লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

ভালবাসা- ভালবাসা
উপলব্ধি

সংখ্যা

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩

জোহরা উম্মে হাসান

comment ৮  favorite ০  import_contacts ১,০৬৭
"Love is like the wind, you can't see it, but you can feel it." ― Nicholas Sparks
এক
অনেক ঘুরে ফিরে বলে কয়ে আজ যে চাকরিটা তার জন্য যোগার হোল , সেটাকে ঠিক চাকরী্‌ বলা যাবে কিনা তা ঠাহর করতে অনেক সময় লাগলো রইস উদ্দীনের । কপাল মন্দ তার। পৈত্রিক শাড়ীর দোকানটা কোন কুক্ষণে আগুনে জ্বলেপুড়ে একেবারে ছারখার হয়ে গেল । বাজারে দেন-দেনাও জমেছিল ঢের। তাই হঠাৎই কোরেই ছেলে বেলার বন্ধু আনোয়ারের কথা মনে পড়ায় কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসা !আনোয়ার বনানীর একটা বেশ বড়সড় গারমেন্টস এ সুপারভাইজারের চাকরি করে । মন্দ ভালো ম্যালা লোকের সাথে চেনা জানা আছে তার ।
অনেক রাতে মেসে ফিরে এসেই রইস জানালো সেই সুখবরটা ! শুনেই এতদিনের বুকে জমা চিন্তার ভারী পাথরটা এক মুহূর্তে ই যেন একটা পাখীর পলকা পালক হয়ে বাতাসে উড়াল দিল। কিন্তু নাওয়া খাওয়া সেরে পুরুস্ট দু’ঠোঁটের ডগায় আয়েসে একটা সিগারেট ধরিয়ে বিশাল শরীরটাকে বিছানার সাথে টান টান এলিয়ে দিতে দিতে আনোয়ার রইসের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে যে কথাটা শুনালো - তাতে আত্নারাম খাঁচা ছাড়া হবার জোগাড় হোল ও পক্ষের ।
সে রাতে কিছুতেই আর দু’চোখের পাতা এক করতে পারলো না রইস। সুতীব্র মনোঃবেদনা আর অভিমানে নিজেকে বড়ই ক্ষুদ্র বলে মনে হোল তাঁর । বড় অপরাধী ! কোথায় এল সে ? কার কাছে ? নকল স্বামী সেজে থাকার মতো জঘন্য কাজ করতে হবে তাঁকে ? এর চেয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়াই ঢের ভালো । কিন্তু মা, সুমনা আর বাবলু ? কি হবে ওদের ? ওরা তো তার আশায় পথ চেয়ে বসে আছে ।এসব কথা ভাবতেই হঠাৎ করেই এক দমবন্ধ করা রুঢ় বাস্তবতায় ফিরে এল সে !
দুই
মোহান্মদপুরের বাবর রোডের বি- বল্কে অফ হোয়াইট রঙের আট তলা বড়সর একটা এপার্টমেন্ট । এ বাড়ীর ছ’ তলায় হালে এসে বাসা বেঁধেছে রইস । নতুন ভাড়াটে সে । বয়স ৩৭ ছুঁই ছুঁই । দেখতে শুনতে মন্দ না। লম্বায় প্রায় ছ’ ফুটের কাছাকাছি। সুন্দর একহারা শরীর। বেশ টিপটপ , ফিটফাট। মাথা ভরতি এক রাশ মিশকালো ঢেউ খেলানো চুল , এলোমেলো । বেশ পুরুষ্ট একজোড়া গোঁফ, এটা অবশ্য এই সদ্য পাওয়া চাকরির খাতিরে ম্যানেজ করতে হয়েছে । দু’চোখে হালকা পাওয়ার গ্লাস সাথে ঈষৎ লালটে ফ্রেম। সব মিলিয়ে রইসকে আগের চেয়ে অনেক অনেক খোলতাই দেখাচ্ছে। সদ্য কেনা গাড়ীর মতো চকচকে, ঝকঝকে !
এক ইউনিট বাড়ী । এক তলার সাথে অন্য তলার সিঁড়ি আর লিফট ছাড়া যোগাযোগের কোন সুযোগ নেই । কেউ কারো বাড়ীতে কালে ভদ্রে ঢুঁ মারে না । সব ফ্লাটের সামনে ফুল ফুল গ্রিল ঢাকা চিলতে বারান্দা । ওখানে দাঁড়ালে সহজেই চোখ পড়ে নীচের তলাগুলো । উপরের তলাগুলো দেখা যায় না । ছুটির দিন ছাড়া বারান্দাগুলোতে কালেভদ্রে কাউকে কাউকে চোখে পড়ে । শুধুই শাড়ী কাপড়, সালোয়ার কামিজ , সার্ট প্যান্ট আর ছোট কাচ্চা বাচ্চাদের কাপড় চোপড়ে ঢেউ খেলে বারান্দার সীমানা ।
বাড়ীর মালিক এন কে জামান ঢাকার একটা নাম করা থানার ওসি। মহাব্যস্ত মানুষ, কালে ভদ্রে ভাড়াটিয়াদের সাথে দেখা হয় তাঁর। অবশ্য দেখা হবার তেমন দরকারও পড়ে না । জামান সাহবের স্ত্রী স্বামীর হয়ে পুরো বাড়ীটার দেখাভাল করে । দু’ দুটো দারোয়ান সকাল বিকেল বদলা-বদলি কাজ করে । মালি আর কেয়ার টেকারেরও ম্যালা কাজ । জামান সাহেবের বউ নাহিন খুব আলাপী , ছটফটে । সময় সুযোগ পেলেই সে নাকি এ তলা ও তলায় ঘুরে ফিরে বেড়ায় স্বামীর পছন্দের বাহিরে !
হররোজ সকাল আটটা বাজার বেশ একটু আগেই জামান সাহেব তিনতলা থেকে পায়ে হেঁটে নীচে নামেন , হাল্কা ব্যায়াম, এই মাঝ চল্লিশের শরীরটাকে ঠিক রাখার জন্য আর কি । এরপর কোন দিকে না চেয়ে দ্রুত গেটের সামনে পাকিং করা নীল রঙা জীপটার সামনের ছিটটায় উঠে বসেন। নাহিন তিন তলার বারান্দার বাহারি টবের গা ঘেষে স্বামীর আসা যাওয়া পরখ করে। গাড়ীতে উঠতে উঠতে জামান সাহেব তাঁর সুন্দরী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বারকয়েক হাত নাড়েন । লজ্জা লজ্জা একটু মিষ্টি মিষ্টি হাসি দেখা যায় তাঁর সুচারু গোঁফের ডগায় । সবাই নাকি বলে- আদিখ্যেতা । চল আছে, নাহিন নাকি জামান সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী । বড় বউ দেশের বাড়ীতে ফেলে পুত্র সন্তানের আশায় দ্বিতীয় বিয়ে করা । নাহিনের আজতক কোন ছেলে- পুলে হয় নি । না হওয়ার কারণ নিয়েও শোনা যায় নানা কথা ।
যা হোক এখন পর্যন্ত রইস উদ্দীনকে বাড়ীওয়ালা কিংবা বাড়ীওয়ালী কারো সাথে কোন যোগাযোগ করতে হয় নি । আনোয়ার রইসের হয়ে বাড়ী ভাড়া মিটিয়েছে । পঁচিশ হাজার টাকা ফি মাস । ইউটিলিটি চার্জ বাদেই।
রইস উদ্দীনের খুব ছোটো সংসার । বউ আর তিন সাড়ে তিন বছর বয়সী একমাত্র ছেলে । স্ত্রীর ছোট বোনও সঙ্গে থাকে । ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। তবে বেশ ক’দিন হয় রইস উদ্দীনের ফ্যামিলির সবাই শীতের পিঠা খেতে বেড়াতে গেছে দেশের বাড়ীতে , টাঙ্গাইলে। সবাই এই ফিরে এল এল বলে ।
আনোয়ার প্রতিদিন তাঁর দোস্তের খোঁজ-খবর নেয় । আবার কখনও সশরীরে দেখা করতে আসে। যেদিন আসে সেদিন আসতে আসতে তাঁর বেশ রাত হয়ে যায় । তাই কোন কোন রাতে এখানেই থেকে যায় সে ।
রইস এখন একটু একটু কোরে বোধহয় সব ব্যাপারগুলোকে মেনেই নিয়েছে , এই যেমন তাঁর নতুন চাকরি , ধরণ –এই সব আর কি । মেনে না নিয়েই বা উপায় কি ? আর এতে আনোয়ারের সুবিধা হয়েছে বেশ- এটা সেটা নানা কথা বলার ।
সেদিন রাতে রইসকে শুনিয়ে শুনিয়ে হেসে হেসে বললো সে- কি রাজকপাল তোর দোস্ত । আমার যদি তোর মত একটা হেব্বি নায়ক মার্কা চেহারা থাকতো, তো দেখতি ।
-কি দেখতি ? রইস জানতে চায় ।
-সে তুই বুঝবি না । তুই তো আবার জব্বর ভালবাসার লোক । নিজের বউ ছাড়া কিছুই বুঝিস না !
-সেটাই তো সবাই করে ? তুই করিস না ? রইস আজকাল পালটা প্রশ্ন করতে শিখেছে !
আনোয়ার সে সব কথা কানেই তুললো না । বলল - যাক ,শোন দোস্ত- বস এই অধমকেই কিন্তু আগে পছন্দ করছিলো। কিন্তু পরে আর মনে ধরলো না , এই তোকে দেখে । খুব যেন কষ্ট পেয়েছে এভাবে কথাগুলো বলল সে !
রইস বলল , তোর বসকে আবার বলে দেখ ! আমি সরে যাই ।
-হু, কোথায় শা----তুই আর কোথায় আমি ?
রইস সাধারণত এ ধরণের কথায় চুপ করেই থাকে । আনোয়ার নিজে নিজেই প্রশ্ন করে, আবার নিজে নিজেই উত্তর দেয় । এ তার পুরানো স্বভাব ।
আনোয়ারের কথার শেষ নাই । বলেই চলে- শোন শোন দোস্ত , বস কি বলেছিল শুনবি ? শোন। এই দুই মেয়েমানুষ নাকি ভেরী স্পেশাল। খুব সুন্দরী । হেবি ডিমান্ড । তাই যাকে তাকে ওদের স্বামী হলে তো আর মানাবে না। স্পেশাল কিছু চাই, এই ঠিক তোর মত ! বলতে বলতে কড়কড়ে অট্টহাসিতে পুরো বাড়িটা যেন মাথায় তুললো সে ।
তিন
তবে রইসকে এখানে পাঠানোর আগে অনেক ছবক দেয়া হয়েছে ,আনোয়ারই দিয়েছে । এই যেমন, ফ্লাটের কোন মানুষের সাথে কি ভাবে মিশতে হবে । কেমন করে সবার সাথে চলতে ফিরতে হবে । কেমন করে সেই মেয়ে- দুটোকে নিয়ে রুটিন মাফিক এদিক ওদিক ঘুরতে যেতে হবে । বাড়িতে বড়সর পার্টি এলে তা কিভাবে ম্যানেজ করতে হবে । এই সব আর কি । সব বলে টলে তারপর আনোয়ার শেষ মেষে চোখ টিপে একটা বিচ্ছিরি ইঙ্গিতই দিয়েছে। ঠিক আগের মতোই কোরে। আর তা স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগেনি রইসের ।
বড় মানুষদের সাথে উঠা –বসার উপযুক্ত করে তোলার জন্য কয়েক প্রস্ত প্যান্ট সার্ট , জুতো মুজো ইত্যাদি কেনা হয়েছে রইসের জন্য। রং খেলানো পাজামা পাঞ্জাবি , ফুল ফুল টি শার্ট এসব । ঘরে পরার জন্য থ্রি কোয়াটার ঢিলে ঢালা প্যান্টালুন আর হাতে কাজ করা ফতুয়া। যদিও এসবে মোটেই অভ্যস্ত নয় সে । সব কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকছে তার কাছে ।
ছয় সাত দিন হয় নতুন এ বাড়ীতে আসা হয়েছে তার । দিন কাটে কোনমতে । কিন্তু রাত হলেই একরাশ যন্ত্রণা এসে যেন ভর করে তাকে । মনে হয় - মস্ত এ পৃথিবীতে বড় একা সে ! চারপাশে কেউ নেই তাঁর। মা বাবা, স্ত্রী কিংবা ভাই বোন।আগের সে জীবন , সেই পরিচিত ঘড় দোর , গ্রাম , গাছ পালা , নদী জল এসব কিছুই , কিছুই আজ যেন নেই তার !
ইদানীং বাড়ীতে ফোন করা অবিশ্বাস্য ভাবে কমিয়ে দিয়েছে সে- যন্ত্রণার তীব্রতায় ! ভালো লাগে না মিথ্যে মিথ্যি এটা ওটা বানিয়ে বানিয়ে সবাইকে শোনাতে । নতুন চাকরিটা পাওয়ার কথা বাড়ীতে বলা হয়েছে বটে। কিন্তু সেটা যে কি , তা বলতে গিয়ে বারে বারে একটা উদ্ভট কাশিতে হোঁচট খেয়েছে সে ।
সুমনা, তার গভীর ভালবাসার মানুষ , তাঁর স্ত্রী, তাঁকে কিছুই বলা হয়নি রইসের । সুমনার নাকি আবার সেই মাথার পুরানো ব্যামোটা চাড়া দিয়েছে। মা কয়েকবার তাঁর কানে রইসের ফোনটা গুঁজে দিয়েছে বটে কিত্নু সে নির্বিকার । ছোট ভাই বাবলু তাঁকে নিয়মিত নিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারের কাছে। কিন্তু এবারে কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না । সুমনা তাঁর বাবার বাড়ীতেও যাবে না । তাঁর নাকি ভয় রইস যদি ফিরে এসে তাকে না দেখতে পায় । হায়রে অবুঝ নারী ! তবে এতে মন্দের ভাল হয়েছে বলে মনে হয় রইসের ।
বেঁচে গেছে , বড় বাঁচিয়ে দিয়েছে রইসকে আপাততঃ সুমনার এই পুরানো রোগ । তবে রইস ভেবে রেখেছে , একটা পাকা বাঁধানো ডাইরি কিনবে সে- কালকেই । আর তাতে রোজ রোজ রাতে সুমনাকে নিয়ে নিজের মনের যত না বলা কথামালা লিখে রাখবে সে , ভালবাসা ভালবাসার যত কথা ! তারপর একদিন দেশে ফিরে সে সুমনাকে তা উপহার হিসাবে দেবে । ততদিনে সুমনা নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে !
আজ আবার ফোন করেছিল একজন । একজন ? না না দু’জন ! সেই দু’জন , সেই মেয়ে দু’টি , যাদের জন্য আজ এতকিছু !

চার
বিকেল পাঁচটা ছুঁই ছুঁই । একটা ঢাউস অফ হোয়াইট মাইক্রোবাস আট তলা বাড়ীটার সামনে এসে দাঁড়াল । গাড়ীতে দুজন মহিলা , সাথে তিন সাড়ে তিন বছর বয়সী একটা টুকটুকে ছেলে। গাবতলী আসতেই না আসতে যদিও ওপাশ থেকে দু দু’বার ফোন এসেছে রইসের কাছে !
আনোয়ার দারুন উত্তেজিত । রইসকে সাথে করে সে অনেকক্ষণ ধরে ঘর বার , বার ঘর করছিল । গাড়ীটা থামতেই আনোয়ার যেন ধড়ে প্রাণ খুঁজে পেল ।মাইক্রোবাসের দরজাটা সে নিজেই খুলে দিয়ে তৃষ্ণার্ত কাকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ।
প্রথমে যে মেয়েটি নামল, সে সুন্দর একটা জমকালো কালো রঙের বোরকা পড়া - আগাগোড়া মোড়া শরীর, কেবল দু চোখের নেকাব খোলা । ছিপছিপে । পায়ে নাতিদীর্ঘ হাই হিল - মেরুন । তবে তাঁর বোরকার সামনের দিকটা পুরোটাই খোলা । এ কারণে পেটের প্রায় উপর অংশ থেকে পায়ের নীচ পর্যন্ত সবটাই দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির পরনে হাল্কা গোলাপি চাপা পাজামা আর কালো ডীপ লাল ফুল ফুল লম্বা কামিজ। কাঁধে ধাউস একটা কালো রঙের বিদেশী ব্যাগ । ব্যাগের স্ট্রিপ এর সাথে একটা লাল গোলাপ মাথার কাঁকড়া ক্লিপ দিয়ে আটা । মেয়েটি নেমেই দু হাত বাড়ালো, গাড়ীর ভেতরের দিকে । ভেতরের জন এতক্ষণে একটা ছোট বাচ্চাকে সামলাচ্ছিলো । সে বললে ; এই নাও আপু , কুটুকে ধরো ।
যাতে কেউ শুনতে না পায় এভাবে আনোয়ার আস্তে করে বললো - এই ব্যাটা , শোন তাহলে ঐ মেয়েটি তোর শালি। আর এ তোর নতুন বউ । রইস দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল !
কুটু গাড়ী থেকে নেমেই তাঁর মায়ের গলা ধরে কান্না জুড়ে দিল । আনোয়ার অনেক দিনের চেনা মানুষের মতো বলে উঠল- আমাকে দিন ভাবী , আমাকে দিন । আমি ওকে সামলাই । ও পক্ষ হ্যাঁ , না কিছুই বলল না ।
এবারে দ্বিতীয় জনের পালা । সে টগবগে পা ফেলে গাড়ী থেকে নামলো । প্রথম জনের তুলনায় মাথায় বেশ একটু খাটোই হবে সে , তবে খাটো বলতে ঠিক যা বোঝায় ঠিক তা নয় । সেও বেশ বাহারী একটা বোরকা পরেছে আগের জনের মতোই । তবে তাঁর পুরো মুখটাই খোলা । নেকাব টানা নয় । তাঁর চাঁদপানা মুখটা দেখে আনোয়ারের ভিমরি খাওয়ার যোগার । এত রূপসী হয় নাকি মানুষ ? যেমন গায়ের রঙ , তেমনি ভাসা ভাসা দু চোখ । একবারে বলিউডের নায়িকাদের মতো । এত সুন্দর মেয়েরা কেন যে এ ব্যবসায় আসে, সে মনে মনে ভাবে ।
গাড়ীর ড্রাইভার মালসামানা নামাতে নামাতে একা একা হিম শিম খাচ্ছে । রইস তাতে দ্রুত হাত বাড়াল । তা দেখে আনোয়ার খুব মজা পেল যেন । মনে মনে বলল - ব্যাটা , সেই তো পোষ মানলিই, খামোখা আগডুম বাগডুম বাজালি এতদিন ।
সবাই এগিয়ে গেল লিফট বরাবর ।রইস দু চোখ তুলে ভয়ে ভয়ে তাকাল উপরের দিকে। আজ কেন যেন জামান সাহেব সকাল সকাল বাড়ী ফিরেছেন আর একভাবে তাকিয়ে দেখছেন তাদের সবাইকে । বেশ ভয় পেয়ে গেল রইস। অথচ আনোয়ারের এ ব্যাপারে কোন ভয় ডর নেই !

পাঁচ
সকাল হতে না হতেই দু বোনের সাজ সাজ ভাব । যে যার মতো ঘর গুছাচ্ছে । এটা ওটা ওলোট পালোট করছে দু’ জন মিলে ।কাঁচের জানালার পরদার ফাঁক দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে । আর পাঁচ দশটা সংসারী মেয়েরা যেমন করে -তেমনই ।
ওরা অবশ্য রইসকে দেখতে পাচ্ছে না । সেই কেবল তাদের দেখতে পাচ্ছে । আচ্ছা লুকিয়ে দেখা কি ঠিক ? কোনজন বড় আর কোনজন ছোট তা ঠিক বুঝতে পারলো না সে । একই রকম কেন দেখাচ্ছে দুজনকে ? নাহ, বেশ কিছু অমিলও আছে । একজন লম্বায় বেশ একটু বড় । ছোটজনকে চেনা গেছে , একটু বেশী চটপটে আর ঊড়ুক্কু স্বভাবের সে । বড়জনকে খুব শান্ত বলে মনে হোল , একেবার শীতল কোমল দীঘির মত - দু চোখ যেন জল ভেজা বড় উতলা ।পিঠ অব্দি খোলা কালো দীঘল চুল । ছোট জনের চুল খাটো করে ছাটা । একটু লালচে । রঙ করা ?
দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকাল রইস । বেলা প্রায় নটা বাজে । পেটে খিদের ইঁদুর চোঁ চোঁ করছে । বাহিরে গিয়ে নাস্তা সেরে আসতে পারে সে আগের মতন । কিন্তু এখন কি সেটা করা ঠিক হবে ? এমনও তো হতে পারে ওরা নিজেরা নিজেদের মতো কোরে চা বিস্কুট কিছু একটা খেয়ে নিয়েছে । হতেই পারে । ওদের জন্য কি শেষমেস না খেয়ে থাকতে হবে তাঁকে?
কে একজন বারান্দা পাশ কাটিয়ে ওদিকে গেল । রান্না ঘর, না ডাইনিং, না বসার ঘরে কিছু বোঝা গেল না । ফিরে এসে সে ফ্রিজারের হাতলে হাত রাখল । ওহ, আগের দিনে আনোয়ার যে এসে সব বাজার- টাজার করে দিয়ে গেছে, তা মনেই ছিল না রইসের ।বাঁচা গেল । ওরা বোধহয় রান্না ঘরেই গেল ।নাস্তা বানাতে কি ?
ছোট বোনের নাম সুনন্দা । আর বড় বোনের নাম সুবর্ণা । একজন আরেক জনকে নন্দা আর বর্ণা বলেই ডাকছে । মনে হয় পিঠেপিঠি । তা না হলে তো নাম ধরে ডাকার চল কমই ।
যা হোক প্রায় ঘন্টা আধেক পরে ছোট বোন নন্দা দরজার পর্দাটা উঁচিয়ে বলল , আসব ?
অপ্রস্তুত রইস বিছানা থেকে সটান উঠে দাঁড়াল মেঝেতে।
-হাঁ , হাঁ আসুন ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে কেবলি বললো সে ।
-খিদে নেই আপনার ? হাসতে হাসতে জিঞ্জেস করলো নন্দা । যেন কতদিনের চেনা । তারপর আর একটু চপল হেসে বলল , নাকি আমাদের হাতে খেতে বারণ ?
-কি যে বলেন, রইস ভীষণ বিব্রত বোধ করলো ।
-না , না , আসুন আসুন । আপু ডাকছে । নন্দা জোর গলায় হাঁকলো আবারো ।
পাউরুটি টোস্টারে ছাঁকা হোয়েছে আর তাঁর সংগে ডিম পোঁজ । টি পটে গরম গরম দুধ চা ।

এক সাথেই খেতে শুরু করলো তিন জনা । নন্দাই টিপট থেকে চা ঢেলে দিল ।
একটু কি বেশী সময় ধরে এদের সাথে থাকলো কি সে ? খাবার অছিলায় ? রইস মনে মনে ভাবল । এক সংগে না খেয়ে পরে খেলেও কি চলতো না ?
ততক্ষণে কুটুর ঘুম ভেঙ্গেছে। বর্ণা মানে ওর মাই দৌড়ে গেল । কুটু ঘুম ঘুম চোখ মেলে কি জানি কেন যেন বলে ফেললো - সে তাঁর বাপির কাছে যাবে । বড় অবাকই হোল রইস । সে এখন কুটুর বাবা । ছোট এই শিশুটাকে বলিয়ে পড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে কি ! কি জানি !
অগত্যা কুটুকে কোলে নিয়ে তার কান্না থামাতে হল রইসের । দু’ বোন তা দেখে হেসে কুটিকুটি ! তবে বর্ণা হাসল একটু ঠোঁট চিপে আর নন্দা খিল খিল করে !
সারাদিন এভাবে ওভাবে গেল। দুপুরের খাবার খাওয়া হোল তেমনি সকালের মতো একসাথে । এবার নন্দা আর সে পাশাপাশি । ওপারে মুখোমুখি বর্ণা । যদিও সে কথা বললো খুবই কম , আগের মতই । তাঁর দু’ চোখ কেবলই যেন তার হয়ে কথা বললো । একবার রইসের দিকে চেয়ে হাসলোও একটু সে । আগের মতই শব্দ না করে ঠোঁট চিপে ।
বিকেলে ঘুম ঘুম চোখে রইসের কানে এল , অচেনা সেই দুই নারীর লুটোপু্টি খেলা । দুজনেই কি কলকলিয়ে হাসছে ? না নন্দার গলা । তো এত খিল খিল হাসির কি হোল ? বর্ণাও তো হাসছে বেশ। তাহলে তাকে যতটা গম্ভীর মনে হয় , তা নয় সে । আর হবেই বা কি ভাবে ? এসব মেয়েদের তা হতে নেই। আসলে সেইই বোকা । দাঁড় কাককে ময়ূর ভেবে বসেছিল সে ।
সেদিন রাত হতে না হ’তেই টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোয় রইস তাঁর ডায়েরী খুলে বসলো - সুমনার কথা ভেবেই । কি লিখবে সে সুমনাকে ? সারাদিন তো কই এমন করে তাকে মনে পড়লো না তাঁর ? নিজেকে খুব অপরাধী মনে হল রইসের ।এই মেয়ে দুটোর পাল্লায় পরে সে কি এত তাড়াতাড়ি সব ভুলতে বসেছে , নিজেকে , তাঁর অস্তিত্বকে ? সুমনাকে ? মন বলল – নাহ! কিন্তু সুমনাকে সব সত্যি কথা বলতে পারবে তো সে ? তারপর সব ভাবনা বাদ দিয়ে সে লিখতে শুরু করলো- সু--- সু আমার । সবাই বলে ভালবাসা কাঁদায় । তাই , তাই কি ?আমি কি কাঁদছি তোমার জন্য ?
ছয়
আজ কেমন দিন যাবে কে জানে ? সকাল দশটার দিকে কলিং বেলটা বেজে উঠলো যেন অযাচিত ভাবেই । কে ? কে ? এ সময় আনোয়ারের তো আসার কথা নয় । আর আসার আগে সে তো ফোন করেই আসে !
কে এল ? নন্দা গিয়ে দোর খুলে দিল । নাহিন , জামান সাহেবের স্ত্রী । এসেই হৈ চৈ শুরু করে দিল সে । হাব ভাব দেখে মনে হল বর্ণা আর নন্দা তাঁর কতদিনের চেনা , না চেনা হলেই বা কি আসে যায়। মেয়েদের ভাব জমতে যেমন দেরী হয় আবার তেমন ভাব হলে তা যেন শেষ হতেই চায় না । এদের ক্ষেত্রেও হয়তো তাইই হয়েছে।
পাশের ঘর থেকে ওদের আনন্দ উল্লাস ভেসে ভেসে আসছে !নাহিন একটা কথা বলে তো বর্ণা আর নন্দা হেসে গড়াগড়ি খায় । আবার বর্ণা আর নন্দা কিছু বলে তো নাহিন খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ।
রইস এর কি সেই জমকালো আড্ডায় যোগ দিতে ইচ্ছে করছে । কে জানে ?কিন্তু সে কে ? ভাড়াটিয়া স্বামী বইতো কিছু নয় । নাহিন নিশ্চয় এসব কথা জানে না । জানলে ? আচ্ছা নাহিন যদি তাঁর সাথে পরিচয় করতে চায়। বলে যদি একটু ডাকো না ভাই সাহেবকে । আলাপ করি । তখন কি করবে সে ? যাবে না ? না যেতে তো হবেই তাঁকে !
তাই হোল । একটু পরে রইসকে ভীষণ অবাক করে দিয়েই ওরা তিনজন তাঁর রুমটায় এসে ঢুকলো।
নাহিন বর্ণাকে বলল , ভাইয়া না ? বর্ণা কিছু বলার আগেই নন্দা চাপা স্বরে বলল , হু তা ছাড়া আর কে হবে বল!
নাহিন খুটিয়ে খুটিয়ে অনেক অনেকক্ষণ ধরে রইসকে যেন দেখতে থাকল । বেশ একটা অসস্তিতে পড়ল রইস । খুব লজ্জাও পেলো । অথচ এই মেয়েগুলোর যেন কোন লাজ লজ্জা নেইই । একজন অচেনা পুরুষ মানুষকে নিয়ে এত মাখামাখি করা কি শোভা পায় ?
রইসের পরনে স্টাইপ পাজামা । গায়ে লাল হলুদ টাই ডাই ফতুয়া । যা হোক তাঁকে ফেলে এক সময় নাহিনের চোখ গড়ালো সেই টাই ডাই ফতুয়ার দিকে ।
- খুব সুন্দর তো , কোথায় থেকে কিনেছ ভাই এটা ? বর্ণাকে জিঞ্জেগ করলো নাহিন ।
-আড়ং থেকে , বর্ণা অবলীলাক্রমে মিথ্যে মিথ্যি বলে দিল।
-অহ !
নন্দা বলল , ভাইয়া ড্রয়িং রুমে একটু আসবেন।একসাথে বসে বেশ জম্পেশ আড্ডা দেয়া যাবে ।
আর কুটুর কাটুর ? রইস না যাবার জন্য মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করলো ।
বর্ণা বলল ,ঘুমুচ্ছে ঘুমাক না । তারপর রইসকে অবাক করে দিয়ে সে বল্ল, নাহিন আপু ও কিন্ত খুব ভাল হাত দেখতে পারে।
হাত দেখা ? বর্ণা জানল কিভাবে ? তার হাত দেখার বাতিক আছে বটে ! উহ, নিশ্চয় ঐ আনোয়ার ব্যাটা বলেছে । সেই তো কেবল তার এই নেশার কথা জানে । আর তো কেউ না !
যাই হোক , প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও এই তিন অচেনা রমণীর হাত দেখতে দেখতে কখন যে সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর হয়ে এল তা রইস একেবারেই ঠাহর করতে পারলো না রইস!
ম্যাগ্নিফাইং গ্লাশে হাত রাখতে রাখতে একসময় কেবল তাঁর মনে হল, কি ব্যাপার ? এদের বাড়ী ঘর , খাওয়া দাওয়া নেই নাকি ? এ দু’বোন না হয় গোল্লায় যাওয়া । কিন্তু নাহিনের তো ঘর সংসার আছে । যতই স্বামী থাক এখন অফিসে ।
এর মধ্যে অবশ্য নাহিন দু’ তিন বার তাঁর কর্তার সাথে কথা বলেছে মোবাইলে । কথা আর সেই সাথে খিলখিলিয়ে হাসি, ভারী লিকারের সাথে জমাট মিল্ক পাউডার ! রইসের বিরক্ত লাগে বটে কিন্তু তত মন্দও তো লাগে না । কথা শেষ না হতে হতেই আবার তিন রমণীর মহা ফিসফিসানি । নিশ্চয়ই ভাব-ভালবাসার কথা !
রইসের হঠাৎ কোরেই সুমনার কথা মনে হল । সুমনা হলে কি করতো এ পরিস্থিতিতে? সে কি এত তাড়াতাড়ি অচেনা মানুষের সাথে ভাব করতে পারতো ? উহ , না । মানুষ বুঝে ভাব করে করার মস্ত গুন আছে তাঁর । সুমনার কথা মনে হ’তেই ভীষণ রাগ আর অভিমান জমা হোল নিজের উপরে । কেন যে সে আনোয়ারের কথা মেনে নিল , না নিলে কি হতো ? দিনকে দিন এই বারোয়ারী মেয়েদু’টোর সাথে থেকে থেকে সেও কি নেহাত একটা বাজে লোক হয়ে যাচ্ছে না?
দ্বিতীয় দিনও কেটে গেল । রাত এলেই রইসের কেন জানি কেবল সুমনার কথা বেশী বেশী করে মনে পড়ে , হাজার চেষ্টা করেও সে তাঁকে এড়াতে পারে না । আবার সেই ডায়েরী ! সু--- সু আমার ! ভালবাসার খরা নেই , নেই কি ?
সাত
পরের দিনগুলো যে কেমন যাবে , তা আঁচ করতে চাইছে রইস । এর পর কি ? ভাবতে গেলেই দম বন্ধ হয়ে আসে তাঁর।
আজ অনেক সকাল সকাল উঠেছে দু’ বোন । বেশ একটা ব্যস্ত- সমস্ত ভাব । কুটুর ঘুমুচ্ছে । ঘুমাক । অন্যদিন অন্য রকম হয় ।কুটুরও তাঁর মামনিদের সাথে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে । আজ যেন বেহুশ হয়ে ঘুমুচ্ছে ।
নন্দা বলল, আপনি রেডী তো ? আমাদের সাথে যেতে হবে ।
-কোথায় ? জিজ্ঞেস করতে যেয়েও চুপ করে থাকল রইস । এরই মধ্যে আনোয়ারের ফোন এসেছে দু’ বার ।
ঘণ্টা খানেক পড়ে একটা চকচকে গাড়ী এসে দাঁড়াল বাহিরে ! তাঁরা সবাই উঠে বসলো গাড়ীতে । রইস দু’ বোনকে আনোয়ারের কথা মতো একটা তিন তারা হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল ।তারপর কুটুকে নিয়ে সারাদিনমান হেথাহোথা ঘুরপাক খেয়ে মরলো বসন্তের ঝরা পাতার মতো ।
বর্ণা আর নন্দার হাতের রেখা দেখে সে যা অনুমান করেছিল তার সবটাই কি ভুল ? রইস নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করলো ।উহ , এমন বাজে খোলামেলা সাজ-পোশাকে কিভাবে বেড়লো মেয়েদু’টি । ওদের দেখে চিনতে অসুবিধা হোচ্ছিল তাঁর । ছিঃ !
ঠিক সাতটার সময় হোটেলের সামনে থেকে দু’বোনকে উঠিয়ে নেবার কথা । ওদেরকে কি অবস্থায় দেখবে তা ভাবতেই রইসের মুখটা ছাই রঙা হয়ে গেল । লজ্জা আর পাপ বোধে তা ক্ষত বিক্ষত !
ফেরার পথে গাড়ীতে কারো সাথে কারো কথা হোল না তেমন । সবাই বড়ই নিশ্ছুপ ! মনে হয় , বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে সবার উপর দিয়ে । কিন্তু ওরা কেন চুপচাপ ? এরা তো এসবে অভ্যস্ত !
এমনিই চলতে থাকলো ।
ওদের সাথে খাওয়া, কথা বলা একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে রইস । ভাল্লাগে না । কিছুই ভাল লাগে না তাঁর । দম বন্ধ করা কড়করে পরিবেশে কেবল মরে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর ।
রাতে সুমনাকে উদ্দেশ্য করে কিছু লেখাই যেন তাঁকে কাছে পাওয়া । রইলও বা সে স্পর্শের বাহিরে । তবুও সে আছে , নেই কি তাঁর অন্তর জুড়ে? তেমন কোন কথাই হয় না সুমনার সাথে । কেবল হা , হু । সুমনার শরীর আগের মতই । ভাল নয় । রইস জানে সে গেলে সুমনা নির্ঘাত ভাল হয়ে যাবে ! সব অনুভবে আছো তুমি ! আছো তুমি আমার বিশ্বাসে
আর নিঃশ্বাসে ?
সে রাতে ঘুম আসছিল না রইসের । গভীর রাতে দূর থেকে কান্নার করুণ সুর ভেসে এল । কে কাঁদে ? রইস বারান্দায় গেল । শব্দটা পাশের ঘর থেকেই । কে কাঁদছে ? বর্ণা না নন্দা ? নন্দা না বর্ণা ? দুজনেই , দুজনেই !
আট
আজ যা ঘটে গেল তাঁর জন্য রইস মোটেও প্রস্তুত ছিল না । আনোয়ার খুব সকালেই ফোন কোরে জানালো আজ বাসায় ভি আই পি গোছের লোকজন আসছেন। হোক , তাই বলে সরাসরি বাসায় আসা? আনোয়ারের সাথে দীর্ঘক্ষণ এ বিষয়টা নিয়ে বাদানুবাদ হোল রইসের । না বস তাইই চেয়েছেন । এখন থেকে এমনতরো বাড়িতেও আসা -আসি চলবে । এটাই নাকি সেভ !
বর্ণা আর নন্দা সকাল সকাল নাস্তা সেরে নিল ।ফাঁসির দড়িতে ঝোলার পূর্ব প্রস্তুতি নাকি ? রইসের মনটা কেন জানি নীল বিষাদে ভরে গেল । রইস একা একাই এলো নাস্তার টেবিলে । রাতের ভারী কান্না মেয়ে দুটোকে কি রইসের কাছে টানছে ?
একটা কাজ অবশ্য প্রথম দিনের মতই করে নন্দা । রইসকে রোজ সকালে টি-পট থেকে চা ঢেলে দেয় ফুল ফুল সাদা নীল কাপে , কাপের নীচে শুভ্র পিরিচ । রইসের মন্দ লাগে না । বর্ণাও রুটিন মাফিক দু’ একটা কাজ করে বটে আর সেটা হোল কুটুরকে রইসের কোলে তুলে দেয়া । কোন কোনদিন অনেক রাতে ঘুমন্ত ছেলেকে নিজেদের ঘরে নিয়ে যাওয়া । রইসের এসব মন্দ লাগে না । তখন কেমন যেন আপন আপন লাগে বর্ণা আর নন্দাকে । বর্ণাকে কি একটু বেশী বেশী ? কুটুরের মা বলে নাকি , তাঁর পাতানো বউ বলে ?
আহা , তাঁর আর সুমনার যদি কুটুর মতো সুন্দর একটা বাবু থাকতো !
আনোয়ার একটু আগে এসে কুটুরকে খেলনা কিনে দেবার লোভ দেখিয়ে বাইরে নিয়ে গেছে । কুটুর তাঁর বাপিকে ছাড়া যাবে না , তবুও !
আজ বর্ণা আর নন্দার সাজ- পোশাকটা বেশ একটু অন্যরকম। একেবারেই অন্যরকম ।
বর্ণার পরনে লাল পাড় আকাশ নীল শাড়ি । কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ । দু’ হাত ভর্তি বেলোয়ারী কাঁচের চুড়ি । দীঘল কালো পিঠ অবধি চঞ্চল ঝর্না ধারার মতো ঢেউ খেলছে তো খেলছেই ,সোনালি দুপায়ে তাঁর নকশী কাঁটা আলতা । এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে এমন সুন্দর সাজে নিজেকে সাজাল সে ? আকাশলীনা ?
নন্দা বরাবরই আলটা মডার্ন । আজ সেও পুরোপুরি বাঙালি রমণী । হলুদ লাল ডুরে রাজশাহী সিল্ক শাড়ি আর তার সাথে মানিয়ে সোনালি মেটাল গহনায় বড় অপরূপা সে ।পায়ে একটু লম্বায় উঁচু হিল , সাদা পাথর বসানো লাল রঙ্গা । কপালে জ্বলজ্বলে লাল টিপ । সূর্যমুখী ?
এদের দেখতে দেখতে কি রইস সুমনার কথা ভুলে গেল ?
সেই দুজন এলো । বেশ হোমরা চোমড়া গোছের । ঘড়ির কাঁটা এগারো ছুঁই ছুঁই । মহাব্যস্ততার ভাঁজে বাক্সবন্দি তাঁরা ।
অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লোকটি একটু বেশী কথা বলে মনে হোল । যদিও বাঁচাল না তবে প্যাঁচালই ! পাশে বসা অন্যমনস্ক তরুণ বয়সী ফিটফাট অন্যজন ওপাশের কথাগুলো গিলছে । এসবের মধ্যে হঠাৎ কোরেই রইসের হাত দেখার বিষয়টা চলে এল । রইসের ইচ্ছে কোরছিল এ ব্যাপারে কিছু না বলতে কিন্ত আনোয়ারের নির্দেশনা মনে হোতেই- সে তাঁর ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসটা ঘর থেকে নিয়ে এল । হাত দেখা চললো কোনমতে।
বয়স্ক লোকটির যেন আর তর সইছে না। হাত দেখার ফাঁকে দু’ ঠোঁটে বিশ্রী একটা শীষ কেটে সে বলে উঠলো- রইস সাব , র্যা খেন তো এসব প্যানপ্যানানি । আপনার বিবি আর শালীরে এবার ডাকেন। দারোগা সাব আর তার বিবি তো দোনো মাইয়ার চেহারা সুরুতের পাবলিসিটি কোরতে কোরতে ভিমরি খাবার জোগাড় !
জামান সাহেব আর নাহিন ? এরাই তাহলে আনোয়ারের বস ! রইসের কাছে দ্রুত সব যেন জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !
রইস মিয়া- এহনও লেপা পুতুলের মতো বইস্যা আছে ক্যান ? ডাকেন , ডাকেন , পয়সা দিয়া কিনছি না তাঁদের ? ম্যালা হইছে , এবার ডাক দ্যান । প্রাণ ভইরা দেহি!
এর পর কি যে হলো রইস তা নিজেও জানে না । কোথা থেকে এক হিংস্র বাঘের ক্রুরতা তাঁর সর্বশরীর আর মনটাকে গ্রাস করে ফেললো । হাতের কাছের ভারী ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসটা দিয়েই সে মুখোসধারী হায়েনাটাকে সজোরে আক্রমণ কোরে বসলো । তারস্বরে আত্ন চীৎকার ! ছুটে এল বর্ণা আর নন্দা ! আর কি কেউ ? কে জানে । আর কিছুই মনে করতে পারলো না রইস !

নয়
দিন দুই পরে যখন কিছুটা জ্ঞান ফিরলো তখন রইস নিজেকে নিজের ঘরের বিছানায় পড়ে থাকতে দেখলো। জ্বরে গা যাচ্ছে পুড়ে তাঁর । বর্ণা তাঁর কপালে জলপট্টি লাগিয়ে দিচ্ছে পরম মমতায় আর নন্দা গভীর মমতায় তার দিকে ফ্যালফ্যাল কোরে চেয়ে আছে !
রইসের হঠাৎই মনে হল সে যেন নিজের বাড়ীতে । সিরাজগঞ্জের সেই উল্লাপাড়ায় । চারপাশে পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল । উপরে দোচালা টিনের ছাদ । ছাদের মাথায় মা পাকা কূল শুকোতে দিয়েছে। আচারের বয়ম , একটু উঁচু ইটের কার্নিশ এর কোনে । আর তার একপাশে পুঁই শাকের লকলগে ডগা । সিমের জাম সাদা ফুল ! মা পরম মমতা ভরে তাঁর পায়ে ঘষে ঘষে তেল মালিস করে দিচ্ছে আর আলতো হাতে তাঁর মাথায় হাত বুলোচ্ছে সুমনা !
আনোয়ার নিয়মিত রইসের শরীরের খোঁজখবর রাখে । এরই মধ্যে রইসকে অবাক করে দিয়ে বাড়ীওয়ালা আর তাঁর বউকে এসে তাঁকে দেখে গেছে । শরীরের অবস্থার খোঁজ -খবর নিয়েছে । এসব কি কোন বড় ঝড়ের পূর্বলক্ষণ ? আনোয়ার সেদিন কথাচ্ছলে আসল কথাটাই যেন বলে ফেলেছিল । এসব ফাঁদে যে একবার পরে সে নাকি আর বেরোতে পারে না । কিন্তু তাঁকে তো বেরোতেই হবে । যেমন কোরেই হোক ফিরে যেতে হবে তাঁর সুমনার কাছে । দ্রুত ! কিন্তু এদের এ অবস্থায় ফেলে সে যাবে কি কোরে ? এরা কি -----?
নাহ , কোন মোহ নেই । কবে যাবে বাড়ী ফিরে যাবে সে ? আজ , আজই সময় । বর্ণা আর নন্দা বাহিরে গেছে , নিজেদের কাজে । রইস দরজা লক এঁটে পা টিপে টিপে বাহিরে এসে দাঁড়ায় , হাতে তার গ্রাম থেকে নিয়ে আসা সেই রঙ ক্ষয়ে যাওয়া হ্যান্ড ব্যাগ, ভেতরে পুরানো কাপড়-চোপড় ! আর কিছু না ? সেই ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস আর সুমনাকে লেখা সেই ডায়েরীটা ? সুমনার কাছে এতদিন বাদে ফিরে চলেছে সে। কিন্তু বাড়ীওয়ালা তার বউ দেখলেই যে বিপদ বাড়বে তা বেশ বুঝতে পারে সে ! কিন্তু বর্ণা আর নন্দাকে একা ফেলে যাবেই যখন সে, কিছুই কি দেয়ার নেই তাঁর সেই অভাগী মেয়ে দুটোকে ? ওদের এত সেবা –যত্ন আত্নি ? ভালবাসা ? ভালবাসা ?
কি মনে করে আবার পায়ে পায়ে ঘরে ফিরে এল রইস । সুমনাকে মনে কোরে এতদিনের লেখা ডায়েরীটা সে সযত্নে রেখে দিল ডাইনিং টেবিলের ছোট্ট ফুলদানিটার পাশে । এরপর পরম মমতায় গোটা গোটা হাতে লিখল "Love is like the wind, you can't see it, but you can feel it."
ওরা কি বুঝবে ? ভালবাসা , ভালবাসা ?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement