লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ২০১৮
গল্প/কবিতা: ৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার প্রিয়ো বন্ধু (আগস্ট ২০১৫)

বাবার বন্ধু
আমার প্রিয়ো বন্ধু

সংখ্যা

নাঈম

comment ০  favorite ০  import_contacts ৫৮৪
বাবার বন্ধু
বন্ধু প্রায় সবারই ভাল লাগে, পুরানো বন্ধু খুঁজে পেতে যেন আরো বেশী ভাল লাগে। সময়ের সাথে পুরানো বন্ধুরা জীবনের বিভিন্ন রঙ-তুলির টানে যেন নানা রঙের হয়ে ওঠে। তারুন্যে বন্ধু্ত্ব শুরুর অনাবিল স্মৃতি গুলোই যেন বন্ধুকে কাছে টেনে আনতে চায়। অনেক বন্ধু আবার অবস্থার কারনে এড়িয়ে যেতেও চায়, কেউ হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে।
এপ্রিল ২০০২, কলোরাডোর ডেনভার বিমান বন্দরে হোটেল এর শাট্ল গাড়ী এসে পৌঁছালে গাড়োয়ানকে দুডলার বকশিশ দিয়ে নেমে আসলাম। বকশিশ এর পরিমান কম হওয়ার কারনে ওঁর ভদ্রতাতেও কমতি দেখা গেল, সে গাড়ীর দরজা খুলে দিলনা, পেছন থেকে ব্যাগটাও বের করে দিলনা। ছাত্র মানুষের এসব ছোট খাট অসুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েই থাকে, গায়ে মাখতে নেই। গাড়ী থেকে নেমে ট্রলি নিয়ে, ওটাতে ব্যাগ রেখে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে ভাবলাম, গত এক সপ্তাহে লেখাপড়া আর পরীক্ষা মিলে নিজের ওপর যা ঝড় গিয়েছে, বিমান বন্দরের ভেতরে ঢুকবার আগে এখন একটু হেঁটে, হাতপা ঝেড়ে ঢুকি। বাইরে ঝলমলে রোদ গ্রীষ্মের আগমন বার্তা দিচ্ছে, ডেনভারের মত পর্বত শীর্ষের শহরেও শীত করছেনা। ট্রলিটাকে এক পাশে সরিয়ে, মাল পত্রের দিকে লক্ষ রেখে বিমান বন্দরের একদিক থেকে অন্যদিকে হাঁটছিলাম।
আমার ট্রলিটার কাছেই দেখলাম সাদা দামী একটা গাড়ী এসে দাঁড়াল, সামনে চালকের সীট থেকে একজন চশমা পড়া মাঝারি উচ্চতার, একটু গোলগাল দক্ষিন এশীয় এক ভদ্রলোক নামলেন। অন্য পাশে ঘুরে এসে ওনার সোনালী চুলের শেতাঙ্গ স্ত্রী কে দরজা খুলে দিলেন। অতঃপর পেছনের সীট থেকে ছেলে আর মেয়েটাকে নামালেন। বাচ্চাগুলো পুতুলের মত সুন্দর, ছয় কি সাত বছর বয়স হবে, ছেলেটি দারুন ছটফটে, আর মেয়েটি বেশ শান্ত, উনি দুই বাচ্চারই হাত ধরে আছেন। বাচ্চা দুটো ওনার সাথে যেতে চায়, বাবাকে ছাড়তেই চাইছেনা। হাঁটু ভেঙ্গে বসে উনি ওদের আদর করে বোঝাতে চেষ্টা করছেন, মনে হয় বলছেন মাত্র কয়েক দিনের জন্যে উনি যাচ্ছেন বা এরকমেরই কিছু একটা। ওনার স্ত্রী ততক্ষনে গাড়ীর পেছন রাখা ব্যাগটা এনে পাশে দাঁড়িয়ে তিন জনের কান্ড দেখে মিটি মিটি হাঁসছেন। একটু পর, মহিলা ব্যাগটা ভদ্রলোকের পাশে রেখে বাচ্চা দুটিকে সামলে নিলেন, বাচ্চাদুটি ও তাঁর স্ত্রীকে বিদায় ভালবাসা দিয়ে ভদ্রলোক বিমান বন্দরের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। পারিবারিক বিদায়ের দৃশ্যটা দেখে আমার মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেল। আমার মেয়েটা নিশ্চই এখন অপেক্ষা করে আছে ওর বাবার বাড়ী ফেরার জন্যে, ডেনভারে আসার দিন, বাড়ী থেকে বের হবার সময় সে ঘুমিয়ে ছিল, ঘুম থেকে উঠে আমাকে ঘরময় খুঁজেছে। আমার দুবছরের মেয়েটা চুপচাপ গোছের। আমি জানি, বাড়ী পৌঁছালে সে আসে পাশে ঘোরাঘুরি করবে, টুকটাক দুএকটা কথা বলবে, এই ওর আদরের প্রকাশ, ডেকে কোলে নিলে খুশী হয়ে আমার বুকের সাথে লেপ্টে থাকবে। ভদ্রলোক প্রায় আমারই বয়সের, আনুমানিক বত্রিশ বছর বয়স, দেখে মনে হয় এদেশে সুন্দর জীবন গুছিয়ে ফেলেছেন। আর আমি, ভাল জীবনের স্বপ্নে মাত্র স্বপরিবারে দেশ ছেড়েছি এখনো বছর পার হয়নি। একটা ভাল চাকুরীর আসায় পড়তে ঢুকেছি, এই পরীক্ষা আর লেখাপড়া করে আদৌ কোনও লাভ হবে কিনা এখনও জানিনা। অনিশ্চয়তা আমাকে চারিদিকে চোখ রাঙ্গাচ্ছে।
সাত-পাঁচ চিন্তা করছিলাম, কয়েক মিনিট পর বিমান বন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রবেশের জন্যে ঘোষনা শুনলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, আমি সুলভ, অর্থাৎ ইকনমি শ্রেণীর যাত্রী, লাইনটা একটু লম্বা হবে এটাই স্বাভাবিক। দেখলাম পাশের এক্সিকিউটিভ ক্লাশের লাইনে জনা দশেক যাত্রী, ওনারা বিমানের বেশী ভাড়া দিয়েছেন তাই একটু আরামে যাবেন বই কি। দু-তিনজনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই দক্ষিন এশীয় ভদ্রলোক। আড় চোখে দেখে বুঝবার চেষ্টা করছিলাম উনি কোন দেশের লোক? এক্সিকিউটিভ ক্লাশে আমাদের বর্ণের খুব কাউকে দেখিনা তাই এই কৌতুহল, ভারতীয় না পাকিস্তানী? কোন এক কারনে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশী, কেন বা কি ভাবে ওটা মনে হচ্ছিল বুঝতে পারছিলামনা। হঠাৎ ওনার চোখ আমার ওপর স্থির হয়ে গেল, বেশ অস্বস্তিকর অবস্থা, আমি অন্য দিকে তাকানোর ব্যার্থ চেষ্টা করতে লাগলাম। তারপর ভদ্রলোক বেশ জোরেই বলে উঠলেন, এই তুই মালতী না? গলার স্বরে কোন সংকোচ বা দুর্বলতা নেই, যেন গতকালই দেখা হয়েছে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, বহু বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক পড়বার সময়কার ঘটনা, ছেলেদের কলেজের এক নাটকে নষ্টা নারীর চরিত্রের জন্যে কোন মেয়েকে না পেয়ে, ওই চরিত্রটি আমাকেই করতে হয়েছিল সেই থেকে কলেজে আমার ডাক নাম ছিল মালতী। ঝপাং করে লাইন এর ফিতা টোপকে কাছে এসে বললেন, বলতো আমি কে? ততক্ষনে আমি ওনাকে স্মৃতি হাতড়ে চিনতে পেরেছি, আমাদের কলেজের ছাত্র মুনিরুল হাফিজ, কাছে আসার পর জানালাম ওনার নাম, পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললেন, “আমাকে কি তোরা এই নামে ডাকতি?” এবার মৃদু হেসে ওঁর কলেজের ডাক নাম "অ্যাসিটিক এসিড" ছিল তাই জানালাম। হা হা করে প্রান খোলা হাসি দিয়ে উঠলেন, ততক্ষনে ওনার মালপত্র বুঝিয়ে দেবার পালা চলে আসাতে ফিরে গেলেন নিজের লাইনে, জানালেন ভিতরে গিয়ে গল্প হবে ।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়াদি শেষ করে এক পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে আছি। মনে মনে ভাবছি, "বড় লোক বন্ধুর সাথে অত গা ঘেঁষায় কাজ নেই।" একটু পর দেখলাম উনিই আমাকে খুঁজে বের করলেন। জানতে চাইলেন আমি কবে টরন্টো এসেছি। গল্প শুরু হল, পরিবারে খোঁজ নিলেন, আমি মুনিরুল কে 'আপনি' সম্বোধন করায় বেশ বিরক্তি নিয়ে বললেন, তোর কি হয়েছে বলতো, কলেজে থাকতেতো বেশ উচ্ছল ছিলি তুই।
বাধ্য হয়েই, অনুযোগের চাপে, সাবধানতার সাথে “আপনি” কে তুইতে পরিবর্তন করতে হল। ডেনভারে গত এক সপ্তাহ লেখাপড়া আর পরীক্ষার কথা বললাম, খুব আক্ষেপ করে জানাল, ওর জানা থাকলে নিজের বাড়ীতে নিয়ে রাখতো। জানালো ওর স্ত্রী আমেরিকান হলেও ছোট বেলাটা কেটেছে বাংলাদেশে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায়। মিশনারি হাসপাতালে ওর শ্বশুর আর শ্বাশুড়ি ডাক্তার ছিলেন। মহিলা বাংলায় কথা বলা, বাংলদেশী রান্না, সবই পারেন, বাঙালী আতিথেয়তাও ভালই রপ্ত করেছেন। ওর স্ত্রী পেশায় উকিল, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় ওদের পরিচয় হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেই মুনিরুল এদেশে চলে এসেছিল, জীবন বিজ্ঞান(Life Science) এ লেখা পড়া শেষ করে ডাক্তারী পড়েছে। মুনিরুল ওর স্ত্রী, ক্ল্যারাকে বিয়ে করেছে ডাক্তারী পাশ করেই, প্রায় বছর খানেক আগে শেষ করেছে বিশেষজ্ঞ হবার লেখাপড়া, এখন একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ। খুব মজা করে সে জানাল, এদেশে ডাক্তারদের চিকিৎসা সংক্রান্ত মামলায় পরবার বেশ সম্ভাবনা থাকে, তাই উকিলকে বিয়ে করেছে। বিমানে উঠবার ডাকে গল্পে ছেদ পড়লো, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বিমান আকাশে উঠলে আবার গল্প হবে।
বিমান আকাশে উঠে গেলে, একটা বই পড়ার চেষ্টা করছি, পরবর্তী চার ঘন্টা পার করতে পারলেই বাড়ী পৌঁছে যাব, মেয়ে আর বৌকে দেখতে পাবো, তারই অপেক্ষায়। মিনিট দশেক পর বিমানবালা আমার নাম ডেকে অবস্থান জানতে চাইলে বুঝতে বাকি রইলনা মুনিরুল আমাকে খুঁজছে। বিমানবালার পেছন পেছন এক্সিকিউটিভ ক্লাশে ঢুকলাম, দেখলাম মুনিরুল আগেই পাশাপাশি দুটো চেয়ার ব্যাবস্থা করে রেখেছে। খুব সংকোচ হচ্ছিল, নিজের অবস্থান যখন দুর্বল থাকে, তখন অতি ক্ষুদ্র অযাচিত আদর নিতেও বেশ অস্বস্তি লাগে। কিন্তু ওর আব্দারও ফেলতে পারছিলামনা, বসতেই আমাদের জন্যে টোস্ট, ডিমের ওম্লেট, জ্যাম,কফি ইত্যাদি দিয়ে প্রাতঃরাশ এসে হাজির। বললাম, আমি ভাই সুলভ শ্রেনীর মানুষ তাই সকালে পেট পুরে খেয়ে পথ দিয়েছি, হেসে ও জানালো, সেও বহু বছর সুলভ শ্রেনীর যাত্রী ছিল, তাই উচ্চ শ্রেণীতে চড়তে পারার আনন্দটা ভাগ করে নিচ্ছে মাত্র।
গল্প বেশ জমে উঠলো, মুনিরুল জানালো ওর বাবা বোনের সাথে ক্যানাডার কিংস্টন এ থাকেন, টরন্টো থেকে দুঘন্টার পথ, সেখানেই বাবাকে দেখতে যাচ্ছে। জানালাম, আমিও স্বপরিবারে কিছুদিন আগে এসেছি, এখনও গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি, খুব ছোট একটা চাকুরী পেয়েছি, গুদামের কেরানী হিসেবে, অল্প ভাড়ায় এক রুমের একটা বাসায় থাকি। দেশে ফেলে আসা আত্মীয় সজ্জন, বাড়ী আর চাকুরীটার জন্যে এখনো মন কাঁদে। আর নূতন অভীবাসীদের সার্বক্ষনীক যন্ত্রনা আর্থিক অসচ্ছলতাতো আছেই। ক্ষীন একটা আব্দার করলাম যদি ইচ্ছে করে ফেরার পথে ঘুরে যেতে। সে সানন্দে সম্মতি দিল, জানালো ফেরার দিন বিকেলে জাভেদ আর সেলিম এর সাথে দেখা হবার কথা, ওদের সাথেও আমার আবার যোগাযোগ করিয়ে দেবে, আমার তাতে ভাল চাকুরী পেতে সাহায্য হতে পারে। ও দেখলাম অনেক পুরানো বন্ধুর খোঁজ খবর রাখে। ওর ভাষায় “তাল গাছের” মত একা অনেক উঁচুতে উঠে কি আর আনন্দ রইল, সবার সাথে আনন্দটা ভাগ করে নেয়া ওর কাছে অনেক বেশী গ্রহনযোগ্য বলে মনে হয়। মনে মনে আমি ভাবছি, মুনিরুল ছাত্র জীবনে এতটা বন্ধু প্রাণ ছিলনা, বেশ অন্য রকমের মানুষ হয়ে গেছে। ওর বাবা কিসের যেন বড় কর্তা ছিলেন, প্রতিদিন কলেজে বাবার গাড়ীতে আসত, আর আমি অনেক দূরে যেখানে লজিং থাকতাম সেখান থেকে প্রায় ঘন্টা খানেক বাইসাইকেল চালিয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে আসতাম। সবার সাথেই ও মিশত, তবে একটা অলিখিত দুরুত্বও রাখতো। ও আমার মনের কথা যেন মুহুর্তের মধ্যে পড়ে ফেলে বলল,
- জানিস আমার পরিবির্তন শুরু হয়েছে ক্ল্যারার সাথে পরিচয়ের পর থেকে। আমাদের দেশে ওর বাবা-মা কাজ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু অনেক বন্ধু বানিয়েছেন, আমেরিকান হয়েও আমাদের দেশে ওদের অনেক বন্ধু। আমাদের দেশের নিয়ম, আচার আচরন অনেক কিছু রপ্ত করেছেন, ওদের বন্ধু ভাগ্যও বেশ ভাল বলতে পারিস। এদেশেও ক্ল্যারার অনেক বন্ধু, ওর বড় গুন হল, সে বুঝতে পারে কেমন করে বন্ধুত্বকে সুন্দর ভাবে রাখতে হয়।
গল্পে গল্পে জানলাম ওদের দুটো জমজ সন্তান, ছেলেটি মায়ের দেওয়া নাম রাখা হয়েছে সিবাস্তিয়ান হাফিজ, আর মেয়ের নাম রাখা হয়েছে ওর পছন্দে সামীরা হাফিজ। কখন যে টরন্টোর উপকন্ঠে এসে পড়েছি বলতে পারিনা। পাইলট এর ডাকে হুঁশ হল, মুনিরুল জানাল সে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যাবে, এতে ও বড় জোর আধঘন্টা দেরীতে পৌঁছাবে, ওর বোনের বাসাতেই যাচ্ছে, অল্প একটু দেরী হলে কোন ব্যাপার হবে না কিন্তু আমার খুবই সংকোচ হতে শুরু করেছে। ওর অবস্থা ভাল বলে সারাক্ষন ওর দেয়া সব সাহায্য নিতে হবে এটা ঠিক মন থেকে সায় দিচ্ছিলনা। ওর মনে কি কোন দুরভীসন্ধি আছে? আমাকে ভয় পেয়ে বসেছে? বিদায় নিয়ে চললাম নিজের জায়গায়। বিমান থেকে নেমে বিমান বন্দরের বাসে করে টার্মিনালে আসার পথে ওর সাথে শেষ কথা হয়। বিনীত ভাবে বললাম,
- দেখ্ ভাই, তোরা এখানে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছিস, আমি পরিবার নিয়ে মাত্র এসেছি, এখনো একটা ভাল চাকুরী খুঁজে পেতে চেষ্টা করছি। যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব তোর উপরেই রইল, আমি বেশী চেষ্টা করলে মনে হবে স্বার্থের কারনে আপন হতে চাইছি।

সে জানালো, এই ব্যাপারটা সে ভাল করেই বোঝে, চিন্তার কোন কারন নাই, সেই সুযোগ করে যোগাযোগ রাখবে। টার্মিনালে ঢুকে মাল-পত্তর নিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালাম, মনিরুল গেল ভাড়া করা গাড়ীর চাবি বুঝে নিতে।
পেছনের দিকে তাকিয়ে এখন ভাবি, আমাদের মনের সীমাবদ্ধতার জন্যে আমরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারিনা কি এক অসামান্য মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। মুহুর্তটা কতটা অসামান্য সেটা উপলব্ধি করতেও হয়ত অনেক বছর পার হয়ে যায়। যখন বুঝি তখন আর সময়কে ফেরানোর উপায় নেই।
২০১২ সালটা আমার জীবনের ভাল একটা বছর বলতে হবে, সময়ের সাথে এই দেশে জীবন কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠেছিল, লেখা পড়া করার সুফল ভালো একটা চাকুরীও করছিলাম। কিন্তু মোড় ঘুরে গেল বছরের শেষ দিকে। অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক ছাত্র সংঘের সাথে যুক্ত ছিলাম। এদেশে পড়তে আসা নুতন ছাত্রদের সুবিধাদি দেখভাল করে এই সংঘটা। নিজের অভিজ্ঞতার পটভূমিতে এই দেশে পড়তে আসা ছাত্রদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে আনন্দ পাচ্ছিলাম। ওটাই আমার অবসরের সখ হয়ে উঠেছিল। ঐ বছর বেশ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় মিলে নিউ ইয়র্ক এ একটা আন্তর্জাতিক ছাত্রদের সম্মেলন এর ব্যবস্থা করল। হঠাৎ ঐ সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে আমি অবাক হয়েছিলাম। দক্ষিন এশীয় ছাত্রদের বিভিন্ন সুবিধাদি নিয়ে বক্তব্য দিলাম। পরিচিত হোলাম আরো অনেক দেশের বর্তমান ও প্রক্তন আন্তর্জাতিক ছাত্র ও বক্তাদের সাথে । উত্তর আমেরিকার অনেক নামী অধ্যাপক, ব্যক্তিত্বকে সম্মেলনে দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলনা, পৃথিবীর সব অংশ থেকে এই দেশে মেধা আমদানীর একটা সুবিশাল প্রক্রিয়া। একজন আইনজ্ঞের সাথে পরিচিত হলাম, মহিলা আন্তর্জাতিক ছাত্রদের আইনগত সুবিধাদী পেতে সাহায্য করেন। বেশ অবাক হয় জানতে চাইলাম উনি এ দেশের মানুষ হয়ে কেন আন্তর্জাতিক ছাত্রদের আইনগত সুবিধাদি নিয়ে চিন্তা করেন। অবাক হলাম উনার চিন্তাধারা শুনে, তাঁর মতে এই সময়টাতেই একজন ছাত্র সব চেয়ে বিপদ সংকুল সময় পার করে, নূতন দেশ, নূতন পারিপার্শিকতায় প্রায় সব কিছুই অচেনা। একবার এই সময়টা ঠিক ভাবে পার করে আসতে পারলে সমাজ ঐ ছাত্রের কাছ থেকে প্রতিদান পেতে শুরু করে, তাই উনি ঐ সময়টাতে ছাত্রদের আইনগত সাহায্য দিয়ে থাকেন । সত্যই ওদের চিন্তা অনেক সুদূর প্রসারী, সে জন্যেই এই দেশ পৃথিবীর মেধাকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে। সেই সম্মেলনের পর থেকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ওদের আন্তর্জাতিক ছাত্র ভর্তির বিষয়ে বিভিন্ন কাজে ডাকতে লাগলো, ধীরে ধীরে আমার ব্যস্ততা আর আয়ও বাড়তে শুরু করল।
এপ্রিল ২০১৪, শিকাগো থেকে বাবাকে দেখে বাড়ী ফিরছি। মিডওয়ে বিমান বন্দর থেকে বিমানে উঠে বসেছি। আমার পাশের যাত্রি এখনও আসেনাই, মাথার উপরে ব্যাগ রাখার যায়গায় ব্যাগটা রেখে মাত্র বসেছি। দেখি ছয় ফুট বা কিছু বেশী লম্বা এক যুবক, দেখতে ইউরোপীয়দের মত কাল চুল কিন্তু শেতাঙ্গদের মত গায়ের রঙ, আমার সহ যাত্রী এসে হাজির, বয়স উনিশ কি কুড়ি। সে ওপরে ব্যাগ রাখতে যাবার আগেই বললাম, দেখ ভাই আমি সামনের অংশটায় ব্যাগ রেখেছি, দরকার হলে একটু নেড়েচেড়ে যায়গা করে নিও। ছেলেটি বেশ ভদ্র, হাসি মুখে জানাল ওর ছোট্ট একটা ব্যাগ, ও শুধু একটা বই উপরে রাখবে। ব্যাগ থেকে বের করে যে বইটা ওপরে রাখল ওটার সামনের অংশটুকু দেখতে পাইনি, পাশেরটুকু দেখে মনে হল ধর্মীয় গ্রন্থ।
পাশে বসে ভদ্রতা করে সে জানতে চাইল আমি কি টরন্টোতে বেড়াতে চলেছি না কি সেখানেই থাকি? ইদানিং নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারনে বিমানের দরজা বন্ধের পর মুঠোফোনও বন্ধ করে দিতে হয়, তাই সহ যাত্রির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বাবাকে ফোন দিয়ে জানালাম, আমি ঠিক মত বিমানে উঠে গেছি, বাড়ী পৌঁছে আবার কথা হবে। বাবার সাথে ফোনে কথা শেষ করে ছেলেটিকে বিনীতভাবে দুঃখ প্রকাশ করে জানালাম ফোন বন্ধ করার আগেই আমার বাবাকে জানানো প্রয়োজন ছিল আমি বিমানে উঠে গিয়েছি, তাই ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি নাই। জানালাম আমি টরন্টো থাকি, জানতে চাইলাম সে কোথায় থাকে।ইতি মধ্যে বিমান আকাশে উঠে পড়েছে,
ছেলেটা জানালো সে বর্তমানে শিকাগোর নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। তবে মূলত সে ডেনভারের বাসিন্দা ওখানে ওর মা আর বোন থাকে। বেশ খুশী হয়ে বললাম,
- ওহ তাই বুঝি, আমি অনেক বছর আগে ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম তবে তখন ছাত্র ছিলাম বলে টাকা পয়সা কিছুই ছিলনা, একবার সুযোগ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে তবে কখন যে হবে জানিনা। তা, তুমি টরন্টো বেড়াতে চলেছ বোধ করি?
- অনেকটা ওরকমই, ওখানে আমার মা, বোন, দাদু এবং বাবার বোন আসবেন। আমরা সবাই এক সাথে আবার কালকে কিংস্টন শহরের দিকে যাব।
- আচ্ছা, কিংস্টন শহরটা কিন্তু খুব সুন্দর, আগে কখনও গিয়েছ ওখানে?
সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। হেসে বললাম,
- দেখ আমার অবস্থা, নিজের পরিচয়টাই দেয়া হয় নাই, আমি টরন্টো শহরের পশ্চিমের শহরতলিতেই থাকি, নাম “রিয়াজ-ডিন” কিন্তু আমাকে তুমি সংক্ষেপে রিয়াজ ডাকতে পার।
- তুমি কি বলতে চাইছ তোমার নাম রিয়াজুদ্দিন?
আমার চোখ কপালে উঠে গেল, এ পর্যন্ত কোন শেতাঙ্গকে আমার নাম এত সুন্দর উচ্চারনে বলতে শুনিনি। আর উনিশ কুড়ি বছরের এক ছোকরা আমার নাম ঠিক করে বলবে এতো আশাতীত। সে মনে হয় আমার চেহারা দেখে হাসি আটকাতে পারলনা, করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
- আমি সিবাস্তিয়ান, আমিও মুসলিম বলে তোমার নাম ঠিক মত উচ্চারন করতে পেরেছি, তুমি বেশ অবাক হয়েছ দেখতে পাচ্ছি, একদমই আশা করনি নিশ্চয়ই।
ততক্ষনে আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়েছি, মাথা নেড়ে জানালাম ঠিক তাই, সে হেসে আবার বলল,
- তাহলে তোমাকে আরো একটু চমকে দেই, তোমার কিন্তু একটু শক্ত হয়ে বিমানের সীটটা ধরে রাখতে হবে।
তারপর সে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলল,
- আমির বারি মমনসিং (আমার বাড়ী ময়মনসিংহ)।
এতটুকু শোনার পর আমার তখন ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, উত্তেজিত হয়ে বললাম,
- তুমিতো দেখতে একদম বাংলাদেশের ছেলেদের মত নয়। নিশ্চয়ই আমার বাবাকে ফোন করা দিয়ে তুমি বুঝেছ আমি বাংলাদেশী।
অতঃপর ওর কাছ থেকে জানলাম, সে বাংলাদেশী বাবা আর আমেরিকান মায়ের সন্তান। মা ওকালতি করে ওদের বড় করেছেন, বাবা অনেক বছর আগে টরন্টো শহরের পূবে একটা ছোট্ট শহরে গাড়ী দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। সে এখন ওর পরিবারের সাথে মিলিত হয়ে বাবার কবরের পাশে যাবে। ওখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে দাদু আর বাবার বোন যাকে সে ফুফি(ফুপু)ডাকে ওনার বাড়ীতে যাবে। ওর দাদু ওদের দুই ভাই-বোন আর ওর মা কে কিছুদিন না দেখলেই খুব অস্থির হয়ে পড়েন। তাই বছরে ওরা কম করে হলেও একবার কিংস্টন শহরে দাদুকে দেখতে যায়।
এসব শুনে আমার ছেলেটার জন্যে একটু মায়াই লাগছিল, কিচুক্ষন পর দুজনেই চুপচাপ বসে আছি, আমি জানালা দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ গুলোকে দেখছি, ভাবছি সাথে আনা বইটা বের করে পড়ব। পাশে সিবাস্তিয়ান ওর হেডফোন লাগিয়ে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছে, হঠাৎ আমার মনে হল আমি বিদ্যুতের ঝলকের মত সব পরিষ্কার দেখতে পেলাম। অস্থির ভাবে ওকে হাতে ধাক্কা দিয়ে বললাম,
- সিবাস্তিয়ান, তোমার পারিবারিক নাম কি, হাফিজ? তোমার বাবাকি মুনিরুল হাফিজ? তোমার মায়ের নাম কি ক্ল্যারা? তোমার নানুরা এক সময় বাংলাদেশে ছিলেন? তোমার বাবার গাড়ী দুর্ঘটনাটা কি ২০০২ এর এপ্রিল মাসে ঘটে?
এবার সিবাস্তিয়ানের পাল্টা অবাক হবার পালা, সে সব প্রশ্নেরই সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে প্রশ্ন করল, “তুমি আমার বাবাকে চিনতে?”
আমার নিজের অজান্তে তখন আমার চোখ দিয়ে নোনা জলের স্রোত বইতে শুরু করেছে, বেশ কিছুক্ষন কিছুই বলতে পারছিলাম না গলা বুঁজে আসছিল। নিজেকে অকারনে অপরাধি মনে হতে লাগল, মনিরুল কোনদিন যোগাযোগ না করায় কত কিছুই না ভেবেছি, এক সময় ওকে ভুলেও গিয়েছি। নিজের অবস্থান এ দেশে শক্ত হবার পর কোন দিন ভাবিওনি ওর খোঁজ করি। নিজেদের গন্ডিতে আমরা সবসময় ব্যাস্ত হয়ে থাকি। নেশাখোরের নেশার মত এক আবেশে নিজেদের জড়িয়ে রাখি, সেখানে ‘আমি’ আর ‘আমার’ ছাড়া আর কোন কিছুতেই যেন আমাদের মনযোগ নেই। মায়াভরে নিজের সন্তানের মত ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। সিবাস্তিয়ান মৃদু স্বরে আমাকে “সাসা” [চাচা] সম্বোধন করে শান্ত হতে বলতে লাগল। এরই মধ্যে, ফ্লাইট ডেক থেকে ঘোষনা আসল, আর কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা টরন্টোতে নামতে যাচ্ছি। কয়েক মুহূর্ত পর সামলে উঠে আমি ওকে সবিস্তারে সব বললাম, ছেলেটা ওর বাবার সাথে সর্বশেষ কথা বলা বাবার বন্ধুটাকে আপন মনে করে নিরবে চোখ মুছতে লাগলো।
বিমান থেকে নেমে যাওয়ার সময় আমার ব্যাগের পাশে রাখা ওর কোরানটা নিয়ে বলল, আমার বাবার সেই সর্বশেষ আলিঙ্গনটাই আমার আর আমার বোনের সবচেয়ে দামী স্মৃতি, এখনও বিশেষ মুহুর্ত গুলোতে আমি যেন আমার বাবার গায়ের সেই মায়াভরা ঘ্রানটা পাই। বাবার জন্যে ভালবাসা থেকেই মা আমাদের মুসলিম হিসেবে বড় করেছেন।
বিমান থেকে নামার পর সিবাস্তিয়ান বিমান বন্দরে অপেক্ষমান ওর পরিবারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করল। নিজের যোগাযোগের নম্বর ওকে দিলাম, ওরটাও জেনে নিলাম। ওর অনুরোধে পরিবারের সাথে পরিচিত হতে ওর সাথে বিমান বন্দরের বাইরে এসে অবাক হয়ে গেলাম ক্ল্যারা উইলিয়ামসন কে কাছে থেকে দেখে, পশ্চিমা চেহারায় বাঙ্গালী সাজে কেন যেন অতি মমতাময়ী এবং আপন মনে হচ্ছিল। চেহারাটা আমার চেনা লাগলো, করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বেশ পরিষ্কার বাংলায় বললেন
-চিন্তে পেরেছ নিশ্চয়, গত ২০১২তে নিউ ইয়র্কে তোমার সাথে দেখা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ছাত্রদের সম্মেলনে।
আমি একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম,
-পৃথিবীটা কত্ত ছোট্ট, সে কি, তুমিই সেই আইনজ্ঞ না, আন্তর্জাতিক ছাত্রদের আইনগত সুবিধাদির বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলে ঐ সভায়? জানতাম না তুমি আমারই বন্ধু মুনিরুল এর স্ত্রী।
হেসে জনালেন উনি ব্যাক্তিগত জীবনকে কর্ম জীবন থেকে আলাদা রাখতে পছন্দ করেন, তবে সংগত কারনেই বাঙালী কাউকে সহজে ভুলে জাননা। ওদের সাথে জাভেদও এসেছিল, বন্ধুর পরিবার টরন্টো আসলে ওই দেখা শোনার দায়িত্ব নেয়। ওর সাথেও যোগাযোগ হল বহু বছর পর, একই শহরের দুই প্রান্তে থাকি এত বছর অথচ দেখা হয়নি । নিজেদের পথে যাবার আগে সিবাস্তিয়ান দুহাত বাড়িয়ে একবার আলিঙ্গন করতে চাইলে, মায়াভরে মনিরুলের ছেলেটাকে বুকে নিয়ে মনের গভীর থেকে মনিরুল কে বললাম,
- অ্যাসিটিক এসিড, বলেছিলি তুই যোগাযোগ রাখবি, আজ এত বছর পর তোর ছেলেকে পাঠিয়ে এমন করে আবারও অবাক করবি এ কথা কি জানতাম?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement