লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৫৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমার প্রিয়ো বন্ধু (আগস্ট ২০১৫)

বুমেরাং
আমার প্রিয়ো বন্ধু

সংখ্যা

ফাহমিদা বারী

comment ০  favorite ০  import_contacts ৪০৪
বুমেরাং
এক
কংক্রিট ল্যাবে ঢুকে ইতিউতি অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজি করলো বরখা। স্যার ল্যাবে এসে ঢুকতেই সুরুৎ করে মাথাটা বাইরে গলিয়ে দিল। তারপর কায়দামত শরীরটাকেও বের করে আনলো। ফাঁকি মারতে হবে। তবে স্যারের চোখে পড়া যাবে না কিছুতেই। দু’একজন ছেলে ঠিকই বরখা’র এই কসরত দেখে ফেললো। সমস্যা নেই। বরখাকে বিপদে ফেলবে এমন বুকের পাটা নেই ক্লাসের কোন ছেলের।
বরখা’র প্রিয় বান্ধবী মিষ্টি গতকাল থেকে ক্লাসে আসছে না। আজকের সেশনাল ক্লাস অন্ততঃ বাদ দেবেনা এমনটাই ভেবেছিল বরখা। কিন্তু আসলো না। খোঁজ নিতে হবে। অসুখ টসুখ করেছে বোধহয়। এটা ওটা ভাবতে ভাবতে হলমুখো রওয়ানা হল সে। হলে থাকে মিষ্টি। বুয়েটের থার্ড ইয়ারের ছাত্রী ওরা। বরখা আর মিষ্টি। পরিচয়টা বুয়েটে এসেই। মিষ্টি ছোট এক মফঃস্বল শহর থেকে এসেছে আর বরখা ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকে। অথচ ওদের দেখলে মনে হয়, যেন ছোটবেলার বান্ধবী। গলায় গলায় ভাব যাকে বলে। দুজনের আচার-আচরণ ও স্বভাবে কোনই মিল নেই। দু’জন যেন দু’মেরুর বাসিন্দা। মিষ্টি তার নামের মতই। মিষ্টি, নরম-কোমল। কাঠিণ্য শব্দটাই ওর অভিধানে নেই। কোন কিছুতেই শক্ত হতে পারেনা সে।
আর বরখা? ওর প্রধান আপত্তি এই নামটা নিয়ে। সাহিত্যপ্রিয় বাবা তার কোন এক ভিনদেশী সাহিত্যিকের লেখা পড়ে প্রবল বিমোহিত হন। ‘বরখা’ নামটি সেখান থেকেই পাওয়া। মার আপত্তিসত্ত্বেও বাবা তার মেয়ের নাম রাখলেন ‘বরখা’। ‘বরখা’ মানে বৃষ্টি। বাবা হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, বূক্ষ্ণ প্রান্তরে তার মেয়ে হবে এক পশলা বৃষ্টির মতই শীতল। কিন্তু হা- হতৈশী। ওসব কোমলতা মধুরতার ধার ধারেনা বরখা। মুখের উপর উচিত কথা বলতে তার জুড়ি মেলা ভার। ওর মুখের ভাষায় যেমন ধার, তেমনি ধার ওর রূপেও। প্রখর রূপসী সে। বুয়েটের ক্লাসশুরুর প্রথমদিকে ক্লাসের ছেলেরা কাব্য কবিতার বণ্যা বইয়ে দিল বরখাকে দেখে। বরখাও শুরুতে কিছুদিন চুপচাপ সহ্য করলো। অতঃপর শখের কবিদের স্বরচিত কবিতা গলায় ঝুলিয়ে কানে ধরে উঠবোস করিয়ে ছাড়লো। ব্যর্থ, ভগ্নহৃদয় প্রেমিকের দল ‘বরখা’কে ছোট করে ‘খরা’ বানিয়ে দিল। তাদের কাঠফাটা হৃদয়কে সিক্ত করতে ‘বরখা’ হলনা, অগত্যা ‘খরা’ই সই।

দুই
হলের বিছানায় আধশোয়া হয়ে গল্পের বই পড়ছিল মিষ্টি। বরখাকে দেখে তড়াক করে উঠে বসলো।
‘কি রে তুই?’
‘না তো, অন্য কেউ!’ চোখ পাকায় বরখা। ‘ক্লাস করছিস না কেন? কি ব্যাপার? পাস করার ইচ্ছা নাই নাকি?’
‘না রে। গতকাল খালার বাসায় গিয়েছিলাম, আর আজকে একটু রিল্যাক্স করতে ইচ্ছে করলো। তাই আর গেলাম না। তাছাড়া তুই তো আছিস। ক্লাস লেকচার তো পাবোই।’ মিষ্টি দাঁতের ঝিলিক দেখায়।
‘বাঃ বেশ। তাই বলে সেশনাল ক্লাসও বাদ দিবি? আর তোর চক্করে পড়ে আমিও বাদ দিলাম। বাই দ্য ওয়ে, তোর কোন্‌ খালা? ঢাকায় থাকেন যিনি?’
‘হুম। আমার খালাতো ভাইকে তো চিনিস তুই। ঐ যে ইলেকট্রিক্যালে পড়ে। ফোর্থ ইয়ার।’
বরখা’র মনে পড়ে। মিষ্টি একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। লম্বা, হ্যাণ্ডসাম। কিন্তু ক্যাবলাকান্ত। বরখার রাগ লাগে ক্যাবলামার্কা ছেলেদের দেখলে।
‘জি, ক্যাবলা বাবাকে চিনতে পেরেছি।’
‘ক্যাবলা বলবি না, পিয়াল ভাই একটু লাজুক। অপরিচিত মেয়েদের সামনে আগ বাড়িয়ে স্মার্টনেস দেখায় না।’
প্রসংগটা আর এগুলো না। দুই বান্ধবী ব্যস্ত হয়ে পড়লো অন্য আলাপচারিতায়।

তিন
‘বরখা, তোর প্রিয় ফুল কি রে?’
‘কেন? আমার প্রিয় ফুল দিয়ে তোর কি?’
‘আহ্‌, বল্‌ না! ম্যালা প্যাঁচাস না।’
‘কামিনী।’
বরখা আর মিষ্টি ক্যাফেটেরিয়ার সামনে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। দুজনেই আজ শাড়ি পরেছে। পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে। হলুদ লাল শাড়ি। মিষ্টিকে ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছে। আর বরখাকে দেখে চোখ ঝলসে যাচ্ছে। বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।
একটুদূরে ইতঃস্তত ছেলেরা উঁকিঝুকি মারছে। কেউ কেউ আরেকটু সাহসী। সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করছে। তবে বরখা’কে যারা চিনে তারা দূর থেকেই নিরাপদ বোধ করছে। ওদের ক্লাসের কয়েকজন মেয়ে এসে যোগ দেয় বরখাদের সাথে। গল্পে মেতে ওঠে সবাই। ফাল্গুনের সজীব আমেজে চনমনে একদল তরুণ। মিষ্টি ‘একটু আসছি’ বলে উঠে যায়।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মিষ্টির দেখা মেলে। হাতে একরাশ কামিনী ফুল। অবাক হয় বরখা।

‘কি রে ফুল কোথায় পেলি? তাও আবার কামিনী ফুল!’
আনলাম তোর জন্য, পেলাম কাছেই এক জায়গায়।’
অবাক হলেও মুখে কিছু বলে না বরখা। প্রাণভরে সুবাস নেয় কামিনীর। দুটো গুচ্ছ নিয়ে চুলে গুঁজে দেয়।

চার
এরপর থেকে প্রতিদিনই বরখার জন্য ফুল আনা চাই মিষ্টির। একেকদিন একেক ছুঁতোয় সেই ফুল উপহার দেয় বরখাকে। আর কি আশ্চর্য! প্রতিদিনই কামিনী! বরখা জিজ্ঞেস করলে বলে, ওদের হলের পিছনে কামিনীর গাছ আছে। কিন্তু চতুর বরখা ঠিক বুঝে যায় ঘটনা অন্য কিছু। ভেতরে ভেতরে ফলো করার চেষ্টা করে মিষ্টির গতিবিধির।
একদিন ক্লাসে আসার পথে মিষ্টিকে দেখতে পায় বরখা। শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। ছেলেটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল। বরখা মুখ দেখতে পেলনা। দূরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করে, মিষ্টির হাতে একগোছা কামিনী ফুল।
ও এই কথা! কারো ওকালতি করছে বরখা! কেউ মিথ্যে কথা বলে একটা ছেলের দেওয়া ফুল তার কাছে পৌঁছে দেবে এটা কল্পনাও করতে পারে না বরখা। আর সেই একজন কিনা তারই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী!
সেদিনও যথারীতি ক্লাসের একফাঁকে মিষ্টি বরখাকে কামিনী ফুল উপহার দেয়। বরখা শান্তভাবে নেয়। তারপর কমনরুমে এসে চেপে ধরে মিষ্টিকে। বরখা’র নিজস্ব স্টাইলে।
হড়বড় করে পেটের সব কথা বলে ফেলে মিষ্টি। ফুলের প্রকৃত প্রেরক পিয়াল ভাই। বরখাকে তার নাকি খুব ভাল লাগে। এই ফুল পাড়তে গিয়ে একদিন কার্ণিশ থেকে পড়েও গেছে বেচারা।
‘বেচারা! এত মায়া বেচারার জন্য? তুই জানিস না আমি মিথ্যা কথা সহ্য করতে পারি না? আমাকে বোকা বানিয়ে প্রতিদিন ফুল উপহার দিচ্ছিস! এই ফুল দিয়ে তোর ক্যাবলাকান্ত ভাই আমাকে ভোলাবে? তুই আমাকে চিনিস না? কত টাকা দিয়েছে তোকে ওকালতি করার জন্য?’
বরখা তীব্র ভাষায় আঘাত করে মিষ্টিকে। ওর স্বভাবটাই এমন। যখন বলতে শুরু করে হুঁশজ্ঞান থাকে না। যখন হুঁশ ফিরে আসে, ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়।
বরখা রাগে দিক্‌শুন্য হয়ে কমনরুম থেকে বের হয়ে আসে। মিষ্টির মুখের দিকে একবারও না তাকিয়ে। বরখা জানে, মিষ্টি মুখটা বোঁচার মত করে দাঁড়িয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়বে বরখার রাগ ভাঙানোর জন্য। মিষ্টি বেশিক্ষণ পরিস্থিতি গরম রাখতে দেবে না। ওকে ভালোমতোই চেনে বরখা।
বরখা পেছন ফিরে তাকালে হয়তো মিষ্টির মুখে অন্যকিছুও দেখতে পেত, যেটা সে একদমই চেনে না।

পাঁচ
প্রায় তেরো বছর পরের কথা।
বরখা বসে আছে ওর অফিস রুমে। একটা কনসালটিং ফার্মের ডিরেকটর সে। একটু আগে পিয়ন এসে একটা কার্ড দিয়ে গেছে। কার্ডের পেছনে একটা নাম...’মিষ্টি’।
এতগুলো বছরে বরখা অনেক চেষ্টা করেছে মিষ্টির সাথে যোগাযোগ করার। পারেনি। হারিয়েই গেছে মিষ্টি। বরখার সেদিনের ব্যবহার মিষ্টিকে শুধু অবাকই করেনি, ওকে পাল্টেও দিয়েছে অনেকখানি। সেদিনের পর থেকে সদা হাস্যময়ী, চঞ্চল মেয়েটা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। বরখা ভেবেছিল, মিষ্টি নিজে থেকে ওর মান ভাঙাবে, সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু মিষ্টি আর কোনভাবেই ওর সাথে যোগাযোগ করেনি। ওদের এই বিচ্ছেদে ক্লাসের অন্যরা খুব অবাক হয়েছে। কিন্তু কেউ কিছু জানতে পারেনি। ওরা বলেনি কাউকে।
আজ এত বছর পর? মিষ্টি? বরখা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে।
স্লাইডিং ডোরের পাল্লাটা সরিয়ে মিষ্টি এসে ঢোকে ভেতরে। মুখে সেই পরিচিত মিষ্টি হাসি। বরখা উষ্ণ সম্ভাষণ জানায় প্রিয় বান্ধবীকে।
‘তোকে সারপ্রাইজ দিতে এলাম’...ঝলমলে কণ্ঠে বলে মিষ্টি।
‘আমি সারপ্রাইজ্‌ড।’
‘নট ইয়েট। আমার বরের সাথে আলাপ করিয়ে দিই।’
মিষ্টি বাইরে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে একসাথে ঢোকে ওরা। মিষ্টি আর...আর...পিয়াল।
বরখা অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে মিষ্টির দিকে তাকায়।
মিষ্টি স্বীকারোক্তির মত বলে ওঠে, ‘তোর দিকেই ছুঁড়েছিলাম অস্ত্রটা। ভেবেছিলাম...ভালোই হবে। প্রিয় বান্ধবী্কে নিজের পরিবারেরই একজন করে রাখতে পারবো। কিন্তু তুই যে বুলেটপ্রুফ ভুলে গেছিলাম। অস্ত্রটা কিভাবে যেন আমার দিকেই চলে এল।’
এতদিনের অনেক বোঝাপড়া বাকী ছিল। সময় তো লাগবেই। মাঝখানে যে কেউ একজন বসে আছে আমলেই নেই ওদের। ওদের দু’বান্ধবীর বোঝাপড়ার মাঝখানে বসে ক্যাবলাকান্তের মতই হাসতে থাকে পিয়াল।।


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement