বন্ধুর মুখ

বন্ধুত্ব সংখ্যা

ফাহমিদা বারী
মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩৩
  • 0
  • 0
  • ৪১৭
বহুদিন পর দেশের বাড়ির ঠিকানা থেকে একটা চিঠি পেলাম। ছেলেবেলার বন্ধু সাজ্জাদের চিঠি। চিঠিটা খুলতেই ভুর ভুর করে স্মৃতির সুবাস এসে আমাকে একদম এলোমেলো করে দিয়ে গেল।

‘প্রিয় নির্ঝর,
কতদিন হয়ে গেল বাড়ি আসিস না! আমরা না হয় তোর মতো এত এত লেখাপড়া শিখে মান্যগণ্য কিছু হয়ে উঠিনি। কিন্তু একসময় তোর বন্ধু তো ছিলাম! সেই বন্ধুত্বকে একেবারে ধুলোয় উড়িয়ে দিলি!
রন্টু, পলাশ, কবির, মোমেন...আমরা সবাই তো এই মফঃস্বল শহরের আলো বাতাসেই এখনো দিব্যি চলেফিরে বেড়াচ্ছি। শুধু তুইই কেন যেন দলছুট বেপাত্তা হয়ে গেলি। তোদের ভিটেবাড়িটাকেও সেই যে অরক্ষিত রেখে গেলি, কত লোভাতুর চোখের ছোবল থেকে আমরাই একরকম সেটাকে বাঁচিয়ে রাখলাম। কী রে হাসছিস নাকি? না না সত্যি বলছি! একটুও মিথ্যে নয়। আমাদের চ্যাংড়া বদমাইশ সেই তোফাজ্জলের কথা মনে আছে? আরে সে তো আমাদের এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এখন! খবর রাখিস কিছু? তার সেই টিংটিঙে শরীরে এখন বেশ চর্বি লেগেছে। চেহারায় খোলতাই এসেছে। সেই সঙ্গে লকলক করে বেড়েছে লোভের ডালপালা। সেই বদমাইশ তোফাজ্জল কয়েকদিন খুব জুলজুলে চোখ লাগিয়ে রেখেছিল তোদের বাড়িটার দিকে। একবার দখল করতে পারলেই স্রেফ মেরে খেতো। তুই চৌদ্দজনমেও আর ভিটেবাড়ির পাত্তা পেতি না। মোমেন আর কবির দৌঁড়ঝাপ করে নেতা টেতা দিয়ে ভয় দেখিয়ে ওসব ঝামেলা চুকিয়েছে। অথচ তুই এসবের কিছু জানিসই না! এজন্যই কথায় বলে, ‘যার বিয়ে তার খোঁজ নাই...পাড়া পড়শীর ঘুম নাই!’

বিয়ের কথায় মনে পড়লো। কী রে বিয়েটিয়ে করেছিস? নাকি এখনো কৌমার্য ধরে রেখেছিস? বয়স তো পঁয়ত্রিশের কুঠুরিতে ঢুকে পড়লো। এখনো বিয়েশাদী করে থিতু না হলে আর কোনদিন হবি?
আমরা কিন্তু প্রত্যেকেই বেশ গৃহী সংসারীতে পরিণত হয়েছি। পলাশকে দেখলে তো ভিমড়ি খাবি। মাথাভর্তি চুলের নামনিশানাও আর কোত্থাও খুঁজে পাবি না। তার বদলে চকচকে একটা টাক দেখে ভয় পেয়ে ভাববি, ব্যাটা কার মাথা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের ধড়ে বসিয়ে দিল? হাহ হা...সত্যি বলছি রে! আমাদের বাকি তিনজনের অবস্থাও যে ভীষণ ভালো, সেকথাও জোর গলায় বলতে পারছি না। ছেলেপুলের বাপ হয়ে গেছি সবাই, তবু এখনো সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে উদাস গলায় আড্ডা মারি।
আমাদের স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সেই গুনাই নদীটার কথা মনে আছে? ফিনফিনে ফিতার মতো নদীটার বর্ষাকালে সে কী উন্মত্ত রূপ! বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে কত দুনিয়ার গল্প করতাম আমরা! তুই তো একবার গল্প করতে করতে বেখেয়ালে প্রায় পড়েই যেতে বসেছিলি! মোমেন যদি না ধরতো সেদিন কী হতো অবস্থাটা ভাবতে পারিস? আচ্ছা...এসব কথা কি একবারের জন্যও মনে পড়ে না তোর?
আর রন্টু? শিমুল? ওদের দুজনকে কি একেবারেই ভুলে গেছিস? কীভাবে ভুলতে পারলি রে? ভোলা কি সম্ভব তোর পক্ষে? আর মনেও যদি থাকে...একটাবারের জন্যও কি সত্যটা জানার ইচ্ছে হলো না?
এসএসসি পরীক্ষা শেষে প্রতি বিকেলের সেই আড্ডার কথা কি ভোলা যায়? জিল্লুর চাচার দোকানের সেই মুচমুচে কচুরী আর ঘন গরুর দুধের সরভাসা চা...মনে পড়ে না এসবের কথা? সেই চা খেতে খেতে চুপিসারে এদিক সেদিক তাকিয়ে কারো পায়ের আওয়াজ শোনার আশায় বসে থাকতি! আর বনিক মামাদের বাড়ির পেছনের সেই আমবাগানে, ঝিম ধরা দুপুরে আস্ত এক কবিতাই লিখে ফেললি! তোর মনে আছে সেই কবিতার কথা? আমার কিন্তু এখনো প্রতিটা লাইন মুখস্থ আছে! শুনবি?

কনকচাঁপার গন্ধে এখন আর ঘুম আসে না রাতে,
প্রতি রাতে ঠাঁয় বসে থাকি বিছানায়।
বসে থাকি... আর ভাবতে থাকি অবিরত...
কী করছো তুমি এখন?
পড়ার বইটা উল্টে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছো কি?
নাকি খুব গোপনে লুকিয়ে রাখা কারো চিঠি পড়ছো ভাঁজ খুলে?
ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছো এদিক ওদিক...
কেউ এসে পড়লো না তো!
বারান্দায় বাবার চটির আওয়াজটা কানে যেতেই তীব্র ভয়ে লুকিয়ে ফেললে কাগজটা,
বইয়ের ভাঁজে...নাকি বড্ড তাড়াহুড়োয়... তোমার ওম জড়ানো বুকের খাঁজে...

আচ্ছা থাক। বাকিটুকু আর না বলি। সেই কবিতা যাকে নিয়ে লেখা, তার কথা জানতে ইচ্ছে করে না কখনো সখনো?
আর কেউ না জানলেও আমি তো জানি, কীসের অভিমানে সবকিছুকে এত আলগোছে ভুলে গেছিস তুই। এত অভিমান যার ওপরে চেপে রেখে নিরুদ্দেশ হলি, তাকে অন্তত এভাবে অন্ধকারে রেখে না দিলেও তো পারতিস! সে তো আজতক এটাই জানে না যে, তোর হঠাৎ এভাবে সবকিছু ভুলে হারিয়ে যাওয়া শুধুমাত্র তারই জন্যে!
একবার আয়। নিজের বাড়িঘর, বন্ধু, পুরনো স্মৃতি...সবকিছুর সাথে কিছুদিন কাটিয়ে যা। আর সেই ছাইচাপা আগুনটাকেও না হয় আরেকবার উসকে দিলি। কথা দিচ্ছি, এবারে সত্যি সত্যিই সব একেবারে ধুলোর মতো উড়িয়ে দিব।
ইতি,
তোর চিরকালের বন্ধু সাজ্জাদ

চিঠিটা পড়ে ধম মেরে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। মনের মধ্যে আকুলিবিকুলি করে গুমরাতে লাগলো অনেক চাপা পড়া কষ্ট। সাজ্জাদটা বরাবরই বাংলার বস। ভাষার রসমাধুর্য মাখিয়ে এমন নিংড়ে বের করে আনতে পারে বুকের যন্ত্রণা! আমার মা বলতো, কাঁচা কুচি করা আমে লবণ হলুদ মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিলে নাকি সব টক পানি চেপে চেপে বের করে ফেলা সহজ হয়। আজ সাজ্জাদের চিঠিটা যেন সেই কাজটিই করলো। বুকের ভেতরের সব লুকিয়ে রাখা নোনাজল আজ সবেগে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাঁধ ভেঙে।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, এত করে বলছে যখন ঘুরেই আসি একবার। মফঃস্বল ছোট শহরটা আমাকে বহুদিন এভাবে ডাকেনি। বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে পৈত্রিক বাড়িটাতে কোনোরকমে একটা ভাড়াটিয়া বসিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর নিজের লটবহর গুছিয়ে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে সেই যে চলে এসেছি, আজ এত বছরে একবারও আর ওমুখো হইনি। বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই আজো এখনো সেই শহরেই পড়ে আছে। আমার শৈশব কৈশোর আর তারুণ্যের আবির মাখানো দিনগুলোও আটকে আছে ঐ শহরটাতেই। কিন্তু ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি কখনো। রক্তের বন্ধন যখন মুছে যায়, তখন অন্য বন্ধনগুলোও সুতো কাটা ঘুড়ির মতো বেরিয়ে আসতে চায়। সেজন্যই হয়ত বন্ধুবান্ধবদের ভালোবাসার টানও আর ফেরাতে পারেনি আমাকে। ভিটেবাড়ি থেকে যে ভাড়াটা আসতো সেটা মাসে মাসে আমার একাউন্টে জমা হয়ে যেত। নগন্য সে অর্থের যোগবিয়োগ নিয়েও বিশেষ একটা মাথা ঘামাইনি। আমার মোটা অংকের মাসিক বেতনের সাথে সে অর্থের তেমন কোনো তুলনাই চলে না। আর বাপের বাড়ির সাথে আবেগের যে সূক্ষ্ণ একটা সম্পর্ক আছে, সেটাও কোথায় যেন হারিয়েই গিয়েছিল।
তবে এ তো গেল শুধু ওপরের কথা। আমার বাড়ি ফিরতে না চাওয়ার পেছনে এসবের বাইরেও কিছু একটা কারণ থেকে গিয়েছিল। সাজ্জাদের চিঠি পড়ে বুঝতে পারলাম, আমার অন্তর্যামি ছাড়াও সেই কারণটা আরেকজনের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল। তাই আর হয়ত ছলচাতুরি চলে না। একবার ঘুরেই আসি বাড়ি থেকে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেই আর বেশিদিন দেরি করলাম না। সাজ্জাদটা ঠিকই ধরেছে। এতদিনেও কেন যেন ঘর বাঁধতে ইচ্ছে করেনি। তাই পেছন থেকে কেউ টেনে ধরার নেই। আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে কাজটা করি, তাতে ছুটি ম্যানেজ করা তেমন কঠিন ব্যাপার নয়। ছুটি চাইলেই বস মুখের দিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসি দিয়ে বলে,
‘কী বন্ধুর বিয়েতে যাচ্ছো নাকি? নিজে তো সেই কাজটা করবে না বলেই ঠিক করে ফেলেছো!’
তারপর ঘসঘস করে ছুটির দরখাস্তে স্বাক্ষরটা করে আরেকদফা উপদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
‘তুমি হ্যাঁ বললেই এখনো কথা চালাতে পারি কিন্তু!’

এখানে ছোট একটা গল্প আছে। প্রসঙ্গটা এসেই পড়লো যখন, গল্পটাও চট করে বলে ফেলি। বস তার ভাগ্নীর জন্য বহুদিন থেকেই আমাকে পটিয়ে যাচ্ছে। বিয়ের বাজারে ছেলের পঁয়ত্রিশ বছর কিছুটা বেশি বয়স বৈকি। কিন্তু অন্যান্য কোয়ালিফিকেশন যাচাইবাছাই করে হয়ত ওটুকু খুঁত অবজ্ঞা করা যায়। স্মোক করি না, দেখতে শুনতে বেশ ভালো, মাস শেষে মোটা বেতন পাই...সবকিছুই আমার পক্ষে সাফাই দেয়। সেই সাথে শাশুড়ি ননদের সাথে কম্প্রোমাইজ করে চলতে হবে না, এটাও বোনাস প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে।
আমি ঝুলিয়ে রেখেছি। বসকে ঝুলিয়ে রাখতে কলজের জোর থাকা চাই। সেটা আমার বরাবরই ছিল। কিন্তু কেন ঝুলিয়ে রেখেছি, সেই জবাব নিজের কাছেও এতদিন পাইনি। মনের কোথায় যেন অলস কিছু দুপুর আর আলতা রাঙানো পায়ের সাথে জুড়ে থাকা এক জোড়া নুপুরের ছবি সপাট গেঁথে আছে। সেই ছবিকে বহুবার শক্তহাতে সরাতে চেয়েছি। কিন্তু এতদিনেও সফল হতে আর পারলাম কই?
সাজ্জাদের মোবাইল নাম্বারটা চিঠিতে ছিল। ফোন করে জানিয়ে রাখলাম আমি আসছি। আমার ফোন পেয়ে সাজ্জাদ খুশি হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু বিহ্বলতা সরিয়ে কথা বলতে পারেনি তেমন একটা। শুধু ছোট করে বললো,
‘এতদিন পরেও স্কুলবন্ধুর কথাকে পাত্তা দিয়েছিস, এটুকুতেই আমি খুশি। আয়...অনেক কথা আছে।’
বাসে যেতে যেতে মনে হলো, এই রাস্তা বুঝি আর ফুরোবেই না। ইদানিং ছোটখাট ট্যুরগুলো প্লেনেই সেরে ফেলি। যেখানে সেই সুবিধা থাকে না, সেখানে প্রাইভেট কার অথবা মাইক্রো ভরসা। ড্রাইভার সাতদিন আগে ছুটি চেয়েছিল। এতদিনেও ফিরে আসেনি। এতদূরে একা ড্রাইভ করতে সাহস হলো না। ভেবেছিলাম, বহুদিন পরে বাসে উঠে হয়ত সেই সময়টাতে ফিরে যেতে পারবো। বাস্তবে তা ঘটলো না। এসি বাসের মধ্যে বসেও কেমন একটা সাফোকেশন হতে লাগলো। সস্তা এয়ারফ্রেশনারের বিটকেলে গন্ধে ভেতরের সবকিছু যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। এত টাকা কাটে যাত্রীদের পকেট থেকে, অথচ ভালো একটা এয়ারফ্রেশনার কিনতে পারে না!
আমি মনোযোগ ঘুরাতে পুরনো দিনগুলোতে ফিরে গেলাম।
সাজ্জাদের চিঠিটা এই পর্যন্ত তেরবার পড়েছি। সবার কথা ঘুরেফিরে বললেও রন্টু আর শিমুলকে নিয়ে বেশিকিছু বলেনি। ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল? নাকি আরো বেশিকিছু বলবে বলে ডেকে পাঠালো? শেষেরটাই হবে হয়ত। নইলে আমিই বা এমন পড়িমড়ি করে কেন ছুটে এলাম!

রন্টুর সাথে আমার কোনোদিনই কোনো বোঝাপড়া করতে ইচ্ছে করেনি। আসলে যাকে নিজের সমকক্ষই ভাবিনি কোনোদিন, তার সাথে কীসের বোঝাপড়া? ওকে নিয়ে মজা করতাম। এটা সেটা বলে খেপাতাম। জানতাম ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনোদিন উত্তরটাও দেওয়ার সাহস নেই ওর। দয়া করে নিজের বন্ধুমহলে ঠাঁই দিয়েছিলাম। নিজের সম পর্যায়ের ভাবতাম না কখনো। অথচ আজ ভাবলে অবাক হই, সেদিন এই রন্টুই কেমন সুচারুভাবে আমার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল! ওর হাতটা সেদিন এতটুকুও কেঁপে ওঠেনি। তাতেই বুঝতে পারি, ভেতরে ভেতরে কতটা সুনিপুণ শিকারী ছিল ও। অথচ আমি তাকে কী না হিসাবের বাইরেই রেখেছিলাম বরাবর! আর কেউ না জানলেও আমার মন তো জানে, সেই লজ্জা আর অপমানেই আমি চিরদিনের জন্য বাড়ি ছেড়েছিলাম।
আর শিমুল? ছোট্ট মফঃস্বল শহরে বেড়ে উঠলেও রূপে গুণে অনায়াসেই যাকে শহুরে মেয়ে বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। সেই শিমুল কী না রন্টুর মতো এমন একটা আনস্মার্ট ভ্যাবলামার্কা ছেলেকে নিজের জীবনসঙ্গী বানিয়ে ফেললো? অথচ এই শিমুলকে নিয়ে কত কবিতা লিখেছি রাতের পর রাত জেগে! অলস বিবর্ণ দুপুরগুলো রঙিন করে তুলেছি সেই টুকটুকে আলতামাখানো পায়ের ছবি কল্পনা করে! সেই শিমুল এভাবে আমাকে চমকে দিল!

আমাদের পাঁচ বন্ধুর দলটিতে রন্টু ভিড়তে চাইতো সেই ছোটবেলা থেকেই। রন্টুর বাবা ছিল ট্রাক ড্রাইভার। মহাজনের ট্রাক বোঝাই মালামাল নিয়ে শহরে যেত ওর বাবা। আমাদের ছোট শহরের নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য তৈরি করা এক কলোনিতে ওরা থাকতো। আমরা পাঁচ বন্ধুই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে মোটামুটি সম পর্যায়ের। সাজ্জাদ, পলাশ, কবির, মোমেন আর আমি। আমরা ছিলাম পঞ্চরত্ন। স্কুলে গলা জড়াজড়ি করে ঘুরে বেড়াতাম। লম্বা বেঞ্চিতে একসাথে বসতাম। পড়াশুনাতে আমি ছোটবেলা থেকেই এগিয়ে থাকলেও ওরা চারজনও আমার কাছাকাছিই থাকতো। আমাদের ছেলেবেলায় গল্পের বই আর টিভি ছিল প্রধান বিনোদন। রাত জেগে ফুটবল আর ক্রিকেট দেখে দিনের বেলা সেসব নিয়ে জোর আড্ডা বসাতাম। পাঁচ বন্ধুরই ছিল ব্যক্তিগত পাঠাগার। নিজেদের মধ্যে বই লেনদেন করে মগজের লাইব্রেরিটাকে আরো উন্নত করতাম। সাজ্জাদ ছিল বাংলায় ভালো। ও মাঝে মাঝে ছোটগল্প কবিতা এসব লিখে এখানে ওখানে পাঠিয়ে দিত। মাঝে মাঝে পত্রিকাতে সেগুলো প্রকাশিতও হয়ে যেত। আমরা দল বেঁধে সেই পত্রিকা কিনে নিয়ে আসতাম। স্কুলের অন্য বন্ধুদের দেখাতাম। সাজ্জাদ সেই শহরেরই একটা কলেজে জয়েন করেছে শুনেছি। এখনো লেখালেখিটা যে ছেড়ে দেয়নি, মাঝে মাঝে পত্র পত্রিকাতে সেটার প্রমাণ পাই।
রন্টু বসতো পেছন দিকের একটা বেঞ্চিতে। তেল দিয়ে মাঝখানে সিঁথি কেটে চুল আঁচড়াতো। কথা বলার সময় তাড়াহুড়োয় কিছু বলতে গেলেই তোতলা হয়ে যেত। আমরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতাম। ওর তোতলামি শোনার জন্য প্রায়ই ওকে রাগিয়ে দিতাম। এটা সেটা বলে খোঁচাতাম। মিছেমিছি দোষ দিতাম। আর তখনই মজা দেখা যেত। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য রন্টু তো তো করে সাফাই গাইতো। আমরা একে অপরের ওপরে হেসে গড়িয়ে পড়তাম। রন্টুর লোভটা আমাদের অজানা ছিল না। সে সবসময় আমাদের দিকে লোলুপ চোখে তাকাতো। আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। মনের মধ্যে আশা ছিল, যদি আমরা একবার ডেকে ওর সাথে কথা বলি। গল্প না হোক, ছোটখাট ফাইফরমাশ খাটিয়ে নিলেও রন্টু রীতিমত বর্তে যেত।

দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা চলে এলো, আবার চলেও গেল। পরীক্ষা শেষে অফুরন্ত অবসর পেয়ে গেলাম সবাই। সেই সময়েই আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে গেল।
আমাদের শহরে ছেলেদের আর মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল ছিল। মেয়েদের প্রতি আকর্ষণের পারদ সবসময়ই ওপরের দিকে উঠে থাকতো আমাদের। কিন্তু মেয়েদের স্কুলের ত্রিসীমানাতে আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ষণ্ডা গোছের দুইজন দারোয়ান একেবারে টাইট হয়ে বসে থাকতো মেয়েদের স্কুলের গেটে। এতদিন পড়াশুনা আর পরীক্ষার ঝামেলায় খুব বেশি সাহস দেখাতে পারিনি। এখন পরীক্ষা শেষের অফুরান অবসরে একটু হিরোগিরি ফলানোর খায়েশ হলো। এক দুপুরে ষণ্ডা দুই দারোয়ানের চোখ বাঁচিয়ে আমরা মেয়েদের স্কুলের লম্বা প্রাচীরে উঠে উঁকি দিলাম। যথেষ্ট হিম্মতের কাজ। তবু পাঁচ বন্ধুই বেপরোয়া। স্কুলের দশ দশটা বছর বসে বসে শুধু আঙ্গুলই চুষলাম। কিছুই করার সাহস হয়নি এতদিন। অবশেষে ‘কী আছে জীবনে’ এমন একটা ভাব নিয়ে দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে মেয়েদের দিকে দৃষ্টিপাত শুরু হলো আমাদের। বলা হয়নি, ততদিনে রন্টুর প্রবেশ ঘটেছে আমাদের দলে। দিনের পর দিন আমাদের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার জন্য বিরক্ত হয়েই দলে নিয়েছি ওকে। আমরা পাঁচ বন্ধু যখন প্রাচীরে উঠে উঁকিঝুঁকি মারতাম, রন্টু তখন নীচে দাড়িয়ে আমাদের জুতা স্যাণ্ডেল পাহারা দিত। আশেপাশে নজর রাখতো, কেউ এদিকে আসছে কী না। কাজেই দলে তার প্রয়োজনটাও কম ছিল না। ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে মাঝে সাঝে একটু আধটু গল্পে অংশও নিতে শুরু করলো একসময়। আমরা ওকে যেটাই বলতাম সেটাতেই ঘাড় নেড়ে সায় দিত। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্যও দলে ওর অবস্থান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো।

আমরা সকৌতুহলে চরম আশ্লেষে মেয়েগুলোকে দেখতাম। খুব মজা লাগতো দেখতে। মেয়েগুলো খলবল করতো মাছের মতো। হেসে লুটোপুটি খেতো নিজেদের মধ্যে। আমরা যথেষ্ট সাবধানী ছিলাম। অল্প একটুখানি মাথা বের করে উঁকি মারতাম। ওরা কেউ কখনো আমাদের দিকে লক্ষই করেনি। তবে সেই ধারণা ঠিক ছিল না। তার প্রমাণ পেলাম একদিন। সেদিনও স্কুলের প্রাচীরে উঁকি দিয়ে দেখাদেখি শেষ করে ফিরে যাবো ভাবছি, এমন সময় মিহি একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম।
‘এই যে শুনুন। আপনারা কারা? এভাবে আমাদের স্কুলের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? দারোয়ান ভাইদের ডেকে আনবো?’
আওয়াজ শুনে আমাদের আত্মায় পানি নেই। পলাশ আর সাজ্জাদ পড়িমড়ি করে নামতে গিয়ে বেশ চোট পেলো পিঠ আর কোমরে। বাকি দুজনও কোনোদিকে না তাকিয়ে জান বাঁচাতে মরিয়া। শুধু আমার দুই চোখ আটকে গেছে মন্তব্যকারিনীর দিকে। দেখি সামনের একটা ক্লাসরুমের সাথে লাগোয়া ঝুল বারান্দার এক কোণে একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চৌদ্দ পনের বছরের হবে। হয়ত ক্লাস এইট বা নাইনে পড়ে। দুপাশে লম্বা বেণী ঝুলছে কোমর পর্যন্ত। মেয়েটার চোখমুখ খুবই ধারালো, একদম কাটা কাটা। চোখে মোটা করে কাজল টানা। সেটা বেশ দূর থেকেও স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। আহলাদী ঠোঁটজোড়ার নিচে চিকন আপেলকাটা চিবুক। আমি দুনিয়ার সবকিছু ভুলে গিয়ে হাঁ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মেয়েটাও কিন্তু লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো না। যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর না শুনে সে কিছুতেই সেখান থেকে নড়বে না। আমি অনেক সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলাম,
‘আচ্ছা আর আসবো না। শুধু বল তো তোমার নাম কী?’
মেয়েটা যেন তেড়ে জবাব দিল,
‘আমার নাম দিয়ে আপনার কাম কী?’
আমি তখন মজা পেয়ে গেছি। নীচ থেকে বন্ধুরা সমানে সাবধানবাণী জপে যাচ্ছে। সেদিকে আমার ভ্রুক্ষেপও নেই। বললাম,
‘একটা কাজ আছে। না বললে আবার আসবো। আর বললে চলে যাবো। তোমার নাম কি মর্জিনা?’
‘কে বললো আমার নাম মর্জিনা? কোথায় পেলেন এই নাম আপনি?’
‘ওহ আচ্ছা তাহলে তো তুমি সখিনাই হবা!’
‘এসব কী ক্ষ্যাতমার্কা সব নাম বলছেন! আমার নাম হচ্ছে শিমুল! এবার যাবেন নাকি ডেকে আনবো সবাইকে?’
আমি আবারও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই দুই চারজন মেয়ে শিমুলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তারা তখনো আমাকে দেখেনি। আমিও আর ঝুঁকি নিলাম না। নামটা যখন জেনেই গেছি, বাকিটা বের করা কঠিন কিছু হবে না। ছোট একটা শহর। এখানে নাম জানা থাকলে মানুষটাকে খুঁজে বের করা মোটেও কঠিন কিছু না!

সেই থেকে শুরু। শিমুলদের বাসাটা শহরের আরেক মাথাতে ছিল। আমাদের পাড়া থেকে বেশ দূরে। রন্টুরা যেখানে থাকতো তার আশেপাশে ছিল ওদের বাসা। এরপর থেকে রন্টুর চাহিদা আরো বেড়ে গেল আমাদের, বিশেষ করে আমার কাছে। শিমুল কোথায় থাকে, কোন কোন স্যারের বাসায় কখন পড়তে যায়...সব খবর রন্টুই আমাকে এনে দিতে লাগলো। আমার পাঁচ বন্ধুও কম সহযোগিতা করলো না। কৈশোরের প্রথম প্রেমের বাতাস এসে এলোমেলো করে দিয়ে গেল আমাকে।
আমার অনুমান ভুল ছিল না। ক্লাস নাইনে পড়তো শিমুল। সরকারী চাকরিজীবী বাবার একমাত্র মেয়ে। ওত অল্প বয়সেও কথাবার্তায় কী ভীষণ ব্যক্তিত্বের প্রখরতা! চালচলনে যেন হেমন্তের কোমল দোলা। চাহনিতে রাবিন্দ্রিক আভিজাত্য। নিজেকে বেকুব মনে হতো আমার। এত চমৎকার একটা মেয়ে এই শহরেই আছে, অথচ আমরা সেটা জানিই না! যেহেতু আমিই প্রথম আবিষ্কার করেছি, কাজেই বাকিরা বিনা বাক্যব্যয়ে আমাকেই ব্যাট বল এগিয়ে দিল।

দিন গড়িয়ে চললো। ইতিমধ্যে এসএসসির রেজাল্ট পেলাম। আমি লেটার সহ স্টার মার্ক পেয়ে পাশ করলাম। আমার বন্ধুরাও সবাই ফার্স্ট ডিভিশনে উতরে গেল। স্কুলের ফলাফল খারাপ হলো না। রন্টু কোনরকমে পাশ করে নিজের, সেই সাথে আমাদের ইজ্জত বাঁচালো। হাজার হোক, এখন আমাদের সাথে সাথে থাকে। ও ব্যাটা যদি ফেল করতো, তাহলে কি আমরা কেউ মুখ দেখাতে পারতাম?
স্থানীয় একটা কলেজে ভর্তি হলাম। শিমুলের সাথে আমার সেরকম কিছু হয়ে ওঠেনি ঠিকই, কিন্তু হওয়ার একটা জোর সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি তখন। রন্টু মারফত চিঠি পাঠাতাম। কোনো চিঠিরই উত্তর পাইনি কোনোদিন। প্রথমদিকে নাকি না পড়েই ছুঁড়ে ফেলে দিত। দিনে দিনে অবস্থার উন্নতি হলো। এখন মাঝে মাঝে খুলে দেখে। চিঠির পাতায় গুঁজে রাখা গোলাপ আলগোছে সরিয়ে রাখে। সব খবরই রন্টু এনে দিত। খুশি খুশি গলায় বলতো,
‘লে... লেগে থাক। হ... হবে। চিন্তা ক... করিস না!’
রন্টু না বললেও লেগে আমি ছিলাম ঠিকমতোই। আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার কিছুদিন আগে হুট করে বাবার হার্ট এ্যাটাক করলো। আমরা অথৈ সাগরে পড়ে গেলাম। মা খুব ভেঙে পড়লো। ভাইবোন ছিল না আমার। কিন্তু আমার নিজের পায়ের নিচে তখন থকথকে কাদামাটি। শক্ত ভিত নেই কোথাও। মায়ের শরীরও আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে লাগলো।

পড়াশুনায় ভালো হওয়ার কারণেই হয়তোবা, এতকিছুর পরেও আমার একেবারে ভরাডুবি হলো না। এইচএসসি’র ঘেরাটোপ টপকে ভর্তি যুদ্ধেও সসম্মানে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বায়ো কেমিস্ট্রিতে চান্স পেয়ে গেলাম। আমার চার বন্ধুও বিভিন্ন জায়গায় অনার্সে ভর্তি হলো। কেউওই আমার মতো এতটা ভালো করলো না। কিন্তু গ্রাজুয়েশনের শিকে ছেঁড়ার নিশ্চয়তা দিতে পারলো সবাই।
শুধু রন্টু বেচারার আর বেশিদূর পড়া হলো না। কোনোরকমে ইন্টারমিডিয়েটের সিঁড়ি টপকেই সে একেবারে ধপাস করে বসে পড়লো। পড়াশুনা নাকি আর হবে না ওকে দিয়ে। নিজের বাবার মাধ্যমে একে ওকে ধরে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ড্রাইভারের চাকরিটা জোটাতে পারলো।

আমার ক্লাস শুরু হতে তখনো কয়েকমাস বাকি আছে। শিমুল তখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে। আমার প্রেমের সম্ভাবনা তখন অনেকদূর গড়িয়েছে। রন্টুকে দিয়ে এখনো চিঠিপত্র চালাচালি করি। শিমুল সেগুলো ছিঁড়ে ফেলে না। পড়ে দেখে। যত্ন করে রেখে দেয় বইয়ের ভাঁজে। একদিন সুন্দর এক বিকেলে রন্টু সুসংবাদ নিয়ে এলো। শিমুল নাকি আমার সাথে দেখা করার ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছে। তবে সময়টা বলেনি এখনো। আমিও তাড়াহুড়া করিনি। এতদিন ধরে যে প্রেমের চারাগাছে জলসিঞ্চন করে চললাম, সেটার বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহুর্তকে উপভোগ করি আমি। আজ আচমকা একদিনেই সেই চারাগাছে পরিপুষ্ট ফুল আমি আশা করতে পারি না।
আজ ভাবলে বুঝতে পারি, বিধাতা কী আশ্চর্য সুন্দর ভাবে মানুষের জীবনটাকে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। অথচ মানুষ বৃথাই আকাশকুসুম কাব্য রচনা করে কল্পনার ফানুস ওড়ায় আকাশে।
সেদিন বিকেলের কথা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। হুট করে সেদিন রন্টু বাদে আমার চার বন্ধুই আমাদের বাসায় এলো। ওদের চোখেমুখে চাপা উদ্বেগ। অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকাতে পলাশই খবরটা দিলো। রন্টু নাকি গোপনে শিমুলকে বিয়ে করেছে।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কিছু বলার মতো ভাষা আমি খুঁজে পেলাম না। প্রথমে ভাবলাম ওরা মজা করছে। কিন্তু একে একে প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে সময় লাগলো না। কেউ মজা করছে না। ওরা যা বলছে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। ওরা চলে যাওয়ার পরে আমি বিমুঢ় হয়ে সারা বিকেল সন্ধ্যে রাত নিজের ঘরে একা একা বসে থাকলাম। আমার কান্না এলো না। রন্টুকে কিছু জিজ্ঞেস করার কথা মনেও এলো না। শুধু একবুক প্রশ্ন নিয়ে আমি বসে রইলাম। খুব লজ্জা লাগলো আমার। নিজেকে এতটা বোকা আর উজবুক আমার কখনোই মনে হয়নি। যাকে আমি সামান্য ফরমাশদাতার চেয়ে বেশি কিছু কখনো ভাবতেই পারিনি, সেই কী না এভাবে শেষ দানটা মেরে দিল!

এরপরের গল্পটা সংক্ষিপ্ত। আমরা প্রত্যেকেই যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমি ক্লাস শুরু হতে না হতেই ঢাকায় চলে গেলাম। মা একা হয়ে পড়লো। একাকীত্বের কষ্টের সাথে যোগ হলো নানারকম অসুখ বিসুখ। আমার ঢাকায় চলে আসার দু’বছরের মাথায় মা ও একদিন বাবার উদ্দেশ্যে পরপারে রওয়ানা দিল।
মা’র দাফন কাফন শেষ করে বাড়িটাকে নিয়ে চিন্তায় পড়লাম। বন্ধুরাই এগিয়ে এলো। খোঁজখবর লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ভাড়াটিয়া জুটিয়ে ফেললো। বাড়ির একটা অংশে আমাদের জিনিসপত্রগুলো সরিয়ে এনে আরেকপাশটা পুরোটা ভাড়া দিয়ে দিলাম। তারপর বাকি অংশে তালা ঝুলিয়ে একেবারে পাকাপাকিভাবে ঢাকা চলে এলাম। পেছনে পড়ে রইলো সবকিছু। ছাত্র থাকা অবস্থায় ভাড়ার টাকাটা বেশ কাজে লাগতো। সেটার প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেল একসময়।
রন্টু আর শিমুলের খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছে হয়নি। ওরাও আর সামনে আসেনি কখনও। চার বন্ধু প্রথমদিকে চিঠিপত্র লিখলেও ধীরে ধীরে কমে এলো যোগাযোগ। এই এতদিনের মাথায় সাজ্জাদই আবার আমাকে সবেগে টেনে নিয়ে গেল অতীতে।

চিন্তায় ইতি টানলাম। বাস চলে এসেছে গন্তব্যে। বাস থেকে নেমে কিছুদূর ভ্যানে যেতে হয়। রাস্তাঘাট এই এতগুলো বছরেও প্রায় আগের মতোই আছে। চারপাশ দেখতে দেখতে যেতে লাগলাম। এতদিন পরে কীভাবে আবার সবার মুখোমুখি দাঁড়াবো, এই অদ্ভুত ভাবনা পেয়ে বসলো আমাকে। সাজ্জাদকে বলেছিলাম, আমাদের বাড়ির খালি অংশটাই কাউকে দিয়ে একটু ঝেড়ে মুছে রাখতে। আমি সেখানেই উঠবো। সেই কথা ধোপে টিকেনি। সাজ্জাদ সাফ জানিয়ে দিয়েছে,
‘তুই এখন রাজাই হ আর বাদশাহই হ, পুরনো বন্ধুর আতিথেয়তাই গ্রহণ করতে হবে। ছাড়াছাড়ি নাই!’
অগত্যা বহুদিন পরে অনভ্যাসে সঙ্কুচিত সম্পর্কের মাঝখানটাতে গিয়ে পড়লাম। বন্ধুরা একে একে দেখা করতে এলো। সাজ্জাদ ভুল কিছু বলেনি। সবাই বেশ পাল্টে গেছে। সময়ের মোটাদাগ আমাদের প্রত্যেকের শরীরে কেটে কেটে বসে গেছে। বহুদিন পরে পঞ্চবন্ধু মিলে বেশ জম্পেশ আড্ডা বসালাম। সময়ের মাঝখানের পর্দা চুপিসারে মিলিয়ে যেতে সময় লাগলো না। অল্প সময়েই আমরা একেবারে সেই আগের মতোই মিলে গেলাম।

সবাই চলে যাওয়ার পরে রাতে আমি আর সাজ্জাদ ওর বাসার ছাদে গিয়ে বসলাম।
সাজ্জাদের বউ বেশ রুচিশীলা আর সৌখিন। পুরো ছাদে নানারকম টবে প্রচুর গাছগাছালি লাগিয়েছে। জুঁই কামিনি আর হাসনাহেনার গন্ধে মৌ মৌ চারপাশ। আকাশে ঝকঝকে জোৎস্না। দু’বন্ধু কিছুক্ষণ বিমুঢ় হয়ে বসে রইলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে। সাজ্জাদই মৌনতা ভাঙল একসময়।
‘জানতে চাইলি না সেদিন কেন ওমন হুট করে রন্টুকে বিয়ে করেছিল শিমুল? আর শিমুলের বাবা-মাই বা কী কারণে রন্টুর মতো ছেলের সাথে শিমুলের বিয়েটাকে মেনে নিয়েছিল?’
আমি চুপ করে থাকলাম। জানি, কিছু বলতে হবে না। আজকে যা বলার সাজ্জাদই বলবে। কিছু সময় চুপ করে থেকে সাজ্জাদই আবার বললো,
‘শিমুল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যে রাস্তাটা দিয়ে যেত, সেই রাস্তাটা খুব নিরিবিলি থাকতো সবসময়। ওরা চার পাঁচজন বান্ধবী সবসময় একসাথে যেত। সেদিন শিমুলের বাসা থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাই ওর বান্ধবীরা সবাই আগেই চলে গিয়েছিল। শিমুল একা একা যাওয়ার পথে হঠাৎ দুজন ছেলে ওর সামনে এসে দাড়ায়। ছেলেদুটোর মুখ ঢাকা ছিল। শিমুল চিনতে পারেনি কাউকে। ওরা শিমুলের মুখে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল দিয়ে অজ্ঞান করে গাড়িতে উঠিয়ে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়। তারপর উপর্যুপরি নির্যাতন চালিয়ে সন্ধ্যেবেলা ওকে ফেলে রেখে যায় সেই আগের জায়গাতেই। ততক্ষণে শিমুল না ফিরে আসাতে ওর বাসা থেকে খোঁজ শুরু হয়েছে। তোর সংবাদদাতা রন্টুও তখন সেই জায়গাতেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল, শিমুলের ফেরার অপেক্ষায়। শিমুল তখন তোর ব্যাপারে রাজি হয়েছে। তাই তোর চেয়েও রন্টুর আগ্রহ কম ছিল না কোনো অংশে।
ছেলেগুলো সেই গাড়িটা থেকেই ফেলে দেয় অচেতন শিমুলকে। তারপর তুমুল বেগে গাড়ি চালিয়ে সরে যায় সেখান থেকে।’

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছি। বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গেছি। এ যেন একেবারে সিনেমার গল্প। সাজ্জাদ বলে চললো,
‘এরপর কী হলো বুঝতেই পারছিস। রন্টু কাছে গিয়ে চোখেমুখে পানি দিয়ে শিমুলের জ্ঞান ফেরায়। তারপর ওকে বাসায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তখন কাঁদতে কাঁদতে শিমুল বলে, ও কোথাও যাবে না। নিজের মুখ আর কাউকেই দেখাবে না সে। রন্টু শিমুলের কান্না দেখে সান্তনার ভাষা হারিয়ে ফেলে। আর তাছাড়া বোকাসোকা ছেলে। কোথায় কী বলতে হয় সেটাও বুঝতে পারেনি হয়ত। সব ঠিক হয়ে যাবে এমন কিছু বলেছিল হয়ত।’
‘তারপর?’ অবশেষে কিছু বলতে পারলাম আমি।
‘তারপর আর কী? সিনেমার গল্পকেও হার মানায় এই গল্প। শিমুলকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর ওর বাবা-মা দেখামাত্রই বুঝতে পারে, কী হয়েছে তাদের মেয়ের সাথে। লোকলজ্জা আর সমাজের ভয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। রন্টু তখন আগ বাড়িয়ে বলে ফেলে, শিমুলের দায় দায়িত্ব সে নিবে। তাদের চিন্তা করতে হবে না শিমুলকে নিয়ে। রন্টু সাধারণ পরিবারের ছেলে, নিজেও ড্রাইভার...এতকিছু চিন্তা করে আর সময় নষ্ট করে না শিমুলের বাবা-মা। তাদের মেয়ের ভাগ্যে যে এরচেয়ে ভালো কিছু আর ঘটবে না সেটা তখন তারা মেনে নিয়েছে। এর সপ্তাহখানেক পরেই রন্টুর সাথে শিমুলের বিয়েটা হয়ে যায়। একেবারে সাদামাটা, পারিবারিকভাবে। রন্টুর বাবা-মা বেশিকিছু জানতো না। তারা ভেবেছে, ছেলেমেয়ে নিজেরা নিজেদের পছন্দ করেছে। তাই হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত। জানতে পারলে হয়ত তারাও শিমুলকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিত না। এই সমাজে ধর্ষিতাকে কেই বা মেনে নেয় বল? তোর কথা যে রন্টুর মনে হয়নি তা কিন্তু নয়। কিন্তু শিমুল ওকে অনুরোধ করেছিল কারো কাছে কিছু না বলার জন্য। ওর এই দুর্ভাগ্যের কথা যেন কেউ জানতে না পারে। তাই শিমুলের মুখের দিকে তাকিয়ে তোর কাছে কিছুই বলতে পারেনি রন্টু। অনেকদিন পরে আমার শত চাপাচাপিতে বাধ্য হয়ে শেষমেষ সব খুলে বলেছে রন্টু। সেই সাথে কথা আদায় করে নিয়েছে, যেন কাউকে কিছু না বলি। সেই কথা রাখতে পারলাম না। তোর কাছে সত্যটাকে বলেই দিলাম!’

আমি বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম সাজ্জাদের দিকে। সাজ্জাদ বললো,
‘একবার দেখা করবি ওদের সাথে?’
‘আমি! না না...আমি কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবো ওদের সামনে? আমি তো সেদিনের পর থেকে রন্টুকে আর ভিড়তেই দিইনি আমার আশেপাশে! আমার কি কোনো অধিকার আছে এখন গিয়ে ওর সাথে কথা বলার? না না...থাক। ওরা ভালো থাকুক!’
‘হ্যাঁ রে। ভালোই আছে দুজন। দুটো ফুটফুটে ছেলেমেয়ের বাবা-মা এখন।’
আমি কিছু বললাম না। শিমুলের সেই ব্যক্তিত্বভরা চাহনী ফুটে উঠলো মানসচোখে।

আজ তার পাশে রন্টুর বোকা বোকা মুখটাও ভেসে উঠলো। বহুদিন সেই মুখটাকে মনে করতে চাইনি। ওর বোকা বোকা সেই চাহনির পেছনে অন্য কোনো ক্রুর শত্রুর ছায়া খুঁজে পেয়েছি এতদিন। আজ মনে হলো, সেই শত্রুর ছায়াটা কর্পুরের মতো কোথায় যেন উড়ে গিয়েছে। সেখানে ফুটে উঠেছে মানবতায় ভরপুর একজন বন্ধুর প্রতিচ্ছবি, যাকে কখনোই মন থেকে বন্ধু বলে মেনে নিইনি। অথচ সে পাশে থেকেছে ছায়ার মতো। কাঁধে তুলে নিয়েছে বন্ধুত্বের দায়।
চোখ দুটো জলে ভরে এলো। মনে মনে বললাম,
‘সুখে থাকিস বন্ধু...’
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী অতি চমৎকার একটি লেখা পড়লাম। খুব ভালো লাগলো, কবির জন্য রইলো শুভকামনা।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

বন্ধুত্বের চিরাচরিত রূপটিকেই তুলে ধরার প্রয়াস গল্পটিতে। বন্ধু ভুল বুঝে দূরে সরে গেলেও প্রকৃত বন্ধু কখনো বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে না।

০১ ডিসেম্বর - ২০১৪ গল্প/কবিতা: ১ টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০ পাঠক স্কোরঃ ৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "উষ্ণতা”
কবিতার বিষয় "উষ্ণতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ডিসেম্বর,২০২১