লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ আগস্ট ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftস্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

ময়নাপাখির মুখ
স্বাধীনতা

সংখ্যা

শান্তা ফারজানা

comment ১০  favorite ৩  import_contacts ১,০৪০
পেটের উপর কান রেখে কিছু শুনতে চেষ্টা করে কুমার।
কী? কী খোঁজ?
আচ্ছা বউ, বাচ্চাটা কি শ্বাস নেয় না? শব্দ শুনিনা কেন?
যাহ্‌ পাগল! স্বামী উদ্বিগ্ন মুখটা দেখে হাসতে শুরু করে আলোমতি। একমাসও হইলোনা...
ও, তো কী হইছে?
উনার এখনও কিছুই হয় নাই। এই এত্তোটুকু রক্তের ফোটা। কত ছোট তা হাত দিয়ে দেখায় আলোমতি। অর্ধেক তোমার, অর্ধেক আমার। সোনামনি ধীরে ধীরে বড় হবে। তারপরেই না...। শুধু শ্বাস নেয়ার শব্দই না। ওর খেলা করার শব্দও তুমি শুনতো পাবা। বুঝেছো আমার ময়নাপাখি! এখন ঘুমাও...।
আলতো হাতে কুমারের চুলে বিলি কাটতে থাকে মতি। বউ এর মায়াময় আদর ভাললাগে ওর। আরো কাছে গিয়ে শোয়। বুকে মুখ ঘষে। ঘ্রাণ নেয়। আলোমতির গায়ের গন্ধটা একদমই অন্যরকম। কিন্তু মিষ্টি। জাগতিক কোন কিছুর সাথে মেলানো যায়না। আস্তে আস্তে হাত বুলোয় পেটে। খুলে দেয় সবুজ ব্লাউজের বোতাম। হঠাৎ কোন কিছু ভেঙে যায় যেন। আলোমতি হাসতে থাকে। ওর কাঁচভাঙা হাসি নিশ্ছিদ্র আকাঙ্ক্ষাকে আরো গভীর করে তোলে। কোমল হাতে কমিয়ে দেয় হারিকেনের তীব্রতা।
ক্লান্ত প্রায় কুমার কিছুক্ষণ পরপর জানতে চায় বাচ্চাটা ব্যথা পাচ্ছে কিনা। উত্তরে হেসেই চলে মতি। কাঁচভাঙা হাসিটা আনন্দের কিংবা আবেগই স্বামীর যত্নকাতর শিশুমন দেখে। সে আঁকড়ে থাকে কুমারের পিঠ। সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুছে দেয় মমতা নিয়ে। কিছুটা সময় পর কুমারও হেসে উঠে। দ্রুত শ্বাসে অস্থির হয়ে যায়। আঁকড়ে ধরে বউ এর সোহাগ মাখানো শরীর...।
বাড়ির পেছনে বিশাল পুকুর। সেখানে রূপালী জ্যোৎস্নার ছায়া। কুমারের ঘুম আসে না। মতির পেটে হাত রাখে। অনাগতের কথা ভাবে। গায়ের রং ফর্সা হবে। চুলগুলো বোধহয় কোঁকড়া হবে। নিজের মত। আর নাকটা হবে বুচি। বড় বড় চোখ, কালো। ঠিক মায়ের মত। যত্ন করে আদর এঁকে দেয় মতির ডান গালে। বউটা ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে।
ইদানীং কুমারের অস্থির সময় কাটে। ডান-বাম পায়চারী আর কানে রেডিও লাগিয়ে বসে থাকে। কখনো বন্ধুদের সাথে ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে। উত্তেজিত কুমার প্রায়ই জড়িয়ে পরে বিতর্কে। চেহারায় দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ।
সেই দুশ্চিন্তা আলোমতিকেও সংক্রমিত করে। কুরে তোলে দ্বিধান্বিত। চুলে নারকেল তেল লাগাতে লাগাতে এসে বসে প্রিয়জনের পাশে। কাঁধে হাত রেখে আলতো সুরে প্রশ্ন তোলে,
কী হইছে? আমারে বলবা?
না... কিছু নাতো।
আমার ময়নাপাখি। আমি জানি, কিছু একটাতো হইছেই। আমার কাছে লুকাইয়োনা।
মতি তাকিয়ে থাকে তার প্রিয় মানুষের দিকে। কুমার চোখ লুকাতে চায়।
তুমি যুদ্ধে যেতে চাও...।
বিস্মিত হয়ে যায় কুমার বুদ্ধিদীপ্ত স্ত্রীর কথায়। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। দৃষ্টি চলে যায় ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে। যে এখনও জাগতিক সমস্ত চেতনার ঊর্ধ্বের; তার মায়ের শরীরে পরম উষ্ণতার বাড়ন্ত।
কিন্তু বউ...। টগবগে তরুণের রক্তের জোয়ার যুদ্ধে যাবার আহ্বান জানায়। কিন্তু মনটা সংকুচিত হয়। তার সবচেয়ে আপনজন আর অনাগত ভবিষ্যৎ তাকে পিছু টানে।
ময়নাপাখি তুমি যাও। তোমারে যাইতেই হইবো। দ্যাশটা বাঁচাইতেই হইবো। কী হইছে, ক্যামনে হইছে অতশত কইতে পারুম না। তয় বুঝতেছি আগুন লাগছে, আগুন। আমার জন্য ভাইবো না। আমি সামলাইয়া নিমু।
বউ...! কুমারের চোখে টলটলে জল। গড়িয়ে পরে মতির পেটের উপর।
একটা কথা বলি, আমারেও নিয়া যাইবা...? আমিও তোমার সাথে থাইকা লড়াই করুম... আমরা তিনজনে...।
মতি আর কথা বলতে পারে না। গলার পর ক্ষীণ হয়ে আসে। সোনালী স্বপ্নের উপর মরিচার ভয় সে করে না, বরং প্রিয় স্বামীকে সঙ্গ দিতে চায়।
তাকে উৎসাহিত করে তোলে। তার সাথে গলাপানিতে নামলেও কোনদিন কুণ্ঠাবোধ হয়নি মতির। একটা বেড়ে উঠা 'কিন্তু' তার পথ রুদ্ধ করে দেয়। তার সাহসী পা দুটোকে অক্ষম করে তোলে। ওর প্রিয় 'ময়নাপাখি উড়ে যায়, রেখে যায় সুখ স্মৃতি। মতি জানালায় অনড়। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে প্রতীক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে।
কুমারের যুদ্ধে যাবার বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারে না তার বাবা ফরিদ খাঁ। একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে। মতি যাকে কোনদিনও অজু করতে দেখেনি, সে ব্যাক্তি নামাজ, রোজা, কোরআন, হাদিস এসবের মধ্যে ডুব দেয়। তার মতই কয়েকজন 'হঠাৎ মৌলবী' নিয়ে মিটিং করে। "শান্তি কমিটি" নামক কিছু একটার সভাপতি, সহ সভাপতি, সদস্যপদ বিভিন্ন পদের নামধারী ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। মতি বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করে। একদিন পাঁচ/ছয়জন পাকিস্তানি মিলিটারিকে সন্তুষ্ট চিত্তে হাসি-ঠাট্টা করতে দেখে এর অন্তর্গত নির্যাস সম্পর্কে ধারণা করতে পারে। পঞ্চম শ্রেণী উতরে যাওয়া মতি।
বউ, এ্যই বউ, দেখ দেখ কী নিয়া আসছি।
কী হইছে ময়নাপাখি! দৌড়ে উঠানে আসে আলোমতি।
এই নাও ফুলকপি আর হলুদ পা হাঁস। চল, চল জলদি। আমার এখনই খিধা লাইগা গ্যাছে। রান্নাঘরে হাঁড়ি পাতিলে ঠোকাঠুকি করে দুজন মিলে রান্না চড়ায়। হাঁস-ফুলকপির তরকারি। স্ত্রীর সাথে সংসার-সংসার খেলতে ভালো লাগে কুমারের। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে মতির পিঠে হাত বুলানো, পেটে চিমটি কাটা, গালে আদর মেখে দেওয়া- নানান ছেলেমানুষি আরো সানন্দিত করে তোলে সুখময়টাকে।

আহ ! ছাড়োতো! কি যে বদ অভ্যাস। কৃত্রিম রাগান্বিত চেহারায় বলে মতি! ওর ঠোঁটের কোণে উপভোগ্য হাসি।
ছাড়বো! ছাড়ো। মানে বেশি বেশি ধরো। ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠে কুমার। হাসতেই থাকে, হাসতেই থাকে...।
পোড়া একটা গন্ধ এলোমেলো হয়ে যায় সুখ। মতি ব্যস্ত হাতে কাঠ-ভুষি ঠেলে দেয় মাটির চুলায়। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, আর জ্বলতে থাকে মন; পুড়ে যাওয়া স্মৃতিতে। ভীষণ গরম। মতি ঘোমটা খুলে গায়ের ঘাম মুছে নেয়। হঠাৎ কাশির শব্দে চমকে উঠে সে।
ফরিদ খাঁ। ইদানীং তাকে বড় বেশি দেখা যায় রসুই ঘরের দরজায়। কারণে কিংবা অকারণে। সময় নিয়ে প্রয়োজন শেষ করে। মতি বিরক্ত হয়, কিন্তু প্রকাশ করে না। তার এখন সাত মাস চলছে। শরীরে বেশি ভাল বোধ হয় না। শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। ছোটবেলায় পিতামাতা গত হয়। আশ্রয়হীন মতিকে আগলে রেখেছিল কুমার। ছোট্ট বাচ্চার মত বুকে জড়িয়ে রাখতো। বিয়ের পর কোনদিনও নিজেকে এতটা অসহায় মনে হয়নি মতির। কিন্তু আজ বড় ক্ষুদ্র মনে হয়, বড় তুচ্ছ মনে হয়। ভীষণ কান্না পেতে থাকে।। এই যুদ্ধ কি কোনদিনও শেষ হবে না? ওর 'ময়নাপাখি' কে কোনদিনও আর দেখতে পাবে না?
উঠানো জ্যোৎস্না। গাছের পাতায় বাতাসের খেলা। ছায়া মাখা আলো বাঁধভাঙ্গা নীরবতা। সেই রূপালী অন্ধকারের কোলে ডুবে থাকে মতির চোখ।
শোন বউ, ছেলে হলে নাম রাখবো 'স্বাধীন' আর মেয়ে হলে 'মুক্তি'।
হুম, তা না হয় হইলো। কিন্তু আমার নাম কই? নতুন নাম...।
তুমি...তুমি তো আমার বাচ্চা বউ, সোনা বউ, বুচি বউ, ভালো বউ, আমার রাইফেল, আমার গুলি, আমার গ্রেনেড, আমার স্বপ্নের দেশের মুক্ত মাটি।
কুমারে বাহুবন্ধনে হেসে উঠে মতি। কাঁচ ভাঙ্গা হাসি। সেই শেষবার। রাতের গভীরতা গায়ে চাপিয়ে এসেছিল সে। গোপনে। কোথা থেকে দুটো পেয়ারা এনেছিল মতির জন্য। দাড়ি সর্বস্ব মুখ। এলোমেলো চুল। মাটিমাখা শরীর। উদ্দীপ্ত জোড়া চোখ ছিল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আগুন। ছিল বউ ও অনাগত সন্তানের প্রতি মমতা, ছিল ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। আর ছিল বেদনা। আগামীকাল দক্ষিণ-পূর্ব ব্রিজের একটা গুরুত্বপূর্ণ। অপারেশন আছে। কমান্ডারের নির্দেশ, এ্যাকশন স্টার্ট-আপ এ কুমারকে থাকতে হবে বিদায় বেলায়। স্বামীর সেই দীর্ঘশ্বাস এখনও ভেসে বেড়ায় চতুর্ভুজ ঘরে দেয়ালে...।
টুক-টুক। অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দে ফিরে আসে মতি। দরজার ওপাশে কেউ। ব্যতিব্যস্ত। নিগূঢ় রাত্রিকে ভেঙে টুকরো করে দিচ্ছে শব্দটা। কোমরে হাত রেখে মতি ধীরে নেমে আসে খাট থেকে। ঝেড়ে ঠিক করে শাড়ী। আঁচলে মাথা ঢেকে সাবধানে উঁকি দেয় দরজায়। হাতে চেরাগ। মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ...।
গলায় খাঁকারি তোলে ফরিদ খাঁ। পাশে একজন পাকিস্তানী উর্দি পরা। মিটিং- এ সবাই তাকে 'হুজুর' বলে সালাম দিতে দেখেছিল পেছনে 'শান্তি কমিটির দুজন'।
প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে মতি।
কিছু বোঝার আগেই ফরিদ খাঁ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।
কণ্ঠে ঝরে পরে পোষ মানানো সুর...
কিছু ভাইবো না বউমা। আমগো কমিটির বড় সাব। উনার খ্যাদমতেই তো বাইচ্যা আছি। তারে একটু খুশি কইরা...। ইশারায় কোন কিছু ইঙ্গিত দিয়ে দরজায় ফিরে যায় ফরিদ খাঁ। হাত কচলাতে কচলাতে বলে,
সাব, অন্দর আইয়ে। গরীবকা ঘর। লাইট-ফ্যান নেহি হ্যায়। বেতমিজই, কে নিয়ে মাফি চাহিয়ে...।
'হুজুর'এর দৃষ্টি ভরা উত্থাল ঢেউ। মতি যেন ভুনা করা কবুতর। মুখে জল এসে যায় হারমৌটার।
বেয়াদ্দব লাড়কী, সাবকো 'সালাম' দো...। মতিকে উদ্দেশ্য করে উপদেশ ঝাড়ে ফরিদ খাঁ।
কুঞ্চিত ভ্রুর নিচে মতির অবিশ্বাস্য চোখ। তার পিতৃসম শ্বশুর কিনা...। জ্বলে উঠে প্রতিরোধ শিখা। বেড়ার সাথে আটকে থাকা চকচকে দা' এর দিকে তাকায় একবার। এক-দুই-তিন-চার। পৌনে আট মাসের মতি ভারী দেহে এতজনের সাথে একা পেরে উঠবেনা। ভাবনার জাল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় তার। হঠাৎ... কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই দ্রুত পা চালায় পেছনের দরজার দিকে।
পুকুরে শুভ্র ছায়া। জ্যোৎস্নার। মতির চিৎকারে আতংকিত হয় আকাশের চাঁদ। সে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজেকে এবং বুকে লালিত স্বপ্নকে। যত জোরে সম্ভব। পুকুর পেরুলেই বাঁশ খোলা, তারপর ফসলের জমি, এককোণে জঙ্গল। কোনভাবে জঙ্গলে ঢুকে পড়া গেলেই লুকানো যাবে।
পেছনে হিংস্র পদশব্দ। ভেসে আসে উচ্ছৃঙ্খল কথোপকথন পোয়াতি মাগী ভাগতাছে। ধর, জলদি কইরা ধর। আমার সাধের কণ্টক। দূরত্ব কমতে থাকে। সে গতি বাড়িয়ে দেয়। বেড়ে যায় শ্বাস। ফুসফুস ছিঁড়ে যাবে যেন। অদূরেই বিশাল মেহগনি। ছোটবেলায় নিজ হাতে লাগিয়েছিল কুমার। ওর যত্নে গাছটা আজ পরিপূর্ণ। শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছুটে চলে মতি। হঠাৎ ক্লান্ত পা থমকে যায়, মেহগনির পুরুষ শেকড় রুদ্ধ করে দেয় তাকে। দমন করে এক যোদ্ধার বিজয় পতাকাকে। আলোমতি তাল হারিয়ে ফেলে, গড়িয়ে পড়ে পুকুরে। পেটে প্রচণ্ড আঘাত পায়, পাড়ে আটকে থাকা কিছুর সাথে। তার পৃথিবী শূন্য করে দেয়া লাল রক্ত অন্ধকারের সাথে বেদনার্ত মিছিল করে। মনে পড়ে প্রিয় 'ময়নাপাখির মুখটা' মানুষ কীভাবে এতো সুন্দর করে ভালবাসতে পারে ! আর দেহে আশ্রিত এলোমেলো সন্তানের নিষ্পাপ হাসি। এই মেহগনির ছায়ায় বসেই ওরা ষোলগুটি খেলতো...

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement