো চাকরি পেয়েছি কিনা। তুমি জেনে খুশি হবে যে, অনেক চেষ্টার পর অবশেষে আমি একটা চাকরি পেয়েছি। বেশ ভাল চাকরি। বেতনটাও ভাল।
বুঝলে বাবা, তোমার কষ্টের দিনের অবসান ঘটতে চলেছে। তোমাকে আর কষ্ট করে কাজ করতে হবে না। আমার জন্য আর মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হবে না। আর যারা তোমার কাছে টাকা পাবে তাদের সব টাকা আমি এবার এক এক করে শোধ করে দেব। আমাদের বাড়িটাও পাকা করব।
বাবা তুমি কিন্তু গত চিঠিতে তোমার বুকের ব্যাথাটার কথা কিছুই লেখো নি। জানো বাবা আমি তোমার বুকের ব্যাথাটা নিয়ে অনেক চিন্তিত। কেননা বুকে ব্যাথা হওয়াটা খুব খারাপ লক্ষণ। তাই বাবা আমি ঠিক করেছি আমার চাকরির প্রথম বেতন যেদিন পাবো সেদিনই তোমাকে বাড়ি থেকে আমার এখানে আনব। এবং তোমাকে ভালো ডাক্তার দেখাব। আমার বিশ্বাস তোমার বুকের ব্যাথাটা একদম সেরে যাবে।
বাবা আমি সামনের হপ্তায় দুই দিনের জন্য বাড়িতে আসতেছি। চাকরিতে যোগদানের পূর্বে মায়ের কবরটা একবার জিয়ারত করতে চাই। আর তাছাড়া মায়ের কবরটা নতুন করে বাঁধাতে হবে। গতবার গিয়ে দেখেছিলাম মায়ের কবরটা অনেক ভেঙে গেছে।
আচ্ছা বাবা আজ আর বেশি কিছু লিখছি না। বাড়িতে এসে তোমার সাথে অনেক কথা হবে। অনেক গল্প করব তোমার সাথে। ভাল থেকো আর নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রেখো।

ইতি তোমার
এনামুল
লেখা শেষে চিঠিটা ভাঁজ করে জামার পকেটে রেখে দিলাম। বিকালে বাইরে বের হয়ে একটা খাম কিনে ডাক অফিসে গিয়ে চিঠিটা বাবার কাছে পাঠাতে হবে এই কথাটা নিজেকে বার বার মনে করিয়ে দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে, চিঠিটা আমার বাবার কাছে আর কখনোই পাঠাতে পারবো না।
জানলাম ওই দিন বিকালে। বিকালে যখন আমি ডাক অফিসে যাওয়ার জন্য বাইরে বের হচ্ছিলাম তখন আমার সবথেকে কাছের বন্ধু রতন এসে আমাকে জানালো আমার বাবার মৃত্যুর সংবাদ। ও আমাকে বলল, " এনাম চাচা আর নেই। গতকাল বিকালে হাটের মধ্যে হঠাৎ হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়লেন।আমি তখন সেখানে ছিলাম। ছুটে গিয়ে চাচাকে উঠিয়ে পাশের একটা দোকানের চৌকিতে বসাতে বসাতে চাচার দেহটা নিথর হয়ে গেল।
হাটের আরো কয়েকজন মানুষ আর আমি মিলে চাচার লাশটা বাড়িতে নিয়ে গেলাম। তোর এখানে খবর পাঠাতে আর খবর পেয়ে তোর বাড়িতে পৌঁছাতে অনেক সময়ের ব্যাপার। তাই গতকাল রাতেই সবার পরমর্শে চাচার লাশ দাফন করা হয়েছে। কথাগুলো শোনার পর আমি চারপাশে অন্ধকার দেখতে থাকলাম। যে বাবা আমার জন্য এত কিছু করলেন,যে বাবা আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিল, সেই বাবা আজ নেই। এ কথাটা আমি মানতে পারছিলাম না। বার বার মনে হতে লাগল হয় আমি ভুল শুনছি আর না হয় ও আমাকে মিথ্য বলছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়লাম। তার পরের কয়েক ঘন্টা যে কিভাবে কেটেছিল সেদিন, কখন আমি রতনের সাথে গাড়িতে উঠেছিলাম, বাড়িতে পৌঁছেছিলাম, কখন বাবার কবরের পাশে যেয়ে বসেছিলাম, বাবার কবরের পাশে বসে কেঁদেছিলাম কিনা, তা আজও আমি মনে করতে পারি না। যখন আমি একটু স্বাবাভিক হয়েছিলাম তখন নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম বাবার কবর জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা অবস্থায়। শুনতে পেয়েছিলাম ফজরের আযানের সুমধুর ধ্বনি। পাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম রতন আর ভুতোকে বসে থাকতে। ভুতোর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আমি ভুতোকে কাছে টেনে নিয়ে পরম আদরে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার চোখের পানি ভুতোর শরীরের লোম ভিজিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ মনে পড়তেই পকেট থেকে বাবাকে লেখা চিঠিটা বের করে চোখের সামনে মেলে ধরেছিলাম। চিঠিটা পড়তে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু অক্ষরগুলো সব কেমন যেন ঝাপসা লাগছিল সেদিন। চিঠিটা আবার ভাঁজ করে মাটির ঢেলা দিয়ে চাপা দিয়ে বাবার কবরের উপর রেখে দিয়েছিলাম। চিঠিটা ছিল বাবার কাছে লেখা আমার শেষ চিঠি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement