দুপুরের দিকে জাহানারার আর কিছু করার থাকেনা। ছেলে মেয়েরা সব ঙ্কুল কলেজে, স্বামী মনসুর আলি মাঝে মাঝে এসে দুপুরে ভাত খেয়ে যান। খেয়ে দেয়ে ফিরে গেলেই জাহানারার অলস প্রহর শুরু হয়।সারাদিনে বলতে গেলে এটুকুই জাহানারার নিজস্ব সময়।
জাহানারা সবসময় রান্না বান্না আগেইসেরে নেন যাতে দুপুরের পর এসময়টা ফাকা পাওয়া যায়। টেলিভিশন নষ্ট হয়ে গেছে দুবছর হয়ে গেছে। আর ঠিক করা হয়নি। জাহানারার বিনোদনের মাধ্যম বলতে আছে শুধুএকটা পুরোনো রেডিও। আজকাল অনেক গুলো এফএম ব্যান্ড চালু হয়েছে। সেখানে অনেক আধুনিক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে চৌকস ভঙ্গিতে কথা বলে। জাহানারা মুগ্ধ বিষ্ময়ে শুনে যান।
বাবা মা মারা যাবার পর বাবার বাড়ির সাথে সম্পর্ক‍ শেষ হয়ে গেছে। স্বামী মনসুর আলি স্কুলে পড়ান। প্রায়ঃই ব্যস্ত থাকেন। বিয়ের পর দুই একবার শ্বশুরবাড়ী যাওয়া ছাড়া আর কখন ও কোথাও নিয়ে যাননি। জাহানারার কোথাও যাবার জায়গা ও নেই। পুরোনো রেডিওটার দ্বারাই বাইরের জগতের সাথে যা একটু যোগাযোগ।
কয়দিন ধরে সাঙ্ঘতিক গরম পড়েছে।দুপুরের দিকে টিনের চালের ঘরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে। জাহানারা শোওয়ার ঘরের মেঝেতে শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনছিলেন। এমন সময় পাশের বাড়ির হিন্দু বউটি এল।
জাহানারারা যে পাড়ায় থাকেন সেখানে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস। দীর্ঘ দিন এদের সাথে থেকে জাহানারার ও কিছু হিন্দু আচার আচরন রপ্ত হয়ে গেছে।
এই বউটি এখানে নতুন ভাড়া এসেছে। বিয়ে হয়েছে প্রায় দুতিন বছর হয়েছে। ছেলেমেয়ে এখনো হয়নি। জাহানারার সন্দেহ মেয়েটি বাজা।
বউটির নাম সুশীলা, মিশুক প্রকৃতির, কথা বলতে পছন্দ করে। প্রায়ই এসে জাহানারার খোজ খবর নেয়।
- মাসীমা আংকেলের সাথে কথা হয়েছে?
জাহানারা একটু অপ্রস্তুত বোধ করলন। সুশীলা পাড়ার কোন এক বাড়ীতে শেলাই শেখে। অনেকদিন ধরে জাহানারাকে বলছে যাতে ওদের সাথে যোগ দেয়। জাহানারা শেষবার বলেছিলেন, মনসুর সাহেবের সাথে কথা বলে জানাবেন কারন মাসপ্রতি তিনশো টাকা বেতন দেবার ব্যপার আছে। কিন্তু মনসুর সাহেব এতোই ব্যস্ত থাকেন যে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।
সুশীলা খুব চটপটে ধরনের। জাহানারার মুখ দেখেই ব্যপারটা বুঝে গেল... জিজ্ঞেস করেননিতো, তাইনা! কোন সমস্যা নাই। মাস্টার সাহেবকে বলে আমি আপনার বেতন মওকুফ করে দেব। চলেন চলেন….।

দী্র্ঘ দিন ধরে কেউ জাহানারার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন মূল্য দেয়নি। বলতে গেলে সারাজীবন ধরেই তিনি অন্যের ইচ্ছেতে পরিচালিত হয়েছেন। মনসুর আলি যে সব তার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন ঠিক তা নয়। তবে তিনি কোন ব্যাপারে জাহানারার মতামত ও নেননা। কোন ব্যাপারে অমত থাকলে সেটা প্রকাশের ভাষা জাহানারার জানা নেই। ব্যক্তিত্ত সম্ভবত একেই বলে।
জাহানারা সুশীলার চাপাচাপিতে আর কিছু বলতে পারলেননা। তিনটা বেজে গেছে। ছেলে বিল্টু, মেয়ে রুমা...সবাই ফিরতে ফিরতে পাঁচটা বেজে যাবে।স্বামী মনসুর আলি টিউশনি সেরে ফিরবেন আটটার পর।
জাহানারা ভেবেছিলেন সেলাই কোন টেইলর দোকানে শেখানো হয়। কিন্তু সুশীলা তাকে নিয়ে গেল একটা মধ্যবিত্ত বাড়ীর ড্রইং রুমে। মেঝেতে পাটি বিছিয়ে দশবারোজন বসেছে। এদের মধ্যে বেশীরভাগই মধ্য বয়স্কা, দুএকজন স্কুল কলেজের ছাত্রী ও আছে। জাহানারা ভেবেছিলেন মাস্টার সাহেব বয়স্ক কোন লোক হবে। কিন্তু এখানে যে বসে আছে তার বয়স বড়জোর পঁচিশ ছাব্বি শ হবে। সুশ্রী চেহারা,মুখটা একটু গম্ভীর ধরনের। এতোগুলো মেয়ের মাঝে একটা কমবয়সী ছোকরা, সংস্কারবশঃত জাহানারার ভ্রু একটু কুচকে যায়।
সেলাই মাস্টারের নাম স্বকপন। জাহানারাকে একটু খাতির ও করলো। সিরিয়াস ভঙ্গিতে অনেক কিছু করে দেখাল। সূচীকর্মে জাহানারার দৌড় বড়জোর ছেড়া বোতাম সেলাই পর্যন্ত। জাহানারা তেমন কিছুই বুঝতে পারলেননা। কিন্তু ছেলেটা এতো আগ্রহ করে শেখাচ্ছে...জাহানারা এমন ভাবে মাথা নাড়লেন যেন তিনি সব বুঝতে পেরেছেন। সেলাই মাস্টারের কি একটা কাজ থাকায় আধ ঘন্টার মধ্যেই ছুটি হয়ে গেল। জাহানারা কিছুই শিখতে পারেননি।
দুশ্চিন্তা হচ্ছিল বাসায় তালা দিয়ে এসেছেন। মাঝে মাঝে ছেলে বিল্টু আগেভাগেই চেল আসে। ইদানিং পাড়ার দুই একটা বাড়িতে চুরি ডাকাতি ও হচ্ছে।
দুশ্চিন্তায় জাহানারার গলা শুকিয়ে গেল। সবিকছু ঝাপসা দেখতে লাগলেন। এরকম উদ্বেকজনক পরিস্থিতিতে ও একটা ব্যাপার জাহানারার নজর এড়ালনা। স্বপন সিরিয়াস ভঙ্গিতেই সেলাই শেখাচ্ছিল, সুশীলার দিকে আলাদা ভাবে নজর ও দেয়নি। কিন্তু নারী পুরুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের একটা বিশেষ উত্তাপ আছে, স্বপনের একঝলক চাহনি কিংবা সুশীলার আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে যা টের পাওয়া যায়।
সুশীলার স্বামীকে জাহানারা দুএকবার দেখেছেন। কেমন যেন রাগী রাগী চেহারা, স্বপন নামটা হিন্দু মুসলমান দুটাই হতে পারে। জাহানারাকে সে খালাম্মা বলে ডেকেছে, কিন্তু তাতে কিছুই বোঝা যায়না।
যেকোন পরকীয়া সম্পর্ক চাক্ষুষ করার মধ্যে একধরনের উত্তেজনা আছে। জাহানারার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।



মনসুর সাহেব গরুর মাংস খেতে খুব পছন্দ করেন। সপ্তাহে অন্তত শুক্রবার তিনি মাংস কেনার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইদানিং মাংসের দাম আড়াইশো টাকা হয়ে যাওয়ায় মাসের শেষ শুক্রবার গুলোতে সস্তার মাছ কিংবা ডিম দিয়ে চালাতে হচ্ছে। আজ মাসের উনত্রিশ তারিখ। মনসুর সাহেব পরীক্ষার খাতা কাটা উপলক্ষে বাড়তি কিছু টাকা পেয়েছেন, সে সুবাদে দুপুরে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। ডিজিটাল সময় অনুযায়ী জুমআ’র নামাজ শেষ করে শুক্রবার দুপুরের খাবার খেতে খেতে তিনটা চারটা বেজে যায়।
মনসুর সাহেব সপ্তাহের ছয়দিন ই অসুরের মত খাটেন। কিন্তু শুক্রবার তিনি কোন টিউশনি রাখেননি। এদিন তিনি মনের সুখ মিটিয়ে আলস্য করেন।
গতকাল রাত এগারটার দিকে সুশীলার স্বামী অলক এসেছিল, উদ্ভ্রান্ত চেহারায়। সুশীলাকে নাকি খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। ভেতরের ঘরে হতভম্ব হয়ে শুনছিলেন জাহানারা।
জাহানারার কাছে সুশীলা প্রায়:ই আসতো, তাই অলক জাহানারার সাথে কথা বলতে চায়। জাহানারা বুঝেছিলেন স্বপনের কথা এখনো কেউ জানেনা। কোনরকমে ড্রইং রুমে এসে অলককে জানালেন যে তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেননা। অলক কোন এক ওষুধ কোম্পানীতে মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভের কাজ করে। গরীবের ছেলে, কষ্ট করে নাকি বড় হয়েছে। চেহারাটা রাগী ধরনের হলে ও জাহানারার কাছে ভালো মানুষ ই মনে হয়েছে।
সেই থেকে জাহানারা রক্তহীন মুখে ঘুরে বেরাচ্ছেন, যেন সুশীলা পালিয়ে যাবার জন্য তিনি নিজেই দায়ী। মাংসে লবন একটু বেশী দিয়ে দিলেন, যদিও কেউ কোন অভিযোগ করলোনা।
জাহানারার অস্বাভাবিক চালচলন কেউই খেয়াল করলোনা। কেউ কখনো করেওনি। স্বামী মনসুর সাহেব নিরাবেগ ধরনের মানুষ, কথা কম বলেন। ছেলে বিল্টু বয়ো:সন্ধিতে পড়েছে, বাইরের দুনিয়াই তাকে বেশী টানে। আর মেয়ে রুমার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, গায়ের কালো রং আর উচুঁ দাতের জন্য সে সম্ভাবনা ও কম, একারনেই হয়তো মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে, কারো সাথে মিশতে চায়না। জাহানারা অনুভব করেন সংসারে যে তার একটা অবদান আছে সেটা কেউ কখনো স্বীকার করেনি।
বিকেলের দিকে স্বামী ঘুমাচ্ছেন দেখে জাহানারা ভল্যুয়ম কমিয়ে দিয়ে রেডিও চালু করলেন। কিন্তু পুরোনো রেডিও তে ঘড়ঘড় শব্দ তো হবেই। শব্দ শুনে মনসুর সাহেব পাশ ফিরলেন। জাহানারা ভাবছিলেন রেডিও বন্ধ করবেন কিনা, কিন্তু মনসুর সাহেব চোখের ইশারায় মানা করলেন।
রেডিও তে তুমুল বির্তক হচ্ছে। বির্তকের বিষয় বদলে যাও, বদলে দাও। র্তকবাগীশ ছেলেটা বিভিন্ন তথ্য প্রমান উপস্থাপন করে বলছে, এই পচাঁ গলা সমাজ ব্যবস্থা আমাদের কিছুই দিতে পারবেনা, সবকিছু একদম গোড়া থেকে বদলে দিতে হবে। মেয়েটা বলছে পরির্বতনের দরকার আছে, তারমানে এই নয় যে যা কিছু পুরানো সব ছুড়ে ফেলতে হবে।
শ্রোতারা এসএমএসের মাধ্যমে তাদের মতামত জানাচ্ছেন। উত্তেজনা চরম রুপ ধারন করেছে। এরমধ্যে এক আধুসিক কবির কবিতা নিয়ে উত্তেজনা চরম রুপ ধারন করলো। কবির কবিতার নাম “Marriage …Form of Legal Prostitution”। তিনি বলতে চান- যে বিয়েতে মতের অমিল হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে স্বামীর সাথে থাকতে হচ্ছে, শয্যাশঙ্গীনি হতে হচ্ছে, সেটা একধরনের বেশ্যাবৃত্তি। স্বামী যদি লম্পট, সমাজবিরোধী, ঘুষখোর ও হয়, স্ত্রীকে তা মেনে নিতে হবে।
অনুস্ঠান একসময় শেষ হয়। জাহানারা-মনসুর আলি মুখোমুখি এক শব্দহীন পরিবেশে বসে থাকেন। মনসুর আলির চোখের ভারী চশমার কারনে জাহানারা তার অভিব্যক্তি বুঝতে পারেননা। অনেকটা নিজের অজান্তেই জাহানারা বলে উঠেন- ঠিকই তো, শুধু সমাজের রীতিনীতির কারনে কাউকে ভালো না লাগলেও তার সাথে সারাজীবন থাকতে হবে কেনো?
মনসুর আলি সরাসরি দ্বিমত করলেননা- তোমার কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজ নয়। স্বামী যদি লম্পট, চরিত্রহীন হয় তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যা কিছু প্রাচীন তার সবকিছু উড়িয়ে দেবার যে প্রবনতা সেটাও ঠিকনা। দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য বিয়ের মত প্রাচীন একটা সামাজিক ব্যবস্থাকে তুমি legal prostitution বলতে পারোনা।
জাহানারা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খান। মনসুর আলির চোখ তার চশমার আড়ালে ঢাকা পড়েছে। কিন্তু জাহানারার মনে হল মনসুর আলি তার ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।
সুশীলার ব্যাপারটা তুমি জানতে.... তাইনা! দেখো, বদলে দেওয়া আর ভেঙ্গে ফেলা এক জিনিষ না, আমি হয়তো তোমাকে সুখ স্বস্তি কিছুই দিতে পারিনি....কিন্তু তার জন্য তুমি যদি আমাকে আগেই ছেড়ে যেতে তাহলে তো আর....
মনসুর আলি হঠাত নাটকীয়ভাবে চুপ করে যান। জাহানারা চোখ ফেটে জল আসতে চায়। মহাসমুদ্রে একাকী দিকভ্রান্ত নাবিক দুরের একেচিলতে ডাঙ্গা দেখে মুহূর্তেই জীবনের সন্জীবনি রসে পরিপূর্ন হয়ে উঠেন। কিন্চিত পূর্বের পৃথিবীর সবচেয়ে নৈরাশ্যবাদী ব্যক্তিটি মুহূর্তেই পৃথিবীর সবচেয়ে আশাবাদী মানুষে পরিনত হন। তেমনি খুব ছোট স্বপ্ন কিংবা স্বীকৃতি সংসারের যাতাকলে পিষ্ট মানুষকে বাঁচিঁয়ে রাখে....খুলে দেয় বন্ধ দরজা।