লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬০
গল্প/কবিতা: ২২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (জুন ২০১৪)

অবাঞ্চিত মা
মা

সংখ্যা

হাসনা হেনা

comment ০  favorite ০  import_contacts ২৬২
কুমিল্লা শহরের কত অলি গলি ঘুরেছে রুবি কিন্তু মায়ের দেখা মিলল না আজও। কিন্তু মাকে যে তার দেখতেই হবে। দুখী মায়ের ললাট চুমে সে জিজ্ঞেস করবে তার জন্য কি সামান্য টুকু মাতৃত্ব বোধ জাগেনি কখনও তার, নাকি শুধু ঘৃণাই জেগেছে। কত মাকে দেখেছে সে, দেখেছে সন্তানের জন্য কি অকৃপণ অকৃত্রিম ভালবাসা, কি উচ্ছ্বসিত আবেগ, এর যেন তুলনা হয়না, এর যে শেষ নেই। রুবি সে অকৃত্রিম ভালবাসা আর অমিয় আবেগের স্পর্শ পায়নি কখনও। তবে একটি চরম সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া যায়না যে, সব মা’ই এক রকম হয়না। তারপরেও মা। চৌকস আর সুশীল রুবি বেড়ে উঠেছে একটি এতিমখানায়। সেখানে ছিলনা মায়ের ভালবাসা বাবার আদর কিংবা আপনজনেরা। মাঝে মাঝে হাহাকার করে উঠে তার শূন্য বুক। তার মত অনেকেই সেখানে বেড়ে উঠেছে কিন্তু রুবি যেন একটু আলাদা চিন্তা নিয়ে বড় হয়েছে। রুবি লেখা পড়ায় ভাল বলে অনেকের সহযোগিতায় সে লেখা পড়া শেষ করে বিসিএস পাশ করে একটি সরকারী কলেজে প্রভাষকের চাকরী পেয়েছে। বহু কষ্টে মায়ের ঠিকানা সে যোগাড় করে কুমিল্লায় এসেছে কিন্তু সে ঠিকানায় ওদের কাউকে পাওয়া গেলনা। ওরা অনেক বছর আগেই এ শহর ছেড়ে চলে গেছে; কোথায় গেছে কেউ জানেনা। এত হাঁটা হাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে রুবি জানে মানব মনের জটিলতা মানব সমাজকে করে তুলেছে কতটা জটিল, করে তুলেছে কতটা দূর্বেধ্য আর সেই জটিলতার ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে কত সংকীর্ণতা, হীনতা আর নির্মমতা। ভাবে সে, কবে শেষ হবে অন্ধ বিশ্বাস আর মানবতা বর্জিত সর্বনাশা বিচিত্র বোধের। রুবি ক্লান্ত হয়ে একটি পুকুর পাড়ে গাছের নীচে বসে পড়ল, গাছের শরীরে নিজের গা এলিয়ে দিয়ে উপরের দিকে তাকাল। সবুজ পত্র পল্লবে ছাওয়া গাছটিকে চিনতে চেষ্টা করল মনোযোগ সহকারে। এরি মধ্যে দুটি দোয়েল এসে ডালে বসল। একটি দোয়েল ডালে আরাম করে বসে গাইতে লাগল আরেকটি অযথাই টিউ টিউ করে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফালাফি করতে লাগল। না জানি কি সুখে আত্মহারা সে। প্রকৃতির সুন্দরতম দান এ পাখিরা। পাখিরা রূপে গুণে প্রকৃতিকে করে তুলেছে আরও সুন্দর আরও মহনীয়। এরি মধ্যে আরও কত পাখি এসে ভিড় করল গাছে। ওদের বিচিত্র কলরবে নিমিষেই পড়ন্ত বিকেল মুখরিত হয়ে উঠল। রুবির সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল নিমিষে, কান পেতে শুনতে লাগল জটিল আর কুটিল বোধহীন প্রাণবন্ত কলরব। মনে মনে ভাবে, আহ! ওদের কত দায়হীন, কলঙ্ক গ্লানিহীন স্বাধীন জীবন। বুদ্ধিমান শ্রেষ্ঠ মানব জাতির মনগড়া কঠিন শিকল ওদেরকে বাধতে পারেনা। হঠাৎ কার ডাক শোনে রুবি ফিরে তাকাল। তিন চারজন যুবক নির্লজ্জ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। ওদেরই একজন বলল, কি করতেছ এই জাগায়? আরেকজন বলল, কার জন্য অপেক্ষা? অন্য একজন বলল, যাবে নাকি আমাদের সাথে? রুবি এবার উঠে দাঁড়াল, বোঝে উঠতে পারল না ওদের প্রশ্নের কি জবাব দেবে। এটুকু বুঝতে পারল ওরা কোন ভাল ছেলে নয়। রুবি ব্যাগ কাঁধে ঝুলাতে ঝুলাতে বলল, আপনারা কি চান? ওরা সবাই হা হা করে হাসতে লাগল। রুবি বলল, এভাবে হাসছেন কেন? সড়ে দাঁড়ান, আমি যাব। একজন আরও কাছে এসে বলল, তোমারে চাই, আমাদের ফেলে কই যাবা সুন্দরী। রুবি এবার ক্ষেপে গিয়ে বলল, খবরদার, একদম বাজে কথা বলবে না। একজন বলল, বলবনা, আমাদের সাথে চল। একজন গান ধরল, সুন্দরী চলেছে একা পথে।
-তোমাদের সাথে যাব কেন? এবার সবাই রুবিকে ঘিরে দাঁড়াল। এরি মধ্যে এক ভদ্রলোক এসে বলল, কি হচ্ছে এখানে? লোকটির কথা শোনে ছেলেগুলি প্রায় দৌঁড়ে পালিয়ে গেল। কাছে এসে বলল, কে তুমি? ওরা কি করছিল এখানে? রুবি সব খোলে বলল তাকে। লোকটি বলল, এ বদমাশগুলিকে শায়েস্তা করা দরকার। তুমি এমন নির্জন জায়গায় একা বসে থেক না বাড়ী ফিরে যাও। ছেলে পেলেরা খুবই খারাপ।
-ছেলে পেলেরা কবে ভাল হবে বলতে পারেন? কবে সে সভ্যতা আসবে ? কবে মেয়েরা নিরাপদে পথ চলবে? কবে নির্দোষ নারীরা কলঙ্কহীন গ্লানিহীন জীবন পাবে, কবে? কবে? সে দিন কি আসবে কখনও? রুবির অভিমানের আবেগ লোকটির অন্তর স্পর্শ করল। লোকটি শান্ত কণ্ঠে বলল, জানিনা। তুমি বাসায় ফিরে যাও।
- আমি এখানে একজনকে খুঁজতে এসেছি। যে ঠিকানা দিয়েছে, এ ঠিকানায় ওরা নেই। কেউ বলতেও পারেনা ওরা কোথায় আছে। দেখুনতো আপনি চিনতে পারেন কিনা। লোকটি ঠিকানা দেখেই চিনতে পারল। ভদ্রলোক রুবিকে ভাল করে দেখে বলল, কে তুমি?
-আমার পরিচয় দেয়ার মত কিছু নেই। প্লিজ, দয়া করে বলুন ওদের ঠিকানা কোথায়। আমার মনে হচ্ছে আপনি চিনেন।
-ওরা তোমার কি হয়? কেনইবা খুঁজছ?
-আমার মাকে খুঁজছি। আর কিছু বলতে পারবনা। প্লিজ। ভদ্রলোক রুবির চেহারার সাথে একজনের মিল খোঁজে পেয়েছে। নানা প্রশ্ন করে রুবির অনেক কথা জানল কিন্তু রুবি আসল পরিচয়টি দিতে পারল না। মানুষ মানুষকেই যেন বড় ভয় পায় কেননা মানুষই দৃষ্টিভঙ্গি আর আচরণের দ্বারা প্রত্যক্ষ ভাবে শাস্তি দেয় মানুষকে। ভদ্রলোক তার নাম জামান বলে পরিচয় দিল এবং বলল তার বাবা এডভোকেট হাসান সাহেবের ছোট বেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আত্মীয়। এখনও ওদের সাথে তার
যোগাযোগ আছে। হাসান সাহেবের পরিবারের অনেক কথাই সে জানে। মনে মনে ভাবে কে তার মা। হাসান সাহেবের একমাত্র মেয়ে রোকেয়ারতো কোন সন্তান নেই। এই মেয়ে তবে কার কথা বলছে। রুবি এতক্ষণ আলাপচারিতায় জামান সাহেবকে নির্ভরযোগ্য মানুষ বলেই ধরে নিল। আর মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, এবার হয়ত মায়ের দেখা সে পাবে। জামান সাহেব বলল, আচ্ছা একটা কথা; তোমার মায়ের সঙ্গে এত দিন যোগাযোগ ছিল না কেন?

-ওদের পরিবারের সাথে যদি আপনার ঘনিষ্ঠতা থাকে, তবেতো আপনার সবই জানার কথা।
- অনেক কিছু জানি, সব না। হাসান চাচার একমাত্র মেয়ে রোকেয়া ছাড়া আর কোন সন্তান নেই। যুদ্ধের পর পরই বাড়ীটি বিক্রি করে ওরা চট্টগ্রামে চলে গেছে। রোকেয়া খুবই ভাল মেয়ে ছিল।
-ভালরাইতো মন্দের শিকার হয় বেশী আর কেউ কেউ পরকালে পুরস্কার প্রাপ্তির আশ্বাস দেয় বিপণœ মানুষকে।
-ঠিক বলেছ। আমাকে তুমি নির্দ্বিধায় বলতে পার। কে তুমি?
-সব জানতে পারবেন পরে।
-আচ্ছা শুধু একটা কথা বল, ঠিকানাটা তোমাকে কে দিয়েছে?
- সেখানকারই একজন।
- নামটা বল।
-সুস্মিতা ব্যাণার্জী। চমকে উঠল জামান সাহেব। মূহুর্তে ম্লান হয়ে গেল তার চেহারা। দুঃসহ অতীত যেন তাকে বহু পেছনে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। এ সুস্মিতা ছিল একদিন তার প্রিয় মানুষ। দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালবাসত কিন্তু জাত ধর্মের কঠিন দেয়ালে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দুজনের ¯^প্নের পৃথিবী। রুবি জামান সাহেবের নিরবতা দেখে বলল, কি ভাবছেন? ওদের ঠিকানাটা দিন। জামান সাহেব নিজকে সামলে বলল, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি, তুমি কি কোন এতিম খানায় বড় হয়েছ?।
-হে।
জামান সাহেবের আর কিছুই বুঝতে বাকী রইল না। রুবিকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করল। রুবির একই আবদার কখন সে ঠিকানাটা দেবে কিন্তু জামান সাহেব ঠিকানাটা দিতে চাইলেন না। রুবি বার বার শুধু জানতে চাইল কেন দেবেনা। আমিতো থাকতে আসিনি, শুধু মাকে বুকে জড়িয়ে ধরব একবার। জামান সাহেব বলল, সত্য বড় নির্মম। তুমি সে নির্মমতাকে নূতন করে জাগিয়ে তোলনা। আমি বুঝি, তোমার অন্তরে কিসের রক্ত ¶রণ। নূতন করে মেয়েটাকে আবার কষ্টে ফেলনা। রুবি আর্ত কন্ঠে বলে, সন্তান মাকে কষ্টে ফেলবে? ওহ, আমিতো আবার অপাংতেয়, অবাঞ্চিত সন্তান।
-নাহ, নিজেকে এত ছোট ভেবনা। আমি আর সুস্মিতাই তোমাকে এতিম খানায় রেখে এসেছিলাম। রোকেয়ার বিয়ে হয়েছে কিন্তু কেউ জানেনা এ ঘটনা। ওর আর কোন সন্তান হয়নি। ¯^ামীটিও বেশী সুবিধার নয়। যদি জানে তুমি তার সন্তান; তা হলে তার দুঃখ আরও বেড়ে যাবে। রুবি হা-হা করে হেসে বলে, কি অদ্ভুদ এ পৃথিবী, একজন অপরাধ করে আরেকজন এর দায়ভার বহন করে। জামান সাহেব শুধু দুঃখ প্রকাশ করল কিছু করতে না পারার জন্য। অবশেষে রুবির জয় হল হাসান সাহেব ঠিকানা সহ একটি চিঠি লিখে দিলেন।

হাসান সাহেব দরজা খোলেই অবাক হয়ে রুবির দিকে তাকিয়ে রইল নিরবে। রুবি বলল আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিন। হাসান সাহেব বলল, তুমি কাকে চাও? রুবি চিঠি দিয়ে বলল, এটা পড়লেই বুঝবেন আমি কে। হাসান সাহেব চিঠি পড়েই আতকে উঠল বিরক্ত হয়ে বলল, কেন এসেছ তুমি? পুরুনো কষ্ট বাড়াতে কেন এসেছ? রুবি বলল, শুধু আমার মাকে একবার দেখব।
-কি লাভ তাতে? তুমি চলে যাও আমি চাই না আমার মেয়ের জীবনে আবার নতুন কোন ঝড় উডুক। এ জগৎ সংসারে কত নির্মম সত্য আছে যা মানুষ ভুলে থাকতে চায়। রুবি সালাম করে বলল, সত্যকে ভুলে থাকা যায় কিন্তু সত্যকে মিথ্যে করা যায়না। আমারতো কোন অপরাধ নেই, আমার মায়েরতো কোন অপরাধ নেই। আমার মায়ের মত কত নারী চরম মূল্য দিয়েছে এ ¯^াধীনতার জন্য। কেন লজ্জায় ঘৃণায় তারা পালিয়ে বেড়াবে সত্যকে গোপণ করে? কেন তারা অপমানিত হবে সম্মানের বদলে। একি সভ্যতা? একি মানবতা? বৃদ্ধ হাসান সাহেব চোখ মুছে বলল, এ অবাধ্য বোধের পরিবর্তন যেদিন হবে সেদিন। তোমার মত একটি সন্তানের জন্য সে কত হাহাকার করেছে কিন্তু পায়নি--- অথচ তারই গর্ভজাত সন্তানকে আমরা মেনে নিতে পারছিনা। রুবি বলল, আমার জন্ম যেভাবেই হইক, সে আমার মা। অনেক কাকুতি মিনতির পর হাসান সাহেব রোকেয়াকে খবর দিয়ে আনল জীর্ণ শীর্ণ শরীর তার; প্রায়ই অসুস্থ্য থাকে। মাকে দেখে চোখে পানি আসল কিন্তু চেপে রাখল। রোকেয়া রুবিকে দেখে বলল, ও কে বাবা? হাসান সাহেব উত্তর দেয়ার আগেই রুবি বলল, আমি রুবি। ঢাকা থেকে এসেছি, আমি কি আপনাকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি? রোকেয়া খুব কম কথা বলে। রুবির কথা শোনে অবাক হল এবং বলল কেন?
-আপনি আমার মায়ের মত, তাই। রুবি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। রোকেয়া যেন কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব করল। এমনি প্রশান্ত স্পর্সের আশায় সে কতদিন কেঁদেছে, কত অপে¶া করেছে। নিজেও রুবিকে জড়িয়ে বলল, কে তুমি? কিছুই বলল না রুবি। চোখের পানি মুছে বের হয়ে পড়ল আবার স্নেহ ভালবাসাহীন এক দূসর পৃথিবীতে। হাসান সাহেব অনেক আগেই উঠে গিয়েছিলেন অন্য রুমে কিন্তু ভুলে ফেলে গেলেন চিঠিটি। রোকেয়া খুঁজতে লাগল মেয়েটি কেন তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। চিঠিটা পায়ের কাছ থেকে কুড়িয়ে পড়তে লাগল কোন জরুরী কাগজ কিনা। চিঠি পড়েই রোকেয়া হু হু করে কেঁদে বলল আমি এক দূর্ভাগা অবাঞ্জিত মা। তারপর দরজা খুলে রুবির চলে যাওয়া পথের দিকে দৌঁড়ে গেল। তত¶ণে রুবি অদৃশ্য হয়ে গেল অনেক পথের ভীড়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement