লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ জানুয়ারী ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৫)

নমিতা বৌদি
বৈশাখ

সংখ্যা

Monikanchon Ghosh Projit

comment ০  favorite ০  import_contacts ১,২৮০
সকাল বেলা মধ্যপাড়া যেতে না যেতেই আমার গ্রাম সম্পর্কের এক বউদির কান্নার রোল শুনতে পেলাম। নানা স্মৃতির ঝুলি আওড়িয়ে বউদিটা কি কান্নাটাই না কাঁদছে। তার কান্না দেখলে সবারই কান্না এসে যায়। ব্যাপারটা আর কিছুই না । কিছুদিন আগে আমার সেই গ্রাম সম্পর্কের দাদা মারা গেছে। শুনেছি ক্যান্সারে ধরেছিল তাকে। দেশ বিদেশ করেও ভালো হয়ে ওঠেনি। মনে কাঁটার বেড়া দিয়ে দুঃখটাকে ছুটি দিলাম। আর ভাবতে লাগলাম পাশের বাড়ির আরেক বউদির মৃত্যুর কথা।

আমাদের পশ্চিম পাশের বাড়ির নমিতা বউদি। বউদিকে অনেক কাছ থেকে দেখিনি আবার বেশি দূর থেকেও দেখিনি। আমি দোদুল্যমান হয়েই বউদিকে দেখেছি। কেননা আমি বরযাত্রীতে গিয়েছিলাম। তাই মনে পড়ে সেই হলুদ মাখা শরীরের হলুদাভ উচ্ছ¡লতা, লাল বেনারশির মোহনীয় রঙ, আর রাঙা মুখে নববধূর উচ্ছ¡ল হাসি। তার মুখে এক ঝলক হাসি সব সময় লেগেই থাকতো । সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলতো । বউদিটা গোমড়া মুখে কারো সাথে কোনো দিন কথা বলেছে কি না কেউ বলতে পারে না।

বাঙালি মেয়েদের বিয়ের পর ¯^ামীর ঘরই আপন ঘর হয়। অন্য সংস্কৃতির লোকেদের ক্ষেত্রে কি নিয়ম তা আমার জানা নেই । তবে অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিতে ভিন্নই মনে হয়। কেননা তাদের চাল-চলন, পোষাক-পরিচ্ছদ, কথা-বার্তা সবই তো ভিন্ন । তাই মন-মানসিকতা যে ভিন্ন হবে না এর কোনো কারণ আমি আপাত দৃষ্টিতে দেখতে পাই না।
যাই হোক বাঙালি মেয়েদের পরকে আপন করার রীতি সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। কি এক অপার ঐশ্বরিক শক্তি বিধাতা মেয়েদের ভেতর সৃজন করেছেন তার ঠিকানা পাওয়া ভার। যে ঐশ্বরিক শক্তির দ্বারা হঠাৎ করেই কোনো অচেনা লোককে এতটা আপন করে নিতে পারে।

বাঙালি সমাজ এবং সংসারের নিয়মে মেয়েদের শ্বশুর বাড়িতেই যেতে হয়। সবাই বলে মেয়েদের শ্বশুর বাড়িই আসল বাড়ি। কেননা এখানে তারা কপালে তিলক চন্দন মেখে,বেনারশি পড়ে, গায়ে হলুদ মেখে আসে। আবার তিলক চন্দন পরেই চিরতরে বেরিয়ে যায়।

আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির এই ধারা আবহমান কাল থেকে চলে আসছে। মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে ¯^ামীর ঘরে যেতেই হবে। আর ¯^ামীর বাড়ির লোকেরাই হবে আপনলোক। ¯^ামী হবে পরম আত্মীয় বা আপনজন। পক্ষান্তরে জন্মদাতা পিতা-মাতা, ভাই-ভগিনীরা হবে চিরপর। পরকে আপন আর আপনকে পর করার এই অনমনীয় রীতি আমাদের সমাজে ছিলো-আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আমার মনে হয়।

যাই হোক মেয়েরা যৌবনে পা দিতেই বাবা-মা চিন্তা করে কখন মেয়েকে বিদায় করা যায়। পাত্র দেখে বেড়ায়। নমিতা বউদির বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রায় বিশ মাইল দূর থেকে পাত্র পছন্দ করে গেছে তার বাবা। তাই বাবার কথা রাখতেই নমিতা বউদি আর দশটা মেয়ের মত এক অচেনা অজানা লোকের সাথে হাত মিলিয়েছে। তার হাতে শিথেয় সিঁদুর পরেছে। চোখে চোখ রেখে শুভ দৃষ্টি বিনিময় করেছে। তার পিছনে সাতপাক ঘুরেছে। শেষে মালা বদলও করেছে। পক্ষান্তরে অলোক দাদার নিকটও মেয়েটি কিন্তু চেনা নয় । একেবারে অচেনা অজানা । কিন্তু এই দুই অচেনা অজানা মানুষের মাঝে এত সুনিবিড় বন্ধন কেন বাঁধা হলো? কে বেঁধে দিলো তাদের এই বাঁধনে? অন্য ছেলের সাথে কেন নমিতা বউদির বিয়ে হলো না? কিংবা অলোক দারও তো অন্য মেয়ের সাথে বিয়ে হতে পারতো? কিন্তু কেন হলো না? আমার এই প্রশ্নের জবাব বিধাতা ছাড়া দ্বিতীয় কারো কাছে পাইনি। বিধাতার উত্তর আমার কানে পৌঁছায় নি কোনো দিন।

যাই হোক বিয়ের পর মেয়েদের ¯^ামীর ঘরে আসতেই হয়। বউদিকেও আসতে হলো। সে সবারই আপন হলো । সবাই তাকে আপন করে নিলো। বাঙালি সংসারে ছেলে সন্তানের অপার চাহিদা রয়েছে। কেননা ছেলে সন্তান বংশ রক্ষা করে আর বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি যেতে হয় না। পক্ষান্তরে মেয়ে সন্তান কখনোই বংশ রক্ষা করতে পারে না। কোনো যুক্তিও খাটে না। কেননা বিয়ের পর মেয়েদের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সব কিছুই বদলে যায়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে মেয়েদের জলের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। জল যেমন যে পাত্রে রাখা যায় । সেই পাত্রেরই রঙ ধারণ করে। তদ্রুপ মেয়ে মানুষও তাই। আধ্যাত্মিক পুরুষ লালন শাহ্ বলেছিলেন- “সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী জাতির কি হয় বিধান? কিংবা বামন চিনি পৈতা প্রমাণ বাউনি চিনি কেমনে।” বাস্তবেও মেয়েদের দেখে আসলে ধর্ম-বর্ণ নির্ণয় করবার উপায় নেই।


সমাজ সংসারের চাহিদা মত নমিতা বউদিও ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায় এমনই অবস্থা এই বউদিটিরও। রাতের বেলায় সুস্থ মানুষ ঘুমাতে গেলেও সকালে আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারে নি। শেষে শাশুড়ির কটু কথা হজম করে লাঠি ভর দিয়ে উঠতে হয়েছে। পক্ষাঘাতে বউদির বাম দিকটা একেবারে অচল হয়ে গেছে। আজ লাঠিটাকে সম্বল বানিয়ে হাঁটা চলা করে। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখানো হলেও কোনো ফল হয় নি। তাই ধীরে ধীরে বউদির উপর থেকে সংসারের আদর উঠে যেতে থাকে। কমে যায় প্রাণপ্রিয় ¯^ামীর অপার ¯েœহ।
কাগজের পৃষ্ঠার মত সংসারের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি ¯^ামী পক্ষাঘাত গ্রস্থ। কিন্তু স্ত্রী তাকে ফেলে না যেয়ে প্রতিদিন ৩-৪ কিলোমিটার পথ হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়ায়, ¯^ামীর মুখে ভাত তুলে দেয়, ¯œান করায় । কেন এটা করে? আর স্ত্রী অসুস্থ হলে তার প্রতি ¯^ামীর কেন এত অযতœ? এই কি বাঙালি সমাজের রীতি-নীতি? এটাই কি ¯^ামী স্ত্রীর ভেতরকার প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা? হায় রে বাঙালি সমাজ!
সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে-এ কথাটি সবাই অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করলেও আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। কেননা, নমিতা বউদির রূপ-গুণ কোনো অংশে কম ছিলো না। ¯^ামীর সাথে চার-পাঁচ বছর ধরে সংসারও করেছে। কিন্তু অসুস্থতার জন্য তার রক্তঘাম এক নিমিষেই ধুলো হয়ে উড়ে যেতে পারে? না ! পারে না । কিন্তু তাই হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।

নমিতা বউদির ভাগ্যেও অসুস্থ হয়ে ¯^ামীর সেবা শশ্রæষা জোটেনি । আমাদের সমাজে যে ব্যক্তি কাজ করতে অক্ষম তাদের কোনো মূল্য নেই। তারা এই সংসারের সবজির উচ্ছি¡ষ্ট। আবর্জনা। বউদিও এই সংসারের আবর্জনাই । ¯^ামীর গালাগাল আর শাশুড়ির দাঁত খিঁচুনি একটা রক্ত মাংসে গড়া শরীরধারীর পক্ষে কতদিন সহ্য হতে পারে। এক মাস। দুই মাস। কিংবা বড় জোর এক বছর । এর বেশি নয়। তবুও বউদি দুই বছর ধরে সহ্য করেছে। সংসারের লোকেরাও বলাবলি করে বেচারি মরে গেলেই বাঁচি। তাই আর নয়। বউদিও ভাবে অনুভব করে যে, সে এই সংসারের বোঝা। বিধাতাকে ডেকেও রক্ত মাংসের শরীরটা থেকে মুক্তি পায় না। কেননা এখানেই তো বিধাতার পার্শিয়ালটি । জানি না কি অপরাধ ছিলো বউদির। আর সেই অপরাধের এই করুণ শাস্তি তাকে ভোগ করতে হচ্ছে তীলে তীলে।

মানুষ খুব সহজেই পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না। কেউ-ই চায় না এই পৃথিবীর আলো বাতাস থেকে বঞ্চিত হতে। তাই বউদিরও তেমন কোনো আশা নেই বলে ¯^ামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। বাবা-মায়ের মন মানে না। তাই অসুস্থ মেয়েকে ভ্যান গাড়িতে করে নিয়ে যায় একটু সেবা করার জন্য । কিন্তু বাপের বাড়ি যেয়েও তেমন পরিবর্তন হয় না। সেখানেও বাড়তি একটা বোঝার মত মনে হয় সবার কাছে। নতুন নতুন কয়েক দিন আদর হলেও পরে আদর কমে যায়। বউদিটারও একই অবস্থা। আর ভালো লাগছে না। হাত না নাড়াতে পেরে কাঁদে। কিন্তু কাঁদলে কি আর হাত ভালো হবে। না? তা কি করে সম্ভব?

তাই ভাবনার রশিতে নিজেকে বেঁধে নিয়ে শত দুঃখ যন্ত্রণা বুকের কোটরে করে ¯^ামীর বাড়ি যাবার অচল সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা মেয়েরা ¯^ামীর বাড়িতে মৃত্যুকেই ¯^র্গসুখের মৃত্যু বলে মনে করে। ¯^ামীর বাড়িতে আশার পর থেকেই শাশুড়ির মুখ কালো কুচকে চেহারায় পরিনত হয়। ¯^ামীর তিক্ত কথার ফুলঝুরি বউদিকে আরো কাঁদায়। তাই বেশিদিন টিকতে দিলো না কেউ বউদিটাকে।

এক দিন রাতে নিঃশব্দে গলায় দড়ি দিয়ে বউদিটি নিঃশেষ হয়ে গেল চিরতরে। পরদিন সকালে সেই তিলক-চন্দন মেখে দিলো বাড়ির অন্য লোকেরা। চিতায় ওঠানোর পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। চার বছরের ছেলের হাতের আগুন পেয়ে কালো ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেল নমিতা বউদি।

আমাদের সমাজে এখনো এমন হাজারো নমিতা বউদি আছে যাদের একই অবস্থা। আমাদের মন মানসিকতা উন্নত না করলে এমনই হাজারো নমিতা বউদি পৃথিবীর থেকে নীরবে হারিয়ে যাবে। হায় রে মানুষ! হায় রে সমাজ! হায় রে সংসার! হায় রে নিয়তি!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement