বড় দুই বোনের পরে আমি, তাই আমার আদরটা একটু বেশী রকমেরই বৈকি! বড় আপার বিয়ের বছরে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি। তাই বড় আপার সাথে শৈশব স্মৃতিতে তেমন কিছু নেই। ভাইবোন সম্পর্কের মধুর (কখনো বিধুর) স্মৃতি যা সব ছোট আপাকে ঘিরেই।

ছোট আপার সাথে আমার বয়সের ব্যবধান ছয় কি সাত বছরের হবে। মা'র কাছ থেকে শোনা- আমাকে নাকি ছোট আপা কখনোই কোল থেকে নামাতই না। সারাদিন আমায় কোলে করে বেড়াত।

যখন বুঝতে শিখি, তখন আমার উপর আপার সবচে অসহ্য অত্যাচার ছিল গা ডলে ডলে আধাঘন্টা ব্যাপী ম্যারাথন গোসল। আমি সাধারণত গোসল করতে চাইতাম না, গোসল করলেও কয়েক মগ পানি ঢেলে পগার পার। কিন্তু যেদিন আপা আমাকে বাগে পেত, সে কি ডলা! মনে হত তোয়ালে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে চামড়া তোলে ফেলবে। আর বলত, "গিদর কোনহানকার?" পকেটে মার্বেল, ব্লেড নিয়ে ঘুরাঘুরি করা সেই আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম…

মনে পড়ে, আব্বার একটা রেডিও ছিল। তখন রেডিও মানেই "বাংলাদেশ বেতার"- "গানের ডালি", "বিজ্ঞাপন তরঙ্গ" ইত্যাদি। আমরা দু ভাইবোন মিলে শুনতাম। আর বাংলা সিনেমার গানগুলো গাইতে চেষ্টা করতাম। আপার গানের গলা যথেষ্ট ভাল ছিল, এখনো আছে। সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, কনকচাঁপার প্লেব্যাক তার মুখস্থ ছিল। আমি যদি কোন গান গাইতে চেষ্টা করতাম, তখন ফোড়ন কেটে বলত, "বাঁশ গলা নিয়ে গান গাইতে আইস না। যা, ভাগ।" এখনো টিপ্পনী কাটে। এইতো সেদিন কোরাসে গান গাইবো বলে নাম লিখিয়েছি জেনে বলল, "তোর গানের গলা আছে রে?" সত্যি সত্যি আমি আপার মত ভাল গাইতে পারি না।

তখন সপ্তাহের প্রতি বৃহষ্পতি, শুক্রবার মানে বিটিভির ছবি। আমাদের ঘরে কোন টিভি নেই। চাচার বাড়িতে তখন একটি সাদাকালো টিভি ছিল। সে দিন সব কিছু ফেলে রেখে সবার আগে গিয়ে বসে থাকত টিভির সামনে। আমার টিভি দেখা বারণ ছিল। তাই আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যেত। যেদিন অতি সন্তর্পনে তার পিছু নিতাম সেদিনই মা এসে দুজনকেই টিভির ঘর থেকে বের করতেন। সে কারণে তার টিভি দেখা মিস হত। আর আমার উপর ঝাড়ি…

মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হলাম। আপার জন্য বিভিন্ন পাত্রের খোঁজ আসতে শুরু করল। আপাও আগের চেয়ে অনেক ফ্রেন্ডলি হল। আমার ভাল লাগার কথা ওকে বলতাম, ও তার ভাল লাগার কথা আমাকে বলতাম। আপাকে আমাদের এক ফুফাতো ভাই পছন্দ করতেন। তাই তিনি আমাকে একটু বিশেষ আদর করতেন; জোর করেই বিস্কুট, চানাচুর, নাবিস্কো লজেন্স কিনে দিতেন। তখন জানতাম না কীসের জন্য তিনি আমাকে এত আদর করতেন।
আমি স্কুল কামাই করতাম বলে সব সময় সন্দেহ করে বলত, "ক্লাসে নিশ্চয় কেউ আছে, যারে তোর না দেখলে ভাল লাগে না?" তার সন্দিহান মনের প্রশ্নের উত্তর প্রথম প্রথম দিতে পারতাম না, পাছে আব্বা- মা'র কাছে সব বলে দেয়।

এমনি করে আপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি ক্লাস সেভেনে ওঠার পর আপার বিয়ে হয়ে গেল। পাত্রপক্ষ হতে আপাকে দেখতে আসার দিনটা আনন্দের ছিল। কারণ সেদিন মিষ্টি খাওয়া যেত, পাত্রপক্ষের দেওয়া টাকার ভাগ ভাটোয়ারা কিছু পেতাম। সে আনন্দ আরও ঘনীভূত হল যখন দুলাভাই আপার হাতে রিং পরিয়ে দিল। তারপর নতুন স্বপ্ন, নতুন সংসার। গৃহত্যাগ।

আমার প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগতো। আপার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। তাই বৃহষ্পতিবার চলে যেতাম আপার বাড়িতে। শুক্রবার থেকে শনিবারে স্কুল ধরতাম। দুলাভাই তখন আমাকে এতটা বড় মনে করতেন না বলেই (এখন যেমন করেন) চানাচুর, বড়া, ডালপুরি, সিঙ্গারা এনে রাখতেন। এভাবেই আমি এসএসসি পাশ করি। আপার প্রথম ছেলে সানির জন্ম হয়।
আমিও ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়ে শহরে চলে আসলাম। আপার সংসার, আমার পড়াশুনা। ব্যস্ত হয়ে গেলাম দুজন দুজনের মত। মাঝে মধ্যে সময় সুযোগ হলে দেখা হয়; আমি আপাকে দেখতে যাই, নইলে আপা আমাদের বাড়ি আসে। ঈদ কি মেলায় সবার সাথে বসা হয়। তবে সে আসর বড় আপার দুই ছেলে মেয়ে, ছোট আপার তিন ছেলে মেয়ের কোলাহলে জমে ওঠে, আমাদের কথা, হাসি চাপা পড়ে যায় ওদের ছুটাছুটি আর কোলাহলে।

এভাবেই ভাঙে এক একটা মিলন মেলার।

হ্যাঁ, কখনো যদি মনের কোণে খুব ঘন মেঘ জমে ওঠে তাহলে সোজা আপার বাসায় চলে যাই। সেখানে জমে ওঠে যাপিত জীবনের সুখ- দু:খের কথা, সংসারের হালচাল। কথায় কথায় ভেসে ওঠে হৃদপটে দূর অতীতের ভাবনা গুলো। মনে করিয়ে দেয়, সর্দি, ঘামে, ধুলোয় লুটোপুটি হয়ে থাকা এক শিশু ভাইয়ের কথা। আমিও হেসে বলি, তার সদ্য ধোয়া পায়ে পাড়া দিয়ে মেজাজের বারোটা বাজানোর কথা।

ক্রমান্বয়ে বাড়ছে ব্যস্ততা। তবু ক্ষণিক অবসর হলেই মনে পড়ে অতীতের সেই খুনসুটির কথা। আপুর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আনমনেই গেয়ে ওঠতো, "তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকা দির নাম…" তার ছল ছল চোখের দিকে তাকিয়ে তখনকার আমি কি বুঝতাম তার সে গানের মানে?