বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৫ আগস্ট ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯২

বিচারক স্কোরঃ ২.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮৯ / ৩.০

নীলকমল

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

অচিনপুর

শ্রমিক মে ২০১৬

গল্পকারের গল্প

উপলব্ধি এপ্রিল ২০১৬

গল্প - এ কেমন প্রেম? (আগস্ট ২০১৬)

মোট ভোট ২২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯২ তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে

শামীম খান

comment ১৫  favorite ০  import_contacts ৭৯৬
এই মাত্র একটি তারা ঝরে পড়লো । শান্তা একবার বলেছিল , এই সময়ে প্রেমিকার নামে প্রার্থনা করলে বিধাতা ফেরান না । চল্লিশ পেরিয়ে গেছি , সেই প্রার্থনাটি আজো সারা হয়নি । শান্তার কথা এখন আর খুব একটা মনে পড়েনা । সত্যি বলতে কি , ক্যামেরা কাঁধে আমার এ বাউণ্ডুলে জীবন শান্তার বিরহে ভেবে অনেকেই ভুল করেন । আসল কথা হোল আফ্রোদিতির সাথে আজো সুসম্পর্ক গড়ে উঠেনি । তা না হোলে আজতক ঘর-সংসার না হোক অন্তত শীতের রাতে লেপের তলায় মনে পড়ার মত দুয়েকজন সুনয়নার খোঁজ জানা থাকতো । যাকগে সে সব । এভাবে দিনের বেলায় উল্কাপাত দেখতে পাবো , আগে ভাবিনি । তৈরি থাকলে কাঁধের ডি এস এল আর অলিম্পাসে আটকে ফেলতে পারতাম । এ নিয়ে খুব বেশী আক্ষেপ করবো না । বঙ্গোপসাগরের কুল ঘেঁষা এই দ্বীপদেশে এসে আফসোসের ঝুড়ি সহসা বেশ হালকা হয়ে গেছে । প্রকৃতি এখানে বর্ণে , গন্ধে , শোভায় বিমোহিত করে রাখে সারাক্ষণ । এর টান মনে সৃষ্টি করে স্বর্গীয় আমেজ । এসেছিলাম বন্ধুর আমন্ত্রনে সাত দিন আগে । পৌঁছা মাত্র ব্যাগ আর ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়েছি । কাশের বনে হাওয়ার খুনসুটি , গাছের ডালে ধ্যানমগ্ন মাছরাঙা , নদীর পাড়ে সপরিবারে ভোঁদড়দের রোদ পোহানো , সন্ধ্যার আগে পিপাসার্ত হরিণ পালের সদলবলে পুকুর পাড়ে হাজিরা দেওয়া , এসব কি ফ্রেমে আটকে শেষ করা যায় ! আজও সারাদিন ছবি তুলেছি , শুধুই ছবি তুলেছি । ক্যামেরা হাতে এতই মগ্ন ছিলাম যে এখন এই শেষ বিকেলে এসে মনে পড়েছে দুপুরের খাবারটা মিস হয়ে গেছে ।

বাড়নতলা ঘাটে দাঁড়িয়ে খেয়ার অপেক্ষা করছিলাম । আমার পেছনে বাঁদা । সুন্দরি , গেওয়া , গরাণ , কেওড়ার নিরবিচ্ছিন্ন বনরাজী । পায়ের কাছে বালেশ্বর , নদী ভয়ঙ্কর ! এই পয়েন্টে পাক্কা এক কিলোমটার চওড়া । প্রচণ্ড স্রোতের বুকে সহস্র ঘূর্ণাবর্ত । কুমীর আর হাঙ্গরের বসত ভিটে । দক্ষ সাতারুও নামার আগে দশ বার হিসাব করবে । সন্ধ্যার ঘণ্টা খানেক বাকী । এপারে বন্যতা । শক্তির কাছে মমতা অচেনা , সুযোগের সামনে সম্মান তুচ্ছ । একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে গা ছমছম করে । সভ্যতার বসবাস দূরে , ঐ পারে । এখান থেকে খালি চোখে মনে হয় যেন ঝাপসা একটি ছবি , ছবির গ্রাম । ঐ গ্রাম থেকে হাঁটি হাঁটি পায়ে সভ্যতার শিশুটি ক্রমেই হেঁটে গেছে , শহরতলী আর শহর পেরিয়ে , রাজধানী দিকে । বনের ভেতর ঘর বাড়ী থাকার কথা নয় । তবু দুতিনটি গোলপাতার অবৈধ ঘর খাঁড়া করেছে বাওয়ালীরা , গোপনে । কাছে পিঠের বনজীবিদের রাতের ঠিকানা । প্রতি বছর বাওয়ালী আর মৌয়ালদের কাজ শুরু হয় বর্ষার শেষে । হাজার হাজার মানুষ দল বেঁধে এই পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়ে বনে । খেয়া ঘাটটি শুধু কাজের মৌসুমেই খোলা থাকে । এবছর বর্ষা এখনো শেষ হয়নি । এরিমধ্যে একটি দুটি করে মৌয়ালের দল বনে আসতে শুরু করেছে । এমনই একটি দলের সাথে সকালে ঢুকে পড়েছিলাম ।

দূরে খেয়া নৌকাটা দৃষ্টি গোচর হতেই পেটের নাড়ি মোচড় দিয়ে ফের ক্ষুধার তীব্রতা জানান দিল । ছাত্র জীবনের কথা মনে পড়ছে । ক্লাস শেষে ঘরে ফেরা মানে অপেক্ষমাণ এক প্লেট ভাত । সন্ধ্যায় মেস বাড়ীর বারান্দায় সেই ঠাণ্ডা খাবারের প্লেটটি বাড়তি একটি কাঁচা মরিচ পেলে অসাধারণ হয়ে উঠত । গোগ্রাসে শেষ করে ছুটে যেতাম টিউশানিতে । শিহাবকে অঙ্ক শেখানোর ফাঁকে সেখানেও প্রতীক্ষা । প্রথমে ভাবতাম এক কাপ চায়ের । পরে বুঝেছি চা নয় , চা ওয়ালির । চোরা চাহনিতে অষ্টাদশীর সৌন্দর্য সুধা চায়ের সাথে গলাধঃকরণ । শান্তা কি বুতে পারতো ! জেনেশুনেই কি সে ভাইয়ের পড়ার টেবিলের পাশে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতো !

সন্ধ্যা নামতেই খেয়া পারাপার বন্ধ হয়ে যায় । প্রযুক্তির এই যুগে উৎকর্ষতার ছোঁয়া লেগেছে সবখানে । খেয়াটি ইঞ্জিন চালিত । সকালে নদী পেরুবার সময় বৃদ্ধ মাঝির সাথে এসব নিয়ে আলাপ হচ্ছিল । বিকেলে দেখছি হালে বসেছে একটি মেয়ে । হয়তো সে মাঝির মায়াবতী মেয়েটি । বাবাকে বিশ্রাম দিতে নিজেই এসে হাল ধরেছে । এ অঞ্চলে এটা অসম্ভব বা অচ্ছুৎ কোনটিই নয় । ফেরার যাত্রী আমি একা । বসেছি মেয়েটির মুখোমুখি । তার মুখে মেখে থাকা কাঁচা হলুদের দাগ দৃষ্টি এড়াচ্ছে না । ষোল সতেরোয় মেয়েরা রূপচর্চায় করতে পারেনা , এমন কিছু নেই । কয়েকদিন আগে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় ভরদুপুরে হঠাৎ করে যেতে হল । বেল টিপতেই যে মেয়েটি দরোজা খুলে দিল তাকে দেখে ভড়কে গেলাম । মুখ ভর্তি কালো কালো পিঁপড়ে ! মুখে এক দলা কালো পিঁপড়ে মেখে দিব্যি হেসে খেলে বেড়াচ্ছে মেয়েটি । আমার ফ্যাঁকাসে চেহারা দেখে হেসে ফেললো , ‘এটা হোল অ্যান্ট ফেসিয়াল । আগামী কাল চলবে আরও জবরদস্ত ট্রিটমেন্ট , ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল ।’ ভ্যাম্পায়ার ফেসিয়াল হোল নিজের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে , তার থেকে নির্যাস নিংড়ে , সেই রস মুখমণ্ডলের অনাকাঙ্ক্ষিত ভাজগুলোতে ইঞ্জেক্ট করা । কমনীয় মুখাবয়বের আড়ালে সুগোপন নির্দয়তাকে ঢেকে রাখায় মেয়েদের অসাধারণ প্রতিভা চিরদিন আমাকে বিস্মিত করেছে ।

এই মেয়েটির এসবের প্রয়োজন ছিল না । বিধাতা তাকে সাজিয়েছেন অকৃপণ হাতে । আমি তার দিকে ভাল করে তাকাতেই সূর্য দিনের শেষ আলোটুকু ঢেলে দিল , কনে দেখা আলো । রাজা শান্তনুর মত অপলক চোখে চেয়ে রইলাম । চোখের চাহনির কোনে তাজা গোলাপ , ভ্রূতে রহস্য আঁকা । পৃথিবীর সব সৌন্দর্য দেহের ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়ে নৌকার হালে বসা পাটনি যে হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ রানী সত্যবতী তা আর্যপুত্রের চেয়ে বেশী কে আর জানে ! কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম জানি না । ধ্যান ভাঙ্গল মেয়েটির জড়তাহীন বাংলায় , সৌম্যদার বন্ধু আপনি ?
-হ্যাঁ , একসঙ্গে কাজ করি আমরা ।
-ওদের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি । তা সারা দিন কি কি ছবি তুললেন ?
-সারা দিন তো শুধু ছবিই তুলেছি , কোনটির কথা আলাদা করে বলবো ? যেটা দেখি তোমাদের এখানে সবই ভালো লাগে । তা তোমার একটি ছবি তুললে আপত্তি করবে না কি ?
মেয়েটি স্মিত হাসল । আমি বিকশিত সৌন্দর্যকে মুহূর্তে বন্দি করলাম ইলেকট্রনিক মেমরিতে । পারে পৌঁছে প্রথমেই যেটা চোখে পড়লো সেটা হোল আলোর খেলা । দিনের শেষ আলোয় ওপারের বনভুমি স্বর্গীয় সাঁজে সেজেছে । মাঝ নদীতে দাঁড়িয়ে জুম করতে হবে । এই ছবি না তুলতে পারলে একজন ফটোগ্রাফার আজীবন বুকে অতৃপ্তি নিয়ে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে ঘুরে বেড়াবে অন্যপ্রান্তে । আমি আবারো খেয়ায় চেপে বসলাম । নাও ঘুরিয়ে মেয়েটি মৃদু হাসল , ‘রাজা শান্তনুর কাহিনী জানেন ? আপনি কিন্তু সে রকম কিছু একটা করে ফেললেন ।’ অষ্টাদশীর মুখে গল্প শোনার লোভে ভেতরে ভেতরে আমি চঞ্চল হয়ে উঠলাম । চেহারায় অজ্ঞতা এঁকে প্রশ্ন করলাম , রাজা শান্তনু , সে আবার কে ?
-মহাভারতের বর্ণনায় শান্তনু ছিলেন আর্য বংশের রাজা , কৌরবদের প্রপিতামহ । যৌবনে তিনি গঙ্গা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন । কোন এক কারণে গঙ্গা একে একে তার সাতটি নবজাতক পুত্রকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলেন । রাজার চোখের সামনেই ঘটছিল সব । তবু রাজা তাকে বাঁধা দিতে পারেন নি । এ নিয়ে প্রশ্ন করাও সম্ভব ছিল না । কেননা বিয়ের আগেই গঙ্গা দেবী রাজাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন । তাদের অষ্টম সন্তান ছিলেন দেবব্রত , মহাবীর ভীষ্ম । জন্মের পরে তাকেও নদীতে ফেলতে নিয়ে চললেন গঙ্গা । এবার রাজা আর নিজ প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে পারলেন না । বাঁধার পাহাড় হয়ে সামনে দাঁড়ালেন । গঙ্গা রুষ্ট হলেন । প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের দায়ে রাজাকে ত্যাগ করে ফিরে গেলেন স্বর্গে । রাজপুত্রগন আসলে অভিশপ্ত ছিলেন । এজন্যেই তাদের এই প্রায়শ্চিত্যের আয়োজন । গঙ্গা দেবী প্রথম থেকে জেনে শুনেই প্রায়শ্চিত্য করছিলেন । কিন্তু শান্তনুর কাছে এ রহস্য ভেদ করতে চাননি । গঙ্গা ভীষ্মকে নিয়ে রাজমহল ত্যাগ করলে রাজা বৈরাগ্যের পথে পা বাড়ালেন । সংসার রাজ্যপাট কিছুতেই মন ছিল না । দূর থেকে ষোলটি বছর গঙ্গা দেবী সবই অবলোকন করছিলেন । এবার সামনে এসে ফিরিয়ে দিলেন ভীষ্মকে । রাজপুত্রকে পেয়ে শান্তনু ফের রাজ্য শাসনে ব্রতী হলেন । কিন্তু সংসার শূন্যই রয়ে গেল । একদিন রাজা হাস্তিনাপুর ছেড়ে শিকারে যাচ্ছিলেন বনে । উদ্দেশ্য ছিল কয়েকদিনের অবকাশ যাপন । হঠাৎ যমুনা নদীর পাড়ে এসে তিনি বিস্মিত হলেন । নদীর পাড়ে নাও । সেখানে বসে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুন্দরী , সত্যবতী । রাজা ওপারে যেতে চাইলে পাটনি আজ্ঞা পালন করলেন । রাজা কিন্তু নামলেন না । বললেন , ফের ওপারে নিয়ে চল । এভাবেই সারা দিন এপার থেকে ওপার ফের ওপার থেকে এপার ঘুরতে লাগলেন ।

গল্পের এ পর্যায়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটির দু চোয়াল শক্ত হোয়ে গেল , ‘এ গল্প আপনি আগে থেকেই জানতেন । আমি কি মিথ্যা বলেছি ?’ আমি জবাব দিলাম না । মুহূর্তে তার চোখদুটি জলে ভরে উঠলো । সে চোখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল সে । শান্তাও সেদিন এমনটি ছিল । সেই রাত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যস্ত ছিল কালচারাল প্রোগ্রামে । নির্জনে খোলা আকাশের নীচে সেই প্রথম কাছাকাছি আমি আর শান্তা । সুযোগ পেয়ে একটু অবাধ্য হয়ে উঠেছিলাম । দৌড়ে পালিয়েছিল ও । পরদিন দেখা করতে যেয়ে ব্যর্থ হলাম । দেখা মিলল টানা সাত দিন পর । ওর চোখে অবিশ্বাস আর অশ্রু । সেই শেষ , আর কখনো দাঁড়াতে পারিনি ওর সামনে । একদিন ওর বাবাও জানিয়ে দিলেন শিহাবকে আর অঙ্ক শেখাবার প্রয়োজন নেই । বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তাকে আর দেখিনি । অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আজো বিশ্বাস করতে পারি না , এতো তুচ্ছ কারণে একটি সম্পর্ক শেষ হয় যেতে পারে ।

মৌয়ালদের একটি দল জড় হয়েছিল ঘাটে । ছবি তোলা শেষে সত্যবতী নাও ভেড়াল । দলটি উঠে বসতেই কোথা থেকে দুইটি যুবক বনের পথ ধরে ছুটে এলো । একজনের হাতে ধারালো ছুরি , অন্যজনের আগ্নেয়াস্ত্র । মৌয়াল দলের থেকে কেঁড়ে নেবার কিছুই ছিল না । দস্যুদের চোখ পড়লো আমার দিকে । অস্ত্রের মুখে ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিল আমার টাকা-পয়সা আর ঘড়ি । ক্যামেরার দিকে হাত বাড়াতে দেখে হাত জোড় করে অনুনয় করলাম । হৃদপিণ্ডটি ছিঁড়ে নিলেও এর চেয়ে কম কষ্ট পেতাম । দুঃখে কষ্টে অপমানে মাথা নিচু করে রইলাম । কতক্ষন এভাবে ছিলাম মনে নেই । সত্যবতীর চিৎকারে সম্বিৎ ফিরল । ওকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ডাকাতেরা ! এবার উঠে দাঁড়াতে হোল । আর সহ্য করা যায় না । মৌয়ালদের বোঝালাম , যা হচ্ছে তা মেনে নেয়া ঘোর অন্যায় । তোমাদের ঘরেও মা বোন আছে । ডাকাতদের রুখতে হবে । এসো , উঠে দাঁড়াও । আমার কথা শুনে ওরা ভাবলেশহীন চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল । বুঝতে পারছিলাম ডাকাতদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কারো মনের সাঁয় নেই । একটি শেয়াল মৌচাকে ঝাপিয়ে পড়েছে । খামচে খাচ্ছে মেয়েটিকে । পড়ে থাকা একটি গরাণ কাঠ হাতে তুলে আমি ছুটে গেলাম । একটি আঘাত করতেই অন্যটি ছুটে এলো । মুহূর্তে ছুরির আঘাতে ধরাশায়ী করে ফেললো আমাকে ।

সত্যবতী যখন নৌকায় ফিরলো , তার দুচোখে আগুন । মুখাবয়ব , বিধ্বস্ত নগরী । চোখের কোনে ফুটে থাকা সেই গোলাপটি পিষ্ট হয়েছে । পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে একবার তাকাল সে । লোকগুলো চোখে চোখ রাখার সরলতা হারিয়ে ফেলেছিল । নিজেদের মধ্যে আলাপ সালাপে ব্যস্ত হোল তারা । ইঞ্জিন চালু করতেই আমি চিৎকার করে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম । কেউই এগিয়ে এলো না । কোন মতে হামাগুড়ি দিয়ে নৌকার কাছে আসতেই সত্যবতী এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল আমাকে । তার ক্রুদ্ধ চোখের দিকে চেয়ে কাতর স্বরে অনুরোধ করলাম , ফল হোল না ।

মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পারছি । চোখের সামনে কুয়াশার পর্দা । ওপার থেকে হাত বাড়িয়ে শান্তা ডাকছে , চলে এসো , চলে এসো ............... । হঠাৎ মাঝ নদীতে জ্বলে ওঠা তীব্র আলোয় আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল । মুহূর্তে খেয়া নৌকাটিকে গ্রাস করেছে লেলিহান অগ্নিশিখা । সেকেণ্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে মাথায় প্রশ্ন এলো , পেট্রোল ছাড়া এমন কাণ্ড কি ভাবে হতে পারে । মৃত্যু ভয়ে একদল মানুষ চীৎকার করছে । সে সব ছাপিয়ে একটি নারী কণ্ঠ ভেসে এলো , ‘কাপুরুষের দল , প্রতিশোধ নিলাম !’ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া অব্দি আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম । ওপার থেকে আরেকটি ইঞ্জিন বোট এগিয়ে এসেছে । টর্চের আলো ফেলে তল্লাশি চালাচ্ছে ওরা । দু হাত উঁচিয়ে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে চিৎকার করলাম , ‘আমি বেঁচে আছি ।’ জ্ঞান হারাচ্ছি বুঝতে পারছি । চেতনার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে শান্তার লেখা সেই চিঠিটি মনে পড়লো ।
প্রিয় কায়সার ,
কষ্ট পাবে জেনে একটি কথা তোমাকে কখনোই বলা হয়নি । আমি হেপাটাইটিস বি রোগে ভুগছি । এতদিন ডাক্তারেরা আশার কথা শুনিয়েছেন । এখন আর শোনান না । আমার ভাইরাসটি ট্রিটমেন্টে রেসপণ্ড করে নি । অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে । পারলে ক্ষমা করো ।
ওপারে কারো ভাইরাস হয় না । আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকবো ..................।
তোমার শান্তা ।
দুর্বোধ্য মুখোশের আড়ালে নিজের ভালোবাসাটি বাঁচিয়ে রাখতে মেয়েদের সার্বজনীন স্বার্থপরতা চিরদিন আমাকে বিস্মিত করেছে ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন