লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ আগস্ট ২০১৮
গল্প/কবিতা: ৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৫)

তুষারিত ভাবনা
বৈশাখ

সংখ্যা

নাঈম

comment ২  favorite ০  import_contacts ৫২১
বি: দ্র: গল্পটি শুদ্ধ বাংলায় লেখা, লেখকের ধারনা এতে পাঠক বেশী আনন্দ পাবেন। কারো পড়তে কষ্ট হলে লেখকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।

ব্যাপারটি অতি ক্ষুদ্র হইলে কি হইবে, সংশ্লিষ্ট সমস্যাটি অতীব নিগুড়। বাল্যবেলায় আমার একবার ম্যালেরিয়া জ্বর হইয়াছিল, কাঁপুনি দিয়া জ্বর অসিত। ডাক্তার বাবু কুইনাইন খাওয়াইলেন, আমার ম্যালেরিয়া জ্বর সারিয়া উঠিল বটে কিন্তু মুখ হইতে সেই কুইনাইন এর স্বাদ সরাইতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগিল।দেশ ছাড়িয়া বেশ কতক বছর নিজেকে বিদেশী সাহেব বানাইবার অপচেষ্টা করিয়া বুঝিতে পারিতেছি নিজের ভিতরকার বাঙ্গালীটি ক্রমশ জাঁকিয়া বসিতেছে, তাই ভাবিলাম ঘটনা সবিস্তারে সকলকে জানাইয়া রাখা ভাল, পাছে স্বজতিরা আমার দোষ খুঁজিয়া পান।
প্রায় আড়াই দশক পূর্বে স্নাতক হইবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ পরীক্ষা শেষ করিয়াছি। আমাদের শ্রেনীর মধ্যে যাঁহারা স্নাতক হইলেন উহার নিম্ন তৃতিয়াংশ কাল বিলম্ব না করিয়া স্বরস্বতীর শিবির ছাড়িয়া লক্ষীর দ্বারস্থ হইলেন অর্থাৎ চাকুরী এবং ব্যবসায় মনোনিবেশ করিলেন এবং পাশের কাগজটি বিবাহের সময় কাজে লাগিতে পারে ভাবিয়া উপযুক্ত স্থানে সরাইয়া রাখিলেন। মধ্যম তৃতিয়াংশ কোন দিকে যাইবেন ভাবিতে লাগিলেন, কেহ চাকুরী খুঁজিলেন কেহ ব্যবসার চেষ্টা করিতে লাগিলেন, অনেকে আরো একটি পাশ দিবার মনবাসনাও দেখাইলেন। অনেক মহিলা বন্ধু বিবাহের পিঁড়িতে বসিয়া আমাদের বাকি সকলের কয়েক বেলা আমোদ ও উদর পূর্তির ব্যবস্থা করিলেন। ফাঁসিয়া গেলেন উত্তম তৃতীয়াংশ, উহাদের যেন "উচ্চ" শিক্ষা ব্যতীত আর কোন পথ খোলা রহিলনা। পরীক্ষার ফলাফল যখন বিভাগীয় বিজ্ঞপ্তিতে বাহির হইয়াছিল তখন তাহারা যে পরিমান পুলক বোধ করিয়াছিলেন এখন উহারা ততোধিক বিপদগ্রস্ত হইলেন। তাহারা স্বরস্বতীর ভালবাসায় লক্ষীর দুয়ারে ধর্না দিতে পারিলেননা।
উপরে বর্ণিত সর্বশেষ, অর্থাৎ উত্তম তৃতীয়াংশের চূড়ামনি হইয়া আমার যে কি দশা হইল উহা পাঠকের অতি সহজেই অনুমেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কনিষ্ঠ একটি পদ পাইলাম বটে, কিন্তু উহাতে দক্ষিণা এতটাই ক্ষীন যে আমার প্রিয় যন্ত্র-বিহীন দ্বিচক্র যান অর্থাৎ “বাইসাইকেলটিই” শুধু আমার মনোবেদনা বুঝিল। এদিকে আমার প্রিয়তমা অর্থাৎ প্রমিকার বিভিন্ন দিক হইতে সম্বন্ধ আসিতে লাগিল, অতি উৎকন্ঠার মধ্যে কালাতিপাত করিতে লাগিলাম। প্রায়শই উহার অম্ল মধুর ভর্তসনা শুনিতে হইল যে, শ্রেনীর "গাড়োল" গুলা চাকুরী বা ব্যবসা করিয়া একের পর এক সংসারে মনযোগী হইতেছে, আর আমি এখনও বাইসাইকেল ঠ্যাঙ্গাইয়া বাবার বাড়ী আর অনুষদে যাতায়ত করিতেছি। শ্রীমতি পারিলে আমার শিরেই বিবাহের পিঁড়িখানা সজোরে ছুঁড়িয়া মারেন।

বিপদ সত্যই ঘনীভূত হইল যখন, আমাদের শ্রেনীর কৃতকার্য্যদের মধ্যে সর্বশেষ অবস্থান অলংকৃতকারী শ্রীমান ইসমাইল,বহু জাতিক বীমা কোম্পানীর চাকুরী পাইয়া গেলেন। তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া দুই বৎসরের মধ্যে কোম্পানীর মধ্যম পর্যায়ের কর্তা বনিয়া গেলেন। কোম্পানী এমন একনিষ্ঠ কর্মীর ললাটে চুম্বন করিবে ইহাই স্বাভাবিক, উনাকে কোম্পানী একখানি যন্ত্রচালিত শকট দিয়া পুরষ্কৃত করিলেন। এমনই কৃতিত্বে তিনি আসিয়া আমার প্রেমিকার প্রাণাধিক প্রিয় বান্ধবী উর্মির পাণি প্রার্থনা করিয়া বসিলেন। “আমরা”, অর্থাৎ আমার প্রিয়তমা এবং আমি উভয়ের বন্ধু হিসাবে বিবাহের সমস্ত অনুষ্ঠানে যোগদান করিতে বাধ্য হইলাম বটে, কিন্তু সকলের আড়ালে আমার প্রিয়তমার চোখ রাঙ্গানিতে আমার প্রায়শই নিম্ন-উদরে পীড়ার উদ্রেক হইতে লাগিল। বলাই বাহুল্য যে আংশিক প্রিয়তমার দৃষ্টি এড়াইতে এবং আংশিক প্রকৃতির ডাকে আমি ঘন ঘন ক্ষুদ্র ঘরে যাতায়ত করিয়া কোন রকমে সম্মানের সহিত অনুষ্ঠানের সকল দায়িত্ব পালন করিলাম।
পাঠক বুঝিতেই পারিতেছেন আমার জীবন কেমন ভীতি কর হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু বাংলাদেশ চিরকালই মায়ার দেশ, ভালবাসার দেশ, বোধকরি অনেকেই অবহিত আছেন একমাত্র আমাদের দেশেই মাসীর মায়া, মাতৃদেবী অপেক্ষা অধিক হইয়া থাকে। আমার বেলাতেও উহার ব্যতিক্রম হইলনা, লক্ষী আমার দুরাবস্থা দেখিয়া স্বরস্বতী কে কিছু বলিয়া থাকিবেন বোধকরি। সহসা উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তরাঞ্চলে, প্রায় উত্তর মেরুর সহ্নিকটে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি উচ্চতর গবেষনা করিবার সুযোগ পাইলাম, কাগজ মারফত জানিলাম কিছু মাসোহারাও থাকিবে। আর দেরী না করিয়া পিতৃদেব কে আমার প্রিয়তমার পরিবারের নিকট সম্বন্ধ লইয়া যাইতে অনুরোধ করিলাম। উহারা অবস্থা দর্শনে নিম রাজি হইয়া রহিলেন। পাত্র কিঞ্চিত শিক্ষিত বটে, কিন্তু তাহাদের কন্যাকে খাওয়াইতে পরাইতে পারিবার মত অর্থের যোগান দেখিতে না পাইয়া সম্পুর্ন রাজি হইতে অপারগ রহিলেন। অতঃপর আমার প্রিয়তমা তাঁহার পরিবারকে বিভিন্ন রকম ভয় ভীতি প্রদর্শন করিয়া নিম রাজিকে সম্পুর্ন রাজিতে পরিবর্তন করাইয়া ছাড়িলেন। আমার অনুজপ্রতিম যাহারা এখন প্রেমের সুধা পানে ব্যাপৃত তাহাদের অবগতিতে এখানে বলিতে চাহি, সঠিক সঙ্গিনীই পারিবে আপনার মধ্যকার উৎকর্ষতা কে বাহির করিয়া আনিতে। প্রেমের বাঁধন এমনই এক বিনি সুতার মালা (ভূল করিয়া ফাঁস পড়িলেও পড়িতে পারেন), উহার টানে আপনি সাত সমুদ্র তের নদী অতিক্রম করিতে দ্বিধা বোধ করিবেননা। কিন্তু অতিক্রম করিয়া কি বিপদে পড়িবেন না বিপদ হইতে বাঁচিবেন তাহা আমি নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারিতেছিনা।
অতঃপর, আমাদের শুভ পরিনয় সম্পন্ন করিয়া, আমাদের চারি খানি বাক্স এবং আমার একটি মাত্র পত্নী সমেত আগষ্ট মাসের শেষ দিকে কানাডা নামক দেশের উত্তরাঞ্চলের উদ্দেশ্যে পথ দিলাম। সুদীর্ঘ আটচল্লিশ ঘন্টা ধরিয়া বিমান, রেলগাড়ী এবং বাস চড়িয়া যেখানে উপস্থিত হইলাম সেখানে বাঙ্গালীর সংখ্যা ঐ দিন হইতে দুই এ উন্নীত হইয়াছে। আমরা আসিয়াছি সবুজ ঘেরা বাংলাদেশ হইতে, এখানে দেখিলাম সকল কিছুই শ্বেত বর্ণের তুষারাবৃত।

যে দেশে আসিয়া পড়িয়াছি, উহা বেশ আশ্চর্য এক জাতীর দেশ বলিয়া মনে হইতে লাগিল। হাজার তুষারপাত আর ঠান্ডাতেও উহারা সকালে উঠিয়া দৌড়াইতে বাহির হয়, বাড়ীর কুকুর কে প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পাদনে বাহিরে লইয়া আবার ঘরে রাখিয়ে সময় মত কাজে হাজিরা দেয় । হাঁটু পরিমান তুষার দেখিয়া ইহারা তাচ্ছিল্য করিয়া বলে, শীত কবে পড়িবে কে জানে? তুষারপাতের পর জানালার নিম্নাংশ পর্য্যন্ত তুষারে ডুবিয়া গেলে, বলে আহা বেশ লাগিতেছে, এই না হইলে শীতকাল? আর যখন জানালাটিই তুষারে প্রায় ডুবিয়া যায় উহাদের মুখে হাসি ফুটিয়া উঠে। সকলে মিলিয়া স্কি, স্কেটিং, টোবাগনিং, স্নোবোর্ডিং নাম্নী বিভিন্ন খেলায় মতিয়া উঠে, আর আমি এমন শীতে কোথায় লুকাইব তাহার পথ খুঁজিয়া পাইনা।
এমন দেশে আসিয়া আমার স্ত্রীর কর্মস্পৃহা বাড়িয়া গেল, সে আমাকে গবেষনায় সম্পুর্ন মনোনিবেশ করিবার সূযোগ করিয়া দিবার নিমিত্তে, বাঙ্গালীর চিরাচরিত মাতৃ রূপ ধারণ করিল। এমন ঠান্ডার দেশে আসিয়া সে আমাকে কিছুই করিতে দিলনা, আমি শুধু খাইলাম, ঘুমাইলাম এবং গবেষনায় ব্যাপৃত থাকিলাম। এক সময়, দিন ঘুরিয়া, মাস হইল, মাস ঘুরিয়া বছর, তাহাতেও শেষ না হইয়া দশক অতিক্রম করিতে লাগিল। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব শেষ করিয়া এদেশের সন্তান দিগকে শিক্ষিত করিতে লাগিলাম। স্বরস্বতীর পর এবার লক্ষী আমার প্রতি কৃপা দৃষ্টি রাখিলেন, জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ আসিল। ঠান্ডার দেশে শরীর গরম রাখিবার জন্যে সুলভে প্রাপ্য মাংস এবং সুরার প্রতি আকর্ষন ক্রমশ বাড়িতে লাগিল, ফলতঃ আমার শরীরে মেদ বাড়িল এবং কাজের চাপে ও উত্কন্ঠায় মস্তকের কেশ অপসারিত হইতে লাগিল। অবস্থা দৃষ্টে মনে হইতে লাগিল, শরীরটি একটি জাপানী আলু এবং মাথাটি পেঁয়াজ চাষের ক্ষেত্র। ইতমধ্যে নিজেদেরও সংসার ভরিয়া উঠিয়াছে।সন্তানেরা আসিয়াছে, সময়ের সাথে উহারাও শশীকলার মত বড় হইয়া উঠিতে লাগিল, এক সময়, আমরা যে বয়সে দেশ হইতে আসিয়াছিলাম সেই বয়সে উহারা উপনীত হইল।


সন্তান সকল মনে করিল উহাদের মাতা এত বছর সংসারের জন্যে হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি করিয়াছে, অতএব তাঁহার একটি লম্বা ছুটি প্রাপ্য। সন্তান সকলের ভাব এমনই যে আমি নেহাত হাস্য তামাশা করিয়া সময় কাটাইয়াছি, কিন্তু কাহাকে বুঝাইব আমার মর্ম বেদনা? সন্তানেরা সকলে মিলিয়া উহাদের মাতার যাতায়ত ভাড়া ও খরচাদি উপহার হিসাবে দিতে উদ্যত হইল। উহারা আমাকেও যাইতে অনুরোধ করিল, কিন্তু উহা নেহাৎই দৃষ্টিকটুতা এড়াইবার জন্যে। আমি সব বুঝিয়া, ভান করিলাম, আমারও কাজের অনেক চাপ চলিতেছে, অতএব আমি যাইতে পারিতেছিনা। অতঃপর আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, শীতের শুরুতে বাক্স বাঁধিয়া দেশের উদ্দেশ্যে পথ দিলেন। সন্তানেরা উহাদের কার্য্যপলোক্ষে এই দেশের বিভিন্ন অংশে থাকে, ফলতঃ উহারা নিজেদের স্থানে ফেরৎ যাইবার পর বাটিতে রহিয়া গেলাম শুধুই আমি।
এই সময়ে পাঠককূলকে আমার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে কিঞ্চিত অবহিত না করিলেই নয়, ইতিমধ্যে আমার ওজন অতিরিক্ত বাড়িয়া যাওয়াতে ডাক্তারগণ আমার উপর কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করিলেন। কিঞ্চিত গেঁটে বাতের সমস্যাও দেখা দিতে লাগিলে, আমার না করিবার আর উপায় থাকিলনা। জীবন হইতে ভাত, বিভিন্ন রকমের ভর্তা নির্বাসিত হইল, বয়সের কারনে সুরা ত্যাগ করিয়া ধর্মে মন দিতে লাগিলাম, মাঝে মাধ্যেই নিজেকে বক ধার্মিক ভাবিতেও কুন্ঠা করিলামনা। সময়ের সথে মানুষের আয়ু ফুরাইয়া আসে, মৃত্যু ভয় বাড়ে , আমার মত স্বল্প ইচ্ছা-শক্তির মানুষের যে সেই সব লক্ষণ আরো বেশী প্রকট হইয়া দেখা দিবে পাঠককূল উহা সহজেই অনুমান করিতে পারিবেন। আমি বৎসর খানেকের মধ্যে আমার ওজন কমাইয়া যাহা সঠিক ওজন বলিয়া ডাক্তার বলিয়াছেন উহাতে আনিতে সক্ষম হইলাম। সকলে আমার ইচ্ছা শক্তির সুনাম করিতে লাগিলেন, কিন্তু ভিতরের খবর কেবল আমি এবং আমার পাঠকেরা জানিলেন।

পাঠক দিগের না বিরক্তি আসিয়া যায় তাই এই কাহিনীর যবনিকাতে উপনীত হওয়া জরুরী, সর্বশেষে স্ত্রী বিহনে আমার একটি দুর্দিনের কাহিনী লিখিয়া শেষ করি। একদিন তুষার ঝড়ের কথা শুনিয়া ভোর পাঁচ ঘটিকায় উঠিয়া, কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে পথ দিয়াছি, শুনিলাম ঝড় শুরু হইবে প্রত্তুশে আট ঘটিকায়, কর্মস্থলে যাইবার সময়। আমার বড়কর্তা, বিভাগীয় প্রধান, শারীরিক অসুস্থতার কারনে কিছুদিন যাবৎ কর্মস্থলে বেশীক্ষন থাকিতে পারেননা, তৎকারনে আমাকে নিয়মিত বিভাগ পরিচালনার জন্যে হাজির থাকিতে হয়। যে কারনে আগাম রওয়ানা হইয়াছিলাম, সে উপকার পাইলাম, ট্রাক নাম্নি সকল দেশেরই রাস্তায় ত্রাস সৃষ্টিকারী যান্ত্রিক বৃষ সমূহ তখনও বেশী পরিমানে নামেনাই বিধায় নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে পৌনে ছয় ঘটিকায় পৌঁছাইয়া স্রষ্ঠার নিকট কৃতজ্ঞতা জানাইলাম। গাড়ী রাখিতে রাখিতে আবিষ্কার করিলাম বড়কর্তা আমার আগেই পৌঁছাইয়া গিয়াছেন।ভিতরে ঢুকিয়া কর্তাকে কৌতুক করিয়া বলিলাম তোমার পত্নী কি তোমাকে রাত্রিতে কর্মস্থলেই থাকিতে বলিয়াছেন। তিনি কৌতুকের উত্তরে বলিলেন, তোমার পত্নী দেশান্তরে অবকাশ যাপনে গিয়াছেন বলিয়া আমার পত্নীর প্রতি অবিবেচক মন্তব্য কি শ্রেয়? হাস্যরসান্তে, নিজের কামরায় গিয়া কাজে মনযোগী হইলাম। ইতমধ্যে জানালা দিয়া ঝড়ের দাপট দেখিয়া ভীত হইতেছি। দুপুর নাগাদ বড় কর্তা জানাইলেন তিনি অসুস্থ বোধ করিতেছেন বিধায় বাড়ী মুখি হইবেন।
বেলা তিন ঘটিকায় ঝড়ের অবনতি দেখিয়া, সহকর্মীদিগকে ডাকিয়া বলিলাম, সুবিধামত বাড়ীর পথে রওয়ানা দিতে, কাজ প্রতিদিনই থাকিবে, স্বুস্থ ভাবে বাড়ীতে পরিবারের নিকট পৌঁছানো সর্বাপেক্ষা জরুরী। অতঃপর সরঞ্জামাদী লইয়া নিজেও বাড়ীর মুখি হইলাম। বৈকালিক দপ্তর ছুটির প্রহর, অর্থাৎ পাঁচ ঘটিকার অনেক আগেই পথ দেওয়ার কারনে পথের দেরী আংশিক ভাবে এড়ানো গেল, রাস্তায় বিভিন্ন মোড়ের পিচ্ছিলতা সাবধানতার সহিত অতিক্রম করিয়া নির্বঘ্নে বাড়ী আসিয়া দেখি বাড়ীর চারিদিক পাঁচ বা ছয় ফুট তুষারে পরিপুর্ণ।অতঃপর তুষার সরাইতে ব্যাপৃত হইলাম। পাঁচ ঘন্টার কিছু অধিক হাঁড় ভাঙ্গা খাটুনির পর বাড়ীর রাস্তাটিকে তুষার মুক্ত করিয়া, দস্তানা হইতে হস্ত বাহির করিয়া দেখিলাম উহার অংগুলী সমুহ ঠান্ডায় নীলবর্ণ ধারন করিয়াছে, বেশী ওজনের তুষার নাড়াচাড়া করিয়া কোমরে ও হতের কব্জিতে বেদনা অনুভূত হইতেছে। পাঠক আমার স্বাস্থ্যের সহিত কিঞ্চিত আগেই পরিচিত হইয়াছেন, আমার কায়িক শ্রম বিমুখ অঙ্গের সহিত পুনরায় পরিচিতির প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করিনা ।
বাড়ীর প্রবেশ দ্বার খুলিতে খুলিতে প্রচন্ড ক্ষুধা ও তৃষ্ণা অনুভব করিতেছিলাম। যান্ত্রিক শীতল বাক্সে প্রিয়তমা পত্নীর রাখিয়া যাওয়া বেশ কয়কটি দিনের পুরানো ভাত ও ডাল পাইয়া কিঞ্চিত আশার বর্তিকা পাইলাম যেন। আমি নিয়মিত ভাত খাওয়া ত্যাগ করিয়াছি বিধায় ইহা চোখে পারেনাই। তুষার ঝড়, অতীব ঠান্ডা এবং অনেকক্ষণ পরিশ্রমের কারণে আমার মস্তিষ্কের ভিতরে লুক্কাইত বাঙ্গালীটি যেন জাগিয়া উঠিল। হঠাৎ মনে হইল এমন দিনে শুটকির ভর্তা যোগে ভাত ও ডাল গুলার একটি সুব্যাবস্থা করা যাইতে পারে। চিন্তা করিবা মাত্র কাজে নামিয়া পড়িলাম, খুব অল্প প্রচেষ্টায় কিছু পেঁয়াজ, সরিষার তৈল ও কাঁচা ও শুষ্ক লাল লঙ্কা সহ শুটকি ভর্তা তৈয়ার হইয়া গেল । অতঃপর আয়েস করিয়া আমার দেশীয় কায়দায়, খাওয়ার কেদারায় পা উঠাইয়া রসাইয়া রসাইয়া এক বর্তন ভাত খাইলাম। আমার খাওয়ার আগ্রহ দেখিয়া নিজের প্রতি নিজের একরূপ করুনা হইতে লাগিল। এমন আহারদীর পর একটু চা না হইলে ব্যাপারটা পরিপুর্ন হয়না দেখিয়া ঘন দুধের চাও বানাইলাম।

সুর করিয়া চুমুক দিয়া চা পান করিতে করিতে মনে চিন্তা আসিতে লাগিল, আবেগের বশবর্তী হইয়া আমি যাহা করিলাম তাহা নিতান্তই ছেলে মানুষী। সপ্তাহান্তে ডক্তার যখন প্রশ্ন করিবেন শারীরিক ওজন গত দর্শনে নামিতে দেখিলাম, এবার বাড়িয়া গেল কেমন করিয়া, তাহার কি উত্তর দিব? ভাবিয়া দেখিলাম, সময়ের সাথে আমার বাঙ্গালীপনা ক্রমশ বাড়িতেছে। কিন্তু উহা কি করিয়া এই দেশের ডাক্তার কে বুঝাইব? আমার স্বজাতির স্বভাব বিশ্লেষণ করিলে, উহাদের খারাপ, অথবা বলিতে পারি “ভাল নয়”, এরূপ গুনাবলীর একটি বিশদ ফর্দ তৈয়ারী করা অতি অল্প সময়ের ব্যাপার। আমার ধারনা অনেক বাঙ্গালীই এই ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শিতাও অর্জন করিয়াছেন। তবে উহাদের একটি ভাল গুন আছে, তাহা সকল খারাপ গুনের সেই বিশদ ফর্দ কে এক ফুৎকারে উড়াইয়া দিতে পারে, উহা হইল, বাঙ্গালী ভয় পায়না। আমাদের দেশের সন্তানেরা কত সহজেই ভয়কে জয় করিতে পারে, প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখিয়া দঁড়াইতে পারে, আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ সকলই তার প্রমান বহন করে। এ সকল ভাবিয়া কিয়ৎকাল নিজেকে সাহসী করিবার চেষ্টা করিলাম। কিন্তু আমি একজন ভীতু প্রকৃতির মানুষ বলিয়া জীবনে বারংবার প্রমান পাইয়াছি।, ফলতঃ আবারও ডাক্তারের ভীতি আমাকে পাইয়া বসিল। অথবা বলিতে পারি আমার সাহসিকতা জাগাইবার জন্যে যাঁহাকে প্রয়োজন, আমার প্রিয়তমা পত্নী আমার সহিত না থাকায়, সাহস আর জাগিয়া উঠিতে পারিতেছিলনা।

শেষ পর্যন্ত ভাবিয়াছি ডাক্তারকে বলিব আমার ওজন খারাপ আবহাওয়ার কারনে বাড়িয়াছে। ডাক্তার বোধ করি আবহাওয়াকে আমার মত অপদস্থ করিতে পারিবেননা। নিজ অধ্যবসায়ে একটি প্রবল ভীতি হইতে নিজেকে পরিত্রান করিতে পারিয়া আত্মতৃপ্তি লইয়া চায়ের সর্বশেষ চুমুকটি লইলাম।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • সৃজন শারফিনুল
    সৃজন শারফিনুল ভাল লাগলো
    মজা পেলুম...
    প্রত্যুত্তর . ১৫ এপ্রিল, ২০১৫
  • Ishtiak Zaman
    Ishtiak Zaman লেখকের কাছে অনুরোধ
    বি: দ্র: গল্পটি শুদ্ধ বাংলায় লেখা, লেখকের ধারনা এতে পাঠক বেশী আনন্দ পাবেন। কারো পড়তে কষ্ট হলে লেখকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।

    এইখানে শুদ্ধ কথাটি পরিবর্তন করে "সাধু" শব্দটি লিখুন। কারণ, আপনার লেখা সাধু ভাষায় লিখ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬
    • নাঈম আপনার মতামত এর জন্যে অনেক ধন্যবাদ।আমি ঠিক জানিনা, মনে হয় না এখন আর কিছু বদলানোর সুযোগ আছে, তবে ভবিষ্যৎ এর জন্যে মনে রাখবো । আর বানান ভুলের জন্যে আমি প্রায় রাজা, কুড়ি বছর ধরে নিয়মিত বাংলা না লিখে বানান প্রায় কিছুই মনে নেই। তবে আপনার মতো সুহৃদ পাঠক পেলে লেখকের স্বপ্ন পূরণ হয়।
      প্রত্যুত্তর . ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

advertisement