লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৫৮

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈরিতা (জুন ২০১৫)

ফুলি
বৈরিতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৫৮

নাসরিন চৌধুরী

comment ১০  favorite ১  import_contacts ১,১৩৬

সবাই দৌড়ে যাচ্ছে, চারদিকে হুলস্থুল কাণ্ড। কেউই কিছু বলতে পারছেনা। একজনের দেখাদেখি অন্যজনও ছুটছে। শেষ পর্যন্ত গন্তব্যস্থানে এসে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! সবাই দেখল একটা নবজাতক শক্ত জমিনে পড়ে আছে, চিৎকার করছে কিন্তু আওয়াজ বেরুচ্ছেনা তার। বাচ্চাটার চারপাশে শুকনো কতগুলো ডালপালা পড়ে আছে, সেগুলোর খোঁচায় বাচ্চাটার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটে গিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।মাঘের সকাল।প্রচণ্ড শীত ও চারদিকে কুয়াশায় ঘেরা। এই অবস্থায় একটা বাচ্চা এখানে কিভাবে এল কেউ কিছু বলতে পারছেনা। আর এই বিরুপ প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে এই বাচ্চাটা আর কিছুক্ষণ থাকলে মারা যাবে এটা নিশ্চিত—এমন কথা অনেকের মুখ থেকেই ভেসে আসছে। কিন্তু কেউই বাচ্চাটাকে কোলে নিচ্ছেনা বা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নিচ্ছেনা। কেউ কেউ বলছে এটা জ্বিনের বাচ্চা!

ফুলি বসে আছে মাটির চুলার পাশেই। খড়কুটো দিয়ে হালকা আগুণে ধানের তুঁষ ছিটিয়ে দিচ্ছে যাতে আগুণের তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ছোট বয়সে মা মারা যাবার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সংসার, তাই নানী শখ করে নাতনীকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এতটুকুন বয়স থেকে নানী'র সাথেই আছে ফুলি কিন্তু নানীও যে মামাদের সংসারে আজ আশ্রিতা হয়ে গেছে সে বিষয়টা বেশ উপলব্ধি করতে পারে ফুলি। নানী'র সে গায়ের জোরও আগের মতো নাই এবং কানেও শোনেনা আর চোখেও দেখেনা। ফুলি কতবার নানীকে বলেছে বা বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু নানীর কাছে দিন আর রাত সমান।

নানী'র বিছানায় নানীকে জড়িয়ে ঘুমায় ফুলি। বয়স বিশ বা একুশ হবে। কুঁচকুঁচে কাল তার গায়ের রঙ। এঅব্দি কোন বিয়ের পাত্র তার জন্য আসেনি। সারাদিন মামীদের সাথে বাড়ির কাজ করে, রান্না বান্না করে। পুরো সংসারটাকে সে নিজ হাতেই আগলে রাখছে প্রচণ্ড মমতা দিয়ে। বিশ্বাসের জায়গাতে মামীদের কাছেও নিজের জায়গাটুকু করে নিয়েছে ফুলি। দুটো মামাত ভাই আর তিনটে মামাত বোনও আছে। বয়সে সবাই তার ছোট। একদিন রাতে নানী'র সাথেই ঘুমিয়ে আছে ফুলি। হঠাৎ আবিষ্কার করল কেউ যেন লেপের নীচে দিয়ে তার বুক খামছে ধরছে এবং কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখল তার পাশেই তার সমবয়সী মামাত ভাই রবি। এবার মুখ ডুবিয়ে দিল রাক্ষসটি তার বুকে- চুষে চুষে হাতির মত শরীরটা একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ফুলি চিৎকার করার চেষ্টা করেও পারেনি। হাত-পা ছুঁড়েছে যদি নানী টের পায় কিন্তু সে প্রচেষ্টাও বৃথা!

রবি হুমকি দিয়ে গেল, “যদি মুখ খুলিস তাহলে এই বাড়ির ভাত তোর জন্য হারাম হয়ে যাবে এবং ঠিকানাও হারাতে হবে।” শেষ আশ্রয়টুকু হারাবার ভয়ে চুপ হয়ে যায় ফুলি। এভাবেই প্রতিরাতে রবি তার যৌনক্ষুধাটুকু মিটিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। দিন যায়, মাস যায়, ফুলি নিজের শরীরের পরিবর্তনটুকু বুঝতে পারছে। কি করবে সে কাকে বলবে ভেবে পায়না! আজকাল সে বড় চাদর দিয়ে শরীরটা ঢেকে রাখে আগেও সে রেখে ঢেকেই চলত সেজন্য সবার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এভাবে কেটে যায় ন'মাস।

একদিন শেষ রাতে প্রচণ্ড ব্যথায় শরীর ককিয়ে উঠে। পাশে নানী ঘুমুচ্ছে। অন্য ঘরে আছেন মামা- মামীরা। না কাউকে জাগানো যাবেনা এবং কাউকে কিছু জানানো যাবেনা তাহলে এই মুখ নিয়ে বাঁচা তার পক্ষে সম্ভব হবেনা। দরজা খুলে ঘরের পেছনে খালি জায়গাতে শুয়ে পড়ল। এর পর কি হয়েছে ফুলি'র আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখল নিন্মাংশে একটা ছোট্র প্রাণ কাতরাচ্ছে আর রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে চারপাশ। কারো সহযোগিতা ছাড়াই নতুন অতিথি ভয়াল পৃথিবীর মুখ দেখল। ফুলি প্রথমে ভেবেছিল বাথরুমের ট্যাঙ্কির ঢাকনা খুলে তার ভেতরে ফেলে দেবে কিন্তু আত্মা কাঁপছিল তার! কিছুক্ষণ বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদল। বুকে নিয়ে তাকে খেতে দিল। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে সে জানেনা! চারিদিকে ফজরের আযান শোনা যাচ্ছে। না আর দেরী করা যাবেনা! বাচ্চাটার কপালে শেষ চুমু খেয়ে তাকে আস্তে আস্তে নামিয়ে রেখে এল দু'মিটার নীচু খালি জমিতে। কেউ হয়ত জানবেনা যে কে তার জন্মদাত্রী কিন্তু ভালবেসে যদি কেউ কোলে তুলে নেয় বেঁচে যাবে হয়ত ছোট্র প্রাণটা। খুব কষ্ট হয়েছিল তার কিন্তু এছাড়া কোন উপায় ছিলনা।


রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখে উৎসুক জনতা আস্তে আস্তে তাকে ঘিরে ধরছে। তার অসহায় চোখ দুটি ভয়ে, লজ্জায় নত হয়ে আসছে। লোকজন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই তাকে জন্মদাতার নাম বলতে হল। সারা গ্রামময় রটে গেল ঘটনা। জনতার চাপের মুখে ফুলি'র মামী মানে রবি'র মা কাপড় পেঁচিয়ে বাচ্চাটিকে শক্ত জমিন থেকে তুলে আনলেন। ফুলিকে নিয়ে গোসল দিয়ে বাচ্চাটিকে তার কোলে দেয়া হল। মাঘের প্রচণ্ড শীত বাচ্চাটিকে কাবু করতে পারেনি। মায়ের কোলে যেন সে প্রশান্তির ছায়া খুঁজে পেল।

সমাজ বলে একটা কথা আছে। সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে, ছেলে মেয়ে দুটোকে দোররা মারা হবে তারপর তাদের বিয়ে দেয়া হবে। রবি'র গায়ে ভারী জ্যাকেট পরানো হল তার ভেতর আরও মোটা মোটা সুয়েটার পরানো হল। দশটা বেত একসাথে বেঁধে দশ বার গায়ে ছোঁয়ানো হল। ফুলি'র জন্য মোটা কাপড়ের তেমন ব্যবস্থা ছিলনা। তার শরীরের বেশ কিছু জায়গা কেটে গিয়েছিল। মাত্র বিশ হাজার টাকা দেনমোহরে কাজী ঢেকে তাদের বিয়ে পড়ানো হল।

এভাবেই দিন যাচ্ছিল। নবজাতক কন্যাটি একমাসের মধ্যেই বেশ ফুটফুটে হয়ে উঠল। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে এসে দেখে যায় কিন্তু পরিবারের কোন সদস্য ফুলি'র সাথে কথা বলেনা একমাত্র নানী ছাড়া। ফুলি এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেনা। সারাদিন বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। আর মামাত ভাই বোনগুলি সারাক্ষণ তাকে গালিগালাজ করেই যাচ্ছে কিন্তু কেউ রবিকে কিছু বলছেনা। ফুলি'র দীর্ঘশ্বাস দিন দিন গাঢ় থেকে গাঢ় হয়ে আসে!

এর মধ্যে একদিন ফুলি বাথরুমে গিয়েছে, এসে দেখে তার প্রিয় সন্তানটি নিথর হয়ে পড়ে আছে। নাক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গরম রক্ত। গলায় বসে আছে শক্ত হাতের পাঁচ আঙ্গুলের দাগ। অনেকেই দেখেছে কিন্তু কেউ মুখ খোলেনি সেদিন। সবাই ভাবছে গলার যন্ত্রণাময় কাঁটাটি বুঝি নেমে গেল! বেঁচে থাকলে এই সমাজ তাকে প্রতিদিন প্রতিবার কথার অস্ত্র দিয়ে মারতো। ভালই হয়েছে সে মুক্তি নিয়ে চলে গেছে বা কেউ তাকে জোর করে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে এই ভেবে ফুলিও চুপ হয়ে যায় কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জল ফেলে।

হঠাৎই জানানো হল কোন কারন ছাড়াই ফুলিকে তিনমাসের মধ্যেই তালাক দেয়া হবে। বিশহাজার টাকা আঁচলে বেঁধে তালাকের সীলমোহরে ফুলি পা বাড়ায় একদিন অজানা গন্তব্যে। পেছনে পড়ে থাকে ধূলি ধূসরিত লাঞ্ছনার এ্যালবাম, যে এ্যালবাম কেউ কখনও খুলে দেখবেনা। সানাই বাজবে, রবিও বর সাজবে, বধূ থাকবে, থাকবেনা শুধু ফুলিরা। এই সমাজে ওরা বড়ই বেমানান!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement