লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ জুলাই ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবিজয় (ডিসেম্বর ২০১৪)

বিনিময়ে
বিজয়

সংখ্যা

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২৪

হাফিজ রাজু

comment ১৮  favorite ০  import_contacts ১,০৫৩

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ দেশের সৌন্দর্য ভরা জেলা হবিগঞ্জ। পাহার ঘেরা এ জেলার সবুজ-গাও থানার কিষাণ-নগর গ্রাম। শিক্ষিতের হার খুবই কম এ গ্রামে। সেই গ্রামের ”কিষাণ-নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়” এর প্রধান শিক্ষক মোঃ ফয়েজ মিয়া, বয়স প্রায় ষাট। লোকে তাকে ফয়েজ মাষ্টার বলে ডাকে, কেউ কেউ আবার ফজু মাষ্টার বলেও ডাকে। নিজ বাড়ী এ গ্রামেই, গ্রামের অনেক সম্মানি ব্যাক্তি তিনি। পরিবার নিয়ে খুব সুখেই বাস করছেন। পরিবারে রয়েছে তার সহধর্মিণী ফিরোজা বেগম, দুই ছেলে আজগর মিয়া ও সবুজ মিয়া¬ এবং সবার ছোট মেয়ে ফারজানা আক্তার, সবার ছোট বলে ফারজানা আদর একটু বেশিই পেত, ভাইদের যেন চোখের মনি ফারজানা। বড় ছেলে আজগর এর পড়াশোনায় তেমন মন ছিলনা, তাই নিজে মাষ্টার হয়েও বড় ছেলেকে বেশিদূর পড়াতে পারেননি। ছোট ছেলে সবুজ শহরের কলেজ থেকে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে, তার ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা করার।এখন সেই চেষ্টাই করছে সবুজ। আর একমাত্র মেয়ে ফারজানার মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। ফারজানাও অনেক ভাল ছাত্রি। দেশের অবস্থা এখন ভাল না, পূর্ব পাকিস্তান এর কোন দাবিই মেনে নিচ্ছে না পশ্চিম পাকিস্তানিরা। যে কোন সময় দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে, তাই মাধ্যমিক পরীক্ষা কিছুটা আগে শুরু হয়ে গেছে।

দেখতে দেখতে ফারজানার পরীক্ষা শেষ হয়ে এলো, সবুজও একদিন হাসি মুখে বাড়ি ফিরে সবাইকে খুশির খবর জানাল। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে র্ভতির সুযোগ পেয়েছে। খুব শিগরিই সবুজকে ঢাকা চলে যেতে হবে। এদিকে বড় ছেলে আজগর বাড়িতেই থাকে, জমিজমা দেখাশোনা করে। আজগরকে নিয়ে ফজু মাষ্টার সবসময় খুব চিন্তিত থাকে, কারন তার চলাফেরা ভাল লোকদের সাথে নয়। কিছুদিনের মধ্যেই সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছে, বছরের শুরুতেই ক্লাস চলছে পুরোদমে। এদিকে দেশ ধীরে ধীরে উত্তাল হয়ে উঠছে। ৭ই র্মাচ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এদেশের আপামর জনতার রক্তের উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। এদেশের সারে সাত কোটি মানুষ এখন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে প্রস্তুত।

হটাতই ২৫শে র্মাচ রাতে পাকিস্তানিদের হামলা, হাজার হাজার নিরস্র জনতাকে হত্যা করেছে হায়েনারা। শেখ মুজিব সহ আরো অনেকে গ্রেফতার। বাঙ্গালীরাও থেমে নেই, পাল্টা জবাব দিতে যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পাকিস্তানিরা আস্তে আস্তে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বাঙ্গালিরাও পিছিয়ে নেই, যে যার মত করে যুদ্ধে নেমেছে।
সবুজ প্রথম বর্ষের ছাত্র, মাত্র কয়দিন হল ক্লাস শুরু হয়েছে, এরই মধ্যে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হলের প্রায় সবাই যুদ্ধে যাচ্ছে, সবুজ ঠিক করল সেও যুদ্ধে যাবে। কিন্তু সে চিন্তা করতে লাগল- বাবাকে যদি এখন জানাই বাবা হয়ত আমাকে যুদ্ধে যেতে দেবেনা, থাক এখন আর বলবনা, কয়দিন পর চিঠি দিয়ে জানাব। এই বলে সবুজ তার বন্ধুদের সাথে যুদ্ধে চলে গেল। এদিকে ফয়েজ মাষ্টার খুব চিন্তিত, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল কিন্তু এখনও সবুজের কোন খবর পাচ্ছে না। কোন চিঠিও দিচ্ছে না।

গ্রামের মাতব্বর করিম শেখ, তার কথায় গ্রামের সাধারণ মানুষ উঠবস করে। এক কথায় এই করিম শেখ কিষাণ-নগর গ্রামের হর্তাকর্তা। এ গ্রামেও পাকিস্তানিরা ঢুকে পড়েছে, অবশ্য করিম শেখ এক প্রকার নিমন্ত্রণ করেই যেন তাদেরকে এ গ্রামে ডেকে এনেছে। এখন সব রকম তথ্য দিয়েও সহায়তা করছে করিম শেখ। গ্রামের মানুষদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার দলে ভেড়াচ্ছে সে। ফয়েজ মাষ্টার এর বড় ছেলে আজগরকেও পটিয়েছে সে, এখন আজগর করিম শেখ আর পাকিস্তানিদের দলে। আজগর এখন বাড়িতেও নিয়মিত যায়না, পাকিস্তানিদের সাথে থাকতে নাকি তার অনেক ভাল লাগে, তাই প্রায়ই তাদের ক্যম্পেই থাকে আজগর। ফজু মাষ্টার এ নিয়ে বেশ চিন্তিত, আজগরকে এখন ছেলে বলে মানতেই নারাজ। এ নিয়ে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয় পরিবারে। কারও কথাই শুনতে চায়না আজগর। সারা জীবন সবাইকে আদর্শের শিক্ষা দিয়ে, দেশপ্রেম এর শিক্ষা দিয়ে এখন নিজের ছেলেই রাজাকার এর খাতায় নাম লিখিয়েছে, এ যে কত কষ্টের তা একমাত্র মাষ্টারই বলতে পারবে। আর ছোট ছেলে সবুজের তো কোন খবরই পাচ্ছেন না তিনি। ২-৩ টা চিঠিও দিয়েছেন হলের ঠিকানায় কিন্তু কোন উত্তর মিলছেনা, মিলবেই বা কি করে সবুজ তো আর হলে নেই। সবুজ এখন কুমিল্লা এলাকায়, পাকিস্তানিদের বিরোদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করছে।

ছেলে রাজাকার, এজন্য পাকিস্তানিরা কোন ক্ষতি করছেনা মাষ্টার পরিবারের। কিন্তু এমন লজ্জা আর অপমান নিয়ে এ গ্রামে আর থাকতে রাজি নন ফজু মাষ্টার। সবাই কেমন জানি আঙ্গুল দিয়ে কথা বলে- ”ওই যে দেখ রাজাকারের বাপ যাইতাছে”। তাই মাষ্টার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে ফারজানাকে নিয়ে গ্রাম ছাড়বেন তিনি। কোন আত্মীয়ের বাড়িতে যাবেন না, তার এক বন্ধুর বাড়িতে উঠবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার দূর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গণি, তিনি আখাউড়া পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাষ্টার। ছেলে মেয়ে নেই, স্বামী স্ত্রী দুজনই তাদের সংসারে। আব্দুল গণি ফয়েজ মাষ্টার এর কলেজ জীবনের বন্ধু, একে অপরের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক। তিনি একা একাই মাঝে মাঝে আসতেন তার বন্ধুর বাড়িতে। হটাৎ একদিন ফজু মাষ্টার তার পরিবার নিয়ে দূর্গাপুর এর আব্দুল গণি সাহেবের বাড়িতে হাজির। ফয়েজ মাষ্টার এর আগেও বহু বার এখানে এসেছেন, কিন্তু এবারের আসাটা যেন একটু ভিন্ন। এ গ্রামে এখনো পাকিস্তানিরা আসেনি, তবে আখাউড়া শহরে আসতে শুরু করেছে। এদিকে সবুজ কুমিল্লা এলাকা থেকে তার বাড়ির ঠিকানায় পরপর কয়েকটি চিঠি দিয়েছে, তার বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধে যাবার কথা জানিয়ে। কিন্তু মাষ্টার তখন তার বন্ধুর বাড়িতে, তাই কোন চিঠি পাননি তিনি। চিঠির উত্তর না পাওয়ায় সবুজও খুব চিন্তিত, আবার ভাবছে এতদিন বাবাকে না বলায় হয়ত রাগ করেছে।
এদিকে কিষাণ-নগর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলেছে। পাকিস্তানিরা পালাতে শুরু করেছে। একদিন গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা একটি বড় অপারেশন চালালো, এই অপারেশনে করিম শেখ সহ বহু পাকিস্তানি নিহত হয়েছে, ফজু মাষ্টার এর বড় ছেলে আজগর রাজাকার এবং কয়েকজন শুধু পালাতে পেরেছিল। কিষাণ-নগর গ্রাম এখন মুক্ত। আজগর এবং তার সঙ্গীরা পালিয়ে আখাউড়া এসে উঠেছে। মৃত্যুর মুখ থেকে তারা বেচে এসেছে। তারপরেও তাদের শিক্ষা হয়নি, আখাউড়া এসেই আবার পাকিস্তানিদের সাথে যোগ দিয়েছে। আজগর এবার কমান্ডার পর্যায়ের রাজাকার। সে মূলত ক্যাম্পেই থাকে, বিশেষ কোন কাজ ছাড়া বের হয়না। অন্যরা তার কাছে খোজ খবর এনে দেয়। ফজু মাষ্টার এবং আজগর পাশাপাশি গ্রামে থাকলেও কেউ কারো খবর জানেনা। ফজু মাষ্টার এবং আব্দুল গণি সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করছে, থাকার জায়গা দিচ্ছে, খাবার দিচ্ছে। রাজাকারের এক গোয়েন্দা একদিন এই খবর জেনে গেল, সেদিনই সে ক্যাম্পে গিয়ে হাজির-

:- সালাম আজগর সাব, একটা তাজা খবর আছে।
:- তাই নাকি! কি খবর তাড়াতাড়ি বল।
:- দূর্গাপুর গেরামের এক পোস্টমাস্টার তো সব শেষ কইরা দিল, মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার যায়গা দেয়, খাওন দেয়, এইডা তো মাইনা লওন যায়না।
:- কি কও এইসব, হাছা কইতাছো তো?
:- জ্বি সাব, আমি নিজ চোখে দেইখা আইছি।
:- তাইলে তো মেজর সাবরে কওন লাগে, তুমি লগে যাইবা, বাড়ির সবাইরে উডাইয়া ক্যাম্পে লইয়া আইবা, ক্যাম্পে আইনা খতম কইরা দিবা।
:- জ্বি সাব, আমি যাইতাছি, আপনি মেজর সাবরে কন, আমি বাইরে আছি।

আজগর মেজরকে বললে, মেজর বিপুল সৈন্য নিয়ে পোষ্ট মাষ্টার গণি সাহেবের বাড়িতে গিয়ে হাজির। ফজু মাষ্টারের পরিবার এবং গণি সাহেবের পরিবারের সবাইকেই গাড়িতে করে আখাউড়া ক্যাম্পে নিয়ে আসল পাকিস্তানিরা। আজগর তখনো ক্যাম্পের একটা রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে।
:- আজগর সাব, ওই বাড়িতে মোট পাঁচজন ছিল, সবাইরে নিয়া আইছি, চলেন বাইরে চলেন, আপনিই তাদেরকে শাস্তি দেন।
:- নাহ! আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগতেছে, কিছু ভালো লাগতাছেনা। মেজর সাবরে বলো সবগুলারে যেন খতম কইরা দেয়।
:- জ্বি সাব যাইতাছি, তয় আরেকটা কথা, তাগো লগে একটা যোয়ান মাইয়াও আছে, খুব সুন্দরী।
এই কথা শুনে আজগর একটু নড়ে চড়ে বসল।
:- তাই নাকি? তাহলে তো একটু বাজিয়ে দেখতে হয়। মাইয়াডারে পশ্চিমের রুমটায় নিয়া রাখো, বাকি-গুলারে খতম কইরা দেও। তাড়াতাড়ি যাও সন্ধ্যা হয়ে এলো আবার।
:- জ্বি আচ্ছা, যাইতাছি।
আজগর তখনো জানেনা সে কাকে মারার হুকুম দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চারটা গোলীর শব্দ শুনতে পেল আজগর। শব্দগুলো যেন তার বুক ছেদ করে গেল।

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেল। এদিকে আজগরও ক্লান্তি মুছে হটাৎ মনে করল পশ্চিমের রুমে আটকে রাখা মেয়েটির কথা। মনে মনে ভাবল সে এখন প্রস্তুত ঐ রুমে যাওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে পশ্চিমের রুমের দিকে এগোতে লাগল আজগর। এদিকে নিজ চোখের সামনে বাবা মা কে প্রাণ দিতে দেখে ফারজানা যেন ভয়ে বোবা হয়ে গেছে। তার উপর আবার তার সাথে যে কি হয় সে চিন্তায় ফারজানা ভীত শঙ্কিত। রুমের চৌকির এক কোনায় মাথা নিচু করে উল্টো দিকে বসে কাঁদতেছে ফারজানা। ভয়ে যেন জমে গেছে সে। এমন সময় রুমে প্রবেশ করল আজগর, ফারজানা বুঝতে পারল রুমে কেউ একজন প্রবেশ করেছে। ফারজানা শঙ্কিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল-
:- আমারে ছাইড়া দেন, আল্লার দোহাই লাগে আমারে যাইতে দেন।
:- হহহহ যাইতে দিমু, তোমারে কিচ্ছু করমুনা, তুমি আমারে খুসি করো!!
:- ছ্বি ছ্বি !! এইসব কি বলেন, আমারে ছাইড়া দেন।
:- দিমু দিমু, আগে তুমি এই দিকে একটু তাকাও, তোমারে একটু দেহি।
ফারজানা কিছুতেই চৌকির কোনা থেকে মাথা তুলছে না। আজগর একটু জোর করেই যেন হাত বাড়িয়ে ফারজানাকে তার দিকে ফিরালো। আর তখনই যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল আজগর ও ফারজানার মাথায়।
:- ফারজানা তুই!! তুই এইহানে কেমনে আইলি?
:- ভাইজান তুমি!! ছ্বি ভাইজান ছ্বি ! আমার কেন মরণ হইল-না,
আজগর এর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এলো, এটা কি করল আজগর।
:- বইন তুই আমারে মাফ কইরা দে, আমি অনেক বড় ভুল কইরা ফালাইছি।
:- আমি এই মুখ আর কাউরে দেখাতে চাইনা, আমি বাচতে চাইনা।
এই বলে ফারজানা আজগর এর কোমরে গাথা ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে নিজের তলপেটে বসিয়ে দিল। আজগর তাকে আটকানোর সুযোগও পেলোনা। মূহুর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ফারজানা। আজগর কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল-
:- এইডা তুই কি করলি বইন, আমারে মাফ কইরা দে। বাবা মা, বাবা মা কই?
ফারজানা কিছু বলতে পারছে না, ছোট্ট করে শুধু ”বাইরে” বলেই চিরদিনের মত ঘুমিয়ে পড়ল ফারজানা। আজগর চিৎকার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো, এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। বাইরের বাতির আলোয় একপাশে দেখতে পেলো চারটি লাশ পড়ে আছে, আজগর সেদিকে দৌরে গেল। দেখতে পেল দুটি অজানা লাশের পাশে তার বাবা আর মায়ের লাশ পড়ে আছে, কাছে গিয়েই আজগর হাও মাও করে কাঁদতে শুরু করল। নিজের এই অপরাধ নিজেই ক্ষমা করতে পারছেনা আজগর। এটা কি করল সে, নিজের বাবা মাকেই মেরে ফেলল, তাই দৌরে ছুটে গেল বারান্দায় দাড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যের কাছে। তার কাছ থেকে রাইফেলটা নিয়ে নিজের থুতনিতে লাগিয়ে ফায়ার করে দিল আজগর। চোখের পলকেই নিঃস্বাশ বন্ধ হয়ে গেল আজগর এর। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত নিজের জীবন দিয়ে করল সে। কিন্তু যা ঘটে গেছে তা কি কখনো ফিরে পাবার?

দেখতে দেখতে নয় মাস পার হয়ে গেল এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে এই যুদ্ধে। অবশেষে সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বার প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে শুরু করেছে। দেশের আনাচে কানাচে থেকে আসছে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের খবর। শেষমেশ ১৬ই ডিসেম্বর সারা দেশে এক সাথে বিপ্লব ঘটে। বাংলার আকাশে উড়ে লাল সবুজের পতাকা। নয় মাসের সকল কষ্ট যেন এ নিমিষেই ভুলে গেল এ বিজয়ী জাতি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ১০-১২ দিন পর বাড়ি ফিরল সবুজ। মাথায় লাল সবুজের পতাকা বাধা, হাতে ছোট একটি ব্যাগ ও হাসি মুখ। গ্রামে ঢুকতেই সবাই কেমন যেন কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে সবুজের দিকে। কেউ কিছু বলছেনা, সবাই নীরব। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে সবুজ যেন আরও বিস্মিত, ঘরে তালা ঝুলছে, উঠোন দেখে মনে হচ্ছে এ বাড়িতে বছর যাবত কেউ থাকেনা। প্রতিবেশীরা কেউ বলতে পারেনা মাষ্টার পরিবার কোথায়। বলবেই বা কি কেও, মাষ্টার সাহেব তো কাউকে বলে যায়নি তিনি কোথায় যাচ্ছেন। সবুজ তার সকল আত্মীয়ের বাড়িতে খোজ করলেন কিন্তু কেউ বলতে পারলনা। এভাবে দিন, সপ্তাহ পেড়িয়ে মাস পার হয়ে গেল কিন্তু সবুজ তার বাবা, মা, ভাই, বোনের কোন খোজ পেল না। তবে কি তারা আর কোনদিন ফিরবেনা? এমনই এক অজানা প্রশ্ন বুকে জমা করে সবুজের দিন চলে যাচ্ছে।
সবুজ নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা, এত কিছু হারানোর পরেও সে মনকে এই বলেই সান্ত্বনা দেয়, সব হারিয়ে হলেও সে একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছে, যে দেশে প্রাণ খুলে নিঃস্বাশ নেয়া যাবে, যে মাটির গন্ধে বুক ভরে যাবে।

”নয় মাস ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যোদ্ধে এরকম বহু পরিবার সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে, হাজারও পরিবারের পরাজয় ঘটেছে। বিনিময়ে পুরো জাতি পেয়েছে একটি বিজয়, যে বিজয়ের আনন্দ সব হারানোর বেদনাকে ভুলিয়ে দিয়েছে”। আর এখানেই এই গল্পের নামকরনের সার্থকতা।
(বিঃদ্রঃ : এই গল্পের সকল চরিত্র, স্থান ও ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।)

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement