-হামিদ, এদিকে আয় তো একটু।
হামিদ এগিয়ে আসে গুটি গুটি পায়ে। মা রান্নাঘরে দাঁড়ানো ছিল।
-“কয়টা বাজে দেখে আয় তো বাবা, মাথাটা কেমন জানি ব্যাথা ব্যাথা করছে আমার।”
-“শুয়ে থাকো তো মা, বেশি বাজে না। আব্বু তো আসবে সেই রাত আটটায়। রান্না তারপর করলেই পারো। ঘুমাতে ঘুমাতে তো সেই রাত ১টাই।”
-“নাহ, মানুষ টা কষ্ট করে আসবে। রেঁধেই রাখি। আজকে আবার তোর আব্বুর পছন্দের ইলিশ রাঁধলাম, তুই যাহ, যা করছিলি কর গিয়ে।”
কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে চলে যায় হামিদ। জানে যে বুঝানর চেষ্টা করে লাভ নেই মা কে।
রাত দশটার দিকে খেতে ডাকায় টেবিলে যেয়ে হামিদ দেখলো মা একা বসে আছে। চোখটা কেমন ভেজা ভেজা দেখে আর প্রশ্ন করলো না কোনো। চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল।
বারটার দিকে পানি খেতে যেয়ে দেখলো মা এখনও একইভাবে বসা টেবিলে। হামিদ কাছে যেয়ে আস্তে করে বললো, “মা, শুতে যাও। রাত তো অনেক হয়েছে।”
-“হ্যা রে যাই, তুই যা”- বলে সচকিত হয় ওর মা।
সে রাতে বাসায় ফেরে না হামিদের আব্বু আনিস সাহেব……………
পরদিন সকাল থেকেই হামিদের মন খুশি খুশি হয়ে আছে। আজকে ওর নানুর আসার কথা। একটু চিন্তা অবশ্য লাগছে ওর আব্বুকে নিয়ে কারন সকালের দিকেই ওর আব্বু আর মায়ের একটা বিশাল ঝগড়া হয়ে গেছে।
হামিদ শুয়ে ছিল একা একা। কলিংবেল বাজায় মা দরজা খুলে দিয়ে সরে আসলো দেখলো ও। আব্বু ঢুকলো ঘরে। কেমন জানি অদ্ভুত আচরণ করছিলো আব্বু। দেখে ভয় পেয়ে গেল হামিদ। ওর চেনা আব্বুর মত লাগছিলো না আব্বুকে। সেই সময়েই হঠাত মা চিৎকার দিয়ে উঠলো-
“আবার আনিস? আবার এগুলো করে আসলা তুমি? ছেলেটার জন্যেও কি আমাকে একটু দয়া করা যায় না?”
-চুপ থাক, কেমন জানি গর্জে উঠে আব্বু।
ভয়ে কেঁপে উঠে হামিদ শুনে। পরের পুরো সময়টা হামিদ হিস্টিরিয়া রোগীদের মত কাঁপে আর কাঁদে। ওর সামনে যা হচ্ছিল ও কিছুই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। নৃশংসতার সব সীমা পার হবার পর ঝগড়া যখন শেষ হল, আব্বু দাঁড়িয়ে ছিলো কোণায় আর মা বিছানা ধরে উঠার চেষ্টা করছিলো আর হামিদ আব্বুর ভয়ে শব্দ না করে মুখ চেপে ধরে কাঁদছিলো।
কান্নার কারণটা শুধু ভয় ছিল না, ছিল ভয় আর অদ্ভুত একটা লজ্জা। মায়ের জন্যে ভালবাসা থেকে যে লজ্জা উঠে আসে।
নানুরা আসে বিকেলের দিকে। নানু আর নানা এসেই কেমন গম্ভীর মুখে মা কে নিয়ে মায়ের রুমে যেয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। হামিদ অবাক হয়ে যায় নানু ওকে একবার আদর ও করলো না দেখে। ওদিকে আব্বু বেরিয়ে গেছে বাসা থেকে ঝগড়ার পরপর ই। অনেক্ষণ পর যখন নানুরা ঘর থেকে বের হল তখন হামিদ দেখলো মা ঝরঝর করে নানুকে ধরে কাঁদছে। নানা হামিদ কে দেখে বললো-“কি রে, চল- মা আর তুই কিছুদিন আমাদের সাথে থাকবি”
হামিদ বুঝে গিয়েছিলো এটা স্বাভাবিক নানুর বাড়ি বেড়ানো না। মা দেখলো ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করছে। হামিদ আস্তে করে যেয়ে মা কে জড়িয়ে ধরলো। পৃথিবী তো এটাই, না?
পনেরো বছর পরের কথা-
একটা অভিজাত বাসা ধানমন্ডির। হামিদ, ওর মা আর স্ত্রী সুনীলা থাকে এখানে। সুনীলার বাচ্চা হবে, খুশিতে বেশিরভাগ সময়েই তার গালদুটো লাল হয়ে থাকে। হামিদ আর ওর মা মোটামোটি সারাদিন ই সুনীলা কে এটা নিয়ে ক্ষেপায়। প্রায় সময়েই দেখা যায় সুনীলা রাগ করে বারান্দায় যেয়ে ওর বাচ্চার সাথে কথা বলছে,
“দেখসো তুমি, তোমার বাবা আর দাদী কেমন করে? তুমি কিন্তু আমাকে ওদের থেকে বেশি ভালবাসবে,তাই না?”
এসব সময়ে মাঝে মাঝে লুকিয়ে ওকে দেখে হামিদ। ওর মনে পড়ে যায় একটা সময়ের কথা-
ওর মা কাঁদছে, ভিক্ষা করার মত করে ওর বাবাকে বলছে যে হামিদকে নিও না,আমার কাছেই থাকুক ও। আর ওর ঘৃণ্য বাবা, ওই লোকটা টাকা চাচ্ছে ওর মায়ের কাছে। কি কষ্ট করেই না মা হামিদ কে নিজের করে রেখেছিলো, মা না থাকলে…………………
ভাবতে পারে না হামিদ আর, চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। সুনীলার দিকে চেয়ে মনে মনে প্রতীজ্ঞা করে ও, সুনীলাকে যে মা বলে ডাকবে – তার কখনও ঐ কষ্টগুলো হবে না যেগুলো হামিদ পেয়েছে, সুনীলার কখনও ঐ কষ্টগুলো পেতে হবে না- যেগুলো হামিদের মা পেয়েছিলো।
হ্যা, হামিদের শক্ত প্রত্যয় নীরবে এটাই বলতে চায়,- “একদিন সব আনিস সাহেবের দিন শেষ হয়ে যাবে, যাবেই”
১৯ জানুয়ারী - ২০১১
গল্প/কবিতা:
৯ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
প্রতি মাসেই পুরস্কার
বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।
লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন
-
প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ নভেম্বর,২০২৪