লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৬টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

ক্লোনিং
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

সংখ্যা

Shimul Shikder

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩৩৪
ঘটাং ঘটাং শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দূরে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। মেরামত কাজের একটা গাড়ি বিকট শব্দে পাশ দিয়ে চলে গেল। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকলে ঘুম আসার কথা না। কিন্তু ক্ষুধা পেটেই আমার ভালো ঘুম হচ্ছে। কারণ, না খেতে খেতে আমি ভীষণ ক্লান্ত। যেখানে বসি সেখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এখন রাত দুইটা তিনটা হবে হয়তো। এ সময়টায় মগবাজারের মোড় কিছুটা সুনসান থাকে। কিন্তু আজ রাস্তা মেরামতের জন্য কাজ চলছে বলে সামান্য ব্যস্ত। আমি উঠে বসলাম। ঘুমের কারণে হয়তো এতক্ষণ ক্ষুধা টের পাইনি। এখন পেটের মধ্যে ভীষণভাবে পাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে আসবে। আমার পাশেই রোগা পাতলা একটা লোক এই গরমের মধ্যে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। জাগতিক কোন সমস্যা তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। লোকটার শরীর থেকে ভয়ংকর দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এমনিতেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটের মধ্যে পাকাচ্ছে। তার সাথে এই দুর্গন্ধ যোগ হয়ে মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি বমি হয়ে যাবে। সরে বসা দরকার। আমার অপর পাশে একটু দূরে মোটা একটা মহিলা বসে আছে। হাতে ছোট একটা আয়না। একটু পরপর আয়নায় মুখ দেখছে আর গম্ভীরভাবে ঠোঁটে কটকটে লাল লিপস্টিক লাগাচ্ছে। মহিলাটির পাশে দাড়িয়ে শুকনা মতো এক লোক চিৎকার করে কিছু বলছে। রাস্তা কাটার ‘ঘটঘট’ শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। আমি উঠে মোটা মহিলার পাশে গিয়ে বসলাম। লোকটা মহিলাটাকে হুংকার বলছে,‘পয়সা যায় কই? আমারে হাইকোর্ট চিনাস?’ আমি একটু এগিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলাম। ঠিক তখনই প্রচণ্ড একটা লাথি আমার পেটে এসে পড়লো। আমি ছিটকে ফুটপাতের পাশে ড্রেনে গিয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিলো জীবনটা বের হয়ে আসবে। তীব্র ব্যাথায় কেঁদে উঠলাম। মুখ দিয়ে ‘কু কু’ ছাড়া আর কোন শব্দ বের হলো না। ড্রেন থেকে কোনমতে উঠে দৌড়ে রাস্তা পাড় হলাম। মোটা মহিলাটার উপর সমস্ত রাগ লোকটা আমার উপর ঝেড়েছে। রাগে দুঃখে কেঁদে ফেললাম। মগবাজার মোড়ের ফুটপাতের এই জীবন আমার ভাগ্যের সাথে স্থায়ীভাবে মিশে গেলো। আমার জীবন কিন্তু এরকম হওয়ার কথা ছিল না।

বিশ বছর আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির এক অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলাম আমি। স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করেছি। অসাধারণ ফলাফলের জন্য টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণার চাকরি পেয়ে যাই। আমার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘ক্লোনিং’। একটা জীবকে নকল করে হুবহু আর একটি জীব তৈরি করা। ইঁদুর, বেড়াল, কুকুর, কাক, কোকিল নানা রকম পশুপাখীতে গবেষণাগার ভরে ফেললাম। একটি প্রাণীর একটি দেহকোষের কেন্দ্রকে অপর একটি প্রাণীর কেন্দ্রবিযুক্ত ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপিত করি। তাতে নুতন নুতন অদ্ভুতসব প্রাণী তৈরি হতে থাকে। শরীর কুকুরের, পা ইদুরের। আবার শরীর বিড়ালের, দুই দিকে পাখির মতো দুটি ডানা আছে। সৃষ্টির নেশা আমাকে পেয়ে বসলো। আমার রাত দিন কাটে গবেষণাগারে। গবেষণার অভিনব সফলতা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার গবেষণার ফান্ড কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো।
কিন্তু ‘ক্লোনিং’ নিয়ে গবেষণা করতে করতে গিয়ে আমার গবেষণা আর ক্লোনিং এ সীমাবদ্ধ থাকেনি, অন্যদিকে মোড় নেয়। আমি প্রাণীদের ব্রেন কিভাবে কাজ করে তার উৎস খুঁজতে শুরু করলাম। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর গবেষণা করার পর অবশেষে সফলতা ধরা দিলো। আমি একটা প্রাণীর ব্রেনের কার্যকলাপ ‘ক্লোনিং’ প্রক্রিয়ার মতো অন্য প্রাণীর ব্রেনে প্রতিস্থাপন করার প্রক্রিয়া আবিস্কার করে ফেললাম। কাজটি সমাধান করার জন্য একটা মেশিন ডিজাইন করলাম। মেশিন তৈরির দায়িত্ব পড়লো ‘মেডট্রনিক’ নামের এক কোম্পানির উপর। বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে মাল্টিমিলিয়ন ডলার নেমে গেলো। যেদিন মেশিন গবেষণাগারে আনা হলো উত্তেজনায় সেদিন রাত আমার নির্ঘুম কেটেছে। এখন আসল কাজ শুরু করার পালা। ঠিক তখন একটা খবর আমার মাথায় বাজ হয়ে পড়লো। আমেরিকাতে ক্লোনিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করার সিদ্বান্ত নেয়া হলো। ক্লোনিং পদ্বতিতে কোন মানুষকে নকল করে আকার আকৃতিতে দেখতে হুবহু তার মতো অসংখ্য মানুষ তৈরি করা সম্ভব। ফলে কোনটা আসল আর কোনটা নকল মানুষ সেটা বোঝা কঠিন হয়ে যাবে। ক্লোন পদ্বতিকে বৈধতা দিলে মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় আমার মাল্টি মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট স্থগিত করে দিলো। আমার স্বপ্ন থেমে গেলো। আমি পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেলাম। সকালে ঘুম ভেঙ্গে বাসার সামনের কফির দোকানে আট দশ কাপ কফি খাই, পার্কের বেঞ্চে সারাদিন শুয়ে থাকি, মাঝে মাঝে গবেষণাগারে গিয়ে মেশিনটাকে ছুঁয়ে দেখি। সন্ধ্যা নামলে বাসায় ফিরে আসি, টিভির রিমোট নিয়ে টেপাটিপি করি। আমার বয়স তখন ৪৫/৪৬। বিয়েশাদী করিনি। দুটি প্রাণীর মধ্যে ব্রেনের সফল ‘একচেঞ্জ’ ছিল আমার একমাত্র স্বপ্ন। এর পেছনে আমি গত সাড়ে পাঁচ বছর ব্যয় করেছি। বিয়ে করার চিন্তা মাথায় একবারও আসেনি।


ক্লোনিং স্থগিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নুতন নুতন অনেক প্রজেক্টের প্রস্তাব দেয়। বিশাল বিশাল ফান্ডের লোভ দেখায়। কিন্তু আমি আর কোন কিছুতে মন বসাতে পারলাম না। সিদ্বান্ত নিলাম দেশে ফিরে যাবো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনেক বুঝিয়ে মেশিনটাকে সাথে নিয়ে নিলাম।
মগবাজারে আমার পৈতৃক বাড়ি। বৃদ্ধ মা ছাড়া সেখানে আমার আর কেউ নেই। বাড়ীর দোতালায় আমেরিকা থেকে আনা সমস্ত মেশিন স্থাপন করে গবেষণাগার প্রস্তুত করে ফেললাম। বাংলাদেশ এ গবেষণায় বাধা দেওয়ার কেউ নেই, নেই কোন আইনগত সমস্যা। প্রথমে সিদ্বান্ত নিলাম পরীক্ষামুলকভাবে একটা কুকুরের ব্রেনের সাথে একটা কাকের ব্রেনের এক্সচেঞ্জ করবো। একটা কুকুর আর একটা কাক যোগার করা হলো। প্রায় বছরখানেক ধরে সেই কুকুর আর কাকের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন কোষ, তাদের ডিএনএ আর ব্রেন নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালালাম। অবশেষে তাদের ব্রেনের স্ট্রাকচারের একটা করে স্বতন্ত্র ইমেজ তৈরি করে ফেললাম। এখন একটার ব্রেনের ইমেজ অপরটার ব্রেনে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এলো সেই স্বপ্ন পুরনের ক্ষণ।
একদিন খুব ভোরবেলা আসল কাজে হাত দিলাম। কুকুরটার মুখ মাস্ক দিয়ে ঢেকে মেসিনের লিভার দিয়ে ভালভাবে সেটাকে মেশিনের সাথে আটকে দিলাম। কুকুরটা বের হাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। কুকুরকে আনেস্থেশিয়া দিলাম। কুকুর অজ্ঞান হয়ে গেলো। মেশিন চালু করলাম। মেশিন কুকুরের ব্রেন স্ক্যান করতে লাগলো। এবার অপর একটা লিভার দিয়ে কাককে মেসিনের সাথে আটকালাম। কাক ‘কা কা’ করে ডানা ঝাঁপটাতে লাগলো। আনেস্থেশিয়া দিয়ে কাককে অজ্ঞান করে মেশিন চালু করলাম। এবার মেশিন কাকের ব্রেন স্ক্যান করতে লাগলো।

সমস্ত সিস্টেম রেডি। লিভারে এখন একটা টান দিলেই মেশিন থেকে আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি বের হয়ে কুকুরের ব্রেনে হিট করবে। কাকের ব্রেনের স্ট্রাকচারাল ইমেজ নিয়ে কুকুরের ব্রেনের প্রতিস্থাপিত করবে। কুকুরের আচরণ হবে কাকের মতো। কুকুর ‘কা কা’ করে ডাকবে। আমি মেসিনের লিভার ধরে টান দিলাম। অজ্ঞান কুকুর ‘ক্যোঁৎ ক্যোঁৎ’ করে শব্দ করে সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি দিতে লাগলো। আর কাকটাও ‘ক্যাঁক ক্যাঁক’ শব্দ করতে লাগলো। হঠাৎ কাকটার কী হলো, ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে লিভার থেকে ছুটে গেলো। আমি তড়িৎ বেগে কাকটাকে ধরতে গেলাম। ঠিক তখনই টের পেলাম আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির গতি পরিবর্তিত হয়ে আমার মাথার ভিতর ঢুকে গিয়েছে। আমি মেঝেতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারালাম।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন টের পেলাম আমি আমার বাড়ীর সামনের ডাস্টবিনের পাশে শোয়া। আমাকে ঘিরে পাড়ার অন্য কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে। আমার ব্রেনের স্ট্রাকচার কুকুরের ব্রেনে ঢুকে গিয়েছে। কুকুরটা শরীরই এখন আমার শরীর হয়ে গিয়েছে। পাড়ার সব কুকুরগুলো মিলে ‘ঘেউ ঘেউ’ করে সেই মুহূর্তেই আমাকে পাড়া ছাড়তে বাধ্য করলো। আমার স্থান এখন মগবাজারের মোড়ের ফুটপাথ।

প্রায় ভোর হয়ে এলো। ঘড়ঘড় করে ময়লার একটা ট্রাক সামনে এসে থামল। ট্রাকের আসে পাশে ময়লা খাবারের আশায় কয়েকটি কুকুর ভিড় জমালো। ক্ষুধার জ্বালা আর সইতে না পেরে আমি ও ছুটলাম ময়লার ট্রাকের দিকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement