লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মে ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৫)

শুভ নববর্ষ
বৈশাখ

সংখ্যা

সাদাত শাহরিয়ার

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩৪২
আজকে চারুকলার সবাই ভীষণ ব্যস্ত। সকাল থেকে কারুর যেন দম ফেলার জো নেই। বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া কোনটাই এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অথচ এই দুপুরে চৈত্র সংক্রান্তিরও প্রায় অর্ধেক চলে গেল। বিকেলের আগে ম্যুরালগুলো শেষ না করতে পারলে আগামীকালের মঙ্গল শোভাযাত্রা যে শোভা হারাবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। অহনা দ্রুত হাতে একটা বাঘের মুখোশে কালো তুলিতে গোঁফ আঁকার চেষ্টা করে। হঠাৎ অন্তু এসে বলল, ওহ হো হল না অহনা। বাঘের গোঁফ এত মোটা হয় না। একটু চিকন করে আঁক।
কইছে তোরে! শালা বেশি পণ্ডিতি দেখাস! মনে মনে বলে অহনা। শত হলেও ডিপার্টমেন্ট সিনিয়রকে তো সামনা সামনি যা খুশি তা-ই বলা যায় না। একটু পর অহনা অন্তুকে বলল, জি ভাইয়া ঠিকই বলেছেন। এই দেখুন বাঘের গোঁফ একদম চিকন করে দিলাম।
-কই দেখি। হুম এখন ঠিক আছে।
- আরে ভাইয়া আমি তো খেয়ালই করিনি। দেখুন এই গোঁফটা এখন একদম আপনার গোঁফের মত হয়ে গেছে!
অহনার কথা শুনে আশে পাশের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। দিলাম ব্যাটাকে এক হাত! অহনা ভাবে আর হাসে। সেই শুরু থেকেই এই ছেলেটা গায়ে পড়ে জ্ঞান দিতে আসে। বিষয়টা অসহ্য লাগে অহনার। একবার বকুলতলার এক আড্ডায় কে যেন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ কার লেখা? অহনা বলেছিল, মধুসূদন। তার এ সংক্ষিপ্ত জবাব শুনে অন্তু যেন একটু বেশিই ক্ষিপ্ত হয়েছিল সেদিন, শোন অহনা। এভাবে বললে হবে না। বলতে হবে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আচ্ছা ‘মধুসূদন’ নামে তো যদু, মধু, রাম, শ্যাম যে কেউই হতে পারে। কিন্তু কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো একজনই। তা-ই না? তোমার মত আজকালকার দিনের ছেলেমেয়েদের এমন সর্ট কাট মানসিকতা চরম অস্বস্তিকর। শিল্পী, সাহিত্যিকদের কিভাবে সম্মান করতে হয় তা তোমার শেখোইনি ... । এরপর অন্তু কি বলেছিল তা আর অহনার মাথায় ঢোকেনি। অহনার শুধু মনে হচ্ছিল তার মাথার মধ্যে যেন হাজার হাজার ঝি ঝি পোকা মিছিল মিটিং করছে! আর তাদের দাবি যেন একটাই – অন্তু, তোরে দেইখা নিমু!!!
[২]
পরদিন সকালবেলা।
বৈশাখী সূর্যের প্রথম আলোয় উদ্ভাসিত চারদিক। বকুলতলা থেকে ভেসে আসা ‘এসো হে বৈশাখ’ আহবানে আজ যেন জাগ্রত গোটা বাঙালি হৃদয়। টি এস সির রাজু ভাস্কর্যের পা ছুঁয়ে অপরাজেয় বাংলা ঘিরে আজ যেন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছুটেছে। অহনা জীবনে আজ প্রথম শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরে হাঁটতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তারপরও মনে এতটুকু বিরক্তি আসছে না। মঙ্গল শোভাযাত্রায় তার মত আরও অনেকে আছে – জুঁই, কারিশমা, আঁখি – এরা সবাই-ই আজ জীবনে প্রথম শাড়ি পরেছে। জুঁই বলল, দোস্ত শাড়ির প্যাচে প্যাচাইয়া গেলে আমারে ধরিস কিন্তু!
-আমারেও ধরিস ভাই। বলল অহনা।
সামনের দিকে ইঙ্গিত করে জুঁই অহনাকে বলল, তোরে ধরার লোক চলে এসেছে!!
অহনা দেখল তাদের ঠিক সামনেই অন্তু হাঁটছে। বাহ বেশ। আজকের দিনটা স্মরণীয় করে রাখার এই সুযোগ। দোস্ত তোর কাছে কাগজ, কলম আছে না?
অহনার কথা শুনে বিস্মিত হয় জুঁই, কি বললি? কাগজ কলম দিয়ে তুই এখন কি করবি?
-অন্তুকে দেখে আমার মধ্যে কিঞ্চিৎ কাব্যভাব জেগে উঠেছে। দে দে কাগজ কলম দে। দেরি হলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।

ঘণ্টাখানেক পর।
অন্তু ঠিক বুঝতে পারছে না কি হয়েছে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন বিভ্রান্তিকর হাসি দিচ্ছে। এমন কি ডিপার্টমেন্টের দুই একটা মেয়ে তাকে দেখে চোখও টিপে দিল। আজিব ব্যাপার! হলটা কি সবার! আজকে কি আমাকে অত্যধিক সুন্দর লাগছে! অতি সুপুরুষ টাইপ কিছু!! কাউকে সে কিছু বলতেও পারছে না আবার সইতেও পারছে না। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোনটা রিসিভ করতেই বন্ধু আলিমের কণ্ঠ শুনল অন্তু, কিরে গোপাল ভাঁড়! পিঠে জন্তু ট্যাগ নিয়া ঘুরতাছিস ক্যান? মেয়েদের আটেনশন পাওয়ার তোর এত শখ!
-মানে কি এই কথার? তাড়াতাড়ি পিঠে হাত দিল অন্তু। আরে এটা কি? একটা সাদা কাগজে বড় বড় হরফে লেখা – ‘এই আমি অন্তু / বিরাট এক জন্তু’। কিন্তু এটা তার পিঠে কে লাগাল?
-কিরে গাধা! পাইলি কিছু?
-ওই আলু ফোন রাখ।
অন্তুর মাথায় যেন আগুন জ্বলতে থাকে। কে? কে করল এমন কাজ? সকালে বাসা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রা পর্যন্ত প্রতিটা ঘটনা সে খুব মনোযোগ দিয়ে ভাবতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারে না। মিছিলে একবার তার মনে হয়েছিল কে যেন তার পিঠে হাত দিচ্ছে। কে যেন ছিল পিছনে? কে যেন? পেয়েছি! আমি শিউর এটা অহনার কাজ।
[৩]
বিকেলবেলা।
অহনা বন্ধুদের সাথে চারুকলায় আড্ডা দিচ্ছে। চারুকলার ভিতরে শিক্ষার্থীদের বানানো অনেকগুলো ভাস্কর্য আছে। এর মাঝে একটা আছে বয়স্ক এক লোকের কোমড় পর্যন্ত বানানো প্রতিকৃতি। অহনা ওটার গলা জড়িয়ে ধরে জুইকে বলল, এই আমার জামাইয়ের সাথে আমার ছবিটা তোল তো ...
-দাঁড়া তুলতেছি।
কিন্তু অহনার আর ছবি তোলা হয় না। এরই মধ্যে তার সামনে বিনা মেঘে ব্জ্রপাতের মত উদয় হয় অন্তু। এটা তুমি কোন কাজ করলে অহনা? আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি? আমাকে সবার সামনে হাসির পাত্র বানিয়ে তোমার কি লাভ হল?
অহনা কিছু বলে না। চুপ করে থাকল।
অন্তু বলতে থাকে, আমি কি তোমার সাথে খুব বড় কোন অন্যায় করেছি? আমি মাঝে সাঝে তোমার টুকটাক ভুল শুধরে দেবার চেষ্টা করেছি। সেটা কি কোন অপরাধ হয়েছে?
অহনার এবার একটু একটু খারাপ লাগতে থাকে। আসলেই তো! অন্তু তো তার কোন ক্ষতি করেনি। সরি ভাইয়া। ভুল হয়ে গেছে।
-তুমি জান না অহনা তোমার এই টুকরো সাদা কাগজ আমাকে আজ চারুকলার ‘গোপাল ভাঁড়’ বানিয়ে দিয়েছে।
কথাটা শুনে অহনার ফিক করে হেসে ফেলতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতির জন্য সে হাসতে পারে না। নিচু স্বরে আবার বলে, সরি ভাইয়া।
অন্তু বলল, জানো মানুষ যাকে খুব পছন্দ করে তার কাছ থেকে এতটুকু কষ্ট পেলেও তার মাত্রা অনেক বেশি মনে হয়।
অহনা কিছুই বলে না। তার এখন আসলেই খারাপ লাগতে থাকে। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ থাকে। বাতাসটা অনেক ভারি মনে হতে থাকে। একটু পর কিছু না বলেই অন্তু চলে যাওয়া শুরু করে। অহনা তাকে থামায়। অন্তু ভাইয়া সরি। একটা কথা আজ আপনাকে বলা হয়নি। শুভ নববর্ষ।
অহনার কথা শুনে অন্তু হেসে ফেলল, ও হ্যাঁ তাই তো, শুভ নববর্ষ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement