লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৬৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

উপলব্ধি
উপলব্ধি

সংখ্যা

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৩

ফাহমিদা বারী

comment ১৬  favorite ১  import_contacts ৯২৪
৪ঠা মার্চ, ১৯৯৬
দৈনিক আঞ্চলিক বার্তা
শহরের উপকণ্ঠের বাজলা সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে গতকাল ক্লাস চলাকালীন সময়ে এক শিক্ষকের নির্মম প্রহারের শিকার একজন ছাত্রকে স্থানীয় একটি নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেটি বিদ্যালয়ের জুনিয়র অংকের শিক্ষক দ্বারা নির্দয়ভাবে নির্যাতিত হয়। ছাত্রের প্রতি এই পৈশাচিক আচরণের প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের যথোপযুক্ত শাস্তির দাবীতে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা শহরে মানববন্ধন গড়ে তোলে। আজ সকালে উক্ত শিক্ষককে পুলিশী হেফাজতে নেয়া হয়েছে। ছাত্রটির দরিদ্র পিতা তার ছেলের প্রতি শিক্ষকের এই ঘৃণ্য আচরণের বিচার চেয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
...........................................................................

৬ই জানুয়ারি,২০১৬
দৈনিক ভোরের আলো
আজ দুপুরে নগরীর শেখেরটেক এলাকার একটি নির্মীয়মান ভবন হতে এক কিশোর কে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কিশোরের বয়স ১৫/১৬ বছর। কিশোরটি মাদকাসক্ত। তার জবানবন্দি থেকে জানা যায় যে, সে তার সহযোগী আরো দু’জন মাদকাসক্ত বন্ধুর দ্বারা শারীরিক আক্রমনের শিকার হয়েছে। মাদক ক্রয় এবং তা বাটোয়ারা সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয় এবং অপর দুই বন্ধু তাকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করে। কিশোরের অবস্থা আশংকাজনক। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পুলিশ কতৃক তার পিতার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, এবং কিশোরকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিশোরের পিতা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, তার ছেলেটি অসৎ সঙ্গের প্রভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। তিনি তার পুত্রের উপর হামলাকারীদের যথোপযুক্ত বিচার দাবী করেছেন এবং এ ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেষ থেকে শুরু
সকাল বেলাতেই আজ স্ত্রীর সাথে একপ্রস্ত হয়ে গেছে।
এ আর নতুন কী! এ তো সিরাজ মুন্সীর নিত্যদিনের কেচ্ছা। ‘রাগ’ শব্দটা সমার্থক তার জীবনের সাথে। তার জীবনের একটা সকাল রাগ ছাড়া শুরু হয় না, একটা রাত রাগ ছাড়া শেষ হয় না। এত রাগ! এত রাগ! যখন রেগে যান, সব কিছু ধুলিস্যাৎ করে দিতে ইচ্ছে করে। ভালো-মন্দ কোন কিছুই তখন তার মাথায় থাকে না। শুধু সামনে যে থাকে, তার অস্তিত্ব মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ছোটবেলা থেকেই এই রাগ তার জীবনের অনুষঙ্গ। সিরাজ মুন্সীর বাবা ছেলের এই প্রচণ্ড রাগ দেখে মনে মনে ভাবতেন, ছেলে নিশ্চয়ই জীবনে মস্ত কিছু করবে। নামের সাথে আছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের নাম। তার মতই কিছু একটা কেউকেটা হবে তার ছেলে।
কেউকেটা না হোক, বিখ্যাত শব্দটা ঠিকই জুড়ে গিয়েছে তার জীবনের সাথে। আর তাও এই রাগেরই কল্যাণে।
স্ত্রী মাহমুদা নরম শরম মানুষ। কিন্তু তিনিও আর পারেন না। বিবাহিত জীবনের অনেকগুলো বছর তিনি দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করেছেন। সাত চড়ে রা করেননি। কিন্তু পাথরেরও বোধহয় জবান আছে। তা না হলে সে ঝরণা কিভাবে প্রবাহিত করে? এখন আর চুপ করে থাকেন না মাহমুদা বেগম। কথার পিঠে বেশ দু’কথা বলে দেন। যা হয় হবে। আর কত ভয় করে থাকবেন? আর তাছাড়া কিসের ভয়? আর কী হারানোর আছে তার? সবকিছুই তো হারিয়েছেন জীবনের। সম্মান, শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা...স্ত্রী হিসেবে কোন প্রাপ্যই তার ভাগ্যে জুটেনি। উপরন্ত গালিগালাজ, অসম্মানজনক আচরণ, এসব কিছুই তার প্রতিদিনের পাওনা। তাই এখন নিজেও দু’চারটা ফেরত দিতে শিখেছেন। তাতে আগুনের মুখে ঘি পড়ে। দাউ দাউ করে তা জ্বলে ওঠে।
‘নবাবের বেটি, পোলার খোঁজ রাখো কিছু? সে কই যায়? কী করে? সারাদিন ঘরে বসে কাজটা কী তোমার? ঘাড় ধাক্কা মাইর্যা বাড়ির বাইরে পাঠায়ে দিমু। তখন বুঝবা আমি কী জিনিস!’
‘জী, আপনি কী জিনিস সেইটা বোঝার জন্য আর বাইরে যাওয়ার কী দরকার? আর পোলা আমার একার নাকি? আপনি খোঁজ রাখতে পারেন না তার? আপনি তো শিক্ষক মানুষ। পোলারে শিক্ষা দিতে পারেন নাই?’
‘কী এত সাহস তোর!......’
মাহমুদার ভয় লাগে না। ছেলে বড় হয়ে গেছে। দুনিয়া চিনে গেছে। ছেলের জন্য এতদিন চুপ করে থেকেছেন। এই লোক যদি তার গায়ে হাত তোলে তাহলে তিনিও ছেড়ে কথা বলবেন না। দরকার পড়লে পুলিশের কাছে যাবেন। এই হুমকি তিনি স্বামীকে দিয়েও রেখেছেন। মাহমুদা বেগমের দিকে হাতের বিশাল থাবাটা বাড়িয়ে দিয়েও সরিয়ে নিলেন সিরাজ মুন্সী। হুমকিটা মনে পড়ে গেছে তার।

কিন্তু ছেলের ব্যাপারে তার অধিকারবোধ টনটনে। দরদের জায়গাটাও কম না। ইদানিং ভালো ঠেকছে না ছেলের মতিগতি। দু’তিন বছর আগেও ছেলের ওঠা বসা চলা ফেরা সব কিছুই পানির মত স্বচ্ছ ছিল। চোখ তুলে বাবার দিকে চাইতো না কখনো। স্কুল, কোচিং আর বাসা এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার জীবন। কিন্তু সিরাজ মুন্সীর বুঝতে অসুবিধা হয় না, ছেলে তার আর আগের মত নাই। আগে কখনো কোচিং থেকে ফিরতে দেরি হতো না, এখন নিয়মিত দেরি হয়। পড়াশুনা করতে দেখা যায় না তেমন। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। কোথাও একটা গড়বড় তো হয়েছেই।
স্ত্রীর সাথে যতই হম্বিতম্বি করুক, ছেলের সাথে সিরাজ মুন্সী অন্য মানুষ। ছেলের প্রতি মমতার ফল্গুধারা তার সবসময়ই বয়ে চলে। ছেলের কোন আবদার অপূর্ণ রাখেন না। কেউ তার ছেলেকে উঁচু গলায় কিছু বলবে এটা হজম করা তার পক্ষে অসম্ভব। একটা ছেলে পয়দা করেছে, এই কৃতিত্বের কারণেই তিনি মাহমুদা বেগমকে এখনো কিছুটা যত্ন করেন।
গড়বড়টা বুঝতে পারার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কারণটাও জেনে গেলেন তিনি। ছেলে মাদকে আসক্ত হয়েছে। এটা আবিষ্কার করে একেবারে ভেঙে পড়লেন সিরাজ মুন্সী। শাপ শাপান্ত করে বউকে তার চৌদ্দগুষ্ঠীর নাম ভুলিয়ে দিলেন। জিনিসপত্র ভেঙে চুরে তছনছ করলেন। এত কিছুর পরেও ছেলেকে তেমন কিছুই বললেন না। তার মত চণ্ডাল মানুষ পর্যন্ত এই একটি ব্যাপারে ধৈর্য ধরলেন। যে ভাবেই হোক, ছেলেকে ফেরাতে হবে এই পথ থেকে। ছেলের বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা বলে জানতে চেষ্টা করলেন, কাদের পাল্লায় পড়ে এই পথে পা বাড়িয়েছে সে। ছেলেকে সংশোধন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করলেন। তিনি যখন মোটামুটি গুছিয়ে আনতে শুরু করেছেন তখনই দুপুরে একদিন পুলিশের ফোন পেলেন। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে হাসপাতালে এসে দেখেন, ছেলে তার অর্ধমৃত হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বিছানার সাদা চাদর।
দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল সিরাজ মুন্সীর। বুকের ভেতরটা একেবারে শূণ্য হয়ে গেল। মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্তেই কী জানি কেন একটা অসহায় ক্ষুব্ধ পিতার যন্ত্রণামাখা মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। খুব...খুব যেন চেনা সেই মুখ। কার মুখ সেটা?
আজ যদি আয়নায় নিজের মুখটা তিনি দেখতে পারতেন, তাহলে হয়তো জানতে পারতেন দু’টি মুখে কতখানি সাদৃশ্য জড়িয়ে আছে।

ফিরে দেখা

সিরাজুল ইসলাম মাস ছয়েক হলো জয়েন করেছেন এই স্কুলে। অংকের শিক্ষক। অংকে মাথা তার বরাবরই ভালো। ভেবেছিলেন ছাত্রদের বোঝাতেও তিনি পারদর্শীই হবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখলেন ব্যাপারটা মোটেও এত সহজ নয়। এইসব গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানো কি আর চাট্টিখানি কথা! তার উপর ক্লাসের মধ্যে হৈ চৈ, চিল্লাপাল্লা। মাথা ধরে যায় তার। নাঃ, বাবা’র কথা শুনে শিক্ষকতা পেশায় আসা মোটেও ঠিক হয়নি তার। ছাত্র পড়ানো তার কাজ নয়। এর চেয়ে কোন অফিসে বসে কলম চালানো অনেক সহজ হতো মনে হয়।
কিন্তু তার পিতা শিক্ষকতার মহান আদর্শে উজ্জীবিত। আর তাছাড়া কেরানীগিরি করে জীবন অতিবাহিত করার মাঝে গৌরব কোথায়?
রাগটা তার বরাবরই বেশি। ছাত্ররা একই জিনিস যখন বারেবারে ভুল করে, হাত একেবারে নিশপিশ করে তার। কেউ তার ক্লাসে বেশি একটা হৈ চৈ করে না এখন। একদিন ক্লাস ক্যাপ্টেন কে ডেকে যা বলার বলে দিয়েছেন। এরপর থেকে ক্যাপ্টেন এতটাই বেশি সচেতন থাকে যে, সিরাজুল ইসলামের ক্লাসে পিন পড়লেও আওয়াজ পাওয়া যায়।
টিচার’স কমনরুমে অন্য শিক্ষকদের মাঝেও ফিসফিসানি। নতুন শিক্ষক বড্ড বদমেজাজি। ইতিমধ্যেই দু’জন শিক্ষকের সাথে টুকটাক ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। কেমন যেন কথায় কথায় ফোঁস করে ওঠার অভ্যাস। ধৈর্য নিয়ে কোন কিছুই বেশিক্ষণ শুনতে পারে না। সবার সাথেই মোড়লবাজি করতে আসে। পুরনো শিক্ষকরা নতুন জুনিয়র শিক্ষকের এমন আচরণে রীতিমত অবাক। এতদিন যাবত চাকরি করছেন তারা। কারও সাথে ন্যূনতম সম্মান বজায় রেখে পর্যন্ত কথা বলে না! সবাই নিজে থেকেই দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন সিরাজুল ইসলামের সাথে।
সেদিন ক্লাস সিক্সের ক্লাস নিচ্ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। তার ক্লাসে ছাত্ররা বলতে গেলে মুখ সেলাই করেই রাখে। কেউ না বুঝলেও কোন প্রশ্ন করার সাহস পায় না। আর মনোযোগ এদিক ওদিক হলে তো কথাই নাই। বোর্ডে অংক লিখে দিয়ে ক্লাস টহল দিতে শুরু করলেন তিনি। এমন সময় নজরে আসলো, এক ছাত্র অংক করা বাদ দিয়ে খাতায় আলপনা আঁকছে। ছাত্রের এই দুঃসাহসে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। নিজের চেয়ারে বসে ছাত্রকে সামনে ডেকে পাঠালেন।
‘এই, তুই কী লিখছিস খাতায়?’
‘স্যার, অংক করছি।’ ছাত্রটি নির্বিকার মুখে জবাব দেয়।
‘যা, খাতা নিয়ে আয়। আমাকে দেখা।’
ছাত্রটি সামনে থেকে সরে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মুখেচোখে ভয়ের লেশমাত্র নাই।
হঠাৎ মাথায় আগুন চড়ে গেল সিরাজুল ইসলামের। ছাত্রের গায়ে হাত তো তুললেনই, কিন্তু তারপর আর কী কী করলেন তা তার নিজেরই মনে নাই। সজ্ঞানে যখন ফিরলেন, দেখলেন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাচ্ছে ছেলেটি। পুরো ক্লাসের সবাই ভীত সন্ত্রস্ত মুখে তাকিয়ে আছে। ক্লাস ক্যাপ্টেন দৌড়ে গিয়ে হেডমাস্টারকে ডেকে নিয়ে আসে।
পানি বহুদূর গড়ায়। ছাত্রটি গরীব। সেজন্যই হয়তো অতিরিক্ত মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়। ছোট মফঃস্বল শহর। দ্রুততর সময়ে খবরটি পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা মানববন্ধন করে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অন্য শিক্ষকেরাও পুরোপুরি বিপক্ষে অবস্থান নেয় সিরাজুল ইসলামের। পুলিশ হাতকড়া লাগানোর আগে একবারের জন্যই সেই ছাত্রের পিতার মুখোমুখি হতে হয় তার। অসহায় দরিদ্র পিতার চোখে সেদিন কোন জিঘাংসা বা প্রতিহিংসা দেখতে পাননি তিনি। তার দৃষ্টির মাঝে ভর করেছিল অসীম শূণ্যতা, প্রিয়জনের অনাকাঙ্ক্ষিত কোন অশুভ আশংকায় ভয়ার্ত কান্না। তার দৃষ্টির সেই অসীম শূণ্যতা একমুহুর্তের জন্য হলেও অস্তিত্বের ভীত ধরে নাড়া দিয়ে যায় সিরাজুল ইসলামের।

সময়ের চক্রবাকে
ক্ষণিকের আবেগে বিবেক হারিয়ে ফেলা রাগের মাশুল ভালোই গুনতে হয় সিরাজুল ইসলামকে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপের জেরে খুব সহজে পার পান না তিনি। চাকরিটা পর্যন্ত খোয়াতে হয়। জেল খাটতে হয় প্রায় তিন মাস। সিরাজুল ইসলামের বাবাকে ছেলের জামিন পেতে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়।
এরপর তিনিই অনেকটা জোর জবরদস্তি করে ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। শান্ত সুশীলা এক মেয়ে দেখে ছেলের বিয়ে দেন, যদি এসবের গুণে হলেও ছেলের আগুনের মত রাগ ঠাণ্ডা হয়। ছেলের ‘মস্ত’ কিছু হওয়ার স্বপ্নটা অবশ্য ততদিনে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম ঢাকায় এসে প্রথম কিছুদিন টো টো কোম্পানির ম্যানেজারগিরি করলেন। এরপর নিজের নামটা এফিডেফিট করে পরিবর্তন করে নিলেন। সিরাজুল ইসলাম থেকে হয়ে গেলেন সিরাজ মুন্সী। মৃত্যুর আগে তার বাবা’র কানে ছেলের এই নাম পরিবর্তনের খবর ঠিকই পৌঁছে গেল। বৃদ্ধ পিতা শুধু একটা কথাই বললেন,
‘কী পাল্টাইতে গিয়্যা কী পাল্টাইলি রে বাপ!’
একসময় একটা ছোটখাট প্রাইভেট স্কুলে চাকরি পেয়ে গেলেন সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজ মুন্সী। অংকে মাথা ভালো, সুতরাং প্রাইভেটে ছাত্র পেতে অসুবিধা হয়নি। রাগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন নাই যদিও, কিন্তু একটা কথা ঠিকঠাক বুঝেছেন তিনি। জীবনে বাঁচতে হলে আর ছাত্রের উপর রাগ দেখানো যাবে না। মেজাজ বেশি খারাপ হলে বাথরুমে ঢুকে মাথায় পানি ঢেলে আসেন।

দেখতে দেখতে দিন গড়িয়ে যায়। স্ত্রী’র সাথে নিত্য খুটখাট বাঁধলেও জীবনের চাকা থেমে থাকে না। সন্তানকে পেয়ে তার মনে হয়, জীবনে যেন তিনি অবশেষে কিছু পেলেন। আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসতে থাকে তার ঘটনাবহুল অতীত। খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া আর তেমন কেউই এখন জানেন না, একসময়ের ‘বাজলা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়’এর অংকের শিক্ষক সিরাজুল ইসলামের কথা।

হঠাৎ আলোর ঝলকানি
সিরাজ মুন্সী বেশিক্ষণ অচেতন থাকতে পারেন না। পুলিশ তাকে সচেতন করে ফেলে। ছেলের দিকে তাকিয়ে তার মাথা সোজা হয়ে থাকতে চাইছে না, তবু তাকে পুলিশের একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিয়ে যেতে হচ্ছে। দু’একজন মিডিয়ার লোকও কোথা থেকে যেন খবর পেয়ে চলে এসেছে। তাদের উপর্যুপরি জিজ্ঞাসাবাদে সিরাজ মুন্সী অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। অসহায় কাতর কণ্ঠে তিনি শুধু বলতে পারেন, তিনি বিচার চান।
কিন্তু বিচারের চেয়েও বড় কিছু তিনি এই মুহুর্তে চান। তার পুত্রের সুস্থতা। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। বিচারের আকুতিকে ছাপিয়ে উদ্গীরিত লাভার মত ফুঁসে ওঠে তার অসহায়, অনাকাঙ্ক্ষিত কোন আশংকায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া পুত্রস্নেহ। তার চোখ জুড়ে নেমে আসে অসীম শূণ্যতা...নিঃসীম অন্ধকার।
হঠাৎ বিদ্যুৎস্ফূলিঙ্গের মত মনে পড়ে যায় কিছু একটা। সেই মুখ...সেই মুখের উপর খোদাই করা একজোড়া চোখ...সেই চোখের শূণ্য চাহনী......তাতে মিশে থাকা অব্যক্ত যন্ত্রণা...।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সিরাজ মুন্সী।
ক্ষণিকের জন্য তার অস্তিত্বের ভীতে নাড়া দিয়ে যাওয়া সেই অব্যক্ত যন্ত্রণাকে, কুড়ি বছর পর অবশেষে আজ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন।।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
    মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ একজন লেখক বা লেখিকার সব লেখাই যে সব সময় একই রকম হবে, তার কি কোন নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি ! সে কারণেই আমি মনে করি, কোন ভাল লেখক বা লেখিকার কোন একটা লেখা যদি আগের লেখাগুলোর মত না হয়, তাহলে তাকে বরং সমালোচনা না করে অনুপ্রেরণা যোগানো যেতে পারে । সেটাই সবচেয়ে ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৬ এপ্রিল, ২০১৬
    • শামীম খান সালাম সানা ভাই । সহমত । এই সাইটে অনেক লেখক লেখিকাকে পেয়েছি যারা সিরিয়াস এবং কমিটেড । আসুন আমরা তাদের উৎসাহ দেই , অনুপ্রেরণা দেই , বাংলা সাহিত্য এগিয়ে যাবে । অল্প দিনের বিচরনে দেখেছি বেশ কয়েকজন হারিয়ে গেলেন , দুঃখ হয় । কোন নেগেটিভ কমেন্ট করতে ( পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করে ) বার্তা দেয়া যেতে পারে । গল্পটি পড়ে আমারও মনে হয়েছে ফাহমিদা এর চেয়ে ভালো লিখেছেন এমন অনেক লেখাই পাওয়া যাবে । তবে সব মিলিয়ে গল্পতিকে অবশ্যই প্রথম কাতারে রাখতে দ্বিধা হবে না । যাই হোক সকল পক্ষকে সাধুবাদ জানাচ্ছি । সবার জন্য শুভ কামনা ।
      প্রত্যুত্তর . ৬ এপ্রিল, ২০১৬
    • ফাহমিদা বারী সানাউল্লাহ্‌ ভাই এবং শামীম ভাই, আপনাদের দু'জনকেই আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। আসলে আমি একটু এক্সপেরিমেণ্ট করার অপচেষ্টা চালিয়েছি। লেখাটাকে একই রকম ভাবে না লিখে কিছুটা অন্যভাবে লেখার চেষ্টা করেছি। পাঠক যখন গঠনমূলক সমালোচনা করেন, সেটা বেশ ভালোই লাগে। আগামীতে আরো ভালো লেখার জন্য একটা কমিটমেন্ট চলে আসে। কিন্তু সমালোচনার নামে লেখককে তীর্যক ভাষায় আঘাত করাটা ধৃষ্টতা এবং অপরাধ। েটা থেকে বোধকরি আমাদের সকলেরই বিরত থাকা উচিত।
      প্রত্যুত্তর . ৬ এপ্রিল, ২০১৬
  • সেলিনা ইসলাম
    সেলিনা ইসলাম আমরা আসলে যতক্ষণ নিজে কারো জায়গায় এসে না দাঁড়াই,ততক্ষণ পর্যন্ত অনুধাবন করতে পারিনা তার অক্ষমতা অথবা দুর্বলতা আসলে ছিল কোথায়! অন্যের বেলায় খুব সহজেই যা কিছু তাই ভেবে নেয়া যায়। আর নিজের বেলায় পুতুপুতু-এমনই দেখা যায় আজকাল বাস্তবে। আমাদের সমাজের চিত্র এটি...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৬ এপ্রিল, ২০১৬
    • ফাহমিদা বারী আপু বাঁচালেন। আমি তো একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলাম। যাক, সমালোচনাকে হজম করারও দক্ষতা থাকা জরুরি।আগামীতে এ ব্যাপারে আরো চেষ্টা থাকবে ইনশাল্লাহ্‌।
      প্রত্যুত্তর . ৬ এপ্রিল, ২০১৬
  • সালমা সিদ্দিকা
    সালমা সিদ্দিকা একটু অন্যরকম গল্প। ভালো লেগেছে। তবে আপু, মনে হয়েছে ঘটনার বর্ণনা একটু বেশি। আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব কিনা জানি না। চেষ্টা করি। আপনি যেমন এক সকালে সিরাজ মুন্সির তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার কথা বললেন তারপর আবার সেখান থেকে ঘটনার বর্ণনায় চলে গেলেন। সিরাজ মুন্সির ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৭ এপ্রিল, ২০১৬
    • ফাহমিদা বারী আমার 'বিতর্কিত' লেখাটি পড়ার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ সালমা। তোমার গঠনমূলক সমালোচনাকে আমি সবসময়ই বিশেষ চোখে দেখি। তাই তোমার এত ফর্মালিটির প্রয়োজন নেই। আমি আসলে বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছো। বলতে পারো, এই লেখাটি আমার একটা এক্সপেরিমেন্ট। ঠিক একই ধাঁচের লেখা থেকে খানিকটা বেরিয়ে আসতে চেয়েছি। সাধারণত যেভাবে লিখে থাকি তা থেকে আর কী! তোমার পয়েন্ট টা ঠিক আছে। কিন্তু মনে হয়, গল্পের ধারাবাহিকতা এতে তেমন একটা ক্ষুন্ন হয় না। এটা আমার দূর্বল আত্মপক্ষ সমর্থন। তবে ইনশাল্লাহ সামনে আমি আরো এ জাতীয় এক্সপেরিমেন্ট চালাবো। কানে তুলো আর পিঠে কুলো বেঁধে নিচ্ছি। হা হা।
      প্রত্যুত্তর . ৭ এপ্রিল, ২০১৬
  • রুহুল  আমীন রাজু
    রুহুল আমীন রাজু গল্পের বাঁক পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে ..... আমার বেশ লেগছে. ফাহমিদা আপুকে অনেক শুভেচ্ছা.
    প্রত্যুত্তর . ৭ এপ্রিল, ২০১৬
  • মোজাম্মেল  কবির
    মোজাম্মেল কবির গল্পটি আমাদের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়ে উপন্যাস লেখার মতো একটি প্লট এর সংক্ষেপিত রুপ। শুভ কামনা ও ভোট রইলো। ভালো থাকুন আপা।
    প্রত্যুত্তর . ১০ এপ্রিল, ২০১৬
  • মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন
    মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন ...আজ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন...। এমনই হয়, কারো আগে আর কারো প্রে> ভাল লিখেছেন। শুভেচ্ছা রইল।
    প্রত্যুত্তর . ১২ এপ্রিল, ২০১৬
  • ইমরানুল হক বেলাল
    ইমরানুল হক বেলাল অসাধারণ একটি গল্প।
    ভালো লেগেছে•••।
    প্রত্যুত্তর . ১৫ এপ্রিল, ২০১৬
  • মোহাঃ ফখরুল আলম
    মোহাঃ ফখরুল আলম ভাল হয়েছে। ভোট পাবেন। আমার কবিতা পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১৬
  • রেজওয়ানা আলী তনিমা
    রেজওয়ানা আলী তনিমা একেবারেই অন্যরকম একটি গল্প। হৃদয়ঘটিত জটিলতা নিয়ে লেখনির ছড়াছড়িতে এরকম গল্পের আকাঙ্খা সবসময়েই থাকে। ধন্যবাদ আপু।
    প্রত্যুত্তর . ২৭ এপ্রিল, ২০১৬
  • madhobi  lota
    madhobi lota anek valo laglo.
    প্রত্যুত্তর . ২৮ এপ্রিল, ২০১৬

advertisement