লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ ডিসেম্বর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৫)

জল নারী মাছরাঙ্গা
বৈশাখ

সংখ্যা

mano bar

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৭৪
নিরাশা আবার বিয়ে করেছে। নিরাশা খুব ফর্সা মিড়মিড়ে সিরসিরে এক ছেলে। তার কিশোর ছেলেকে রেখে হরিয়ালী বৌ নাকি কার সঙ্গে পালিয়ে গেছে। ওর বৌটা ছিল গোলগাল, স্বাস্থ্যবতী শ্যাম্বর্ণা এক ঢঙ্গি। রাস্তায় হাঁটলে মনে হত পেছন দিকটা এই বুঝি খুলে পড়ে যাবে। স্বাস্থ্য আর পশ্চাত নাচন পালাবার অন্যতম লক্ষণ হিসেবে খাতায় নোট করে নিয়েছি। নিরাশার এই বৌটা আবার এক বাচ্চা সমেত নিরাশাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। কেননা তার ভাতারও নাকি কাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। তাহলে মাইনাসে মাইনাসে প্লাস কি করে হয় সেই অংকের রহস্য জলের মত বোঝা গেল।

এমন একটা পুকুর পাড়ে নিরাশার বাড়ী বা ঘর যে পুকুরের কাছে বসে আমি মাঝে মাঝে মাছের ঘাই মারা দেখতাম। দেখতাম উদাসীন মাছরাঙ্গা কেমন তড়িৎ গতিতে ছোঁ মেরে মাছ ধরে উড়ে যাচ্ছে। নিরাশার গলায় দুলত একটা তুলসীর মালা। বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল। কিন্তু ভগবান হচ্ছে লীলাময়। ওর মাথা এমন গরম করে দিল যে ভক্তিভাব গেল উড়ে। শালা নিশ্চয় আগের জন্মে কারো বউ নিয়ে পগার হয়েছিল।

এখন দেখার ব্যাপার এই বৌটা কতদিন পুকুরপাড়ে ঘর করে। এইসব পুকুরের ওপার থেকে একটা হু হু বাতাস এসে যখন তখন মানুষের মন এলোমেলো করে দেয় তখন কোথায় থাকে ঘর আর কোথায় থাকে তোমার সংসার!

পুকুরটা যার তার নাম শৈলেন। পুকুরপাড়ে তার একতলা পাকাবাড়ী। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। কিন্তু অশান্তির কারণ ঐ পুকুর। ফি বছর শৈলেনের পুকুরের মাছ চুরি হয়ে যায়। শৈলেনের সন্দেহ নিরাশার ভাই দাশু এই চুরির পান্ডা। কিন্তু হাতে নাতে ধরা না পড়লে চোর কি আর চোর বলায় যায়। নিরাশার ভাই মোবাইল ফোন চুরি করে দুবার ধরা পড়েছে ঠিক কথা কিন্তু তাবলে মাছ যে সেই চুরি করেছে তার মানে কি? আর চুরি যখন হচ্ছে তখন তোমার প্রতি বছর মাছ ছাড়ার দরকার কি! এই বলে নিরাশা একদিন আমার মতামত জানতে চায়। তখন ওর বৌ পুকুরে স্নান করছে। আর আমি মাছরাঙ্গা ভক্ত হয়ে সানের উপর কবি কবি ভাব নিয়ে বসে আছি। তা মতামত দেব কি যে ভঙ্গিতে ওর বৌ ধীরে সুস্থে দুলকি চালে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে উপরে উঠছে তাতে করে সেই মুহুর্তে মতামত খুঁজেই পেলুম না।

তারপর তো যে পুকুর সেই পুকুর। তা তুমি যে এ পুকুরে চান করতে আসো শৈলেনবাবু কিছু বলে টলে না? নিরাশা প্রায় শুকিয়ে আসা তেল হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে শরীরে বসাতে বসাতে বলে, কাকা কিছু বলে না তবে কাকীমা খুব একটা পছন্দ করে না। শৈলেনবাবু তোমার কাকা হয়? ঐ পাড়া সম্পর্কে কাকা। এই বলে নিরাশা হাসে। তারপর পুকুরে নেমে দুই কানের ফুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে ঝুপ ঝুপ করে বার দশেক ডুব মারে। পুকুরপাড়ের খোলা জানালা দিয়ে একটা আপত্তি জনক দৃশ্য দেখা দিতে না দিতেই তিড়িং বিড়িং করতে করতে শৈলেন সেখানে হাজির হয়।

মনোবাবু যে! পুকুরপাড়ে কি হচ্ছে?
ভাগ্য করেছেন মশাই এতো জামরুল আজ পর্যন্ত কোন গাছে দেখিনি। মিগ্ধ দৃষ্টিতে আমি পুকুরপাড়ের জামরুল গাছের দিকে চেয়ে থাকি।


দুর! দুর! পাড়ার ছেলেদের জ্বালায় রাখার উপায় নেই! শালারা মাছ পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এইবলে ধুপ করে শৈলেনবাবু সানের উপর বসে পড়ে ইঙ্গিতে আমার কাছে একটা সিগারেট চায়। ওদিকে মাছের কথা শুনেই নিরাশা যেভাবে মন্ত্রভুলে এইদিকে চেয়ে থাকে তাতে আমার সন্দেহ হয় ভাই টাই নয় ঐ শালা নিজেই মাছ সরাচ্ছে।

মাছরাঙ্গা দেখতে এলেই আমায় গোটা দুয়েক সিগারেট গচ্চা দিতে হয়। বদলে পাওয়া যায় জলের মত স্বাদহীন এককাপ চা আর শুনতে হয় অনেক আলফাল কথা। জানালার কথা এসময় ভুলে যাওয়াই ভালো। সানের এই ঘাট বড়ই আকর্ষনীয়। মাথা তুললেই ডাবের কাঁদি হাওয়ায় দুলতে দেখা যায়। দেখা যায় থোকা থোকা জামরুল। আর শৈলেনবাবুর মেয়ের বান্ধবীরা এলে ঘাটেই সব বসে যায়। আমি ক্যামেরা ওদের দিকে তাক করতেই দেখি যেন মেয়ে নয় একঝাঁক মাছরাঙা বসে আছে। এদিকে কোন অমোঘ নিয়মে জানিনা নানান কিসিম তরুণ যুবা মাছগুলোও তখন শৈলেনবাবুর এই চত্বরে ঘুরঘুর করতে থাকে।
এসব জুড়িয়ে গেলে আমি ফাঁকতালে শৈলেনবাবুর বৌয়ের কাছে নিরাশার আপত্তিটা রিলে করে দিই। আর অমনি বেরিয়ে আসে নানান খবর। এই বৌটার মতিগতি নাকি মোটেই ভালো নয়। ইতিমধ্যে একজনের যখন তখন আনাগোণা নিয়ে কথা উঠছে। কিন্তু পরদিন নিরাশা জানায় তার শত্রুরা এইসব প্রচার করছে। দিদির কাছে কোন ভাই এলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়?

সেই ভাইয়ের নাম সনাতন। বিবাহিত এক ব্যবসায়ী তবে বয়সে তরুণ। ভাই হওয়া এই বয়সে নিশ্চয় মানায়।

পালাবার কথা শুনে প্রথমেই আমার কৌতূহল হয় সনাতন পথেই কি পালাল। কিন্তু আমার সন্দেহ ভ্রান্ত। পালাল এক বাজারের মক্কেলের সঙ্গে। বৌটা নিজের হাতে বাজার করত কি না।

সেবছর মনসাপুজা উপলক্ষ্যে যে মেলা হয় সেখানে নিরাশার বৌকে দেখতে পেলুম। হলুদ শাড়ী পরে সেজেগুজে ভক্তিভরে পুজো দিতে হাজির হয়েছে। একটা বলি দেবার হাঁস নিয়ে এসেছে। ভগবানের কাছে, তার অনুগৃহীত দেব দেবীর কাছে কেউ অচ্ছুত নয়।


যে কোন কারণেই হোক এ বছর পুকুরের মাছ চুরি হয়নি। তা নিরাশার নতুন বৌ কেমন দেখতে? শৈলেনবাবু অনামিকা আর কনিষ্ঠার মাঝে রেখে সিগারেটে সুখটান দিয়ে বললেন, এক্ষুনি দেখতে পাবে। এইবার আসবে স্নান করতে। তা বলতে না বলতেই দেখলুম শ্যামবর্ণা এক মাঝারি সুশ্রী কন্যা গামছা গায়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। হয়ত উঁচুনীচু সিঁড়ির কারণেই অঙ্গে দোল খেলছে। শৈলেবাবুর সিগারেটের উপরে ছাই জড়ো হচ্ছে আমার মত উনিও ভালো করে বোঝবার চেষ্টা করছেন নিরাশার ভাগ্যকে। আর তখনই কেমন একটা হাওয়া এসে সবকিছু স্তব্ধ করে শুধু ঐ নীচে নামাকেই উজ্বল করে তুলছে। জল, নারী, উতলা বাতাস, মাছরাঙ্গা এইসব নিয়েই জীবন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement